শফিকুজ্জামান খান মোস্তফা, টাঙ্গাইল : টাঙ্গাইলজুড়ে দেখা দিয়েছে তীব্র বিদ্যুৎ সংকট ও ভয়াবহ লোডশেডিং। জেলায় বিদ্যুতের মোট চাহিদা প্রায় ৩৭০ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ২২৩ মেগাওয়াট। চাহিদার তুলনায় বিপুল ঘাটতির কারণে দিন-রাত দফায় দফায় লোডশেডিং হচ্ছে। এতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন, স্থবির হচ্ছে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড।
সংশ্লিষ্ট বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, টাঙ্গাইলের বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) আওতাধীন এলাকায় বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৭০ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১১০ মেগাওয়াট। অন্যদিকে, গ্রামীণ জনপদে বিদ্যুৎ সরবরাহের দায়িত্বে থাকা পল্লী বিদ্যুতের চাহিদা ২০০ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ মিলছে ১১৩ মেগাওয়াট।
চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় জেলার শহর ও গ্রামাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় এক থেকে দুই ঘণ্টা পরপর লোডশেডিং হচ্ছে। এতে প্রচণ্ড গরমের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন শিশু ও বয়স্করা। ফ্যানসহ প্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক যন্ত্র চালাতে না পারায় ঘরে-বাইরে চরম অস্বস্তিতে থাকতে হচ্ছে মানুষকে।
বিশেষ করে রাতে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় ব্যাহত হচ্ছে ঘুম। এতে মানুষের স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বিদ্যুৎ সংকটে পানি সরবরাহ, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা এবং অন্যান্য দৈনন্দিন কাজও ব্যাহত হচ্ছে।
কলকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত
বিদ্যুৎ সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মিল-ইন্ডাস্ট্রি ও বড় বড় কলকারখানা। ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক উৎপাদন কার্যক্রম। উৎপাদন সচল রাখতে বড় প্রতিষ্ঠানগুলো বাধ্য হয়ে ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করছে।
এতে জ্বালানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচও বাড়ছে। অন্যদিকে, ছোট ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো বাড়তি জেনারেটর ব্যয় বহন করতে না পেরে লোকসানের মুখে পড়ছে। বিদ্যুৎ সংকটের কারণে বিভিন্ন মার্কেট ও দোকানপাটের ব্যবসা-বাণিজ্যেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
সংকটে ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প
টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্পেও পড়েছে লোডশেডিংয়ের বিরূপ প্রভাব। বিদ্যুৎ না থাকায় দিনের বড় একটি সময় তাঁত চালানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে কমে গেছে উৎপাদন।
সময়মতো অর্ডার সরবরাহ করতে না পারায় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন তাঁত ব্যবসায়ীরা। একই সঙ্গে কাজের সুযোগ কমে যাওয়ায় অনিশ্চয়তায় পড়েছেন তাঁতশ্রমিকরাও।
এটিএম লুঙ্গি ফেব্রিক্স ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দিলীপ কুমার বলেন, “বিদ্যুৎ না থাকলে উৎপাদন বন্ধ, আর উৎপাদন বন্ধ মানেই লোকসান। দিনে ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। দ্রুত নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকারের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।”
পোলট্রি খামারেও বাড়ছে ক্ষতি
বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব পড়েছে জেলার পোলট্রি খামারগুলোতেও। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় খামারের ফ্যানসহ প্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম চালানো যাচ্ছে না। তীব্র গরমে খামারে মুরগি মারা যাওয়ার ঘটনাও ঘটছে বলে জানিয়েছেন খামারিরা।
পরিস্থিতি সামাল দিতে অনেক খামারি বাধ্য হয়ে জেনারেটর ব্যবহার করছেন। এতে বাড়তি জ্বালানি খরচের চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন ক্ষুদ্র খামারিরা।
বিদ্যুৎ বিভাগের বক্তব্য
টাঙ্গাইল পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার মো. ছানোয়ার হোসেন জানান, পল্লী বিদ্যুতের আওতায় জেলায় বিদ্যুতের চাহিদা ২০০ মেগাওয়াটের বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে ১১৩ মেগাওয়াট। ঘাটতির কারণে ঘন ঘন লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার কাজ করছে।
টাঙ্গাইল বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিউবো) তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ওবাইদুল ইসলাম বলেন, জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদার তুলনায় কম বরাদ্দ পাওয়ায় সাময়িকভাবে লোডশেডিং করতে হচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে।
ঢাকা/এসএস




















