ভিয়েনা ০৪:১০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম :
ইসরায়েলে নেতানিয়াহুকে হটাতে বিরোধী জোটের দিকে সহযোগিতার হাত বাড়াল আরব দলগুলো লালমোহনে সড়ক দুর্ঘটনায় বৃদ্ধের মৃত্যু, ঘাতক যান অজ্ঞাত শিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষকদের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ: শিক্ষামন্ত্রী দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা, তবু যুক্তরাষ্ট্রে বলসোনারো? চোটে মুশফিক ছিটকে গেলেন, মিরপুর টেস্টে খেলছেন হৃদয় বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়াতে জাপানকে প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান লালমোহনে টেন্ডার ছাড়াই অর্ধ কোটি টাকার গাছ কর্তন! ইউএনও’র নীরব ভূমিকা ঝালকাঠিতে যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত ঝালকাঠিতে ইলিশ রক্ষার অভিযানে হামলা, আহত ৭ চরফ্যাশনে কালবেলার ৪র্থ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন

মোবাইল প্রযুক্তিতে স্বপ্ন গড়ছেন ভোলার মহিমা

  • EuroBanglaTimes
  • আপডেটের সময় ১২:০৯:৪২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৩ মে ২০২৬
  • ৭৭ সময় দেখুন

মনজুর রহমান,ভোলা : মোবাইল প্রযুক্তিতে স্বপ্ন গড়ছেন ভোলার মহিমা।
‎যিনি  এক সাহসী মুখ। দারিদ্র্য ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতাকে পেছনে ফেলে মোবাইল প্রযুক্তি খাতে নিজেকে গড়ে তুলেছেন দক্ষ কারিগর হিসেবে।
‎ভোলা সদরের ধনিয়া ইউনিয়নের তালুকদার বাড়ির যৌথ পরিবারে বেড়ে ওঠা মহিমার শৈশব কেটেছে অভাবের সঙ্গে লড়াই করেই। কৃষিশ্রমিক বাবার সীমিত আয়ে ১০ সদস্যের সংসার চালানো ছিল কঠিন। এসএসসি পাসের পর অর্থসংকটের কারণে থেমে যায় তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা। তবে থেমে যায়নি তাঁর স্বপ্ন।
‎সমাজের প্রচলিত ধারণা ভেঙে প্রযুক্তিনির্ভর পেশায় যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন মহিমা। শুরুতে ভোলার সু পরিচিত নবারণ সেন্টারের মোবাইল সার্ভিসিং প্রতিষ্ঠান ‘আকতার মোবাইল টেলিকম’-এ প্রশিক্ষণ নেন তিনি। সেখানে হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার–সংক্রান্ত বিভিন্ন কারিগরি কাজ শেখার মাধ্যমে নিজের দক্ষতা গড়ে তোলেন। বর্তমানে আর শুধু প্রশিক্ষণ নয়—যে প্রতিষ্ঠানে কাজ শিখেছিলেন, সেখানেই চাকরি করছেন তিনি। মাসে ১৭ হাজার টাকা বেতনে মোবাইল সার্ভিসিংয়ের কাজ করে পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নয়নে ভূমিকা রাখছেন।
‎মহিমা জানান, পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) ও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে গ্রামীণ জন উন্নয়ন সংস্থা (জিজেইউএস) বাস্তবায়িত “রেইজ প্রকল্প”-এর আওতায় তিনি ছয় মাসের প্রশিক্ষণের সুযোগ পান। প্রশিক্ষণের শুরুতে পাঁচ দিনের “জীবন দক্ষতা উন্নয়ন বিষয়ক প্রশিক্ষণ”-এ অংশ নিয়ে উদ্যোক্তার গুণাবলি, যোগাযোগ দক্ষতা, নেটওয়ার্ক তৈরি, কুসংস্কার মোকাবিলা এবং আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধিসহ নানা বিষয়ে ধারণা লাভ করেন।
‎মহিমা বলেন, “শুরুতে পরিবার ও সমাজের কিছু মানুষের কাছ থেকে নানা ধরনের কথা শুনতে হয়েছে। কারণ মেয়েদের এই ধরনের পেশায় কাজ করাকে অনেকে ভালোভাবে নেয় না। তবে পরিবারের সহযোগিতা ও নিজের আত্মবিশ্বাস আমাকে সামনে এগিয়ে যেতে সাহস দিয়েছে। এখন কাজ শিখে চাকরি করছি—এটাই আমার সবচেয়ে বড় অর্জন।”
‎মোবাইল সার্ভিসিং খাতে নারী হিসেবে মহিমার উপস্থিতি তৈরি করেছে ভিন্ন ধরনের আস্থা। বিশেষ করে নারী গ্রাহকদের বড় একটি অংশ এখনও তাঁর কাছে মোবাইল সার্ভিস করাতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। ব্যক্তিগত ও একান্ত ব্যবহারের মোবাইল ফোন অন্যের হাতে দিতে অনেক নারী দ্বিধা অনুভব করলেও একজন নারীর কাছে সেটি তুলনামূলক নিরাপদ মনে করেন। ফলে দিন দিন মহিমার নারী গ্রাহকের সংখ্যা বাড়ছে।
‎মহিমা বলেন, “অনেক নারী গ্রাহক আছেন, যারা স্বস্তি নিয়ে আমার কাছে আসেন। তারা মনে করেন, একজন নারী হিসেবে আমি তাদের ব্যক্তিগত বিষয়গুলো বুঝতে পারি। এ কারণে এখন অনেক নারী নিয়মিত আমার কাছে মোবাইল ঠিক করাতে আসেন। পাশাপাশি তারাই আবার তাদের বান্ধবী বা নিকটজনদেরও আমার কাছে মোবাইল ঠিক করানোর জন্য পাঠান।”
‎প্রশিক্ষক আক্তার হোসেন বলেন, “মহিমা অত্যন্ত মনোযোগী শিক্ষার্থী ছিল। নিয়মিত উপস্থিতি ও শেখার আগ্রহ তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। সে এখন চাকরি করছে এবং নিজের দক্ষতা দিয়ে মানুষের আস্থা অর্জন করছে। আমি বিশ্বাস করি, ভবিষ্যতে সে আরও সফল হবে।”
‎মহিমার স্বপ্ন, একদিন নিজের এলাকায় আধুনিক একটি মোবাইল সার্ভিসিং সেন্টার গড়ে তোলা। শুধু নিজের কর্মসংস্থানই নয়, সেখানে অন্য নারীদেরও প্রশিক্ষণ দিয়ে স্বাবলম্বী করে তুলতে চান তিনি। পাশাপাশি তিনি এনএসডিওর লেভেল-ওয়ান সম্পন্ন করেছেন। তাই ট্রেইনার বা সহকারী ট্রেইনার হিসেবে কাজ করারও ইচ্ছা রয়েছে তাঁর।
‎সদর উপজেলার সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, নারীদের প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ বাড়ানো গেলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। একই সঙ্গে নারীর আর্থিক স্বাধীনতা ও সামাজিক ক্ষমতায়ন আরও শক্তিশালী হবে।
‎জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. ইকবাল হোসেন বলেন, “প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে প্রযুক্তি খাতে যত বেশি নারী এগিয়ে আসবেন, ততই তারা স্বাবলম্বী হবেন। এতে রাষ্ট্র, সমাজ ও দেশের অর্থনীতি উপকৃত হবে।”
‎দারিদ্র্য, কুসংস্কার ও সামাজিক বাধা পেরিয়ে মহিমা বেগমের এই এগিয়ে চলা এখন ভোলার অনেক তরুণীর কাছে অনুপ্রেরণার নাম। তাঁর গল্প যেন প্রমাণ করে—সুযোগ, প্রশিক্ষণ ও দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি একসঙ্গে থাকলে বদলে যেতে পারে জীবন, বদলে যেতে পারে সমাজও।
ঢাকা/ইবিটাইমস/এসএস

Tag :
জনপ্রিয়

ইসরায়েলে নেতানিয়াহুকে হটাতে বিরোধী জোটের দিকে সহযোগিতার হাত বাড়াল আরব দলগুলো

Address : Erlaaer Strasse 49/8/16 A-1230 Vienna,Austria. Mob : +43676848863279, 8801719316684 (BD) 8801911691101 ( Ads) Email : eurobanglatimes123@gmail.com
Translate »

মোবাইল প্রযুক্তিতে স্বপ্ন গড়ছেন ভোলার মহিমা

আপডেটের সময় ১২:০৯:৪২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৩ মে ২০২৬

মনজুর রহমান,ভোলা : মোবাইল প্রযুক্তিতে স্বপ্ন গড়ছেন ভোলার মহিমা।
‎যিনি  এক সাহসী মুখ। দারিদ্র্য ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতাকে পেছনে ফেলে মোবাইল প্রযুক্তি খাতে নিজেকে গড়ে তুলেছেন দক্ষ কারিগর হিসেবে।
‎ভোলা সদরের ধনিয়া ইউনিয়নের তালুকদার বাড়ির যৌথ পরিবারে বেড়ে ওঠা মহিমার শৈশব কেটেছে অভাবের সঙ্গে লড়াই করেই। কৃষিশ্রমিক বাবার সীমিত আয়ে ১০ সদস্যের সংসার চালানো ছিল কঠিন। এসএসসি পাসের পর অর্থসংকটের কারণে থেমে যায় তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা। তবে থেমে যায়নি তাঁর স্বপ্ন।
‎সমাজের প্রচলিত ধারণা ভেঙে প্রযুক্তিনির্ভর পেশায় যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন মহিমা। শুরুতে ভোলার সু পরিচিত নবারণ সেন্টারের মোবাইল সার্ভিসিং প্রতিষ্ঠান ‘আকতার মোবাইল টেলিকম’-এ প্রশিক্ষণ নেন তিনি। সেখানে হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার–সংক্রান্ত বিভিন্ন কারিগরি কাজ শেখার মাধ্যমে নিজের দক্ষতা গড়ে তোলেন। বর্তমানে আর শুধু প্রশিক্ষণ নয়—যে প্রতিষ্ঠানে কাজ শিখেছিলেন, সেখানেই চাকরি করছেন তিনি। মাসে ১৭ হাজার টাকা বেতনে মোবাইল সার্ভিসিংয়ের কাজ করে পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নয়নে ভূমিকা রাখছেন।
‎মহিমা জানান, পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) ও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে গ্রামীণ জন উন্নয়ন সংস্থা (জিজেইউএস) বাস্তবায়িত “রেইজ প্রকল্প”-এর আওতায় তিনি ছয় মাসের প্রশিক্ষণের সুযোগ পান। প্রশিক্ষণের শুরুতে পাঁচ দিনের “জীবন দক্ষতা উন্নয়ন বিষয়ক প্রশিক্ষণ”-এ অংশ নিয়ে উদ্যোক্তার গুণাবলি, যোগাযোগ দক্ষতা, নেটওয়ার্ক তৈরি, কুসংস্কার মোকাবিলা এবং আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধিসহ নানা বিষয়ে ধারণা লাভ করেন।
‎মহিমা বলেন, “শুরুতে পরিবার ও সমাজের কিছু মানুষের কাছ থেকে নানা ধরনের কথা শুনতে হয়েছে। কারণ মেয়েদের এই ধরনের পেশায় কাজ করাকে অনেকে ভালোভাবে নেয় না। তবে পরিবারের সহযোগিতা ও নিজের আত্মবিশ্বাস আমাকে সামনে এগিয়ে যেতে সাহস দিয়েছে। এখন কাজ শিখে চাকরি করছি—এটাই আমার সবচেয়ে বড় অর্জন।”
‎মোবাইল সার্ভিসিং খাতে নারী হিসেবে মহিমার উপস্থিতি তৈরি করেছে ভিন্ন ধরনের আস্থা। বিশেষ করে নারী গ্রাহকদের বড় একটি অংশ এখনও তাঁর কাছে মোবাইল সার্ভিস করাতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। ব্যক্তিগত ও একান্ত ব্যবহারের মোবাইল ফোন অন্যের হাতে দিতে অনেক নারী দ্বিধা অনুভব করলেও একজন নারীর কাছে সেটি তুলনামূলক নিরাপদ মনে করেন। ফলে দিন দিন মহিমার নারী গ্রাহকের সংখ্যা বাড়ছে।
‎মহিমা বলেন, “অনেক নারী গ্রাহক আছেন, যারা স্বস্তি নিয়ে আমার কাছে আসেন। তারা মনে করেন, একজন নারী হিসেবে আমি তাদের ব্যক্তিগত বিষয়গুলো বুঝতে পারি। এ কারণে এখন অনেক নারী নিয়মিত আমার কাছে মোবাইল ঠিক করাতে আসেন। পাশাপাশি তারাই আবার তাদের বান্ধবী বা নিকটজনদেরও আমার কাছে মোবাইল ঠিক করানোর জন্য পাঠান।”
‎প্রশিক্ষক আক্তার হোসেন বলেন, “মহিমা অত্যন্ত মনোযোগী শিক্ষার্থী ছিল। নিয়মিত উপস্থিতি ও শেখার আগ্রহ তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। সে এখন চাকরি করছে এবং নিজের দক্ষতা দিয়ে মানুষের আস্থা অর্জন করছে। আমি বিশ্বাস করি, ভবিষ্যতে সে আরও সফল হবে।”
‎মহিমার স্বপ্ন, একদিন নিজের এলাকায় আধুনিক একটি মোবাইল সার্ভিসিং সেন্টার গড়ে তোলা। শুধু নিজের কর্মসংস্থানই নয়, সেখানে অন্য নারীদেরও প্রশিক্ষণ দিয়ে স্বাবলম্বী করে তুলতে চান তিনি। পাশাপাশি তিনি এনএসডিওর লেভেল-ওয়ান সম্পন্ন করেছেন। তাই ট্রেইনার বা সহকারী ট্রেইনার হিসেবে কাজ করারও ইচ্ছা রয়েছে তাঁর।
‎সদর উপজেলার সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, নারীদের প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ বাড়ানো গেলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। একই সঙ্গে নারীর আর্থিক স্বাধীনতা ও সামাজিক ক্ষমতায়ন আরও শক্তিশালী হবে।
‎জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. ইকবাল হোসেন বলেন, “প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে প্রযুক্তি খাতে যত বেশি নারী এগিয়ে আসবেন, ততই তারা স্বাবলম্বী হবেন। এতে রাষ্ট্র, সমাজ ও দেশের অর্থনীতি উপকৃত হবে।”
‎দারিদ্র্য, কুসংস্কার ও সামাজিক বাধা পেরিয়ে মহিমা বেগমের এই এগিয়ে চলা এখন ভোলার অনেক তরুণীর কাছে অনুপ্রেরণার নাম। তাঁর গল্প যেন প্রমাণ করে—সুযোগ, প্রশিক্ষণ ও দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি একসঙ্গে থাকলে বদলে যেতে পারে জীবন, বদলে যেতে পারে সমাজও।
ঢাকা/ইবিটাইমস/এসএস