জাহিদ দুলাল, ভোলা দক্ষিণ : শেখ হাসিনাকে ‘বিশ্বের সেরা অভিনেত্রী’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তাঁর বিরুদ্ধে গুমের সঙ্গে সম্পৃক্ততার গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের স্পিকার ও ভোলা-৩ আসনের সংসদ সদস্য মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীরবিক্রম।
শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) সকালে ভোলার লালমোহন উপজেলা অডিটোরিয়ামে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
লালমোহন উপজেলা নাগরিক সমাজের আয়োজনে বিএনপি ও অঙ্গসহযোগী সংগঠনের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে এ মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন লালমোহন উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাফর ইকবাল। সঞ্চালনা করেন উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম বাবুল।
‘গুম হওয়া স্বজনদের সামনে শেখ হাসিনা অভিনয় করতেন’
মেজর হাফিজ বলেন, গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্বজনদের গণভবনে ডেকে নিয়ে তাদের স্ত্রী ও সন্তানদের সান্ত্বনা দেওয়ার অভিনয় করা হতো। তাঁর দাবি, স্বজনদের সামনে সহানুভূতি প্রকাশ করলেও গুমের ঘটনাগুলোর বিষয়ে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে অন্য ধরনের ভূমিকা ছিল।
তিনি বলেন, গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্বজনদের শেখ হাসিনা আশ্বস্ত করতেন যে তাদের স্বজনদের ফিরিয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু তাঁর দাবি অনুযায়ী, গুম হওয়া ব্যক্তিরা কোথায় রয়েছেন, সে বিষয়ে শেখ হাসিনা অবগত ছিলেন।
মেজর হাফিজের ভাষ্য, তৎকালীন সরকারের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সাধারণ মানুষ তখন পুরোপুরি অবগত ছিল না। তবে পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ঘটনা ও তথ্য সামনে আসায় বিষয়টি জনগণের কাছে স্পষ্ট হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের প্রসঙ্গ টেনে বক্তব্য
গুমের অভিযোগ প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের বিচারিক কার্যক্রম ও সাক্ষ্য-প্রমাণের বিষয়ও তুলে ধরেন মেজর হাফিজ।
তিনি দাবি করেন, গুম হওয়া ব্যক্তিদের বিষয়ে বিভিন্ন সাক্ষ্য-প্রমাণ সামনে আসায় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো এখন জনগণের কাছে স্পষ্ট হয়েছে। তাঁর বক্তব্যে তিনি শেখ হাসিনাকে গুমের নির্দেশদাতা হিসেবেও উল্লেখ করেন।
তবে এসব বক্তব্য মেজর হাফিজের রাজনৈতিক বক্তব্য ও অভিযোগ হিসেবে এসেছে।
‘একজন ব্যারিস্টারকে আট বছর আয়নাঘরে রাখা হয়েছে’
মতবিনিময় সভায় গুম ও বন্দিত্বের প্রসঙ্গ টেনে মেজর হাফিজ বলেন, একজন ব্যারিস্টারকে দীর্ঘ আট বছর হাতকড়া পরিয়ে ‘আয়নাঘর’-এ বন্দি করে রাখা হয়েছিল।
তিনি এ ঘটনাকে অত্যন্ত নির্মম ও জঘন্য হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর দাবি, শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার পর ওই ব্যক্তি মুক্ত হয়ে পরবর্তীতে সংসদ সদস্য হয়েছেন।
গুম ও গোপন বন্দিশালা নিয়ে দেশে-বিদেশে দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন অভিযোগ ও আলোচনা রয়েছে। মেজর হাফিজ তাঁর বক্তব্যে এসব প্রসঙ্গ তুলে ধরে বিগত সরকারের কঠোর সমালোচনা করেন।
‘উন্নয়ন প্রকল্পের নামে অর্থ আত্মসাৎ হয়েছে’
বিগত সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ তুলেও বক্তব্য দেন মেজর হাফিজ।
তিনি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের বিভিন্ন কেনাকাটার প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, একটি বালিশের দাম ৬০ হাজার টাকা এবং একটি পর্দার দাম ৪২ হাজার টাকা দেখানো হয়েছিল।
এ ছাড়া তৎকালীন একজন ভূমি প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে লন্ডনে বিপুলসংখ্যক বাড়ি থাকার অভিযোগও করেন তিনি। মেজর হাফিজের অভিযোগ, সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ যথাযথভাবে না করে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।
লালমোহনের স্থানীয় রাজনীতি নিয়েও ক্ষোভ
মতবিনিময় সভায় লালমোহনের স্থানীয় রাজনীতি নিয়েও অতীতের বিভিন্ন ঘটনার কথা তুলে ধরেন মেজর হাফিজ।
তিনি অভিযোগ করেন, বিগত সরকারের সময়ে লালমোহনের স্থানীয় একজন সংসদ সদস্যের নেতৃত্বে রাজনৈতিক সহিংসতা ও সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটেছিল।
২০১০ সালের উপনির্বাচনের প্রসঙ্গ তুলে ধরে মেজর হাফিজ বলেন, ওই নির্বাচনের সময় ঢাকা থেকে সন্ত্রাসী এনে তাঁর নেতাকর্মীদের বাড়িতে হামলা চালানো হয়েছিল। রামদা দিয়ে কুপিয়ে আহত করা এবং বাড়িঘর ভাঙচুরের অভিযোগও করেন তিনি।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ওই সময় তাঁর নির্বাচনী প্রধান সমন্বয়ক ও ভোলা-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য নাজিম উদ্দিন আলমও হামলার শিকার হন। পরে হাসপাতালে তাঁকে দেখতে গিয়েও প্রবেশ করতে পারেননি বলে দাবি করেন মেজর হাফিজ।
জনগণের মতামত জানতে ‘হ্যাঁ-না’ ভোট
মতবিনিময় সভার শেষ পর্যায়ে নিজের রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের বিষয়ে উপস্থিত মানুষের মতামত জানতে চান মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ।
তিনি তাঁর নির্বাচনী এলাকার মানুষের কাছে জানতে চান, ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে তাঁর দায়িত্ব পালনে তারা সন্তুষ্ট কি না।
এ সময় সংসদীয় পদ্ধতির আদলে উপস্থিত নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের মতামত জানতে ‘হ্যাঁ-না’ ভোট নেওয়া হয়। এতে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হয় বলে আয়োজকেরা জানান।
পরে উপস্থিত নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের করতালির মধ্য দিয়ে মতবিনিময় সভার সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।
রাজনৈতিক অঙ্গনে বক্তব্য নিয়ে আলোচনা
মেজর হাফিজের এ বক্তব্যে একদিকে শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে গুম, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক সহিংসতার অভিযোগ উঠে এসেছে, অন্যদিকে লালমোহনের স্থানীয় রাজনীতিতে অতীতের বিভিন্ন ঘটনার কথাও সামনে এসেছে।
রাজনৈতিক সভায় দেওয়া এসব বক্তব্যের মধ্যে থাকা অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষের প্রতিক্রিয়া বা বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী সময়ে প্রতিবেদনে যুক্ত করা যেতে পারে।
ঢাকা/ইবিটাইমস/এসএস





















