ভিয়েনা ১২:১০ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম :

চরফ্যাশনে আইসিইউ নেই, সংকটাপন্ন রোগীদের ছুটতে হয় দূরে

  • EuroBanglaTimes
  • আপডেটের সময় ১২:২১:৫০ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬
  • ৯ সময় দেখুন

চরফ্যাশনে আইসিইউ নেই, সংকটাপন্ন রোগীদের ছুটতে হয় দূরে

শহিদুল ইসলাম জামাল, চরফ্যাশন : ভোলার চরফ্যাশন ও মনপুরা উপজেলার ছয় লাখের বেশি মানুষের জন্য নেই একটি পূর্ণাঙ্গ নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ)। সংকটাপন্ন রোগীদের নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও বিশেষায়িত চিকিৎসার প্রয়োজন হলে তাদের দূরবর্তী হাসপাতালে নিতে হয়। নদীবেষ্টিত ও বিচ্ছিন্ন এই জনপদে জরুরি রোগী পরিবহনের ক্ষেত্রে দীর্ঘ দূরত্ব ও নৌপথের নির্ভরতা বাড়িয়ে দিচ্ছে চিকিৎসাঝুঁকি।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, চরফ্যাশন উপজেলায় জনসংখ্যা ৫ লাখ ১৮ হাজার ৮১৭ জন। মনপুরা উপজেলায় এ সংখ্যা ৮৯ হাজার ৭৪৫। দুই উপজেলা মিলিয়ে মোট জনসংখ্যা ৬ লাখ ৮ হাজার ৫৬২ জন।

এই বিপুল জনগোষ্ঠীর চিকিৎসার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র চরফ্যাশন। তবে এখানে সংকটাপন্ন রোগীদের জন্য পূর্ণাঙ্গ আইসিইউ সুবিধা না থাকায় গুরুতর অসুস্থ রোগীদের অন্যত্র পাঠাতে হয়।

সংকটাপন্ন রোগীতে বাড়ে ভোগান্তি

হৃদ্‌রোগ, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ, গুরুতর দুর্ঘটনা, তীব্র শ্বাসকষ্ট, জটিল প্রসূতি পরিস্থিতি কিংবা মারাত্মক সংক্রমণের মতো অবস্থায় রোগীকে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ ও বিশেষায়িত চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে দ্রুত প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।

চরফ্যাশনে পূর্ণাঙ্গ নিবিড় পরিচর্যার ব্যবস্থা না থাকায় অনেক সময় রোগীকে অন্য হাসপাতালে স্থানান্তর করতে হয়। এতে চিকিৎসা শুরু ও প্রয়োজনীয় পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে সময়ের চাপ তৈরি হয়।

চরফ্যাশন ও মনপুরার ভৌগোলিক অবস্থান এ সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। দীর্ঘ সড়কপথের পাশাপাশি নদী ও নৌপথের ওপর নির্ভর করতে হয় অনেক এলাকার মানুষকে। রাতের বেলা, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া কিংবা নৌযান ও জরুরি পরিবহনের সংকট থাকলে গুরুতর রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

শুধু দুই উপজেলার মানুষ নয়

চরফ্যাশনের স্বাস্থ্যসেবার ওপর নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা সরকারি জনসংখ্যার হিসাবের চেয়েও বেশি। চর কুকরি-মুকরি, মনপুরা, মুজিবনগরসহ আশপাশের বিভিন্ন চর ও দ্বীপাঞ্চলের মানুষও প্রয়োজনীয় চিকিৎসার জন্য চরফ্যাশনে আসেন।

ফলে স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবার ওপর চাপ শুধু চরফ্যাশন উপজেলার বাসিন্দাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। দুর্গম ও বিচ্ছিন্ন এলাকার মানুষের জন্য চরফ্যাশন গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাকেন্দ্র হিসেবে কাজ করে।

শিশু ও নবজাতকের ঝুঁকি

নবজাতক ও শিশুরাও এই চিকিৎসা সংকটের বড় ভুক্তভোগী হতে পারে। নবজাতকের শ্বাসকষ্ট, জন্মের পর জটিলতা, গুরুতর সংক্রমণ, খিঁচুনি কিংবা দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হওয়ার মতো পরিস্থিতিতে বিশেষায়িত নিবিড় পরিচর্যার প্রয়োজন হতে পারে।

কিন্তু চরফ্যাশনে শিশু ও নবজাতকদের জন্য পৃথক নিবিড় পরিচর্যা ব্যবস্থা না থাকায় গুরুতর অবস্থার রোগীদের দূরের হাসপাতালে নেওয়ার প্রয়োজন হয়।

একটি অসুস্থ শিশুকে নিয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া পরিবারের জন্য যেমন কষ্টকর, তেমনি সংকটাপন্ন অবস্থায় রোগী পরিবহনের সময়টিও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে নদীপথনির্ভর এলাকায় জরুরি রোগী স্থানান্তরের ক্ষেত্রে সময় ও পরিবহনব্যবস্থা বড় বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

দূরত্বই যখন চিকিৎসার ঝুঁকি

জেলা পর্যায়ে চিকিৎসাসেবা থাকলেও চরফ্যাশন ও মনপুরার মানুষের জন্য দূরের কোনো হাসপাতালে পৌঁছানো সবসময় সহজ নয়। সংকটাপন্ন রোগীর ক্ষেত্রে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে স্থানান্তরের পুরো প্রক্রিয়াটিই বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

চরফ্যাশন থেকে দূরের হাসপাতালে যাওয়ার ক্ষেত্রে সড়ক ও নৌপথের ওপর নির্ভরতা থাকায় জরুরি মুহূর্তে দ্রুত চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ সীমিত হতে পারে। বিশেষ করে রাত বা প্রতিকূল আবহাওয়ার সময়ে এ সমস্যা আরও প্রকট হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

প্রয়োজন পূর্ণাঙ্গ নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র

চরফ্যাশন ও মনপুরার ছয় লাখের বেশি মানুষ এবং আশপাশের চর ও দ্বীপাঞ্চলের বাসিন্দাদের চিকিৎসা প্রয়োজন বিবেচনায় এখানে একটি আধুনিক পূর্ণাঙ্গ আইসিইউ স্থাপনের দাবি দীর্ঘদিনের প্রয়োজন হিসেবে সামনে আসছে।

একই সঙ্গে গুরুতর অসুস্থ শিশু ও নবজাতকদের জন্য প্রয়োজনীয় নিবিড় পরিচর্যা ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্টদের মতে, সংকটাপন্ন রোগীর ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা ও নিবিড় পর্যবেক্ষণের সুযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নদীবেষ্টিত ও দুর্গম এলাকার মানুষের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে এ ধরনের সুবিধা থাকলে জরুরি রোগী স্থানান্তরের ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হতে পারে।

চরফ্যাশনে পূর্ণাঙ্গ নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র স্থাপন তাই শুধু একটি অতিরিক্ত চিকিৎসা সুবিধা নয়; দুর্গম এই জনপদের মানুষের জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হতে পারে।
ঢাকা/এসএস

জনপ্রিয়

চরফ্যাশনে আইসিইউ নেই, সংকটাপন্ন রোগীদের ছুটতে হয় দূরে

Address : Erlaaer Strasse 49/8/16 A-1230 Vienna,Austria. Mob : +43676848863279, 8801719316684 (BD) 8801911691101 ( Ads) Email : eurobanglatimes123@gmail.com
Translate »

চরফ্যাশনে আইসিইউ নেই, সংকটাপন্ন রোগীদের ছুটতে হয় দূরে

আপডেটের সময় ১২:২১:৫০ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬

শহিদুল ইসলাম জামাল, চরফ্যাশন : ভোলার চরফ্যাশন ও মনপুরা উপজেলার ছয় লাখের বেশি মানুষের জন্য নেই একটি পূর্ণাঙ্গ নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ)। সংকটাপন্ন রোগীদের নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও বিশেষায়িত চিকিৎসার প্রয়োজন হলে তাদের দূরবর্তী হাসপাতালে নিতে হয়। নদীবেষ্টিত ও বিচ্ছিন্ন এই জনপদে জরুরি রোগী পরিবহনের ক্ষেত্রে দীর্ঘ দূরত্ব ও নৌপথের নির্ভরতা বাড়িয়ে দিচ্ছে চিকিৎসাঝুঁকি।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, চরফ্যাশন উপজেলায় জনসংখ্যা ৫ লাখ ১৮ হাজার ৮১৭ জন। মনপুরা উপজেলায় এ সংখ্যা ৮৯ হাজার ৭৪৫। দুই উপজেলা মিলিয়ে মোট জনসংখ্যা ৬ লাখ ৮ হাজার ৫৬২ জন।

এই বিপুল জনগোষ্ঠীর চিকিৎসার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র চরফ্যাশন। তবে এখানে সংকটাপন্ন রোগীদের জন্য পূর্ণাঙ্গ আইসিইউ সুবিধা না থাকায় গুরুতর অসুস্থ রোগীদের অন্যত্র পাঠাতে হয়।

সংকটাপন্ন রোগীতে বাড়ে ভোগান্তি

হৃদ্‌রোগ, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ, গুরুতর দুর্ঘটনা, তীব্র শ্বাসকষ্ট, জটিল প্রসূতি পরিস্থিতি কিংবা মারাত্মক সংক্রমণের মতো অবস্থায় রোগীকে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ ও বিশেষায়িত চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে দ্রুত প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।

চরফ্যাশনে পূর্ণাঙ্গ নিবিড় পরিচর্যার ব্যবস্থা না থাকায় অনেক সময় রোগীকে অন্য হাসপাতালে স্থানান্তর করতে হয়। এতে চিকিৎসা শুরু ও প্রয়োজনীয় পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে সময়ের চাপ তৈরি হয়।

চরফ্যাশন ও মনপুরার ভৌগোলিক অবস্থান এ সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। দীর্ঘ সড়কপথের পাশাপাশি নদী ও নৌপথের ওপর নির্ভর করতে হয় অনেক এলাকার মানুষকে। রাতের বেলা, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া কিংবা নৌযান ও জরুরি পরিবহনের সংকট থাকলে গুরুতর রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

শুধু দুই উপজেলার মানুষ নয়

চরফ্যাশনের স্বাস্থ্যসেবার ওপর নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা সরকারি জনসংখ্যার হিসাবের চেয়েও বেশি। চর কুকরি-মুকরি, মনপুরা, মুজিবনগরসহ আশপাশের বিভিন্ন চর ও দ্বীপাঞ্চলের মানুষও প্রয়োজনীয় চিকিৎসার জন্য চরফ্যাশনে আসেন।

ফলে স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবার ওপর চাপ শুধু চরফ্যাশন উপজেলার বাসিন্দাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। দুর্গম ও বিচ্ছিন্ন এলাকার মানুষের জন্য চরফ্যাশন গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাকেন্দ্র হিসেবে কাজ করে।

শিশু ও নবজাতকের ঝুঁকি

নবজাতক ও শিশুরাও এই চিকিৎসা সংকটের বড় ভুক্তভোগী হতে পারে। নবজাতকের শ্বাসকষ্ট, জন্মের পর জটিলতা, গুরুতর সংক্রমণ, খিঁচুনি কিংবা দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হওয়ার মতো পরিস্থিতিতে বিশেষায়িত নিবিড় পরিচর্যার প্রয়োজন হতে পারে।

কিন্তু চরফ্যাশনে শিশু ও নবজাতকদের জন্য পৃথক নিবিড় পরিচর্যা ব্যবস্থা না থাকায় গুরুতর অবস্থার রোগীদের দূরের হাসপাতালে নেওয়ার প্রয়োজন হয়।

একটি অসুস্থ শিশুকে নিয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া পরিবারের জন্য যেমন কষ্টকর, তেমনি সংকটাপন্ন অবস্থায় রোগী পরিবহনের সময়টিও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে নদীপথনির্ভর এলাকায় জরুরি রোগী স্থানান্তরের ক্ষেত্রে সময় ও পরিবহনব্যবস্থা বড় বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

দূরত্বই যখন চিকিৎসার ঝুঁকি

জেলা পর্যায়ে চিকিৎসাসেবা থাকলেও চরফ্যাশন ও মনপুরার মানুষের জন্য দূরের কোনো হাসপাতালে পৌঁছানো সবসময় সহজ নয়। সংকটাপন্ন রোগীর ক্ষেত্রে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে স্থানান্তরের পুরো প্রক্রিয়াটিই বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

চরফ্যাশন থেকে দূরের হাসপাতালে যাওয়ার ক্ষেত্রে সড়ক ও নৌপথের ওপর নির্ভরতা থাকায় জরুরি মুহূর্তে দ্রুত চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ সীমিত হতে পারে। বিশেষ করে রাত বা প্রতিকূল আবহাওয়ার সময়ে এ সমস্যা আরও প্রকট হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

প্রয়োজন পূর্ণাঙ্গ নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র

চরফ্যাশন ও মনপুরার ছয় লাখের বেশি মানুষ এবং আশপাশের চর ও দ্বীপাঞ্চলের বাসিন্দাদের চিকিৎসা প্রয়োজন বিবেচনায় এখানে একটি আধুনিক পূর্ণাঙ্গ আইসিইউ স্থাপনের দাবি দীর্ঘদিনের প্রয়োজন হিসেবে সামনে আসছে।

একই সঙ্গে গুরুতর অসুস্থ শিশু ও নবজাতকদের জন্য প্রয়োজনীয় নিবিড় পরিচর্যা ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্টদের মতে, সংকটাপন্ন রোগীর ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা ও নিবিড় পর্যবেক্ষণের সুযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নদীবেষ্টিত ও দুর্গম এলাকার মানুষের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে এ ধরনের সুবিধা থাকলে জরুরি রোগী স্থানান্তরের ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হতে পারে।

চরফ্যাশনে পূর্ণাঙ্গ নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র স্থাপন তাই শুধু একটি অতিরিক্ত চিকিৎসা সুবিধা নয়; দুর্গম এই জনপদের মানুষের জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হতে পারে।
ঢাকা/এসএস