শফিকুজ্জামান খান মোস্তফা, টাঙ্গাইল : মজলুম জননেতা মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর সহধর্মিণী আলেমা খাতুন ভাসানীর জীবন, কর্ম ও আদর্শ নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার আহ্বান জানিয়েছেন বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম। তিনি বলেছেন, দেশের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা গুণী ব্যক্তিদের যথাযথ মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। আলেমা খাতুন ভাসানীর জীবন ও আদর্শ অনুসরণ করে নারীরা সমাজে সম্মানজনক অবস্থান তৈরি করতে পারেন।
মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর সহধর্মিণী আলেমা খাতুন ভাসানীর ২৫তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে তাঁর জীবন ও কর্ম নিয়ে রচিত ‘আলেমা খাতুন ভাসানী’ গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন, আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিলে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।
শনিবার (১০ অক্টোবর) সকাল ১০টায় টাঙ্গাইলের সন্তোষে মাওলানা ভাসানীর দরবার হলে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক, সামাজিক ও শিক্ষাঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। বক্তারা আলেমা খাতুন ভাসানীর জীবনসংগ্রাম, মানবিক মূল্যবোধ এবং মাওলানা ভাসানীর রাজনৈতিক জীবনে তাঁর অবদানের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
নারীদের জন্য শিক্ষণীয় আলেমা খাতুন ভাসানীর জীবন
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম বলেন, পৃথিবীতে যুগে যুগে যেসব গুণী ব্যক্তির আবির্ভাব ঘটেছে, তাঁদের সাফল্যের পেছনে সহধর্মিণীদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। মাওলানা ভাসানীর জীবনেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। আলেমা খাতুন ভাসানী তাঁর জীবন ও কর্মের মধ্য দিয়ে যে দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন, তা দেশের নারীদের জন্য শিক্ষণীয়।
তিনি বলেন, নারীরা নিজেদের কর্ম, নিষ্ঠা ও আদর্শের মাধ্যমে সমাজে সম্মানিত হতে পারেন। এ ক্ষেত্রে আলেমা খাতুন ভাসানীর জীবন থেকে শিক্ষা নেওয়ার অনেক বিষয় রয়েছে। তাঁর অবদান যথাযথভাবে মূল্যায়ন করার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁর জীবন ও আদর্শ তুলে ধরা প্রয়োজন।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, মাওলানা ভাসানীসহ দেশের অনেক প্রকৃত গুণী ব্যক্তিকে যথাযথ সম্মান দেওয়া হয়নি। বর্তমান সরকার তারেক রহমানের নেতৃত্বে মাওলানা ভাসানীসহ দেশের গুণী ব্যক্তিদের যথাযথ মর্যাদা দেওয়ার উদ্যোগ নেবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

মাওলানা ভাসানীর সংগ্রামী জীবনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান
অনুষ্ঠানের প্রধান বক্তা মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু বলেন, আলেমা খাতুন ভাসানী ছিলেন একজন মহীয়সী নারী। জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও তিনি সাধারণ নারীদের মতো অনাড়ম্বর জীবনযাপন করেছেন। তাঁর জীবনযাপন, ব্যক্তিত্ব ও দায়িত্ববোধ তাঁকে অনন্য মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে।
তিনি বলেন, মাওলানা ভাসানীর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের নানা কঠিন সময়ে আলেমা খাতুন ভাসানী তাঁর পাশে থেকে সহযোগিতা করেছেন। কৃষক, শ্রমিক ও খেটে খাওয়া মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় মাওলানা ভাসানী যে সংগ্রাম করেছেন, সেই সংগ্রামী জীবনে তাঁর সহধর্মিণীর অবদান ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু আরও বলেন, দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসে মাওলানা ভাসানীর অবদান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর জীবন ও কর্মের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অবদানও যথাযথভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন। আলেমা খাতুন ভাসানীর জীবন ও কর্ম নিয়ে রচিত গ্রন্থ নতুন প্রজন্মকে দেশের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে সহায়তা করবে।
নারী-পুরুষের সম্মিলিত অবদানের কথা তুলে ধরলেন উপাচার্য
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. এবিএম শহিদুল ইসলাম জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের নারী-পুরুষের সম্মিলিত অবদানের ভাবনা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, পৃথিবীতে যা কিছু কল্যাণকর ও মহৎ অর্জন, তার পেছনে নারী ও পুরুষ উভয়েরই অবদান রয়েছে। সমাজ ও রাষ্ট্রের অগ্রগতিতে নারী-পুরুষের সম্মিলিত ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। মাওলানা ভাসানীর কৃষক, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে সফল করতে আলেমা খাতুন ভাসানীও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
উপাচার্য আরও বলেন, মাওলানা ভাসানীর নামে প্রতিষ্ঠিত মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং তাঁর নামে প্রতিষ্ঠিত গবেষণাকেন্দ্রকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে তাঁরা কাজ করে যাবেন। মাওলানা ভাসানীর জীবন, দর্শন, রাজনৈতিক চিন্তাধারা ও অবদান নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্র সম্প্রসারণের ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস-চ্যান্সেলর অধ্যাপক মো. আনিছুর রহমান।
পাঠ্যপুস্তকে আলেমা খাতুন ভাসানীর জীবনী অন্তর্ভুক্তির দাবি
অনুষ্ঠানে বইটির লেখক শেখ সায়মন পারভেজ হিমেল সরকারের কাছে দুটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি তুলে ধরেন। তাঁর প্রথম দাবি, আলেমা খাতুন ভাসানীর জীবনী স্কুল ও কলেজের পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা। দ্বিতীয় দাবি, মাওলানা ভাসানীর জীবন, দর্শন, রাজনৈতিক চিন্তা ও অবদান নিয়ে গবেষণার জন্য সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং সার্বিক সহযোগিতা নিশ্চিত করা।
লেখক বলেন, আলেমা খাতুন ভাসানীর জীবন ও অবদান বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অথচ তাঁর জীবন ও কর্ম সম্পর্কে নতুন প্রজন্মের অনেকের জানার সুযোগ সীমিত। তাঁর জীবনী পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা হলে শিক্ষার্থীরা দেশের ইতিহাসে তাঁর ভূমিকা, জীবনসংগ্রাম ও আদর্শ সম্পর্কে জানতে পারবে।
তিনি আরও বলেন, শুধু পাঠ্যপুস্তকে জীবনী অন্তর্ভুক্ত করাই নয়, আলেমা খাতুন ভাসানীর জীবন ও অবদান নিয়ে তথ্যভিত্তিক গবেষণার সুযোগও বাড়ানো প্রয়োজন। এ জন্য ঐতিহাসিক দলিল সংগ্রহ, প্রাসঙ্গিক নথিপত্র সংরক্ষণ এবং গবেষকদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা নিশ্চিত করা জরুরি।
শেখ সায়মন পারভেজ হিমেলের মতে, মাওলানা ভাসানীর রাজনৈতিক ও সামাজিক দর্শন নিয়ে বিস্তৃত গবেষণা হলে বাংলাদেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলো আরও সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে তাঁর সহধর্মিণী আলেমা খাতুন ভাসানীর অবদানও ইতিহাসচর্চায় যথাযথ গুরুত্ব পাবে।
‘আলেমা খাতুন ভাসানী’ গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন
শেখ সায়মন পারভেজ হিমেলের রচিত ‘আলেমা খাতুন ভাসানী’ গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে রোদেলা প্রকাশনী। বইটির প্রধান পৃষ্ঠপোষকতায় রয়েছে মাওলানা ভাসানী ফাউন্ডেশন। লেখকের দাবি, বাংলাদেশের ইতিহাসে আলেমা খাতুন ভাসানীকে নিয়ে এককভাবে রচিত এটিই প্রথম জীবনীগ্রন্থ।
গ্রন্থটির মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন ছিল আলেমা খাতুন ভাসানীর জীবন ও কর্ম নিয়ে আলোচনা। বক্তারা মনে করেন, দেশের ইতিহাসে অবদান রাখা ব্যক্তিদের জীবন ও আদর্শ নিয়ে বই প্রকাশ এবং গবেষণামূলক কার্যক্রম পরিচালনা নতুন প্রজন্মকে ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত করার কার্যকর মাধ্যম হতে পারে।
আলেমা খাতুন ভাসানীর জীবন নিয়ে এ ধরনের গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন, জীবনযাপন, মূল্যবোধ এবং মাওলানা ভাসানীর সংগ্রামী জীবনে তাঁর সহযোগিতার বিষয়গুলো পাঠকদের সামনে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি নারীর অবদান ও ইতিহাসে তাঁদের ভূমিকা মূল্যায়নের বিষয়টিও আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে।
ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিল
মাওলানা ভাসানী ফাউন্ডেশনের আয়োজনে এবং মাওলানা ভাসানী ছাত্র ফাউন্ডেশন ও মাভাবিপ্রবি শাখার সহযোগিতায় এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন মাওলানা ভাসানী ফাউন্ডেশনের মহাসচিব মাহমুদুল হক সানু।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন ভাসানী ছাত্র ফাউন্ডেশনের মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি শোহানুর রহমান শাওন। বক্তারা আলেমা খাতুন ভাসানীর জীবন ও অবদান যথাযথভাবে মূল্যায়ন, তাঁর আদর্শ নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা এবং মাওলানা ভাসানীর জীবন ও কর্ম নিয়ে গবেষণার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, দেশের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা ব্যক্তিদের জীবন ও কর্ম সংরক্ষণ করা বর্তমান প্রজন্মের দায়িত্ব। তাঁদের অবদান নিয়ে গবেষণা, বই প্রকাশ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠ্যক্রমে প্রাসঙ্গিক বিষয় অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগ ইতিহাস সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।
অনুষ্ঠানের শেষপর্যায়ে আলেমা খাতুন ভাসানীর আত্মার মাগফিরাত কামনা করে দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় তাঁর জীবন ও আদর্শ স্মরণ করা হয় এবং দেশের ইতিহাসে তাঁর অবদান যথাযথভাবে তুলে ধরার আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করা হয়।
ঢাকা/এসএস




















