শফিকুজ্জামান খান মোস্তফা, টাঙ্গাইল : ‘কোথায় সেই পলো বাওয়া, কোথায় ঝাঁকি জাল, শুকিয়ে গেছে নদী-নালা, বদলে গেছে কাল’—গ্রামবাংলার চিরচেনা সেই দৃশ্য এখন অনেকটাই অতীত। একসময় খাল-বিল, নদী-নালা ও ডোবা থেকে সহজেই মিলত নানা প্রজাতির দেশীয় মাছ। কার্তিকের শুকনো মৌসুমে দল বেঁধে মাছ ধরার উৎসবও ছিল গ্রামীণ জীবনের অন্যতম আকর্ষণ। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, জলাশয় ভরাট, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও নিষিদ্ধ জালের অবাধ ব্যবহারে টাঙ্গাইলে দেশীয় মাছের প্রাকৃতিক উৎপাদন ক্রমেই কমছে। সংকটে পড়েছে মাছের প্রজনন ও সহজলভ্যতা। একই সঙ্গে জীবিকা হারানোর ঝুঁকিতে পড়ছেন হাজারো পেশাদার জেলে।

স্থানীয় প্রবীণদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কার্তিক মাসে হালকা শীত ও প্রখর রোদে নদী-নালা, খাল-বিল এবং নিচু জমির পানি শুকিয়ে গেলে সেখানে আটকা পড়ত নানা প্রজাতির মাছ। তখন কাদাপানিতে নেমে হাত দিয়ে মাছ ধরার উৎসবে মেতে উঠত গ্রামের শিশু-কিশোররা। সময়ের পরিবর্তনে সেই দৃশ্য এখন খুব একটা চোখে পড়ে না।
তবে সেই হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যের কিছুটা দেখা মিলেছে কালিহাতী উপজেলার রৌহা গ্রামের শুকনি বিলে। সম্প্রতি বিলের একটি ছোট অংশের পানি সেচে মাছ ধরতে দেখা যায় চার কিশোরকে। তারা হলো—রিফাত, মাসফিকুর রহমান, মফিরুল ইসলাম ও সেলিম মিয়া। সকাল ৯টা থেকে পানি সেচে দুপুর ১২টার দিকে কাদামাটি থেকে পুঁটি, চাটা, টাকি, শিং ও বাইমসহ প্রায় ১০ কেজি মাছ ধরে তারা।

একই ধরনের দৃশ্য দেখা গেছে ঘাটাইল উপজেলার ধলাপাড়া ইউনিয়নের চাপড়া বিলেও। সেখানে রবিন নামে এক কিশোর তার সঙ্গীদের নিয়ে শোল, টাকি, পুঁটি, খলশে, কৈ, মাগুর, শিং ও টেংরাসহ বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় মাছ ধরে আনন্দে মেতে ওঠে। তবে এমন দৃশ্য এখন আগের মতো নিয়মিত দেখা যায় না।
টাঙ্গাইল জেলা মৎস্য কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় মোট পুকুর রয়েছে ৪১ হাজার ৪৯৫টি। পাশাপাশি মুক্ত জলাশয় হিসেবে রয়েছে ২৯৮টি বিল, ১২৮টি খাল, ৩টি বাওড় ও ৪টি পেন কালচার। কিন্তু আবাসিক এলাকা সম্প্রসারণ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, শিল্পায়ন ও কৃষিজমির সম্প্রসারণের কারণে এসব প্রাকৃতিক জলাশয়ের অনেকগুলো ভরাট হয়ে যাচ্ছে। এতে মাছের স্বাভাবিক আবাসস্থল ও প্রজননক্ষেত্র নষ্ট হচ্ছে।
এ ছাড়া তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনাবৃষ্টি, অসময়ে বন্যা ও খরার কারণে জলাশয়ের স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে। কৃষিকাজের সুবিধার্থে শুষ্ক মৌসুমে অনেক বিল ও খাল সম্পূর্ণ সেচে পানি নিষ্কাশন করা হচ্ছে। এতে মা মাছের বেঁচে থাকা ও প্রজননের সুযোগ কমে যাচ্ছে। অন্যদিকে কারেন্ট জাল, চায়না দুয়ারি, বেহুন্দি ও মশারি জালের মতো ক্ষতিকর জালের ব্যবহারেও ডিমওয়ালা মাছ ও রেণু পোনা নির্বিচারে ধ্বংস হচ্ছে।
স্থানীয় প্রবীণ জেলেদের ভাষ্য, একসময় টাঙ্গাইলের নদ-নদী ও খাল-বিলে শতাধিক প্রজাতির দেশীয় মাছ পাওয়া যেত। বর্তমানে চিতল, রিটা, গুজি আইড়, বাঘাইড়, বামোশ, রানি, টেংরা, পাবদা, চাপিলা, শিং, মাগুর, দেশি কৈ, খলশে, ভেদা, ফলি, গজার, চেং, খরকাটি, বালিয়া, চেলা, পোয়া ও শোলসহ বেশ কিছু প্রজাতির মাছের প্রাপ্যতা আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে।
প্রাকৃতিক উৎসের দেশীয় মাছ কমে যাওয়ায় বাজারেও বেড়েছে এসব মাছের দাম। অল্প পরিমাণে পাওয়া গেলেও তা সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে থাকছে। ফলে দেশীয় মাছের চাহিদা মেটাতে মানুষ ক্রমেই পুকুরে চাষ করা পাঙ্গাস, তেলাপিয়া, রুই ও কাতলার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।
এ সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে পেশাদার জেলেদের জীবিকায়। জেলা মৎস্য দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, টাঙ্গাইলে বর্তমানে নিবন্ধিত মৎস্যজীবীর সংখ্যা ৩০ হাজার ৫০০ জন। এ ছাড়া প্রায় ২০ হাজার মানুষ পরোক্ষভাবে মুক্ত জলাশয়ের মাছ আহরণের সঙ্গে যুক্ত।
কালিহাতীর ঐতিহ্যবাহী চারান বিল এলাকার জেলেরা জানান, বংশপরম্পরায় মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করলেও এখন সারা দিন জাল ফেলেও কয়েক কেজি মাছ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। আয় কমে যাওয়ায় অনেকেই পৈতৃক পেশা ছেড়ে রিকশা চালানো, দিনমজুরি কিংবা অন্য পেশায় যুক্ত হচ্ছেন।
টাঙ্গাইল জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহজাহান কবীর বলেন, দেশীয় মিঠাপানির মাছের বিলুপ্তি রোধে মৎস্য বিভাগ কাজ করছে। উন্মুক্ত জলাশয়ে দেশীয় মাছের নিরাপদ প্রজনন ও বংশবৃদ্ধির জন্য জেলায় ইতিমধ্যে ১৩টি মৎস্য অভয়াশ্রম স্থাপন করা হয়েছে। তবে মাছের প্রাকৃতিক আবাসস্থল রক্ষায় অভয়াশ্রমের সংখ্যা আরও বাড়ানো প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, টাঙ্গাইলের অধিকাংশ খাল-বিল ও নালা পলি জমে ভরাট হয়ে যাচ্ছে। এসব জলাশয় পরিকল্পিতভাবে সংস্কার করে গভীরতা বাড়ানোর পাশাপাশি দখল ও দূষণ প্রতিরোধ করা জরুরি।
প্রাকৃতিক জলাশয় রক্ষা, ক্ষতিকর জালের ব্যবহার বন্ধ এবং মাছের প্রজনন মৌসুমে কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা না গেলে দেশীয় মাছের সংকট আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে হারিয়ে যেতে পারে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী মাছ ধরার উৎসব এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা জেলেদের পেশা।
ঢাকা/এসএস




















