ইবিটাইমস ডেস্ক : ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার রাজনৈতিক জীবনে নতুন অধ্যায় যুক্ত হয়েছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, কারাবাস ও নানা বিতর্ক পেরিয়ে চতুর্থ মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পথে তাঁর জয় দেশটির রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রথম দফার ভোটে পিছিয়ে পড়ার পর দ্বিতীয় দফার নির্বাচনে জয়ী হয়ে ইতিহাস গড়েছেন বামপন্থী এই নেতা। লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম দেশ ব্রাজিলে তাঁর এই জয় এমন এক সময়ে এসেছে, যখন এ অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে ডানপন্থী রাজনীতির প্রভাব বাড়ছে।
শ্রমিক নেতা থেকে প্রেসিডেন্ট
লুলার রাজনৈতিক উত্থান দারিদ্র্য ও শ্রমিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। ব্রাজিলের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় পেরনামবুকো রাজ্যের দরিদ্র কৃষক পরিবারে জন্ম নেওয়া লুলা ছিলেন আট ভাইবোনের মধ্যে সপ্তম। শৈশবে জীবিকার তাগিদে জুতা পালিশ ও চিনাবাদাম বিক্রি করেছেন তিনি।
পরে ধাতুশ্রমিক হিসেবে কাজ করার সময় শ্রমিক ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত হন। ষাটের দশকে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় তাঁর একটি আঙুল কাটা পড়ে। শ্রমিক অধিকার আদায়ের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে ধীরে ধীরে জাতীয় রাজনীতিতে পরিচিতি লাভ করেন তিনি।
প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পরপর তিনবার পরাজয়ের পর ২০০৩ সালে প্রথমবার ব্রাজিলের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন লুলা। ২০০৬ সালে পুনর্নির্বাচিত হন তিনি। ২০১০ সালে দায়িত্ব ছাড়ার সময় শ্রমজীবী মানুষের কাছে জনপ্রিয় নেতা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন।

দারিদ্র্য বিমোচন ও সামাজিক কর্মসূচি
লুলার প্রথম দুই মেয়াদে ব্রাজিলের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি ঘটে। তাঁর সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং দারিদ্র্য বিমোচন উদ্যোগের ফলে প্রায় তিন কোটি মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ পেয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশেষ করে ‘বলসা ফ্যামিলিয়া’ কর্মসূচি নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা হিসেবে পরিচিতি পায়। এই কর্মসূচি লুলার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের অন্যতম প্রধান অংশ হয়ে ওঠে।
তবে তাঁর সরকার ও দলকে পরবর্তী সময়ে বড় ধরনের দুর্নীতির অভিযোগের মুখোমুখি হতে হয়। এসব ঘটনায় জনমনে ক্ষোভ তৈরি হয় এবং ২০১৮ সালে ডানপন্থী নেতা জইর বলসোনারোর প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পথ তৈরি হয়।
কারাবাস থেকে ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন
দুর্নীতির মামলায় লুলাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। পরে বিচারপ্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও এখতিয়ারসংক্রান্ত কারণে তাঁর বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট রায় বাতিল হয়। মামলার বিচারকের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। তবে এসব আইনি ঘটনা ব্রাজিলের রাজনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী বিতর্ক ও মেরুকরণ তৈরি করে।
২০২২ সালের নির্বাচনে জইর বলসোনারোকে অল্প ব্যবধানে পরাজিত করে আবারও ক্ষমতায় ফেরেন লুলা। তাঁর তৃতীয় মেয়াদে সামাজিক কর্মসূচি পুনরুজ্জীবিত করা, আমাজন বন ধ্বংসের গতি কমানো এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ গুরুত্ব পায়।
তবে অপরাধ, দুর্নীতি এবং সরকারি ঋণ নিয়ে অসন্তোষের কারণে তাঁর বিরোধিতাও অব্যাহত রয়েছে।
বয়স ও জনসংযোগ নিয়ে চ্যালেঞ্জ
প্রায় ৮১ বছর বয়সে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়েছিলেন লুলা। নির্বাচনী প্রচারের সময় শারীরিক সক্ষমতা তুলে ধরতে তাঁকে ব্যায়াম ও দৌড়ানোর মতো কার্যক্রমে অংশ নিতে দেখা যায়।
প্রথম দফার ভোটে ফ্লাভিও বলসোনারোর কাছে পিছিয়ে পড়ার পর প্রচারের কৌশলেও পরিবর্তন আনেন তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয়তা বাড়িয়ে নিজের ভিডিও প্রকাশ করেন। এমনকি প্রথমবারের মতো একটি মোবাইল ফোন কেনার ঘটনাও আলোচনায় আসে।
এই পরিবর্তন ব্রাজিলের পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তাকে সামনে নিয়ে আসে। দেশটির জনগণের বড় একটি অংশ এখন অনলাইনভিত্তিক যোগাযোগে অভ্যস্ত। একই সঙ্গে রাজনৈতিক মেরুকরণও তীব্র।
অর্থনীতি ও রাজনৈতিক মেরুকরণ
লুলার সামনে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে সরকারি ঋণ, উচ্চ সুদের হার, অপরাধ এবং দুর্নীতি নিয়ে জনমনে তৈরি হওয়া অসন্তোষ। সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধে বিপুল অর্থ ব্যয়ের বিষয়টিও তাঁর অর্থনৈতিক নীতির সমালোচনায় উঠে এসেছে।
নির্বাচনের আগে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ভাতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েও সমালোচনা হয়েছে। সমর্থকদের কাছে এসব কর্মসূচি দরিদ্র মানুষের জীবনমান উন্নয়নের হাতিয়ার, আর সমালোচকদের কাছে সরকারি ব্যয় ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে উদ্বেগের বিষয়।
লুলার সমর্থকেরা তাঁর রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনকে সামাজিক ন্যায়বিচার ও গণতন্ত্রের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে বিরোধীরা অপরাধ, দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে তাঁদের আপত্তি অব্যাহত রেখেছেন।
ব্রাজিলের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে লুলার ভূমিকা কতটা প্রভাব বিস্তার করবে, তা নির্ভর করবে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, সামাজিক সুরক্ষা এবং বিভক্ত সমাজে রাজনৈতিক সমঝোতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তাঁর সরকারের পদক্ষেপের ওপর।
ঢাকা/এসএস





















