জাহিদ দুলাল, ভোলা দক্ষিণ : ভোলার লালমোহন উপজেলায় ক্রমেই বাড়ছে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। শিশু থেকে বৃদ্ধ—কেউই রেহাই পাচ্ছেন না মশাবাহিত এ রোগের ঝুঁকি থেকে। প্রতিদিন জ্বর ও ডেঙ্গুর উপসর্গ নিয়ে লালমোহন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভিড় করছেন রোগী ও তাঁদের স্বজনরা। গত দেড় মাস ধরে উপজেলাটিতে ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা দিলেও চলতি অক্টোবর মাসের প্রথম ১০ দিনেই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন ২৪ জন ডেঙ্গু রোগী। এর আগে সেপ্টেম্বর মাসে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছিলেন ৪৩ জন। বর্তমানে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিতে ডেঙ্গু আক্রান্ত তিনজন রোগী ভর্তি রয়েছেন।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অন্তর্বিভাগের পাশাপাশি বহির্বিভাগেও প্রতিদিন জ্বর ও ডেঙ্গুর উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিতে আসছেন অনেকে। চিকিৎসকদের মতে, জ্বর দেখা দিলে অবহেলা না করে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসা নেওয়া জরুরি। সময়মতো রোগ শনাক্ত করা গেলে পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বহির্বিভাগের কর্তব্যরত মেডিকেল অফিসার (ইউনানি) ডা. মো. ইউসুফ হোসেন জানান, প্রতিদিনই ডেঙ্গুর উপসর্গ নিয়ে অনেক রোগী আসছেন। তবে অসচেতনতার কারণে তাঁদের অনেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে চান না। যারা পরীক্ষা করাচ্ছেন, তাঁদের প্রতি ১০ জনের মধ্যে অন্তত পাঁচজনের ডেঙ্গু শনাক্ত হচ্ছে বলে তিনি জানান।
তিনি আরও বলেন, যেসব রোগীর শারীরিক অবস্থা ভালো, তাঁদের বহির্বিভাগ থেকেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। আর যাঁদের শারীরিক অবস্থা খারাপ, তাঁদের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

জ্বর নিয়ে অবহেলা, পরে ডেঙ্গু শনাক্ত
ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে লালমোহন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন রয়েছেন মোসা. সুরমা বেগম (৩০)। তিনি উপজেলার রমাগঞ্জ ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের কর্তারহাট এলাকার বাসিন্দা।
নিজের অসুস্থতার অভিজ্ঞতা জানিয়ে সুরমা বেগম বলেন, প্রথমে হঠাৎ জ্বরে আক্রান্ত হন তিনি। এরপর স্থানীয় একটি ফার্মেসি থেকে ওষুধ সেবন করেন। কিন্তু সপ্তাহখানেক পরও জ্বর না কমায় এবং শরীর অতিরিক্ত দুর্বল হয়ে পড়ায় উপজেলা সদরে গিয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেন। পরে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় তাঁর ডেঙ্গু শনাক্ত হয়।
তিনি বলেন, “তিন দিন ধরে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন রয়েছি। চিকিৎসক ও নার্সরা নিয়মিত এসে খোঁজখবর নিচ্ছেন। তবে অধিকাংশ ওষুধই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাওয়া যায় না। ফলে প্রয়োজনীয় অনেক ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে।”
হাম, নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়ায়ও বাড়ছে রোগীর চাপ
এদিকে, ৫০ শয্যাবিশিষ্ট লালমোহন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডেঙ্গুর পাশাপাশি হাম, নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীরাও ভর্তি হচ্ছেন। হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অক্টোবর মাসের প্রথম ১০ দিনে হামে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছেন ১৯ জন রোগী। এর আগে সেপ্টেম্বর মাসে হাম আক্রান্ত ৪৪ জন রোগী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে চিকিৎসা নেন। একই মাসে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত ১২১ জন এবং ডায়রিয়ায় আক্রান্ত ১৮১ জন রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন।
একসঙ্গে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত রোগীর চাপ বাড়ায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসাসেবা ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। সীমিত শয্যা ও জনবল নিয়ে রোগীদের সেবা দিতে হচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে।
চিকিৎসক-নার্সের সংকট, ওষুধের ঘাটতির কথা স্বীকার
এ বিষয়ে লালমোহন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচএফপিও) ডা. আবু মাহমুদ তালহা সাদী বলেন, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক ও নার্সের সংকট থাকলেও বর্তমানে কর্মরত জনবল নিয়ে সম্মিলিতভাবে রোগীদের আন্তরিকতার সঙ্গে সেবা দেওয়া হচ্ছে।
ওষুধের সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সব সময় সব ধরনের ওষুধ মজুত থাকে না। তবে যেসব ওষুধ মজুত রয়েছে, সেগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী রোগীদের বিনামূল্যে দেওয়া হচ্ছে। কোনো ওষুধের ঘাটতি থাকলে তা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতার বিকল্প নেই
ডেঙ্গু প্রতিরোধে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক পর্যায়ে সচেতনতার ওপর গুরুত্বারোপ করে ডা. আবু মাহমুদ তালহা সাদী বলেন, বাড়ির ছাদ, ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র, ড্রাম, টায়ারসহ বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে। কারণ, জমে থাকা পানিতে এডিস মশা বংশবিস্তার করতে পারে।
তিনি আরও বলেন, মশার কামড় থেকে রক্ষা পেতে মশারি, মশা প্রতিরোধক এবং শরীর ঢেকে রাখে এমন পোশাক ব্যবহার করতে হবে। জ্বর হলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। বিশেষ করে তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, রক্তপাত, অতিরিক্ত দুর্বলতা কিংবা শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, লালমোহনে ডেঙ্গুর বিস্তার রোধে নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান, মশার প্রজননস্থল ধ্বংস এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন। পাশাপাশি জ্বরের রোগীদের সময়মতো পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে ডেঙ্গুজনিত জটিলতা কমানো সম্ভব।
ঢাকা/এসএস






















