শফিকুজ্জামান খান মোস্তফা, টাঙ্গাইল : টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে কোনো দৃশ্যমান পানি প্রবাহ না থাকা একটি পরিত্যক্ত ডোবার ওপর প্রায় ১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ। পানি প্রবাহহীন স্থানে বিপুল অর্থ ব্যয়ে সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির নেতারা।
এলাকাবাসীর দাবি, জনস্বার্থ বিবেচনায় না নিয়ে কেবল কাগজপত্রের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছে। তাদের মতে, এখানে সেতু নির্মাণের পরিবর্তে মাটি ভরাট করে সোজা ও প্রশস্ত সড়ক নির্মাণ করা হলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমার পাশাপাশি সরকারের বিপুল অর্থও সাশ্রয় হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সওজ বিভাগ ও দরপত্র সূত্রে জানা গেছে, টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ মহাসড়কের কালিহাতী বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ৩৮ মিটার দীর্ঘ আরসিসি-পিসি গার্ডার সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য প্রথমে ১৪ কোটি ৯৬ লাখ ৬৬ হাজার টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে দরপত্র আহ্বান করে সড়ক ও জনপথ বিভাগ। দরপত্র প্রক্রিয়া শেষে ১৩ কোটি ২৩ লাখ ৯২ হাজার টাকা চুক্তিমূল্যে কাজটি বাস্তবায়নের জন্য ‘তুর্ন এন্টারপ্রাইজ প্রাইভেট লিমিটেড’ নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি প্রকল্প এলাকায় কাজ শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছে।
সরেজমিনে প্রকল্প এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, প্রস্তাবিত সেতুর আশপাশে বর্তমানে ঘনবসতি রয়েছে। সেখানে অসংখ্য পাকা ও আধাপাকা ঘরবাড়িও গড়ে উঠেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এলাকায় কোনো নদী, খাল বা বিল নেই। প্রায় অর্ধশত বছর ধরে এখানে প্রাকৃতিক পানি প্রবাহও নেই। বর্তমানে জায়গাটি একটি সাধারণ ডোবার মতোই রয়েছে।
উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের সাবেক সভাপতি শেখ শফিকুল ইসলাম, বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মালেক, ব্যবসায়ী মো. সাইফুল ইসলাম, আজগর আলী, শামীম মণ্ডলসহ স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, মৃত ডোবার ওপর পুরোনো জরাজীর্ণ সেতু ভেঙে নতুন করে প্রায় ১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে সেতু নির্মাণের উদ্যোগ অযৌক্তিক। তাদের দাবি, এটি সরকারি অর্থের অপচয়ের আশঙ্কা তৈরি করছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, বর্তমান সেতুটির কারণে ব্যস্ততম আঞ্চলিক মহাসড়কের কালিহাতী বাসস্ট্যান্ড অংশে একটি বিপজ্জনক বাঁক বা ‘ব্লাইন্ড স্পট’ তৈরি হয়েছে। এ কারণে সেখানে প্রায়ই ছোট-বড় সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। সেতুটির কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে আশপাশের বাণিজ্যিক এলাকার উন্নয়নও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
স্থানীয় বাসিন্দা ও যানবাহন চালকদের দাবি, সেতুর পরিবর্তে ওই স্থানে মাটি ভরাট করে সোজা ও প্রশস্ত সড়ক নির্মাণ করা হলে মহাসড়কটি আরও নিরাপদ হবে। একই সঙ্গে যানজট কমার পাশাপাশি নতুন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে বলে মনে করছেন তারা।
তবে সড়ক ও জনপথ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারের ব্রিজ ম্যানেজমেন্ট উইংয়ের (বিএমডব্লিউ) নিয়মিত পরিদর্শন, সমীক্ষা ও কারিগরি প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই সেতুটি পুনর্নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আঞ্চলিক মহাসড়কের চেইনেজ ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বিবেচনায় নিয়েই সেতুটির নকশা অনুমোদন করা হয়েছে বলে জানান তারা।
এদিকে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে প্রকল্পটি পুনর্মূল্যায়নের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল। তাদের মতে, রাষ্ট্রের বিপুল অর্থ সাশ্রয় ও জননিরাপত্তার স্বার্থে সেতু নির্মাণের পরিবর্তে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
কালিহাতী উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি মো. আবুল মনছুর বলেন, রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় রোধ ও দুর্ঘটনা কমাতে সেতুর পরিবর্তে ওই স্থানে সোজা করে সড়ক নির্মাণ করা হলে সরকারি অর্থ জনগণের কাজে আসবে। তার দাবি, প্রস্তাবিত সেতুটি নির্মিত হলে দুর্ঘটনা কমার পরিবর্তে আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ বিষয়ে টাঙ্গাইল সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ড. সিনথিয়া আজমেরী খান বলেন, কোনো জলাশয় বন্ধ করার এখতিয়ার সওজের নেই। ব্রিজ ম্যানেজমেন্ট উইংয়ের প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই সেতুটি নির্মাণ করা হচ্ছে। এতে সড়ক দুর্ঘটনা ও হতাহতের সংখ্যা কমবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
তিনি আরও জানান, গত ৭ আগস্ট স্থানীয় সংসদ সদস্য লুৎফর রহমান মতিন নতুন সেতুর নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেছেন।
ঢাকা/ইবিটাইমস/এসএস


















