ভিয়েনা ০৩:৫৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ২৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম :
টাঙ্গাইলে রেলক্রসিংয়ে আটকে গেল বালুবাহী ট্রাক, লাল পতাকা উড়িয়ে থামানো হলো ট্রেন চরফ্যাশনে দুর্গন্ধময় ময়লার ভাগাড়ে গড়ে উঠছে দৃষ্টিনন্দন গ্রিন জোন লালমোহন উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান গিয়াস উদ্দিন আহমেদ গ্রেপ্তার আজ ৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সমাধিতে প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা ভাঙা ব্রিজে জীবনের ঝুঁকি, আতঙ্ক নিয়ে স্কুলে যায় শিশুরা গৃহবন্দি থাকার শর্ত পূরণে জরিমানা পরিশোধ করলেন মালয়েশিয়ার কারাবন্দি সাবেক প্রধানমন্ত্রী মিয়ানমারে পাচারের চেষ্টা, ৪৯২ বস্তা ইউরিয়া সারসহ আটক ৮ সমগ্র ইউরোপজুড়ে বিমানে বোমা হামলার হুমকি মাভাবিপ্রবিতে ক্যারিয়ার গাইডেন্স ও প্রফেশনাল নেটওয়ার্কিং সেমিনার অনুষ্ঠিত

ডিজিটাল স্ক্রিন ছেড়ে ফসলের মাঠে শিক্ষার্থীরা, টাঙ্গাইলে ব্যতিক্রমী কৃষিশিক্ষা

  • EuroBanglaTimes
  • আপডেটের সময় ১২:২৮:৫৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬
  • ১৩১ সময় দেখুন

শফিকুজ্জামান খান মোস্তফা, টাঙ্গাইল : মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল ডিভাইসের অতিরিক্ত ব্যবহারে যখন শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ স্ক্রিননির্ভর হয়ে পড়ছে, ঠিক তখনই এর ব্যতিক্রমী চিত্র দেখা গেছে টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার মহিষমারা কলেজে। এখানে মোবাইলের পরিবর্তে শিক্ষার্থীরা হাতে তুলে নিয়েছে খুন্তি, কোদাল ও কাস্তেসহ বিভিন্ন কৃষি উপকরণ। ফসলের মাঠে নেমে তারা হাতে-কলমে শিখছে বীজ থেকে চারা উৎপাদন ও নিরাপদ কৃষির নানা কৌশল।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এমন উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে ইতিবাচক ভূমিকা রাখার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে কৃষি উৎপাদন ও উদ্যোক্তা তৈরির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

কৃষিনির্ভর এলাকায় ব্যতিক্রমী উদ্যোগ

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মধুপুর উপজেলার প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকার মহিষমারা গ্রামে পরিচালিত হচ্ছে এই জীবনমুখী শিক্ষা কার্যক্রম। ২০১৩ সালে গ্রামের কৃষক ও জাতীয় কৃষি পুরস্কারপ্রাপ্ত আদর্শ কৃষক ছানোয়ার হোসেন বাবার কাছ থেকে পাওয়া ৯৫ শতাংশ জমি এবং নিজের ৪০ শতাংশ জমি মিলিয়ে মোট ১৩৫ শতাংশ জমির ওপর মহিষমারা কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন।

টাঙ্গাইল শহর থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে এবং মধুপুর উপজেলা সদর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার পূর্বে মহিষমারা গ্রামের অবস্থান। এলাকাটি মূলত কৃষিনির্ভর এবং মধুপুরের আনারস চাষের জন্যও পরিচিত।

স্থানীয়দের অধিকাংশই কৃষিজীবী। অর্থাভাব ও দূরত্বের কারণে অনেক পরিবারের পক্ষেই সন্তানদের দূরে রেখে কলেজে পড়ানো সম্ভব ছিল না। এ বাস্তবতা থেকেই স্থানীয় দরিদ্র শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ করে দিতে কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন ছানোয়ার হোসেন।

বর্তমানে মহিষমারা কলেজে তিন শতাধিক শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের উৎপাদনমুখী ও বাস্তবভিত্তিক শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত করতে নেওয়া হয়েছে এই বিশেষ উদ্যোগ।

মাঠে নেমে কৃষি শেখে শিক্ষার্থীরা

সরেজমিনে দেখা যায়, মধুপুর উপজেলা সদর থেকে পাকা সড়ক ধরে গারো বাজার হয়ে মহিষমারা গ্রামে পৌঁছানো যায়। চারপাশে সবুজ ধানক্ষেত ও বিলের মনোরম পরিবেশ। গ্রামের শুরুতেই কলেজটির অবস্থান।

কলেজে গিয়ে দেখা যায়, শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের পাশাপাশি উৎপাদনমুখী শিক্ষা কর্নারে প্রায় ৩০ জন শিক্ষার্থী কৃষিকাজে ব্যস্ত। কলেজের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ছানোয়ার হোসেন শিক্ষার্থীদের সবজির বীজ বোনার আগে মাটি প্রস্তুতের বিভিন্ন কৌশল শেখাচ্ছেন। তার নির্দেশনায় শিক্ষার্থীরা নিজেরাই মাটি প্রস্তুত ও বীজ বপনের কাজ করছে।

২০১৮ সাল থেকে উৎপাদনমুখী শিক্ষা

কলেজের শিক্ষক ও এলাকাবাসী জানান, ২০১৮ সালে শিক্ষার্থীদের জন্য উৎপাদনমুখী শিক্ষা কার্যক্রম চালু করা হয়। এ জন্য কলেজের পূর্ব পাশে প্রায় ৪০ শতাংশ জায়গায় একটি বিশেষ কর্নার তৈরি করা হয়েছে।

সেখানে শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে বিষমুক্ত ও নিরাপদ ফসল উৎপাদনের পদ্ধতি শেখানো হয়। বিভিন্ন মৌসুমের সবজি, ফল ও মসলার চারা উৎপাদনসহ মাটি প্রস্তুত, বীজ বপন ও পরিচর্যার বিভিন্ন কৌশলও শেখানো হয়।

কলেজ কর্তৃপক্ষের আশা, এখানে কৃষিকাজ শেখার পর শিক্ষার্থীরা নিজেদের বাড়িতেও সবজি বাগান ও ছোট পরিসরে কৃষি উদ্যোগ গড়ে তুলতে পারবে।

চাকরির পাশাপাশি কৃষি উদ্যোক্তা হওয়ার শিক্ষা

জাতীয় কৃষি পুরস্কারপ্রাপ্ত কৃষক ছানোয়ার হোসেন জানান, ১৯৯২ সালে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি সিলেটের একটি স্কুলে ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। সেখানে প্রায় সাড়ে তিন বছর চাকরি করার পর গ্রামে ফিরে আসেন। পরে গ্রামের একটি স্কুলে দুই বছর প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। তবে কৃষির প্রতি আগ্রহ থেকে শেষ পর্যন্ত শিক্ষকতার চাকরিও ছেড়ে দেন।

এরপর বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে আনারস, কলা, হলুদ, ভুট্টা, মাল্টা, ড্রাগন ফল, পেয়ারা ও কফিসহ বিভিন্ন ফসল চাষ করে সফলতা অর্জন করেন তিনি।

ছানোয়ার হোসেন বলেন, তার গ্রামের ২০ কিলোমিটারের মধ্যে কোনো কলেজ ছিল না। দরিদ্র কৃষক পরিবারের পক্ষে সন্তানদের দূরে ছাত্রাবাসে রেখে পড়াশোনা করানো কঠিন। তাই নিজের এলাকায় একটি কলেজ প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

তিনি জানান, বাবার ৯৫ শতাংশ এবং নিজের ৪০ শতাংশ জমি মিলিয়ে মোট ১৩৫ শতাংশ জমির ওপর ২০১৩ সালে মহিষমারা কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয়। ২০২২ সালে কলেজটি এমপিওভুক্ত হয়। বর্তমানে তিন শতাধিক শিক্ষার্থীর জন্য ১৮ জন শিক্ষক রয়েছেন। সরকারের শিক্ষা বিভাগের উদ্যোগে কলেজে একটি পাকা ভবনও নির্মাণ করা হয়েছে।

বাড়িতেও কৃষিকাজ করছে শিক্ষার্থীরা

কলেজের শিক্ষার্থীরা জানায়, উৎপাদনমুখী শিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে তারা কীটনাশকমুক্ত সবজি চাষের বিভিন্ন পদ্ধতি শিখেছে। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে অনেকে বাড়িতে বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ করছে। এতে তাদের অভিভাবকরাও খুশি।

শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ ভবিষ্যতে কৃষি কর্মকর্তা হওয়ার স্বপ্নের কথাও জানিয়েছে।

কলেজের প্রভাষক শহিদুল ইসলাম বলেন, পড়াশোনার পাশাপাশি শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে কৃষিতে উৎপাদনমুখী শিক্ষা দেওয়া হয়। ক্লাসের বিরতিতে ও ছুটির পর শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন গ্রুপে ভাগ করে কৃষিকাজে সম্পৃক্ত করা হয়। শিক্ষার্থীরাও আনন্দের সঙ্গে এতে অংশ নেয়।

‘মোবাইল আসক্তি কমছে, তৈরি হচ্ছে কৃষির প্রতি আগ্রহ’

মহিষমারা কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুর রাজ্জাক বলেন, কলেজের শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পাশাপাশি কৃষি উৎপাদনমুখী শিক্ষায় যুক্ত করতে আন্তরিকভাবে কাজ করছেন। এর ফলে শিক্ষার্থীরা মোবাইল ও ইন্টারনেটের অতিরিক্ত ব্যবহার থেকে কিছুটা দূরে থাকার পাশাপাশি বাড়িতেও মা-বাবাকে কৃষিকাজে সহযোগিতা করার মানসিকতা তৈরি করছে।

কৃষি উদ্যোক্তা তৈরির সম্ভাবনা

মহিষমারা কলেজের সভাপতি ও মধুপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, প্রতিষ্ঠাতা ও শিক্ষকদের আন্তরিকতার ফলেই প্রান্তিক পর্যায়ের একটি কলেজ অল্প সময়ে অনেক দূর এগিয়েছে।

তিনি বলেন, শিক্ষাজীবন শেষ করলেই শিক্ষার্থীরা চাকরি পাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। তাই পড়াশোনার পাশাপাশি কৃষি উৎপাদনমুখী প্রশিক্ষণ নিতে পারলে শিক্ষার্থীরা কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে ভবিষ্যতে কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে।

ডিজিটাল আসক্তির সময়ে মহিষমারা কলেজের এই উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের বাস্তবমুখী ও উৎপাদনমুখী শিক্ষায় যুক্ত করার পাশাপাশি কৃষির প্রতি নতুন প্রজন্মের আগ্রহ তৈরিতে একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে উঠছে।
ঢাকা/ইবিটাইমস/এসএস

জনপ্রিয়

টাঙ্গাইলে রেলক্রসিংয়ে আটকে গেল বালুবাহী ট্রাক, লাল পতাকা উড়িয়ে থামানো হলো ট্রেন

Address : Erlaaer Strasse 49/8/16 A-1230 Vienna,Austria. Mob : +43676848863279, 8801719316684 (BD) 8801911691101 ( Ads) Email : eurobanglatimes123@gmail.com
Translate »

ডিজিটাল স্ক্রিন ছেড়ে ফসলের মাঠে শিক্ষার্থীরা, টাঙ্গাইলে ব্যতিক্রমী কৃষিশিক্ষা

আপডেটের সময় ১২:২৮:৫৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬

শফিকুজ্জামান খান মোস্তফা, টাঙ্গাইল : মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল ডিভাইসের অতিরিক্ত ব্যবহারে যখন শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ স্ক্রিননির্ভর হয়ে পড়ছে, ঠিক তখনই এর ব্যতিক্রমী চিত্র দেখা গেছে টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার মহিষমারা কলেজে। এখানে মোবাইলের পরিবর্তে শিক্ষার্থীরা হাতে তুলে নিয়েছে খুন্তি, কোদাল ও কাস্তেসহ বিভিন্ন কৃষি উপকরণ। ফসলের মাঠে নেমে তারা হাতে-কলমে শিখছে বীজ থেকে চারা উৎপাদন ও নিরাপদ কৃষির নানা কৌশল।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এমন উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে ইতিবাচক ভূমিকা রাখার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে কৃষি উৎপাদন ও উদ্যোক্তা তৈরির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

কৃষিনির্ভর এলাকায় ব্যতিক্রমী উদ্যোগ

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মধুপুর উপজেলার প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকার মহিষমারা গ্রামে পরিচালিত হচ্ছে এই জীবনমুখী শিক্ষা কার্যক্রম। ২০১৩ সালে গ্রামের কৃষক ও জাতীয় কৃষি পুরস্কারপ্রাপ্ত আদর্শ কৃষক ছানোয়ার হোসেন বাবার কাছ থেকে পাওয়া ৯৫ শতাংশ জমি এবং নিজের ৪০ শতাংশ জমি মিলিয়ে মোট ১৩৫ শতাংশ জমির ওপর মহিষমারা কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন।

টাঙ্গাইল শহর থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে এবং মধুপুর উপজেলা সদর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার পূর্বে মহিষমারা গ্রামের অবস্থান। এলাকাটি মূলত কৃষিনির্ভর এবং মধুপুরের আনারস চাষের জন্যও পরিচিত।

স্থানীয়দের অধিকাংশই কৃষিজীবী। অর্থাভাব ও দূরত্বের কারণে অনেক পরিবারের পক্ষেই সন্তানদের দূরে রেখে কলেজে পড়ানো সম্ভব ছিল না। এ বাস্তবতা থেকেই স্থানীয় দরিদ্র শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ করে দিতে কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন ছানোয়ার হোসেন।

বর্তমানে মহিষমারা কলেজে তিন শতাধিক শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের উৎপাদনমুখী ও বাস্তবভিত্তিক শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত করতে নেওয়া হয়েছে এই বিশেষ উদ্যোগ।

মাঠে নেমে কৃষি শেখে শিক্ষার্থীরা

সরেজমিনে দেখা যায়, মধুপুর উপজেলা সদর থেকে পাকা সড়ক ধরে গারো বাজার হয়ে মহিষমারা গ্রামে পৌঁছানো যায়। চারপাশে সবুজ ধানক্ষেত ও বিলের মনোরম পরিবেশ। গ্রামের শুরুতেই কলেজটির অবস্থান।

কলেজে গিয়ে দেখা যায়, শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের পাশাপাশি উৎপাদনমুখী শিক্ষা কর্নারে প্রায় ৩০ জন শিক্ষার্থী কৃষিকাজে ব্যস্ত। কলেজের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ছানোয়ার হোসেন শিক্ষার্থীদের সবজির বীজ বোনার আগে মাটি প্রস্তুতের বিভিন্ন কৌশল শেখাচ্ছেন। তার নির্দেশনায় শিক্ষার্থীরা নিজেরাই মাটি প্রস্তুত ও বীজ বপনের কাজ করছে।

২০১৮ সাল থেকে উৎপাদনমুখী শিক্ষা

কলেজের শিক্ষক ও এলাকাবাসী জানান, ২০১৮ সালে শিক্ষার্থীদের জন্য উৎপাদনমুখী শিক্ষা কার্যক্রম চালু করা হয়। এ জন্য কলেজের পূর্ব পাশে প্রায় ৪০ শতাংশ জায়গায় একটি বিশেষ কর্নার তৈরি করা হয়েছে।

সেখানে শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে বিষমুক্ত ও নিরাপদ ফসল উৎপাদনের পদ্ধতি শেখানো হয়। বিভিন্ন মৌসুমের সবজি, ফল ও মসলার চারা উৎপাদনসহ মাটি প্রস্তুত, বীজ বপন ও পরিচর্যার বিভিন্ন কৌশলও শেখানো হয়।

কলেজ কর্তৃপক্ষের আশা, এখানে কৃষিকাজ শেখার পর শিক্ষার্থীরা নিজেদের বাড়িতেও সবজি বাগান ও ছোট পরিসরে কৃষি উদ্যোগ গড়ে তুলতে পারবে।

চাকরির পাশাপাশি কৃষি উদ্যোক্তা হওয়ার শিক্ষা

জাতীয় কৃষি পুরস্কারপ্রাপ্ত কৃষক ছানোয়ার হোসেন জানান, ১৯৯২ সালে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি সিলেটের একটি স্কুলে ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। সেখানে প্রায় সাড়ে তিন বছর চাকরি করার পর গ্রামে ফিরে আসেন। পরে গ্রামের একটি স্কুলে দুই বছর প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। তবে কৃষির প্রতি আগ্রহ থেকে শেষ পর্যন্ত শিক্ষকতার চাকরিও ছেড়ে দেন।

এরপর বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে আনারস, কলা, হলুদ, ভুট্টা, মাল্টা, ড্রাগন ফল, পেয়ারা ও কফিসহ বিভিন্ন ফসল চাষ করে সফলতা অর্জন করেন তিনি।

ছানোয়ার হোসেন বলেন, তার গ্রামের ২০ কিলোমিটারের মধ্যে কোনো কলেজ ছিল না। দরিদ্র কৃষক পরিবারের পক্ষে সন্তানদের দূরে ছাত্রাবাসে রেখে পড়াশোনা করানো কঠিন। তাই নিজের এলাকায় একটি কলেজ প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

তিনি জানান, বাবার ৯৫ শতাংশ এবং নিজের ৪০ শতাংশ জমি মিলিয়ে মোট ১৩৫ শতাংশ জমির ওপর ২০১৩ সালে মহিষমারা কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয়। ২০২২ সালে কলেজটি এমপিওভুক্ত হয়। বর্তমানে তিন শতাধিক শিক্ষার্থীর জন্য ১৮ জন শিক্ষক রয়েছেন। সরকারের শিক্ষা বিভাগের উদ্যোগে কলেজে একটি পাকা ভবনও নির্মাণ করা হয়েছে।

বাড়িতেও কৃষিকাজ করছে শিক্ষার্থীরা

কলেজের শিক্ষার্থীরা জানায়, উৎপাদনমুখী শিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে তারা কীটনাশকমুক্ত সবজি চাষের বিভিন্ন পদ্ধতি শিখেছে। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে অনেকে বাড়িতে বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ করছে। এতে তাদের অভিভাবকরাও খুশি।

শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ ভবিষ্যতে কৃষি কর্মকর্তা হওয়ার স্বপ্নের কথাও জানিয়েছে।

কলেজের প্রভাষক শহিদুল ইসলাম বলেন, পড়াশোনার পাশাপাশি শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে কৃষিতে উৎপাদনমুখী শিক্ষা দেওয়া হয়। ক্লাসের বিরতিতে ও ছুটির পর শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন গ্রুপে ভাগ করে কৃষিকাজে সম্পৃক্ত করা হয়। শিক্ষার্থীরাও আনন্দের সঙ্গে এতে অংশ নেয়।

‘মোবাইল আসক্তি কমছে, তৈরি হচ্ছে কৃষির প্রতি আগ্রহ’

মহিষমারা কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুর রাজ্জাক বলেন, কলেজের শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পাশাপাশি কৃষি উৎপাদনমুখী শিক্ষায় যুক্ত করতে আন্তরিকভাবে কাজ করছেন। এর ফলে শিক্ষার্থীরা মোবাইল ও ইন্টারনেটের অতিরিক্ত ব্যবহার থেকে কিছুটা দূরে থাকার পাশাপাশি বাড়িতেও মা-বাবাকে কৃষিকাজে সহযোগিতা করার মানসিকতা তৈরি করছে।

কৃষি উদ্যোক্তা তৈরির সম্ভাবনা

মহিষমারা কলেজের সভাপতি ও মধুপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, প্রতিষ্ঠাতা ও শিক্ষকদের আন্তরিকতার ফলেই প্রান্তিক পর্যায়ের একটি কলেজ অল্প সময়ে অনেক দূর এগিয়েছে।

তিনি বলেন, শিক্ষাজীবন শেষ করলেই শিক্ষার্থীরা চাকরি পাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। তাই পড়াশোনার পাশাপাশি কৃষি উৎপাদনমুখী প্রশিক্ষণ নিতে পারলে শিক্ষার্থীরা কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে ভবিষ্যতে কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে।

ডিজিটাল আসক্তির সময়ে মহিষমারা কলেজের এই উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের বাস্তবমুখী ও উৎপাদনমুখী শিক্ষায় যুক্ত করার পাশাপাশি কৃষির প্রতি নতুন প্রজন্মের আগ্রহ তৈরিতে একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে উঠছে।
ঢাকা/ইবিটাইমস/এসএস