ইবিটাইমস ডেস্ক: হরমুজ প্রণালির পর এবার নতুন করে বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়েছে বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব আল-মান্দেব। ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের তৎপরতায় লোহিত সাগরের প্রবেশমুখের এই কৌশলগত জলপথে জাহাজ চলাচল নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এর প্রভাব ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্য থেকে এশিয়ার বাজারে তেল সরবরাহের ওপর পড়তে শুরু করেছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন এই অনিশ্চয়তার কারণে তেলের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে পরিবহন ও বীমা ব্যয় বাড়লে তার প্রভাব বৈশ্বিক পণ্যমূল্য ও মূল্যস্ফীতিতেও পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব?
বাব আল-মান্দেব প্রণালি ইয়েমেন ও জিবুতির মধ্যবর্তী একটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ। সরু এই জলপথ লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে সংযুক্ত করেছে।
মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইউরোপ, এশিয়া ও বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে জ্বালানি ও পণ্য পরিবহনে দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে এই প্রণালি। বিশেষ করে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল এশিয়ার বিভিন্ন বাজারে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে বাব আল-মান্দেবের কৌশলগত গুরুত্ব অনেক।
ফলে এই নৌপথে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হলে শুধু আঞ্চলিক বাণিজ্য নয়, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
হুথিদের তৎপরতায় বাড়ছে নিরাপত্তা উদ্বেগ
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সংঘাতের মধ্যেই বাব আল-মান্দেব ঘিরে নতুন করে নিরাপত্তা সংকট তৈরি হয়েছে। ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা কয়েক সপ্তাহ ধরে এই অঞ্চলে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে হুমকি দিয়ে আসছে।
সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোখা হুথিদের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার পাশাপাশি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মায়ুন দ্বীপও তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
মায়ুন দ্বীপের অবস্থান বাব আল-মান্দেবের কাছাকাছি হওয়ায় এর নিয়ন্ত্রণ নৌপথটির নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
হরমুজ সংকটের পর বাব আল-মান্দেবের গুরুত্ব আরও বেড়েছে
বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। ওই নৌপথে সংকট তৈরি হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্য থেকে এশিয়ার বাজারে তেল পরিবহনের জন্য বিকল্প রুটের গুরুত্ব বেড়ে যায়।
এই পরিস্থিতিতে বাব আল-মান্দেবও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ এই নৌপথ ব্যবহার করে এশিয়ার বাজারে তেল পাঠায়।
কিন্তু হুথিদের হুমকির কারণে এই রুটে তেল পরিবহনের পরিমাণ কমে এসেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আগস্টে বাব আল-মান্দেব দিয়ে তেল পরিবহনের প্রবাহ প্রায় ৪ লাখ ব্যারেলে নেমে এসেছিল। সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে সেই প্রবাহ আরও কমেছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
বিকল্প পথে যেতে বাড়বে সময় ও খরচ
বাব আল-মান্দেব এড়িয়ে মধ্যপ্রাচ্য থেকে এশিয়ায় তেল ও অন্যান্য পণ্য পরিবহন করতে হলে জাহাজগুলোকে দীর্ঘ বিকল্প পথ ব্যবহার করতে হবে।
সেক্ষেত্রে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেবের পরিবর্তে জাহাজকে আফ্রিকা ঘুরে ভারত মহাসাগর হয়ে এশিয়ার দিকে যেতে হতে পারে। এতে একটি যাত্রায় অতিরিক্ত কয়েক হাজার নটিক্যাল মাইল পথ পাড়ি দিতে হবে।
ফলে জাহাজের জ্বালানি খরচ বাড়বে, বাড়বে কর্মী ও পরিচালন ব্যয়ও। একই সঙ্গে সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলের কারণে বীমা ব্যয়ও বেড়ে যেতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিকল্প রুট ব্যবহার করলে একটি যাত্রায় প্রায় এক মাস পর্যন্ত অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে। এতে শুধু তেল পরিবহন নয়, অন্যান্য আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহনেও বড় ধরনের বিলম্ব তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শেষ পর্যন্ত চাপ পড়তে পারে ভোক্তার ওপর
নৌপথে অস্থিরতার কারণে পরিবহন ব্যয় বাড়লে তার প্রভাব ধাপে ধাপে বিশ্ববাজারে ছড়িয়ে পড়তে পারে। প্রথমে বাড়তে পারে জাহাজ পরিচালনা ও বীমা ব্যয়। এরপর সেই বাড়তি খরচ পণ্যের আমদানি ও সরবরাহ ব্যবস্থায় যুক্ত হবে।
তেল পরিবহনের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জ্বালানি পরিবহন ব্যয় বেড়ে গেলে তার প্রভাব শুধু পেট্রোল, ডিজেল বা অন্যান্য জ্বালানির দামে সীমাবদ্ধ থাকে না। পণ্য পরিবহন, শিল্প উৎপাদন, কৃষি ও দৈনন্দিন ভোগ্যপণ্যের দামেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
বিশ্ববাজারে জ্বালানি ব্যয় বাড়লে মূল্যস্ফীতির ওপরও নতুন চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বৈশ্বিক অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়তে পারে?
বাব আল-মান্দেব বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথগুলোর একটি হওয়ায় এখানে দীর্ঘস্থায়ী সংকট তৈরি হলে এর প্রভাব ভৌগোলিক সীমারেখার মধ্যে আটকে থাকবে না।
মধ্যপ্রাচ্য থেকে এশিয়ার বাজারে তেল সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে। একই সময়ে বিকল্প পথে জাহাজ পরিচালনার খরচ বেড়ে গেলে আমদানিকারক দেশগুলোর ব্যয়ও বাড়তে পারে।
এর সঙ্গে যদি হরমুজ প্রণালির সংকটও দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর একসঙ্গে একাধিক চাপ তৈরি হতে পারে।
সংকট দীর্ঘায়িত হলে বাড়বে অনিশ্চয়তা
বাব আল-মান্দেব ঘিরে নিরাপত্তা পরিস্থিতি কতদিন স্থায়ী হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে জাহাজ চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠলে আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলো বিকল্প পথ বেছে নিতে পারে।
তবে দীর্ঘ বিকল্প রুট ব্যবহারের কারণে সময় ও ব্যয় দুটোই বাড়বে। ফলে বিশ্ববাজারে পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন করে চাপ তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে তেল ও জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে তার প্রভাব আন্তর্জাতিক বাজারে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই হরমুজের পর বাব আল-মান্দেব ঘিরে তৈরি হওয়া পরিস্থিতিকে এখন শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংকট হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ঢাকা/এসএস




















