ভিয়েনা ১২:৫৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম :
টাঙ্গাইলে হাসপাতালের আঙিনা নিজ হাতে পরিষ্কার করলেন প্রতিমন্ত্রী টুকু সমাজ থেকে সব ধরনের অপরাধ মুছে দেবে বিএনপি: রিজভী হরমুজের পর এবার ঝুঁকিতে বাব আল-মান্দেব, তেল সরবরাহে নতুন সংকট রাজধানীতে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার ঝিনাইদহের জাতীয় বীর, কবি-সাহিত্যিক ও মনীষীদের স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণে নেই কার্যকর উদ্যোগ টাঙ্গাইলে ১১ দলীয় ঐক্যের সংবাদ সম্মেলন মৎস্য উৎপাদন বাড়াতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে: প্রতিমন্ত্রী টুকু শেখ হাসিনা ছিলেন বিশ্বের সেরা অভিনেত্রী: মেজর হাফিজ কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্র গঠনে সকলকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিতে অপ্রত্যাশিত প্রবৃদ্ধি, নেপথ্যে এআই

ঝিনাইদহের জাতীয় বীর, কবি-সাহিত্যিক ও মনীষীদের স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণে নেই কার্যকর উদ্যোগ

  • EuroBanglaTimes
  • আপডেটের সময় ০১:০২:২৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ৬ সময় দেখুন

শেখ ইমন, ঝিনাইদহ : জাতীয় বীর, বিপ্লবী, কবি-সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ, বিজ্ঞানী, শিল্পী, দার্শনিক ও মরমি সাধকদের জন্মভূমি ঝিনাইদহ। এই জেলার মাটিতে জন্ম নিয়েছেন এমন বহু কৃতী মানুষ, যাঁদের অবদান ছড়িয়ে আছে দেশ-বিদেশে। অথচ তাঁদের অনেকের জন্মভিটা আজ অরক্ষিত, কোথাও পৈতৃক বসতভিটা বেদখলের পথে, আবার কোথাও স্মৃতিচিহ্নের অস্তিত্বই নেই।

রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তহীনতা, প্রাতিষ্ঠানিক উদাসীনতা এবং যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে ঝিনাইদহের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ নানা অধ্যায়। কৃতী সন্তানদের জন্মভিটা, পৈতৃক বসতবাড়ি, স্মৃতিচিহ্ন, দলিলপত্র ও ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো সংরক্ষণে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত কোনো উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়।

এমনকি অনেক মনীষীর জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকীতেও জেলা পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য আয়োজন দেখা যায় না। ফলে নিজেদের জনপদের ইতিহাস ও কৃতী সন্তানদের অবদান নতুন প্রজন্মের কাছে ক্রমেই অচেনা হয়ে পড়ছে।

হারিয়ে গেছে বাঘা যতীনের জন্মভিটার অস্তিত্ব

ঝিনাইদহের ইতিহাসে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম উজ্জ্বল নাম যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, যিনি বাঘা যতীন নামে পরিচিত। ১৮৭৯ সালের ৭ ডিসেম্বর জন্ম নেওয়া এই বিপ্লবী নেতা ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

হরিণাকুণ্ডুর রিশখালি গ্রামে তাঁর পৈতৃক ভিটাবাড়ি ছিল। কিন্তু বর্তমানে সেখানে তাঁর জন্মভিটার কোনো দৃশ্যমান অস্তিত্ব নেই। স্বাধীনতা সংগ্রামের এই মহান বিপ্লবীর জন্মভূমির স্মৃতি সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়ও হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

অরক্ষিত ইলা মিত্রের পৈতৃক বাড়ি

তেভাগা আন্দোলন ও নাচোল কৃষক বিদ্রোহের নেত্রী কমরেড ইলা মিত্র শোষিত ও বঞ্চিত কৃষকের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের অন্যতম প্রতীক। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ও তাঁর সঙ্গে এ দেশের মানুষের সম্পর্ক ছিল গভীর।

শৈলকুপার বাগুটিয়ার রায়পাড়ায় ইলা মিত্রের পৈতৃক বাড়িটি ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটি বর্তমানে অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। সংরক্ষণের উদ্যোগ না থাকায় বাড়িটি ধ্বংসের ঝুঁকিতে রয়েছে। একটি স্থাপনা হারিয়ে গেলে এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি সংগ্রামী ইতিহাসও হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

মনীষীদের জন্মভূমিতে নেই স্মৃতিফলক

ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরে জন্ম নেওয়া প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ও সমাজসেবক মথুরানাথ বসুর ভিটামাটি সংরক্ষণেও দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই।

মহেশপুরের বজরাপুরে জন্ম নেওয়া সাহিত্যিক ও সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিত জয়গোপাল তর্কালঙ্কার সংস্কৃত কলেজের কাব্য অধ্যাপক ছিলেন। তাঁর শিক্ষার্থীদের মধ্যে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মতো মনীষীও ছিলেন। অথচ তাঁর জন্মভূমিতে যথাযথ স্মৃতিচিহ্ন নেই।

একইভাবে মহেশপুরের কাজীরবেড় গ্রামে জন্ম নেওয়া রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, সাংবাদিক, লেখক এবং রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সংগঠক মহসিন শস্ত্রপাণির জন্মস্থানেও কোনো স্মৃতিফলক নির্মিত হয়নি।

বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের স্মৃতিও উপেক্ষিত

মুক্তিযুদ্ধের সর্বোচ্চ সামরিক সম্মান বীরশ্রেষ্ঠ খেতাবপ্রাপ্ত সাতজন শহীদের অন্যতম সিপাহী মোহাম্মদ হামিদুর রহমান। মাত্র ১৮ বছর বয়সে দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করা এই বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন বীরশ্রেষ্ঠদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ।

জাতীয় এই বীরের জন্মভূমির স্মৃতি যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও স্মারক নির্মাণে প্রত্যাশিত উদ্যোগ না থাকায় প্রশ্ন উঠেছে। স্বাধীনতার জন্য জীবন দেওয়া একজন বীরের জন্মভূমিতেই যদি তাঁর স্মৃতি দৃশ্যমানভাবে সংরক্ষিত না থাকে, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কীভাবে তাঁর আত্মত্যাগের ইতিহাস জানবে—এমন প্রশ্নই তুলছেন স্থানীয় সচেতন মহল।

বিজ্ঞান, প্রত্নতত্ত্ব ও সমাজচিন্তার কৃতীরাও বিস্মৃত

কালীগঞ্জের রায়গ্রামে জন্ম নেওয়া সাধক, সঙ্গীতজ্ঞ ও নাট্যগীতিকার রসিকলাল চক্রবর্তীর পৈতৃক গ্রামেও উল্লেখযোগ্য কোনো স্মৃতিস্মারক নেই।

কালীগঞ্জের দেবরাজপুরে জন্ম নেওয়া প্রত্নতত্ত্ববিদ ড. ননীগোপাল মজুমদার সিন্ধু সভ্যতার বহু প্রত্নস্থল আবিষ্কারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। প্রত্নতত্ত্বের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা এই গবেষকের জন্মভূমিতেও তাঁর স্মৃতি সংরক্ষিত হয়নি।

ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের বিপ্লবী ও সমাজকর্মী ভবভূষণ মিত্র, যিনি স্বামী সত্যানন্দ পুরী নামেও পরিচিত ছিলেন, জন্মেছিলেন কালীগঞ্জের বলরামপুরে। তাঁর জন্মভূমিতেও উল্লেখযোগ্য স্মারকচিহ্ন নেই।

রবীন্দ্র-গবেষণায় খ্যাতিমান অধ্যাপক সৈয়দ আকরম হোসেন জন্মেছিলেন কালীগঞ্জের গোপালপুর গ্রামে। শিক্ষাজগতের এই কৃতী ব্যক্তির স্মরণেও জেলায় দৃশ্যমান কোনো স্থাপনা গড়ে ওঠেনি।

পাগলা কানাই থেকে সিরাজ সাঁই—মরমি সাধনার স্মৃতিও অনাদরে

ঝিনাইদহ শুধু বিপ্লবী, বিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদদের জন্মভূমি নয়; মরমি সাধনা ও বাউল দর্শনেরও গুরুত্বপূর্ণ একটি জনপদ।

সদরের বেড়বাড়ি গ্রামের সন্তান পাগলা কানাই ছিলেন বাঙালি মরমি কবি ও সাধক। তাঁর দেহতত্ত্ব, জারি, বাউল, মারফতি ও মুর্শিদি গান বাংলা লোকসংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। অথচ তাঁর স্মৃতিও যথাযথভাবে সংরক্ষিত নয়।

হরিণাকুণ্ডুর বেলতলায় জন্ম নেওয়া বাউল সাধক দুদ্দু শাহ ছিলেন লালনের অনুসারী ও মরমি সাধনার গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। তাঁর স্মরণেও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য আয়োজন নেই।

অন্যদিকে হরিণাকুণ্ডুর হরিশপুরে রয়েছে বাউল সাধক সিরাজ সাঁইয়ের সমাধি। বাউল সম্রাট লালনের গুরু হিসেবে পরিচিত এই সাধকের স্মৃতিও আরও বৃহৎ পরিসরে সংরক্ষণ ও উপস্থাপনের দাবি রাখে।

লালনের জন্মভূমিতেও বড় স্মারকের দাবি

বাউল সম্রাট লালন শাহকে ঘিরে কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়া বিশ্বজুড়ে পরিচিত হলেও তাঁর জীবনের শেকড়ের গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় জড়িয়ে আছে ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডুর হরিশপুরের সঙ্গে।

স্থানীয় ইতিহাস ও প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, হরিশপুরেই লালনের জন্ম এবং এখানকার সাধক সিরাজ সাঁইয়ের কাছ থেকেই তিনি বাউল সাধনায় দীক্ষা লাভ করেন বলে বলা হয়ে থাকে।

লালনের দর্শন ও গান নিয়ে দেশে-বিদেশে ব্যাপক গবেষণা হলেও তাঁর সঙ্গে সম্পর্কিত ঝিনাইদহের ঐতিহাসিক স্থানগুলোকে আরও বড় পরিসরে সংরক্ষণ ও উপস্থাপনের দাবি দীর্ঘদিনের।

সাহিত্য ও শিল্পের কৃতীরাও নেই যথাযথ স্মরণে

ঝিনাইদহ সদর উপজেলার হাটগোপালপুরে জন্ম নেওয়া প্রথিতযশা সাংবাদিক ও সাহিত্যিক গৌরকিশোর ঘোষ বাংলা সাংবাদিকতা ও সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। ‘রূপদর্শী’ ছদ্মনামেও তাঁর সাহিত্যকর্ম পরিচিত। অথচ জন্মভূমিতে তাঁর স্মরণে উল্লেখযোগ্য কোনো স্থাপনা নেই।

গণিতশাস্ত্রবিদ ও বিজ্ঞানশিক্ষক কালীপদ বসু, যিনি কে.পি. বসু নামে পরিচিত, জন্মেছিলেন সদর উপজেলার হরিশংকরপুরে। গণিতশিক্ষা ও বীজগণিতের প্রসারে তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্য। তাঁর বাড়িটি ঐতিহাসিক ও প্রত্নসম্পদ হিসেবে বিবেচিত হলেও সেটিও অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে।

সদর উপজেলার দুর্গাপুর গ্রামের সন্তান জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী ছিলেন শিক্ষাবিদ, কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক ও সম্পাদক। তাঁর জন্মভূমিতেও স্মৃতি সংরক্ষণে দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই।

শৈলকুপার রতিডাঙ্গা গ্রামের সন্তান স্থপতি ও কবি রবিউল হুসাইন মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। অথচ নিজের জন্মভূমিতে তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণে তেমন উদ্যোগ নেই।

শৈলকুপার উমেদপুরে জন্ম নেওয়া চিত্রশিল্পী কাজী হাসান হাবিব মাত্র ৩৯ বছর বয়সে মারা যান। এই ক্ষণজন্মা শিল্পীর স্মরণেও নেই উল্লেখযোগ্য আয়োজন।

একই পরিবারের দুই প্রজন্মের দুই কৃতী

ঝিনাইদহের শৈলকুপার মনোহরপুর গ্রাম বাংলা সাহিত্য ও শিল্পাঙ্গনের দুই প্রজন্মের দুই বরেণ্য মানুষের স্মৃতি বহন করছে।

এই গ্রামেই জন্মেছিলেন বাংলা সাহিত্যের মুসলিম রেনেসাঁর কবি গোলাম মোস্তফা (১৮৯৭–১৯৬৪)। তাঁর সাহিত্যকর্ম বাংলা সাহিত্যে বিশেষ মর্যাদা লাভ করেছে।

তাঁরই সন্তান বাংলাদেশের প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী, পাপেটশিল্পের পথিকৃৎ ও সংস্কৃতিজন মুস্তফা মনোয়ার। ১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর মাতুলালয়ে জন্ম হলেও তাঁর পৈতৃক নিবাস ঝিনাইদহের শৈলকুপার মনোহরপুর গ্রামে। চিত্রকলা, পাপেট, টেলিভিশন নাটক ও শিল্পশিক্ষায় তাঁর অবদান বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে স্মরণীয়।

২০২৬ সালের ২৯ জুন তাঁর মৃত্যু হয়।

একই পরিবারের দুই প্রজন্মের এই দুই বরেণ্য ব্যক্তির শিকড় ঝিনাইদহের মনোহরপুরে প্রোথিত হলেও তাঁদের পৈতৃক ভিটা ও স্মৃতিকে কেন্দ্র করে এখনো প্রত্যাশিত কোনো স্থায়ী স্মারক বা স্মৃতি কমপ্লেক্স গড়ে ওঠেনি।

জামাল নজরুল ইসলাম ও সুলতানা জামান—এক পরিবারের দুই কৃতী

ঝিনাইদহের আরেক গর্ব প্রখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী, গণিতবিদ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও বিশ্বতত্ত্ববিদ জামাল নজরুল ইসলাম। ১৯৩৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ঝিনাইদহ শহরে জন্ম নেওয়া এই বিজ্ঞানীর নাম আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানাঙ্গনেও সুপরিচিত।

তাঁর সহোদরা সুলতানা সারওয়াত আরা জামান ছিলেন শিক্ষাবিদ, মনোবিজ্ঞানী ও লোকহিতৈষী। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কল্যাণে কাজ করা বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম হিসেবেও তাঁর ভূমিকা রয়েছে।

একই পরিবারের দুই কৃতী মানুষের জন্মভূমি ঝিনাইদহে তাঁদের স্মৃতি ধরে রাখার মতো স্থায়ী ও সম্মানজনক উদ্যোগ না থাকায় হতাশা প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।

শহীদ বুদ্ধিজীবীর স্মৃতিও অরক্ষিত

শৈলকুপার কাচেরকোল গ্রামের সন্তান এ.এন.এম. মুনিরুজ্জামান ছিলেন প্রখ্যাত পরিসংখ্যানবিদ ও শহীদ বুদ্ধিজীবী। মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে তিনি ও তাঁর পরিবারের কয়েকজন সদস্য নিহত হন।

জাতীয় পর্যায়ে স্বীকৃত এই শহীদ বুদ্ধিজীবীর নামে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ স্মারক ডাকটিকিটও প্রকাশ করেছে। অথচ তাঁর জন্মভূমিতে স্মৃতি সংরক্ষণে দৃশ্যমান উদ্যোগ না থাকায় স্থানীয় ইতিহাসপ্রেমীদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে।

নীল বিদ্রোহের স্মৃতিও হারিয়ে যাচ্ছে

ঝিনাইদহের ইতিহাস শুধু ব্যক্তিমানুষের কীর্তিতে সীমাবদ্ধ নয়। এ জনপদের মাটিতে রয়েছে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, নীল বিদ্রোহ, তেভাগা আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের বহু স্মৃতি।

১৮৮৯ সালের শৈলকুপার নীল বিদ্রোহ এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। শৈলকুপার অদূরের বিজুলিয়া নীলকুঠির অধ্যক্ষ ডাম্বলের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে ৪৮ গ্রামের কৃষক ঐক্যবদ্ধ হয়ে নীলকুঠিতে হামলা চালান বলে ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে।

এই বিদ্রোহের সঙ্গে যুক্ত বুঙ্কবিহারী মিত্র, বসন্ত মিত্র, সরদার সাখাওয়াতুল্লা ও জমির উদ্দিন মণ্ডলসহ সংশ্লিষ্ট কৃষক নেতাদের স্মরণে আজও উল্লেখযোগ্য কোনো স্মৃতিফলক নির্মিত হয়নি।

একটি স্মৃতিফলক কেবল ইট-পাথরের স্থাপনা নয়; যথাযথভাবে নির্মাণ ও উপস্থাপন করা গেলে এটি একটি প্রজন্মের কাছে ইতিহাসের জীবন্ত পাঠশালায় পরিণত হতে পারে।

‘ইতিহাস সংরক্ষণ না করলে আত্মপরিচয়ও হারাবে’

ঝিনাইদহের বিশিষ্ট গেরিলা বীর মুক্তিযোদ্ধা জে এ ওয়াহেদ বলেন, সংরক্ষণের সিদ্ধান্তহীনতা, প্রাতিষ্ঠানিক উদাসীনতা ও যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে জেলার বহু ঐতিহাসিক স্মারক এবং কৃতী সন্তানদের স্মৃতিচিহ্ন ধ্বংসের মুখে পড়েছে।

তাঁর মতে, ইতিহাসকে অবহেলা করা শুধু ঐতিহ্যকে ম্লান করে না, নতুন প্রজন্মের কাছ থেকে এই জনপদের বীরত্ব, গৌরব ও আত্মপরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশও দূরে সরিয়ে দেয়।

সংরক্ষণে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ

জেলার সচেতন নাগরিক সুজন বিপ্লব বলেন, ঝিনাইদহের কৃতী সন্তানদের জন্মভূমি ও ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো চিহ্নিত করে একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করা জরুরি।

এরপর প্রতিটি স্থানের জমি ও মালিকানা যাচাই, বেদখল হয়ে থাকলে তা উদ্ধারের উদ্যোগ, প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় সংরক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী স্মৃতিফলক, জাদুঘর বা স্মারক কমপ্লেক্স নির্মাণের পরামর্শ দেন তিনি।

তিনি বলেন, জেলা প্রশাসন, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার এবং গবেষক ও ইতিহাসবিদদের সমন্বয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া যেতে পারে।

একই সঙ্গে কৃতী ব্যক্তিদের জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকীতে নিয়মিত আলোচনা, প্রদর্শনী, গবেষণা ও সাংস্কৃতিক আয়োজন করা হলে এসব ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে আরও কার্যকরভাবে পৌঁছাবে বলে মনে করেন তিনি।

জেলা প্রশাসনের বক্তব্য

ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসক মো. নোমান হোসেন বলেন, ঝিনাইদহের কৃতী সন্তান ও ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো জেলার গৌরবের অংশ।

তিনি জানান, যেসব স্থান সংরক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে। ঐতিহাসিক স্থাপনা ও স্মৃতিচিহ্ন রক্ষায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে বলেও জানান তিনি।

জনপ্রিয়

টাঙ্গাইলে হাসপাতালের আঙিনা নিজ হাতে পরিষ্কার করলেন প্রতিমন্ত্রী টুকু

Address : Erlaaer Strasse 49/8/16 A-1230 Vienna,Austria. Mob : +43676848863279, 8801719316684 (BD) 8801911691101 ( Ads) Email : eurobanglatimes123@gmail.com
Translate »

ঝিনাইদহের জাতীয় বীর, কবি-সাহিত্যিক ও মনীষীদের স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণে নেই কার্যকর উদ্যোগ

আপডেটের সময় ০১:০২:২৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শেখ ইমন, ঝিনাইদহ : জাতীয় বীর, বিপ্লবী, কবি-সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ, বিজ্ঞানী, শিল্পী, দার্শনিক ও মরমি সাধকদের জন্মভূমি ঝিনাইদহ। এই জেলার মাটিতে জন্ম নিয়েছেন এমন বহু কৃতী মানুষ, যাঁদের অবদান ছড়িয়ে আছে দেশ-বিদেশে। অথচ তাঁদের অনেকের জন্মভিটা আজ অরক্ষিত, কোথাও পৈতৃক বসতভিটা বেদখলের পথে, আবার কোথাও স্মৃতিচিহ্নের অস্তিত্বই নেই।

রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তহীনতা, প্রাতিষ্ঠানিক উদাসীনতা এবং যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে ঝিনাইদহের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ নানা অধ্যায়। কৃতী সন্তানদের জন্মভিটা, পৈতৃক বসতবাড়ি, স্মৃতিচিহ্ন, দলিলপত্র ও ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো সংরক্ষণে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত কোনো উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়।

এমনকি অনেক মনীষীর জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকীতেও জেলা পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য আয়োজন দেখা যায় না। ফলে নিজেদের জনপদের ইতিহাস ও কৃতী সন্তানদের অবদান নতুন প্রজন্মের কাছে ক্রমেই অচেনা হয়ে পড়ছে।

হারিয়ে গেছে বাঘা যতীনের জন্মভিটার অস্তিত্ব

ঝিনাইদহের ইতিহাসে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম উজ্জ্বল নাম যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, যিনি বাঘা যতীন নামে পরিচিত। ১৮৭৯ সালের ৭ ডিসেম্বর জন্ম নেওয়া এই বিপ্লবী নেতা ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

হরিণাকুণ্ডুর রিশখালি গ্রামে তাঁর পৈতৃক ভিটাবাড়ি ছিল। কিন্তু বর্তমানে সেখানে তাঁর জন্মভিটার কোনো দৃশ্যমান অস্তিত্ব নেই। স্বাধীনতা সংগ্রামের এই মহান বিপ্লবীর জন্মভূমির স্মৃতি সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়ও হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

অরক্ষিত ইলা মিত্রের পৈতৃক বাড়ি

তেভাগা আন্দোলন ও নাচোল কৃষক বিদ্রোহের নেত্রী কমরেড ইলা মিত্র শোষিত ও বঞ্চিত কৃষকের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের অন্যতম প্রতীক। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ও তাঁর সঙ্গে এ দেশের মানুষের সম্পর্ক ছিল গভীর।

শৈলকুপার বাগুটিয়ার রায়পাড়ায় ইলা মিত্রের পৈতৃক বাড়িটি ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটি বর্তমানে অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। সংরক্ষণের উদ্যোগ না থাকায় বাড়িটি ধ্বংসের ঝুঁকিতে রয়েছে। একটি স্থাপনা হারিয়ে গেলে এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি সংগ্রামী ইতিহাসও হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

মনীষীদের জন্মভূমিতে নেই স্মৃতিফলক

ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরে জন্ম নেওয়া প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ও সমাজসেবক মথুরানাথ বসুর ভিটামাটি সংরক্ষণেও দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই।

মহেশপুরের বজরাপুরে জন্ম নেওয়া সাহিত্যিক ও সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিত জয়গোপাল তর্কালঙ্কার সংস্কৃত কলেজের কাব্য অধ্যাপক ছিলেন। তাঁর শিক্ষার্থীদের মধ্যে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মতো মনীষীও ছিলেন। অথচ তাঁর জন্মভূমিতে যথাযথ স্মৃতিচিহ্ন নেই।

একইভাবে মহেশপুরের কাজীরবেড় গ্রামে জন্ম নেওয়া রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, সাংবাদিক, লেখক এবং রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সংগঠক মহসিন শস্ত্রপাণির জন্মস্থানেও কোনো স্মৃতিফলক নির্মিত হয়নি।

বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের স্মৃতিও উপেক্ষিত

মুক্তিযুদ্ধের সর্বোচ্চ সামরিক সম্মান বীরশ্রেষ্ঠ খেতাবপ্রাপ্ত সাতজন শহীদের অন্যতম সিপাহী মোহাম্মদ হামিদুর রহমান। মাত্র ১৮ বছর বয়সে দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করা এই বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন বীরশ্রেষ্ঠদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ।

জাতীয় এই বীরের জন্মভূমির স্মৃতি যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও স্মারক নির্মাণে প্রত্যাশিত উদ্যোগ না থাকায় প্রশ্ন উঠেছে। স্বাধীনতার জন্য জীবন দেওয়া একজন বীরের জন্মভূমিতেই যদি তাঁর স্মৃতি দৃশ্যমানভাবে সংরক্ষিত না থাকে, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কীভাবে তাঁর আত্মত্যাগের ইতিহাস জানবে—এমন প্রশ্নই তুলছেন স্থানীয় সচেতন মহল।

বিজ্ঞান, প্রত্নতত্ত্ব ও সমাজচিন্তার কৃতীরাও বিস্মৃত

কালীগঞ্জের রায়গ্রামে জন্ম নেওয়া সাধক, সঙ্গীতজ্ঞ ও নাট্যগীতিকার রসিকলাল চক্রবর্তীর পৈতৃক গ্রামেও উল্লেখযোগ্য কোনো স্মৃতিস্মারক নেই।

কালীগঞ্জের দেবরাজপুরে জন্ম নেওয়া প্রত্নতত্ত্ববিদ ড. ননীগোপাল মজুমদার সিন্ধু সভ্যতার বহু প্রত্নস্থল আবিষ্কারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। প্রত্নতত্ত্বের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা এই গবেষকের জন্মভূমিতেও তাঁর স্মৃতি সংরক্ষিত হয়নি।

ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের বিপ্লবী ও সমাজকর্মী ভবভূষণ মিত্র, যিনি স্বামী সত্যানন্দ পুরী নামেও পরিচিত ছিলেন, জন্মেছিলেন কালীগঞ্জের বলরামপুরে। তাঁর জন্মভূমিতেও উল্লেখযোগ্য স্মারকচিহ্ন নেই।

রবীন্দ্র-গবেষণায় খ্যাতিমান অধ্যাপক সৈয়দ আকরম হোসেন জন্মেছিলেন কালীগঞ্জের গোপালপুর গ্রামে। শিক্ষাজগতের এই কৃতী ব্যক্তির স্মরণেও জেলায় দৃশ্যমান কোনো স্থাপনা গড়ে ওঠেনি।

পাগলা কানাই থেকে সিরাজ সাঁই—মরমি সাধনার স্মৃতিও অনাদরে

ঝিনাইদহ শুধু বিপ্লবী, বিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদদের জন্মভূমি নয়; মরমি সাধনা ও বাউল দর্শনেরও গুরুত্বপূর্ণ একটি জনপদ।

সদরের বেড়বাড়ি গ্রামের সন্তান পাগলা কানাই ছিলেন বাঙালি মরমি কবি ও সাধক। তাঁর দেহতত্ত্ব, জারি, বাউল, মারফতি ও মুর্শিদি গান বাংলা লোকসংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। অথচ তাঁর স্মৃতিও যথাযথভাবে সংরক্ষিত নয়।

হরিণাকুণ্ডুর বেলতলায় জন্ম নেওয়া বাউল সাধক দুদ্দু শাহ ছিলেন লালনের অনুসারী ও মরমি সাধনার গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। তাঁর স্মরণেও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য আয়োজন নেই।

অন্যদিকে হরিণাকুণ্ডুর হরিশপুরে রয়েছে বাউল সাধক সিরাজ সাঁইয়ের সমাধি। বাউল সম্রাট লালনের গুরু হিসেবে পরিচিত এই সাধকের স্মৃতিও আরও বৃহৎ পরিসরে সংরক্ষণ ও উপস্থাপনের দাবি রাখে।

লালনের জন্মভূমিতেও বড় স্মারকের দাবি

বাউল সম্রাট লালন শাহকে ঘিরে কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়া বিশ্বজুড়ে পরিচিত হলেও তাঁর জীবনের শেকড়ের গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় জড়িয়ে আছে ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডুর হরিশপুরের সঙ্গে।

স্থানীয় ইতিহাস ও প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, হরিশপুরেই লালনের জন্ম এবং এখানকার সাধক সিরাজ সাঁইয়ের কাছ থেকেই তিনি বাউল সাধনায় দীক্ষা লাভ করেন বলে বলা হয়ে থাকে।

লালনের দর্শন ও গান নিয়ে দেশে-বিদেশে ব্যাপক গবেষণা হলেও তাঁর সঙ্গে সম্পর্কিত ঝিনাইদহের ঐতিহাসিক স্থানগুলোকে আরও বড় পরিসরে সংরক্ষণ ও উপস্থাপনের দাবি দীর্ঘদিনের।

সাহিত্য ও শিল্পের কৃতীরাও নেই যথাযথ স্মরণে

ঝিনাইদহ সদর উপজেলার হাটগোপালপুরে জন্ম নেওয়া প্রথিতযশা সাংবাদিক ও সাহিত্যিক গৌরকিশোর ঘোষ বাংলা সাংবাদিকতা ও সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। ‘রূপদর্শী’ ছদ্মনামেও তাঁর সাহিত্যকর্ম পরিচিত। অথচ জন্মভূমিতে তাঁর স্মরণে উল্লেখযোগ্য কোনো স্থাপনা নেই।

গণিতশাস্ত্রবিদ ও বিজ্ঞানশিক্ষক কালীপদ বসু, যিনি কে.পি. বসু নামে পরিচিত, জন্মেছিলেন সদর উপজেলার হরিশংকরপুরে। গণিতশিক্ষা ও বীজগণিতের প্রসারে তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্য। তাঁর বাড়িটি ঐতিহাসিক ও প্রত্নসম্পদ হিসেবে বিবেচিত হলেও সেটিও অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে।

সদর উপজেলার দুর্গাপুর গ্রামের সন্তান জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী ছিলেন শিক্ষাবিদ, কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক ও সম্পাদক। তাঁর জন্মভূমিতেও স্মৃতি সংরক্ষণে দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই।

শৈলকুপার রতিডাঙ্গা গ্রামের সন্তান স্থপতি ও কবি রবিউল হুসাইন মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। অথচ নিজের জন্মভূমিতে তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণে তেমন উদ্যোগ নেই।

শৈলকুপার উমেদপুরে জন্ম নেওয়া চিত্রশিল্পী কাজী হাসান হাবিব মাত্র ৩৯ বছর বয়সে মারা যান। এই ক্ষণজন্মা শিল্পীর স্মরণেও নেই উল্লেখযোগ্য আয়োজন।

একই পরিবারের দুই প্রজন্মের দুই কৃতী

ঝিনাইদহের শৈলকুপার মনোহরপুর গ্রাম বাংলা সাহিত্য ও শিল্পাঙ্গনের দুই প্রজন্মের দুই বরেণ্য মানুষের স্মৃতি বহন করছে।

এই গ্রামেই জন্মেছিলেন বাংলা সাহিত্যের মুসলিম রেনেসাঁর কবি গোলাম মোস্তফা (১৮৯৭–১৯৬৪)। তাঁর সাহিত্যকর্ম বাংলা সাহিত্যে বিশেষ মর্যাদা লাভ করেছে।

তাঁরই সন্তান বাংলাদেশের প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী, পাপেটশিল্পের পথিকৃৎ ও সংস্কৃতিজন মুস্তফা মনোয়ার। ১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর মাতুলালয়ে জন্ম হলেও তাঁর পৈতৃক নিবাস ঝিনাইদহের শৈলকুপার মনোহরপুর গ্রামে। চিত্রকলা, পাপেট, টেলিভিশন নাটক ও শিল্পশিক্ষায় তাঁর অবদান বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে স্মরণীয়।

২০২৬ সালের ২৯ জুন তাঁর মৃত্যু হয়।

একই পরিবারের দুই প্রজন্মের এই দুই বরেণ্য ব্যক্তির শিকড় ঝিনাইদহের মনোহরপুরে প্রোথিত হলেও তাঁদের পৈতৃক ভিটা ও স্মৃতিকে কেন্দ্র করে এখনো প্রত্যাশিত কোনো স্থায়ী স্মারক বা স্মৃতি কমপ্লেক্স গড়ে ওঠেনি।

জামাল নজরুল ইসলাম ও সুলতানা জামান—এক পরিবারের দুই কৃতী

ঝিনাইদহের আরেক গর্ব প্রখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী, গণিতবিদ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও বিশ্বতত্ত্ববিদ জামাল নজরুল ইসলাম। ১৯৩৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ঝিনাইদহ শহরে জন্ম নেওয়া এই বিজ্ঞানীর নাম আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানাঙ্গনেও সুপরিচিত।

তাঁর সহোদরা সুলতানা সারওয়াত আরা জামান ছিলেন শিক্ষাবিদ, মনোবিজ্ঞানী ও লোকহিতৈষী। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কল্যাণে কাজ করা বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম হিসেবেও তাঁর ভূমিকা রয়েছে।

একই পরিবারের দুই কৃতী মানুষের জন্মভূমি ঝিনাইদহে তাঁদের স্মৃতি ধরে রাখার মতো স্থায়ী ও সম্মানজনক উদ্যোগ না থাকায় হতাশা প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।

শহীদ বুদ্ধিজীবীর স্মৃতিও অরক্ষিত

শৈলকুপার কাচেরকোল গ্রামের সন্তান এ.এন.এম. মুনিরুজ্জামান ছিলেন প্রখ্যাত পরিসংখ্যানবিদ ও শহীদ বুদ্ধিজীবী। মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে তিনি ও তাঁর পরিবারের কয়েকজন সদস্য নিহত হন।

জাতীয় পর্যায়ে স্বীকৃত এই শহীদ বুদ্ধিজীবীর নামে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ স্মারক ডাকটিকিটও প্রকাশ করেছে। অথচ তাঁর জন্মভূমিতে স্মৃতি সংরক্ষণে দৃশ্যমান উদ্যোগ না থাকায় স্থানীয় ইতিহাসপ্রেমীদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে।

নীল বিদ্রোহের স্মৃতিও হারিয়ে যাচ্ছে

ঝিনাইদহের ইতিহাস শুধু ব্যক্তিমানুষের কীর্তিতে সীমাবদ্ধ নয়। এ জনপদের মাটিতে রয়েছে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, নীল বিদ্রোহ, তেভাগা আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের বহু স্মৃতি।

১৮৮৯ সালের শৈলকুপার নীল বিদ্রোহ এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। শৈলকুপার অদূরের বিজুলিয়া নীলকুঠির অধ্যক্ষ ডাম্বলের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে ৪৮ গ্রামের কৃষক ঐক্যবদ্ধ হয়ে নীলকুঠিতে হামলা চালান বলে ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে।

এই বিদ্রোহের সঙ্গে যুক্ত বুঙ্কবিহারী মিত্র, বসন্ত মিত্র, সরদার সাখাওয়াতুল্লা ও জমির উদ্দিন মণ্ডলসহ সংশ্লিষ্ট কৃষক নেতাদের স্মরণে আজও উল্লেখযোগ্য কোনো স্মৃতিফলক নির্মিত হয়নি।

একটি স্মৃতিফলক কেবল ইট-পাথরের স্থাপনা নয়; যথাযথভাবে নির্মাণ ও উপস্থাপন করা গেলে এটি একটি প্রজন্মের কাছে ইতিহাসের জীবন্ত পাঠশালায় পরিণত হতে পারে।

‘ইতিহাস সংরক্ষণ না করলে আত্মপরিচয়ও হারাবে’

ঝিনাইদহের বিশিষ্ট গেরিলা বীর মুক্তিযোদ্ধা জে এ ওয়াহেদ বলেন, সংরক্ষণের সিদ্ধান্তহীনতা, প্রাতিষ্ঠানিক উদাসীনতা ও যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে জেলার বহু ঐতিহাসিক স্মারক এবং কৃতী সন্তানদের স্মৃতিচিহ্ন ধ্বংসের মুখে পড়েছে।

তাঁর মতে, ইতিহাসকে অবহেলা করা শুধু ঐতিহ্যকে ম্লান করে না, নতুন প্রজন্মের কাছ থেকে এই জনপদের বীরত্ব, গৌরব ও আত্মপরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশও দূরে সরিয়ে দেয়।

সংরক্ষণে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ

জেলার সচেতন নাগরিক সুজন বিপ্লব বলেন, ঝিনাইদহের কৃতী সন্তানদের জন্মভূমি ও ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো চিহ্নিত করে একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করা জরুরি।

এরপর প্রতিটি স্থানের জমি ও মালিকানা যাচাই, বেদখল হয়ে থাকলে তা উদ্ধারের উদ্যোগ, প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় সংরক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী স্মৃতিফলক, জাদুঘর বা স্মারক কমপ্লেক্স নির্মাণের পরামর্শ দেন তিনি।

তিনি বলেন, জেলা প্রশাসন, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার এবং গবেষক ও ইতিহাসবিদদের সমন্বয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া যেতে পারে।

একই সঙ্গে কৃতী ব্যক্তিদের জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকীতে নিয়মিত আলোচনা, প্রদর্শনী, গবেষণা ও সাংস্কৃতিক আয়োজন করা হলে এসব ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে আরও কার্যকরভাবে পৌঁছাবে বলে মনে করেন তিনি।

জেলা প্রশাসনের বক্তব্য

ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসক মো. নোমান হোসেন বলেন, ঝিনাইদহের কৃতী সন্তান ও ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো জেলার গৌরবের অংশ।

তিনি জানান, যেসব স্থান সংরক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে। ঐতিহাসিক স্থাপনা ও স্মৃতিচিহ্ন রক্ষায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে বলেও জানান তিনি।