ইবিটাইমস ডেস্ক : আজ ৩০ আগস্ট, আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস। বিশ্বজুড়ে যখন জোরপূর্বক গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণ এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতার দাবি জানানো হচ্ছে, তখন বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত গুমের ঘটনার নির্মম বিবরণ সামনে এসেছে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুমের শিকার হওয়া বিএনপির তৎকালীন যুগ্ম-মহাসচিব ও বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে ২০১৫ সালের ১০ মার্চ ঢাকার উত্তরার একটি ফ্ল্যাট থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। দীর্ঘ ৬২ দিন নিখোঁজ থাকার পর ভারতের মেঘালয় রাজ্যের শিলংয়ে বিভ্রান্ত ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অবস্থায় তাঁর খোঁজ মেলে।
সালাহউদ্দিন আহমদ গুম হওয়ার ঠিক আগের দিনগুলোতে কোথায় ছিলেন এবং কীভাবে তাঁকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল—সেই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও সাক্ষী তাঁর ঘনিষ্ঠজন সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তা সৈয়দ হাবিব হাসনাত বাসসের কাছে রোমহর্ষক বর্ণনা তুলে ধরেছেন।
যেভাবে শুরু গুমের পটভূমি
২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তৎকালীন সরকার ও বিরোধীদলের মুখোমুখি অবস্থানে দেশে চরম উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়। একে একে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের গ্রেফতার করা হতে থাকে। দলের সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আটক হলে আন্দোলন পরিচালনার জন্য বিএনপির মুখপাত্রের দায়িত্ব দেওয়া হয় সালাহউদ্দিন আহমদকে।
সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি এড়াতে সালাহউদ্দিন আহমদ প্রথমে গুলশানের বিভিন্ন গোপন স্থানে থেকে ভিডিও বার্তা ও বিবৃতির মাধ্যমে আন্দোলনের নির্দেশনা দিতেন। কিন্তু গোয়েন্দারা গুলশানের বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে গেলে তিনি স্থান পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেন।
গুলশান থেকে উত্তরার ফ্ল্যাটে স্থানান্তর
সৈয়দ হাবিব হাসনাতের বর্ণনায়, ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে গুলশানে নজরদারি বেড়ে গেলে সালাহউদ্দিন আহমদ তাঁকে ফোন করে অন্য কোথাও সরিয়ে নেওয়ার অনুরোধ জানান।
গোপনীয়তা: কেবল বেগম খালেদা জিয়া, সালাহউদ্দিন আহমদের স্ত্রী এবং কয়েকজন শীর্ষ নেতা তাঁর এই স্থানান্তরের কথা জানতেন।
কৌশলে উত্তরা নেওয়া: নিরাপত্তার স্বার্থে গাড়ি ড্রাইভারকে একটি মিষ্টির দোকানে বসিয়ে রেখে হাবিব হাসনাত নিজে গাড়ি চালিয়ে গুলশানের গোপন বাসা থেকে সালাহউদ্দিন আহমদ ও বিএনপি নেতা তাবিথ আউয়ালকে উত্তরার বাসায় নিয়ে যান।
দারোয়ানকে আড়াল: দারোয়ানকে সিগারেট কেনার বাহানায় বাইরে পাঠিয়ে অত্যন্ত গোপনে তাঁদের ফ্ল্যাটে তোলা হয় এবং সেখানে একজন বাবুর্চি ও সহকারীকে তাঁদের সেবায় নিযুক্ত রাখা হয়।
১০ মার্চের সেই কালরাত
১০ মার্চ সন্ধ্যায় হাবিব হাসনাত উত্তরার ঐ এলাকায় গিয়ে দেখতে পান পুরো এলাকা থমথমে। সড়ক বাতি নেভানো, দোকানপাট বন্ধ এবং মোড়ে মোড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি।
ফ্ল্যাটে গিয়ে তিনি দেখতে পান দরজা ভাঙা এবং দায়িত্বরত বাবুর্চি ও সহকারী কান্না জড়িত কণ্ঠে জানান—”মেহমানকে তুলে নিয়ে গেছে!”
ঘটনার পর হাবিব হাসনাতকেও গ্রেফতার ও গুমের ভয় দেখানো হলে তিনি এক কাপড়ে দেশ ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। সেখান থেকে সংবাদ সম্মেলন করতে চাইলে তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়।
সরকারের দায় অস্বীকার ও ‘আত্মগোপন’ নাটক
সালাহউদ্দিন আহমদকে গুমের পরপরই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রীরা দাবি করেছিলেন সালাহউদ্দিন আহমদ ‘আত্মগোপনে’ গেছেন। এমনকি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উপহাস করে মন্তব্য করেছিলেন—”আট বস্তা ময়লার সঙ্গে তাঁকেও কোথাও পাচার করে দেওয়া হয়েছে কি না, সেই জবাব খালেদা জিয়ারই দিতে হবে।”
পরবর্তীতে ১৩ মে শিলংয়ে সালাহউদ্দিন আহমদের সন্ধান মেলার পরও তৎকালীন ক্ষমতাসীনরা এটিকে গুম না বলে “দলীয় প্রধানের নির্দেশে আত্মগোপন” বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে।
দীর্ঘ ১৭ বছরের আন্দোলন ও রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের পর ফ্যাসিবাদের পতনে মুক্তি মিলেছে উল্লেখ করে হাবিব হাসনাত বলেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ নির্মাণে এখন সবাইকে ক্ষুদ্র স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে ফ্যাসিবাদবিরোধী ঐক্য বজায় রাখতে হবে।
ঢাকা/এসএস
শিরোনাম :
উত্তরার সেই ফ্ল্যাট থেকে কীভাবে গুম হন সালাহউদ্দিন আহমদ: প্রত্যক্ষদর্শীর রোমহর্ষক বর্ণনা
-
EuroBanglaTimes
- আপডেটের সময় ০৯:৪০:২৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৬
- ২৬ সময় দেখুন
জনপ্রিয়
Translate »





















