ইবিটাইমস ডেস্ক : হরমুজ প্রণালীতে অবরোধ প্রত্যাহারসংক্রান্ত ইরানের সর্বশেষ প্রস্তাব খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে হোয়াইট হাউস। এদিকে তেহরান বলেছে, স্বাধীন দেশগুলোর ওপর নীতি চাপিয়ে দেওয়ার অবস্থানে এখন আর ওয়াশিংটন নেই।
তেল ও গ্যাস পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে গত দুই মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের অভিযানের পর থেকেই অবরোধ আরোপ করে রেখেছে ইরান। এতে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
যদিও যুদ্ধবিরতির ফলে দুই দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের মধ্যে সরাসরি সংঘাত বন্ধ হয়েছে, তবে যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধ করা এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা এখনো নিষ্ফল রয়ে গেছে।
ওয়াশিংটন থেকে এএফপি জানায়, ইরানের ফার্স বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, তেহরান পাকিস্তরের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের কাছে ‘লিখিত বার্তা’ পাঠিয়েছে। এতে পারমাণবিক ইস্যু ও হরমুজ প্রণালিসহ নিজেদের ‘রেড লাইন’ বা অনড় অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে।
এ প্রস্তাব নিয়ে সোমবার শীর্ষ নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠক করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ক্যারোলিন লেভিট বলেন, ‘প্রস্তাবটি নিয়ে আলোচনা চলছে।’
খবরে বলা হয়েছে, এ পরিকল্পনার আওতায় তেহরান হরমুজে তাদের অবরোধ শিথিল করবে এবং ওয়াশিংটন ইরানি বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত পাল্টা অবরোধ তুলে নেবে। একই সঙ্গে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বৃহত্তর আলোচনা চলবে।
ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রেজা তালাই-নিক রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে বলেন, ‘স্বাধীন দেশগুলোর ওপর নিজেদের নীতি চাপিয়ে দেওয়ার অবস্থানে এখন আর যুক্তরাষ্ট্র নেই।’ তিনি আরও বলেন, ওয়াশিংটন শেষ পর্যন্ত ‘অবৈধ ও অযৌক্তিক দাবি’ থেকে সরে আসতে বাধ্য হবে।
ইরানের প্রস্তাব সম্পর্কে জানতে চাইলে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ফক্স নিউজকে বলেন, ‘আমরা ধারণা করেছিলাম, তার চেয়ে এটি ভালো প্রস্তাব।’ তবে তিনি প্রশ্ন তোলেন, প্রস্তাবটি সত্যিই আন্তরিক কি না।
তিনি বলেন, ‘তারা খুব দক্ষ আলোচক। আমাদের নিশ্চিত হতে হবে, যে কোনো চুক্তিই এমন হতে হবে যাতে তারা কোনো সময়ই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দিকে দ্রুত এগোতে না পারে।’
ইরানের শীর্ষ কূটনীতিক আব্বাস আরাকচি রাশিয়া সফরকালে বলেন, ওয়াশিংটনের ‘অতিরিক্ত দাবি’র কারণেই শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে। এ সময় রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যুদ্ধ বন্ধে মস্কোর সমর্থনের আশ্বাস দেন।
এর আগে মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে প্রথম দফার আলোচনা হলেও তা ব্যর্থ হয়। সপ্তাহান্তে দ্বিতীয় দফা বৈঠকের আশা জাগলেও শেষ পর্যন্ত তা হয়নি।
ট্রাম্প বলেছেন, ‘ইরান যদি আলোচনা চায়, তাহলে তারা আমাদের ফোন করতে পারে।’
জাতিসংঘে ইরানের দূত বলেন, উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিতে কোনো প্রতিশ্রুতি দিতে হলে তেহরানের প্রয়োজন এই নিশ্চয়তা যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল আর হামলা চালাবে না।
‘সবকিছু অনিশ্চিত’
রাশিয়ায় আরাগচি বলেন, যুদ্ধ ‘ইরানের প্রকৃত শক্তি’ ও স্থিতিশীলতা তুলে ধরেছে। তবে তেহরানে সাধারণ মানুষের মনোভাব ছিল ভিন্ন।
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ফারশাদ প্যারিসভিত্তিক এএফপির সাংবাদিকদের বলেন, ‘দেশের সবকিছু এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে। অনেক দিন ধরে আমি কাজ করতে পারছি না।’
তিনি বলেন, ‘দেশ পুরোপুরি অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মধ্যে রয়েছে।’
তেহরানের আলোকচিত্রী শেরভিনও একই ধরনের সংকটের কথা জানান।
তিনি বলেন, ‘এই প্রথম আমি বাড়িভাড়া দিতে দেরি করেছি।’
হরমুজে ইরানের অবরোধের ফলে তেল, গ্যাস ও সার পরিবহন বন্ধ হয়ে গেছে এবং বিশ্ববাজারে দাম বেড়ে গেছে।
জ্বালানির দাম বাড়তে থাকায় ট্রাম্পও অভ্যন্তরীণ চাপের মুখে পড়েছেন। নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে এবং জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, এই যুদ্ধ মার্কিনিদের মধ্যে জনপ্রিয় নয়।
ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের প্রধান ইব্রাহিম আজিজি সোমবার বলেন, হরমুজ প্রণালী ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত প্রস্তাবিত আইনের আওতায় দেশটির সশস্ত্র বাহিনী হবে প্রণালীর তদারকি কর্তৃপক্ষ এবং সব ধরনের ফি ইরানি মুদ্রা রিয়ালে পরিশোধ করতে হবে।
তবে জাতিসংঘের সামুদ্রিক সংস্থার প্রধান আর্সেনিও ডোমিঙ্গেজ বলেন, এ ধরনের ট্রানজিট ফি আরোপের ‘কোনো আইনি ভিত্তি নেই’।
রুবিওও এ ধারণা প্রত্যাখ্যান করেন।
তিনি বলেন, ‘ইরান একটি আন্তর্জাতিক নৌপথ কে ব্যবহার করবে এবং এর জন্য কত অর্থ দিতে হবে- এমন ব্যবস্থা স্বাভাবিক করে তুলুক, তা আমরা মেনে নিতে পারি না।’
‘আরও এক বছর যুদ্ধ’
এদিকে, সম্প্রতি মেয়াদ বাড়ানো যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও লেবানন সীমান্তে সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে। বৈরুতের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সোমবার দক্ষিণাঞ্চলে ইসরাইলি হামলায় চারজন নিহত হয়েছেন।
হিজবুল্লাহ ইসরাইলে রকেট হামলা চালানোর মাধ্যমে লেবাননকে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলে। এর জবাবে ইসরাইল বিমান হামলা ও স্থল অভিযান শুরু করে।
সোমবার হিজবুল্লাহ নেতা নাইম কাসেম লেবানন-ইসরাইল সরাসরি আলোচনাকে ‘মহাপাপ’ বলে আখ্যা দেন এবং ঘোষণা করেন, হিজবুল্লাহ ‘পিছু হটবে না’।
এর কিছুক্ষণ পরই ইসরাইলি সেনাবাহিনী জানায়, তারা লেবাননে হিজবুল্লাহর লক্ষ্যবস্তুতে হামলা শুরু করেছে। ইসরাইলের দাবি, যুদ্ধবিরতির শর্ত অনুযায়ী আসন্ন হুমকি মোকাবিলায় তারা ব্যবস্থা নিতে পারে।
ইসরাইলি সেনাপ্রধান ইয়াল জামির বলেন, ২০২৬ সাল ‘সম্ভবত সব ফ্রন্টে যুদ্ধের আরও একটি বছর’ হতে যাচ্ছে ইসরাইলের জন্য।
ঢাকা/এসএস




















