ভিয়েনা ০৯:৩৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬, ৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কৃষকের ঘরে বীজ নেই, বাড়ছে বাজারনির্ভরতা: বীজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ঝুঁকিতে ঝিনাইদহের কৃষি

  • EuroBanglaTimes
  • আপডেটের সময় ১০:৩৬:০১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬
  • ৪ সময় দেখুন

বীজের নিয়ন্ত্রণ বাজারে, ঝুঁকিতে ঝিনাইদহের কৃষি

শেখ ইমন, ঝিনাইদহ : ধান আছে, জমি আছে, কৃষকও আছেন। নেই শুধু কৃষকের নিজের বীজ। একসময় গোলাভরা ধানের পাশে মাটির মটকা, বাঁশের গোলা কিংবা ঘরের চালে যত্ন করে রাখা থাকত পরের মৌসুমের বীজ। সেই বীজেই ফিরত নতুন ফসল, নতুন আশা। এখন বদলে গেছে সেই চিত্র। কৃষকের ঘরের বীজের জায়গা নিয়েছে বাজারের প্যাকেট। নিজস্ব বীজ হারিয়ে কৃষক ক্রমেই হয়ে উঠছেন বাজারনির্ভর।

এই নির্ভরতা কোনো সময় বড় ধরনের সংকট, দুর্যোগ কিংবা বীজ সরবরাহে বিপর্যয়ের মুখে পড়লে শুধু কৃষক নয়, ঝুঁকিতে পড়তে পারে পুরো কৃষি ব্যবস্থা ও খাদ্যনিরাপত্তা। ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার হাজরামিনা গ্রামের প্রান্তিক কৃষক হাশেম হোসেনের অভিজ্ঞতা সেই আশঙ্কারই একটি বাস্তব চিত্র।

চলতি মৌসুমে ৩৫ বিঘা জমিতে আমন ধান রোপণ করেছেন হাশেম। সরকারি বীজের আশায় বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) অনুমোদিত ডিলারের কাছে ঘুরেও প্রত্যাশিত বীজ পাননি। শেষ পর্যন্ত স্থানীয় বাজার থেকে চড়া দামে বেসরকারি কোম্পানির প্যাকেটজাত হাইব্রিড বীজ কিনে বীজতলায় দেন তিনি। সেই বীজ থেকে উৎপাদিত চারা দিয়েই চলছে এ মৌসুমের চাষাবাদ।

একই উপজেলার কাচেরকোল গ্রামের কৃষক মসলেম উদ্দিনের হাতেও এসেছে অঙ্কুরোদগম না হওয়া বীজ। চোখে ক্ষোভ, কণ্ঠে আক্ষেপ। তাঁর ভাষায়, আগে ধান কাটার পর ভালো ধান আলাদা করে রাখা হতো পরবর্তী মৌসুমের বীজ হিসেবে। মাটির মটকা কিংবা গোলায় সেই বীজ যত্নে সংরক্ষণ করা হতো। পরের বছর সেই বীজেই চাষ হতো। এখন সেই নিশ্চয়তা নেই। নিজের ঘরের বীজ হারিয়ে কৃষককে প্রতি মৌসুমে তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে বাজারের দিকে।

নিজস্ব বীজ থেকে বাজারনির্ভর কৃষি

এই পরিবর্তন শুধু একজন-দুজন কৃষকের গল্প নয়। এটি ঝিনাইদহের কৃষিতে দীর্ঘদিন ধরে চলা একটি নীরব পরিবর্তনের চিত্র।

জেলা কৃষি অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ঝিনাইদহে মোট আবাদি জমির পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার ২৩৫ হেক্টর। এর মধ্যে বিএডিসি উফশী বীজের প্রায় ১৯ শতাংশ এবং হাইব্রিড বীজের প্রায় ১ শতাংশ সরবরাহ করে। বাকি বড় একটি অংশের চাহিদা পূরণ করছে বেসরকারি বীজ কোম্পানিগুলো।

একসময় ঝিনাইদহের কৃষকদের বড় একটি অংশ নিজেদের উৎপাদিত ফসল থেকেই পরবর্তী মৌসুমের জন্য বীজ সংরক্ষণ করতেন। প্রায় ১০ বছর আগে জেলার প্রায় ৯০ শতাংশ কৃষক নিজস্ব বীজ ব্যবহার করতেন বলে সংশ্লিষ্টদের তথ্য। বর্তমানে সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। এখন অধিকাংশ কৃষক কোম্পানির কাছ থেকে বীজ কিনে ব্যবহার করছেন।

জেলায় বীজের বাজারে কয়েকটি বেসরকারি কোম্পানিরও উল্লেখযোগ্য প্রভাব রয়েছে। লাল তীর, এসিআই, বায়ারসহ বিভিন্ন কোম্পানির বীজ কৃষকদের কাছে বিক্রি হচ্ছে। ফলে কৃষকের বীজের চাহিদার একটি বড় অংশ এখন বেসরকারি খাত থেকে পূরণ হচ্ছে।

তথ্য অনুযায়ী, ঝিনাইদহে একসময় বিভিন্ন মৌসুমে ধানের প্রায় ৪০ থেকে ৪৫টি জাত, ডালের ২২ থেকে ২৫টি জাত এবং সবজির প্রায় ৩০টি জাতের চাষ ছিল। বর্তমানে ধানের জাত বেড়ে প্রায় ৬০ থেকে ৬৫টি, ডালের জাত ৩২ থেকে ৩৫টি এবং সবজির জাত ৫৫ থেকে ৬৫টিতে দাঁড়িয়েছে।

তবে স্থানীয় ও ঐতিহ্যবাহী অনেক জাতের বীজ সংরক্ষণ ও চাষ কমে যাওয়ায় সেগুলোর অস্তিত্ব নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। বিএডিসির বীজ জেলার মোট কৃষকের প্রায় ২০ শতাংশের চাহিদা পূরণ করতে পারে। ফলে বীজের বাকি চাহিদা পূরণে কৃষকদের একটি বড় অংশকে বেসরকারি কোম্পানি ও বাজারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

বীজের সংকট মানেই শুধু ফসলের সংকট নয়

কৃষকের ঘরে বীজ না থাকার সবচেয়ে বড় বিপদটি চোখে পড়ে স্বাভাবিক সময়ের বাইরে। কোনো মৌসুমে বাজারে বীজের সংকট তৈরি হলে, সরবরাহব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হলে কিংবা কোনো নির্দিষ্ট জাতের বীজ পাওয়া না গেলে কৃষকের হাতে তাৎক্ষণিক বিকল্প কমে যায়। নিজের গোলা থেকে বীজ বের করে দ্রুত চাষে নামার সুযোগ থাকে না।

এর সঙ্গে যুক্ত হয় দাম বৃদ্ধির ঝুঁকি। বাজারে সরবরাহ কমে গেলে কৃষককে বেশি দামে বীজ কিনতে হতে পারে। নিম্নমানের বা নকল বীজ বাজারে ঢুকে পড়লে ক্ষতির মাত্রা আরও বাড়তে পারে।

বীজতলায় চারা না গজালে কৃষকের শুধু বীজের টাকাই নষ্ট হয় না; জমি প্রস্তুত, শ্রম, সময়, সার, সেচ ও অন্যান্য কৃষি উপকরণের খরচও ঝুঁকিতে পড়ে।

এক মৌসুমের বীজ বিপর্যয় তাই এক মৌসুমেই থেমে থাকে না। চাষ পিছিয়ে যেতে পারে, উৎপাদন কমতে পারে এবং কৃষকের ঋণের বোঝা বাড়তে পারে। বড় পরিসরে একই সমস্যা দেখা দিলে বাজারে কৃষিপণ্যের সরবরাহ কমে দাম বাড়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়।

আজকের হাইব্রিড, কালকের বীজ কোথায়?

বীজ ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন এসেছে হাইব্রিডের বিস্তারের সঙ্গে। উচ্চফলনের আশায় ঝিনাইদহের কৃষকদের অনেকে হাইব্রিড বীজের দিকে ঝুঁকছেন। কিন্তু হাইব্রিড বীজের ক্ষেত্রে পরবর্তী মৌসুমে একই মান ও বৈশিষ্ট্যের বীজ ঘরে সংরক্ষণ করে ব্যবহার করা সাধারণত সম্ভব নয়। ফলে এক মৌসুমের পর আরেক মৌসুমে নতুন বীজ কেনার প্রয়োজন তৈরি হয়।

এভাবেই কৃষকের বীজের ওপর নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ কমে গিয়ে তৈরি হচ্ছে বাজারনির্ভরতা। কৃষকের হাতে জমি থাকলেও বীজের নিয়ন্ত্রণ চলে যাচ্ছে বাজারের হাতে। কৃষির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ বীজ যদি কৃষকের নিজের ঘরে না থাকে, তাহলে সংকটের সময়ে নিজের মতো করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও সীমিত হয়ে পড়ে।

ঝিনাইদহে ধান, গম, ভুট্টা, আলু, ডাল ও সবজিসহ বিভিন্ন ফসলের বিপুল পরিমাণ বীজের বাজার রয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, এই বাজারের বড় অংশই বেসরকারি কোম্পানিগুলোর নিয়ন্ত্রণে। বিএডিসি চাহিদার তুলনায় সীমিত পরিমাণ বীজ সরবরাহ করায় সরকারি বীজের ঘাটতি থাকলে কৃষকদের বেসরকারি বাজারের দিকে যেতে হচ্ছে।

হারিয়ে যাচ্ছে স্থানীয় জাত, সংকুচিত হচ্ছে কৃষির বৈচিত্র্য

বীজের সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে কৃষির বৈচিত্র্যও। ঝিঙাশাইল, লতিশাইল, কাটারিভোগ, রাজাশাইল, দুধকলম, বাঁশফুল, রূপশাইল ও দিঘাসহ বিভিন্ন স্থানীয় ধানের জাত এখন বিলুপ্ত বা বিলুপ্তপ্রায় বলে স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।

একইভাবে দেশি খেসারি, স্থানীয় লাল মুগ, মাষকলাই, মাঘী সরিষা, তিল এবং বিভিন্ন স্থানীয় সবজির জাতও কমে যাচ্ছে।

কৃষির এই বৈচিত্র্য শুধু স্বাদ বা ঐতিহ্যের বিষয় নয়। স্থানীয় জাতের বীজ কৃষকের হাতে থাকলে একাধিক ফসল ও জাতের মধ্যে ঝুঁকি ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ থাকে। কোনো একটি জাত রোগ, পোকামাকড় বা আবহাওয়ার বিরূপ প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে অন্য জাত দিয়ে উৎপাদন ধরে রাখার সুযোগ থাকে।

কিন্তু কৃষি যখন সীমিত কয়েকটি বাণিজ্যিক জাতের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন কোনো রোগ, পোকামাকড়, আবহাওয়াজনিত দুর্যোগ কিংবা সরবরাহ সংকট বড় পরিসরে আঘাত হানার ঝুঁকি বাড়ে।

কৃষকের বীজ ব্যাংক ফিরবে কবে?

শৈলকুপার কাঁচেরকোল গ্রামের কৃষক হাবিবুর রহমানের অভিজ্ঞতাতেও সরকারি বীজ সরবরাহের সীমাবদ্ধতার বিষয়টি উঠে এসেছে। তাঁর অভিযোগ, কৃষি বিভাগের প্রদর্শনী দেখে নতুন জাতের ধান চাষ করে ভালো ফলন পাওয়ার পর পরের বছর সেই বীজ সংগ্রহ করতে গিয়ে সরকারি বরাদ্দ শেষ হয়ে যাওয়ার কথা শুনতে হয়েছে। পরে বাধ্য হয়ে বেশি দামে বেসরকারি বীজ কিনতে হয়েছে।

মাঠ পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন, কৃষক পর্যায়ে মানসম্মত বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণের উদ্যোগ থাকলেও এর আওতা সীমিত। ফলে অধিকাংশ কৃষক সেই সুবিধার বাইরে থাকছেন।

এ অবস্থায় কৃষকের ঘরের বীজ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ এখন শুধু ঐতিহ্য রক্ষার প্রশ্ন নয়; এটি কৃষির ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার প্রশ্ন। ইউনিয়ন পর্যায়ে বীজ ব্যাংক গড়ে তোলা, কৃষকদের বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে বীজ সংরক্ষণের প্রশিক্ষণ দেওয়া, স্থানীয় জাত সংরক্ষণ করা এবং বিএডিসির উৎপাদন ও সরবরাহ সক্ষমতা বাড়ানোর মতো উদ্যোগ জরুরি হয়ে উঠেছে।

কারণ কৃষকের ঘরে বীজ থাকা মানে শুধু পরের বছরের চাষের নিশ্চয়তা নয়। এটি দুর্যোগের দিনে কৃষকের হাতে বিকল্প, সংকটের সময়ে কৃষির হাতে নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যতের খাদ্যব্যবস্থার জন্য একটি শক্ত ভিত।

বীজের মান নিয়ে কৃষকের অভিযোগ

বাজারে বিভিন্ন কোম্পানির বীজের আধিপত্য বাড়লেও মান নিয়ন্ত্রণ ও কৃষক সুরক্ষায় কার্যকর নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কোম্পানির বীজ কিনে প্রত্যাশিত ফলন না পাওয়ার অভিযোগও রয়েছে অনেক কৃষকের।

কারও অভিযোগ, বীজের অঙ্কুরোদগম কম; কারও অভিযোগ, প্যাকেটে যে জাতের কথা বলা হয়েছে, মাঠে তার সঙ্গে মিল পাওয়া যায়নি। অথচ বীজ নষ্ট হলে শুধু বীজের দামই নয়, কৃষকের পুরো মৌসুমের শ্রম, সার, কীটনাশক ও সেচের খরচও ঝুঁকিতে পড়ে।

শৈলকুপার দামুকদিয়া গ্রামের কৃষক মাসুদ মোল্লা বলেন, “আগে ধান কাটার সময় ভালো ধান আলাদা করে রেখে দিতাম। পরের মৌসুমে ওই ধান থেকেই বীজ তৈরি করে চাষ করতাম। এখন কোম্পানির বীজ কিনতে হয়। নিজের বীজ রাখার অভ্যাসও অনেকটা চলে গেছে।”

মনোহরপুর গ্রামের কৃষক সিজার জিকরুল বলেন, “বাজারে বিভিন্ন কোম্পানির বীজ পাওয়া যায়। বিক্রেতারা ভালো ফলনের কথা বলে বীজ দেন। কিন্তু বীজ ভালো না হলে আমাদেরই সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়। বীজের সঙ্গে সার, কীটনাশক, সেচ ও শ্রমের খরচও জড়িয়ে থাকে।”

কালীগঞ্জের কৃষক সাদ্দাম হোসেন বলেন, “নিজের ঘরে বীজ মজুদ থাকলে চাষাবাদের খরচ অনেকটা কমে যায়। তাতে কৃষকরা লাভবান হন। কিন্তু বর্তমানে তা হচ্ছে না। বীজ কিনতে গিয়ে লাভের অংশ কমে যাচ্ছে।”

কৃষি বিভাগের বক্তব্য

ঝিনাইদহ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. কামরুজ্জামান বলেন, “কৃষকদের মানসম্মত বীজ ব্যবহারের পাশাপাশি নিজেদের উৎপাদিত ভালো ফসল থেকে বীজ সংগ্রহ করে সংরক্ষণের বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। ভালো ও রোগমুক্ত জমি থেকে উপযুক্ত সময়ে বীজ সংগ্রহ করে সঠিকভাবে সংরক্ষণ করতে পারলে কৃষক পরবর্তী মৌসুমে নিজের বীজ ব্যবহার করতে পারবেন। এতে একদিকে বীজ কেনার খরচ কমবে, অন্যদিকে প্রয়োজনের সময় বাজারের ওপর নির্ভরশীলতাও কিছুটা কমানো সম্ভব হবে।”

তিনি বলেন, কৃষকেরা যাতে মানসম্মত বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণ করতে পারেন, সে বিষয়ে কৃষি বিভাগের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বিভিন্নভাবে পরামর্শ দিয়ে থাকেন। প্রদর্শনী প্লটের মাধ্যমে উন্নত জাতের ফসলের সঙ্গে কৃষকদের পরিচয় করানো হচ্ছে। সেখান থেকে ভালো ফলন পাওয়া গেলে কৃষকদের নিজেদের জমির উপযোগী বীজ সংরক্ষণে উৎসাহিত করা হচ্ছে।

কামরুজ্জামান আরও বলেন, “বীজ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে শুধু বীজ সংগ্রহ করলেই হবে না, সেটি ভালোভাবে শুকানো, রোগমুক্ত রাখা এবং উপযুক্ত পরিবেশে সংরক্ষণ করতে হবে। কৃষকদের এ বিষয়ে সচেতন করা হচ্ছে। একই সঙ্গে স্থানীয়ভাবে ভালো জাতের বীজ সংরক্ষণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ স্থানীয় জাতের অনেক বীজ আমাদের কৃষির ঐতিহ্য ও বৈচিত্র্যের সঙ্গে জড়িত।”

কৃষকের ঘরে বীজ সংরক্ষণের অভ্যাস ফিরিয়ে আনা গেলে উৎপাদন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি দুর্যোগ বা বাজারে বীজের সংকট তৈরি হলে বিকল্প ব্যবস্থা রাখা সম্ভব হবে বলেও জানান তিনি।

বীজের নিয়ন্ত্রণ কৃষকের হাতে ফেরানোর দাবি

ঝিনাইদহের কৃষিতে বীজের বাজারনির্ভরতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কৃষকের নিজস্ব বীজ সংরক্ষণের ঐতিহ্যও কমছে। উচ্চফলনশীল ও হাইব্রিড জাতের চাহিদা বাড়লেও স্থানীয় জাত সংরক্ষণ, কৃষক পর্যায়ে মানসম্মত বীজ উৎপাদন এবং সরকারি বীজ সরবরাহের সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টি এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

কৃষকের ঘরে বীজ ফিরিয়ে আনা গেলে একদিকে যেমন উৎপাদন ব্যয় কমানো সম্ভব, অন্যদিকে বাজারে হঠাৎ বীজ সংকট বা সরবরাহব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলেও কৃষকের হাতে বিকল্প থাকবে। একই সঙ্গে স্থানীয় জাত ও কৃষির জেনেটিক বৈচিত্র্য সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে।

তাই বীজকে শুধু কৃষি উপকরণ হিসেবে নয়, কৃষকের অধিকার, কৃষির স্থিতিশীলতা এবং খাদ্যনিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে দেখার সময় এসেছে।
ঢাকা/ইবিটাইমস/এসএস

জনপ্রিয়
Address : Erlaaer Strasse 49/8/16 A-1230 Vienna,Austria. Mob : +43676848863279, 8801719316684 (BD) 8801911691101 ( Ads) Email : eurobanglatimes123@gmail.com
Translate »

কৃষকের ঘরে বীজ নেই, বাড়ছে বাজারনির্ভরতা: বীজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ঝুঁকিতে ঝিনাইদহের কৃষি

আপডেটের সময় ১০:৩৬:০১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬

শেখ ইমন, ঝিনাইদহ : ধান আছে, জমি আছে, কৃষকও আছেন। নেই শুধু কৃষকের নিজের বীজ। একসময় গোলাভরা ধানের পাশে মাটির মটকা, বাঁশের গোলা কিংবা ঘরের চালে যত্ন করে রাখা থাকত পরের মৌসুমের বীজ। সেই বীজেই ফিরত নতুন ফসল, নতুন আশা। এখন বদলে গেছে সেই চিত্র। কৃষকের ঘরের বীজের জায়গা নিয়েছে বাজারের প্যাকেট। নিজস্ব বীজ হারিয়ে কৃষক ক্রমেই হয়ে উঠছেন বাজারনির্ভর।

এই নির্ভরতা কোনো সময় বড় ধরনের সংকট, দুর্যোগ কিংবা বীজ সরবরাহে বিপর্যয়ের মুখে পড়লে শুধু কৃষক নয়, ঝুঁকিতে পড়তে পারে পুরো কৃষি ব্যবস্থা ও খাদ্যনিরাপত্তা। ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার হাজরামিনা গ্রামের প্রান্তিক কৃষক হাশেম হোসেনের অভিজ্ঞতা সেই আশঙ্কারই একটি বাস্তব চিত্র।

চলতি মৌসুমে ৩৫ বিঘা জমিতে আমন ধান রোপণ করেছেন হাশেম। সরকারি বীজের আশায় বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) অনুমোদিত ডিলারের কাছে ঘুরেও প্রত্যাশিত বীজ পাননি। শেষ পর্যন্ত স্থানীয় বাজার থেকে চড়া দামে বেসরকারি কোম্পানির প্যাকেটজাত হাইব্রিড বীজ কিনে বীজতলায় দেন তিনি। সেই বীজ থেকে উৎপাদিত চারা দিয়েই চলছে এ মৌসুমের চাষাবাদ।

একই উপজেলার কাচেরকোল গ্রামের কৃষক মসলেম উদ্দিনের হাতেও এসেছে অঙ্কুরোদগম না হওয়া বীজ। চোখে ক্ষোভ, কণ্ঠে আক্ষেপ। তাঁর ভাষায়, আগে ধান কাটার পর ভালো ধান আলাদা করে রাখা হতো পরবর্তী মৌসুমের বীজ হিসেবে। মাটির মটকা কিংবা গোলায় সেই বীজ যত্নে সংরক্ষণ করা হতো। পরের বছর সেই বীজেই চাষ হতো। এখন সেই নিশ্চয়তা নেই। নিজের ঘরের বীজ হারিয়ে কৃষককে প্রতি মৌসুমে তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে বাজারের দিকে।

নিজস্ব বীজ থেকে বাজারনির্ভর কৃষি

এই পরিবর্তন শুধু একজন-দুজন কৃষকের গল্প নয়। এটি ঝিনাইদহের কৃষিতে দীর্ঘদিন ধরে চলা একটি নীরব পরিবর্তনের চিত্র।

জেলা কৃষি অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ঝিনাইদহে মোট আবাদি জমির পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার ২৩৫ হেক্টর। এর মধ্যে বিএডিসি উফশী বীজের প্রায় ১৯ শতাংশ এবং হাইব্রিড বীজের প্রায় ১ শতাংশ সরবরাহ করে। বাকি বড় একটি অংশের চাহিদা পূরণ করছে বেসরকারি বীজ কোম্পানিগুলো।

একসময় ঝিনাইদহের কৃষকদের বড় একটি অংশ নিজেদের উৎপাদিত ফসল থেকেই পরবর্তী মৌসুমের জন্য বীজ সংরক্ষণ করতেন। প্রায় ১০ বছর আগে জেলার প্রায় ৯০ শতাংশ কৃষক নিজস্ব বীজ ব্যবহার করতেন বলে সংশ্লিষ্টদের তথ্য। বর্তমানে সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। এখন অধিকাংশ কৃষক কোম্পানির কাছ থেকে বীজ কিনে ব্যবহার করছেন।

জেলায় বীজের বাজারে কয়েকটি বেসরকারি কোম্পানিরও উল্লেখযোগ্য প্রভাব রয়েছে। লাল তীর, এসিআই, বায়ারসহ বিভিন্ন কোম্পানির বীজ কৃষকদের কাছে বিক্রি হচ্ছে। ফলে কৃষকের বীজের চাহিদার একটি বড় অংশ এখন বেসরকারি খাত থেকে পূরণ হচ্ছে।

তথ্য অনুযায়ী, ঝিনাইদহে একসময় বিভিন্ন মৌসুমে ধানের প্রায় ৪০ থেকে ৪৫টি জাত, ডালের ২২ থেকে ২৫টি জাত এবং সবজির প্রায় ৩০টি জাতের চাষ ছিল। বর্তমানে ধানের জাত বেড়ে প্রায় ৬০ থেকে ৬৫টি, ডালের জাত ৩২ থেকে ৩৫টি এবং সবজির জাত ৫৫ থেকে ৬৫টিতে দাঁড়িয়েছে।

তবে স্থানীয় ও ঐতিহ্যবাহী অনেক জাতের বীজ সংরক্ষণ ও চাষ কমে যাওয়ায় সেগুলোর অস্তিত্ব নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। বিএডিসির বীজ জেলার মোট কৃষকের প্রায় ২০ শতাংশের চাহিদা পূরণ করতে পারে। ফলে বীজের বাকি চাহিদা পূরণে কৃষকদের একটি বড় অংশকে বেসরকারি কোম্পানি ও বাজারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

বীজের সংকট মানেই শুধু ফসলের সংকট নয়

কৃষকের ঘরে বীজ না থাকার সবচেয়ে বড় বিপদটি চোখে পড়ে স্বাভাবিক সময়ের বাইরে। কোনো মৌসুমে বাজারে বীজের সংকট তৈরি হলে, সরবরাহব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হলে কিংবা কোনো নির্দিষ্ট জাতের বীজ পাওয়া না গেলে কৃষকের হাতে তাৎক্ষণিক বিকল্প কমে যায়। নিজের গোলা থেকে বীজ বের করে দ্রুত চাষে নামার সুযোগ থাকে না।

এর সঙ্গে যুক্ত হয় দাম বৃদ্ধির ঝুঁকি। বাজারে সরবরাহ কমে গেলে কৃষককে বেশি দামে বীজ কিনতে হতে পারে। নিম্নমানের বা নকল বীজ বাজারে ঢুকে পড়লে ক্ষতির মাত্রা আরও বাড়তে পারে।

বীজতলায় চারা না গজালে কৃষকের শুধু বীজের টাকাই নষ্ট হয় না; জমি প্রস্তুত, শ্রম, সময়, সার, সেচ ও অন্যান্য কৃষি উপকরণের খরচও ঝুঁকিতে পড়ে।

এক মৌসুমের বীজ বিপর্যয় তাই এক মৌসুমেই থেমে থাকে না। চাষ পিছিয়ে যেতে পারে, উৎপাদন কমতে পারে এবং কৃষকের ঋণের বোঝা বাড়তে পারে। বড় পরিসরে একই সমস্যা দেখা দিলে বাজারে কৃষিপণ্যের সরবরাহ কমে দাম বাড়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়।

আজকের হাইব্রিড, কালকের বীজ কোথায়?

বীজ ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন এসেছে হাইব্রিডের বিস্তারের সঙ্গে। উচ্চফলনের আশায় ঝিনাইদহের কৃষকদের অনেকে হাইব্রিড বীজের দিকে ঝুঁকছেন। কিন্তু হাইব্রিড বীজের ক্ষেত্রে পরবর্তী মৌসুমে একই মান ও বৈশিষ্ট্যের বীজ ঘরে সংরক্ষণ করে ব্যবহার করা সাধারণত সম্ভব নয়। ফলে এক মৌসুমের পর আরেক মৌসুমে নতুন বীজ কেনার প্রয়োজন তৈরি হয়।

এভাবেই কৃষকের বীজের ওপর নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ কমে গিয়ে তৈরি হচ্ছে বাজারনির্ভরতা। কৃষকের হাতে জমি থাকলেও বীজের নিয়ন্ত্রণ চলে যাচ্ছে বাজারের হাতে। কৃষির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ বীজ যদি কৃষকের নিজের ঘরে না থাকে, তাহলে সংকটের সময়ে নিজের মতো করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও সীমিত হয়ে পড়ে।

ঝিনাইদহে ধান, গম, ভুট্টা, আলু, ডাল ও সবজিসহ বিভিন্ন ফসলের বিপুল পরিমাণ বীজের বাজার রয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, এই বাজারের বড় অংশই বেসরকারি কোম্পানিগুলোর নিয়ন্ত্রণে। বিএডিসি চাহিদার তুলনায় সীমিত পরিমাণ বীজ সরবরাহ করায় সরকারি বীজের ঘাটতি থাকলে কৃষকদের বেসরকারি বাজারের দিকে যেতে হচ্ছে।

হারিয়ে যাচ্ছে স্থানীয় জাত, সংকুচিত হচ্ছে কৃষির বৈচিত্র্য

বীজের সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে কৃষির বৈচিত্র্যও। ঝিঙাশাইল, লতিশাইল, কাটারিভোগ, রাজাশাইল, দুধকলম, বাঁশফুল, রূপশাইল ও দিঘাসহ বিভিন্ন স্থানীয় ধানের জাত এখন বিলুপ্ত বা বিলুপ্তপ্রায় বলে স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।

একইভাবে দেশি খেসারি, স্থানীয় লাল মুগ, মাষকলাই, মাঘী সরিষা, তিল এবং বিভিন্ন স্থানীয় সবজির জাতও কমে যাচ্ছে।

কৃষির এই বৈচিত্র্য শুধু স্বাদ বা ঐতিহ্যের বিষয় নয়। স্থানীয় জাতের বীজ কৃষকের হাতে থাকলে একাধিক ফসল ও জাতের মধ্যে ঝুঁকি ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ থাকে। কোনো একটি জাত রোগ, পোকামাকড় বা আবহাওয়ার বিরূপ প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে অন্য জাত দিয়ে উৎপাদন ধরে রাখার সুযোগ থাকে।

কিন্তু কৃষি যখন সীমিত কয়েকটি বাণিজ্যিক জাতের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন কোনো রোগ, পোকামাকড়, আবহাওয়াজনিত দুর্যোগ কিংবা সরবরাহ সংকট বড় পরিসরে আঘাত হানার ঝুঁকি বাড়ে।

কৃষকের বীজ ব্যাংক ফিরবে কবে?

শৈলকুপার কাঁচেরকোল গ্রামের কৃষক হাবিবুর রহমানের অভিজ্ঞতাতেও সরকারি বীজ সরবরাহের সীমাবদ্ধতার বিষয়টি উঠে এসেছে। তাঁর অভিযোগ, কৃষি বিভাগের প্রদর্শনী দেখে নতুন জাতের ধান চাষ করে ভালো ফলন পাওয়ার পর পরের বছর সেই বীজ সংগ্রহ করতে গিয়ে সরকারি বরাদ্দ শেষ হয়ে যাওয়ার কথা শুনতে হয়েছে। পরে বাধ্য হয়ে বেশি দামে বেসরকারি বীজ কিনতে হয়েছে।

মাঠ পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন, কৃষক পর্যায়ে মানসম্মত বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণের উদ্যোগ থাকলেও এর আওতা সীমিত। ফলে অধিকাংশ কৃষক সেই সুবিধার বাইরে থাকছেন।

এ অবস্থায় কৃষকের ঘরের বীজ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ এখন শুধু ঐতিহ্য রক্ষার প্রশ্ন নয়; এটি কৃষির ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার প্রশ্ন। ইউনিয়ন পর্যায়ে বীজ ব্যাংক গড়ে তোলা, কৃষকদের বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে বীজ সংরক্ষণের প্রশিক্ষণ দেওয়া, স্থানীয় জাত সংরক্ষণ করা এবং বিএডিসির উৎপাদন ও সরবরাহ সক্ষমতা বাড়ানোর মতো উদ্যোগ জরুরি হয়ে উঠেছে।

কারণ কৃষকের ঘরে বীজ থাকা মানে শুধু পরের বছরের চাষের নিশ্চয়তা নয়। এটি দুর্যোগের দিনে কৃষকের হাতে বিকল্প, সংকটের সময়ে কৃষির হাতে নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যতের খাদ্যব্যবস্থার জন্য একটি শক্ত ভিত।

বীজের মান নিয়ে কৃষকের অভিযোগ

বাজারে বিভিন্ন কোম্পানির বীজের আধিপত্য বাড়লেও মান নিয়ন্ত্রণ ও কৃষক সুরক্ষায় কার্যকর নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কোম্পানির বীজ কিনে প্রত্যাশিত ফলন না পাওয়ার অভিযোগও রয়েছে অনেক কৃষকের।

কারও অভিযোগ, বীজের অঙ্কুরোদগম কম; কারও অভিযোগ, প্যাকেটে যে জাতের কথা বলা হয়েছে, মাঠে তার সঙ্গে মিল পাওয়া যায়নি। অথচ বীজ নষ্ট হলে শুধু বীজের দামই নয়, কৃষকের পুরো মৌসুমের শ্রম, সার, কীটনাশক ও সেচের খরচও ঝুঁকিতে পড়ে।

শৈলকুপার দামুকদিয়া গ্রামের কৃষক মাসুদ মোল্লা বলেন, “আগে ধান কাটার সময় ভালো ধান আলাদা করে রেখে দিতাম। পরের মৌসুমে ওই ধান থেকেই বীজ তৈরি করে চাষ করতাম। এখন কোম্পানির বীজ কিনতে হয়। নিজের বীজ রাখার অভ্যাসও অনেকটা চলে গেছে।”

মনোহরপুর গ্রামের কৃষক সিজার জিকরুল বলেন, “বাজারে বিভিন্ন কোম্পানির বীজ পাওয়া যায়। বিক্রেতারা ভালো ফলনের কথা বলে বীজ দেন। কিন্তু বীজ ভালো না হলে আমাদেরই সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়। বীজের সঙ্গে সার, কীটনাশক, সেচ ও শ্রমের খরচও জড়িয়ে থাকে।”

কালীগঞ্জের কৃষক সাদ্দাম হোসেন বলেন, “নিজের ঘরে বীজ মজুদ থাকলে চাষাবাদের খরচ অনেকটা কমে যায়। তাতে কৃষকরা লাভবান হন। কিন্তু বর্তমানে তা হচ্ছে না। বীজ কিনতে গিয়ে লাভের অংশ কমে যাচ্ছে।”

কৃষি বিভাগের বক্তব্য

ঝিনাইদহ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. কামরুজ্জামান বলেন, “কৃষকদের মানসম্মত বীজ ব্যবহারের পাশাপাশি নিজেদের উৎপাদিত ভালো ফসল থেকে বীজ সংগ্রহ করে সংরক্ষণের বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। ভালো ও রোগমুক্ত জমি থেকে উপযুক্ত সময়ে বীজ সংগ্রহ করে সঠিকভাবে সংরক্ষণ করতে পারলে কৃষক পরবর্তী মৌসুমে নিজের বীজ ব্যবহার করতে পারবেন। এতে একদিকে বীজ কেনার খরচ কমবে, অন্যদিকে প্রয়োজনের সময় বাজারের ওপর নির্ভরশীলতাও কিছুটা কমানো সম্ভব হবে।”

তিনি বলেন, কৃষকেরা যাতে মানসম্মত বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণ করতে পারেন, সে বিষয়ে কৃষি বিভাগের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বিভিন্নভাবে পরামর্শ দিয়ে থাকেন। প্রদর্শনী প্লটের মাধ্যমে উন্নত জাতের ফসলের সঙ্গে কৃষকদের পরিচয় করানো হচ্ছে। সেখান থেকে ভালো ফলন পাওয়া গেলে কৃষকদের নিজেদের জমির উপযোগী বীজ সংরক্ষণে উৎসাহিত করা হচ্ছে।

কামরুজ্জামান আরও বলেন, “বীজ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে শুধু বীজ সংগ্রহ করলেই হবে না, সেটি ভালোভাবে শুকানো, রোগমুক্ত রাখা এবং উপযুক্ত পরিবেশে সংরক্ষণ করতে হবে। কৃষকদের এ বিষয়ে সচেতন করা হচ্ছে। একই সঙ্গে স্থানীয়ভাবে ভালো জাতের বীজ সংরক্ষণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ স্থানীয় জাতের অনেক বীজ আমাদের কৃষির ঐতিহ্য ও বৈচিত্র্যের সঙ্গে জড়িত।”

কৃষকের ঘরে বীজ সংরক্ষণের অভ্যাস ফিরিয়ে আনা গেলে উৎপাদন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি দুর্যোগ বা বাজারে বীজের সংকট তৈরি হলে বিকল্প ব্যবস্থা রাখা সম্ভব হবে বলেও জানান তিনি।

বীজের নিয়ন্ত্রণ কৃষকের হাতে ফেরানোর দাবি

ঝিনাইদহের কৃষিতে বীজের বাজারনির্ভরতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কৃষকের নিজস্ব বীজ সংরক্ষণের ঐতিহ্যও কমছে। উচ্চফলনশীল ও হাইব্রিড জাতের চাহিদা বাড়লেও স্থানীয় জাত সংরক্ষণ, কৃষক পর্যায়ে মানসম্মত বীজ উৎপাদন এবং সরকারি বীজ সরবরাহের সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টি এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

কৃষকের ঘরে বীজ ফিরিয়ে আনা গেলে একদিকে যেমন উৎপাদন ব্যয় কমানো সম্ভব, অন্যদিকে বাজারে হঠাৎ বীজ সংকট বা সরবরাহব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলেও কৃষকের হাতে বিকল্প থাকবে। একই সঙ্গে স্থানীয় জাত ও কৃষির জেনেটিক বৈচিত্র্য সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে।

তাই বীজকে শুধু কৃষি উপকরণ হিসেবে নয়, কৃষকের অধিকার, কৃষির স্থিতিশীলতা এবং খাদ্যনিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে দেখার সময় এসেছে।
ঢাকা/ইবিটাইমস/এসএস