রবিবার অস্ট্রিয়ায় তাপমাত্রা ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস হওয়ার পূর্বাভাস,সমগ্র ইউরোপে ঝুঁকিতে প্রায় ১০ কোটি মানুষ

ভিয়েনা ডেস্কঃ বুধবার (২৪ জুন) অস্ট্রিয়ার আবহাওয়ার পূর্বাভাসে আগামীকাল থেকে তাপমাত্রা বৃদ্ধির সর্বোচ্চ সতর্কতা দেওয়া হয়েছে।
বলা হয়েছে, শনিবার ও রবিবার ভিয়েনার তাপমাত্রা ৩৮° থেকে ৩৯°সে. পর্যন্ত উঠতে পারে। অস্ট্রিয়ার সকল রাজ্যে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে
বিভিন্ন রাজ্য প্রশাসন।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, মধ্য ও পশ্চিম ইউরোপজুড়ে বিস্তৃত হিট ডোম (Heat Dome) আবহাওয়া পরিস্থিতির প্রভাবে অস্ট্রিয়া এখন তীব্র দাবদাহের মুখোমুখি।
বিশেষ করে রাজধানী ভিয়েনা, লোয়ার অস্ট্রিয়া এবং পূর্বাঞ্চলীয় এলাকাগুলোতে তাপমাত্রা ৩৮–৩৯°C পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে বলে আবহাওয়াবিদরা পূর্বাভাস দিয়েছেন। রাতেও তাপমাত্রা ২৩°C-এর নিচে নামছে না, যা আবহাওয়াবিজ্ঞানের ভাষায় ট্রপিক্যাল নাইট, হিসেবে পরিচিত।
ভিয়েনা ও পূর্বাঞ্চলে জরুরি সতর্কতা পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে ভিয়েনা ও এর আশেপাশের এলাকায় হলুদ ও কমলা তাপ সতর্কতা (Heat Alert) জারি করা হয়েছে।
শনিবার এবং রবিবার এই গরমের তীব্রতা সবচেয়ে বেশি অনুভূত হতে পারে। আবহাওয়া দপ্তর থেকে সাধারণ মানুষকে সরাসরি সূর্যের আলো থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
কাদের বেশি ঝুঁকি?
অস্ট্রিয়ার তাপ সুরক্ষা পরিকল্পনা (Heat Protection Plan) অনুযায়ী, এই আবহাওয়ায় স্বাস্থ্যঝুঁকি সবচেয়ে বেশি বাড়ছে: সংবেদনশীল মানুষ, শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং অন্তঃসত্ত্বা নারী। দীর্ঘস্থায়ী রোগী, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ এবং শ্বাসকষ্টে ভুগছেন এমন ব্যক্তিরা এই সময় সবাই সর্তকতা অবলম্বন করুন।
শ্রমিক যারা দিনের বেলায় বাইরে কাজ করেন অতিরিক্ত গরমের কারণে হিটস্ট্রোক, পানিশূন্যতা এবং রক্তচাপজনিত জটিলতা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তির হার বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আবহাওয়াবিদদের মতে, এর পেছনে একটি শক্তিশালী Omega Block বা Heat Dome কাজ করছে যেমন: এটা এমন একটি উচ্চচাপ বলয়, যা গরম বাতাসকে একটি অঞ্চলের ওপর আটকে রাখে এবং মেঘ তৈরি হতে বাধা দেয়। এছাড়াও দিনের পর দিন সূর্যের তাপ জমতে দেয়।
এএফপি এর তথ্য মতে, ইউরোপের অনেক দেশেই তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রি ছাড়ানোর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এর ফলে ইউরোপে ঝুঁকিতে রয়েছে প্রায় ১০ কোটি মানুষ। এই আবহাওয়ায় মানুষের পাশাপাশি প্রাণীরাও তীব্র তাপপ্রবাহের বিপাকে পড়েছে।
হিট ডোম বা তাপ বলয়ের প্রভাবে তীব্র তাপপ্রবাহে পুড়ছে পুরো ইউরোপ। ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, আজ বুধবার ইউরোপের প্রায় ৯ কোটি ৪০ লাখ মানুষ ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা প্রত্যক্ষ করবে, যাদের বড় অংশ ফ্রান্স ও স্পেনের বাসিন্দা।
জার্মানির আবহাওয়া অধিদপ্তর ও যৌথ গবেষণা কেন্দ্রের (জেআরসি) জনসংখ্যা পূর্বাভাসের ওপর ভিত্তি করে তৈরি এই বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, আজ ইউরোপের (তুরস্ক বাদে) বিভিন্ন দেশে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করবে। এতে প্রায় ৩৫ কোটি মানুষ ঝুঁকিতে রয়েছেন, যা এই মহাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ।
চলতি সপ্তাহের তীব্র তাপে সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত হয়েছে ফ্রান্স। গত মঙ্গলবার দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে উত্তপ্ত জুন মাস রেকর্ড করা হয়েছে, যেখানে জাতীয় গড় তাপমাত্রা ছিল ২৯ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এদিন দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ল্যান্ডসের পিসোসে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৪৪ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা এই অঞ্চলের সর্বকালের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে।
প্রচণ্ড গরম থেকে বাঁচতে গিয়ে অসতর্কতার কারণে গত বৃহস্পতিবার থেকে এ পর্যন্ত ফ্রান্সে অন্তত ৪০ জন পানিতে ডুবে মারা গেছেন, যাদের অধিকাংশই কমবয়সী। ফরাসি প্রধানমন্ত্রী এই পরিস্থিতিকে ‘এক মর্মান্তিক মহামারি’ বলে অভিহিত করেছেন। এ ছাড়া গরম সহ্য করতে না পেরে গাড়ির ভেতর আটকে থেকে দুই শিশুর মৃত্যুর খবরও পাওয়া গেছে।
পরিস্থিতি বিবেচনায় দেশের অর্ধেকের বেশি, অর্থাৎ ৫৮টি অঞ্চলে সর্বোচ্চ ‘রেড অ্যালার্ট’ এবং ৩১টি অঞ্চলে ‘অরেঞ্জ অ্যালার্ট’ জারি করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর মেতেও ফ্রান্স।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, প্রচণ্ড গরমে ট্রান্সফরমার বিকল হয়ে দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ৬৮ হাজার ঘরবাড়ি বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছে। ল্যুভর মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষ তাদের ঐতিহাসিক ভবনটি জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে মানানসই নয় জানিয়ে দর্শনার্থীদের দৈনিক পরিদর্শনের সময়সীমা বিকেল ৪টা পর্যন্ত কমিয়ে এনেছে।
অস্ট্রিয়া,ফ্রান্স ছাড়াও পুরো পশ্চিম ও মধ্য ইউরোপ এখন ওলন্দাজ-আফ্রিকান অ্যান্টিসাইক্লোনের কবলে পড়েছে, যা সাহারা মরুভূমি থেকে গরম বাতাস টেনে আনছে।
ইউরোপে রেকর্ড তাপপ্রবাহ: স্পেনের উত্তরাঞ্চলে ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা ওঠার আশঙ্কায় রেড অ্যালার্ট জারি রয়েছে। ইতালির মিলান ও রোমসহ ১৬টি প্রাদেশিক রাজধানীতে তীব্র তাপপ্রবাহের রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে। অতিরিক্ত এসি ব্যবহারের কারণে মিলান ও তুরিনে ব্ল্যাকআউট বা বিদ্যুৎ বিপর্যয় ঘটেছে।
নেদারল্যান্ডস ও বেলজিয়াম: নেদারল্যান্ডসে ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং বেলজিয়ামে ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের পূর্বাভাস দিয়ে ‘অরেঞ্জ অ্যালার্ট’ জারি করা হয়েছে। বেলজিয়াম সরকার দেশের প্রবীণ ও শিশুদের অতিরিক্ত যত্ন নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে জাতীয় ওজোন ও হিট প্ল্যান সক্রিয় করেছে।
জার্মানি ও পূর্ব ইউরোপ: আগামী সপ্তাহান্তে জার্মানিতে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে। পাশাপাশি এই তাপপ্রবাহ দ্রুত পূর্ব ইউরোপের পোল্যান্ড, ক্রোয়েশিয়া এবং হাঙ্গেরির দিকে ছড়িয়ে পড়ছে।
দ্রুত উষ্ণ হচ্ছে ইউরোপ: কোপার্নিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় ইউরোপ মহাদেশটি দ্বিগুণ গতিতে উষ্ণ হয়ে উঠছে। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ফলেই গ্রীষ্মকালীন এই তাপপ্রবাহের তীব্রতা ও স্থায়িত্ব বাড়ছে, যা ইউরোপের পানি সরবরাহে ঘাটতি এবং ভয়াবহ ল্যান্ড স্লাইড বা দাবানলের ঝুঁকি তৈরি করছে।
গত বছরও এই তাপপ্রবাহের কারণে স্পেনে রেকর্ড পরিমাণ বনভূমি পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল। তবে আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, আগামী সপ্তাহের শেষে বজ্রঝড় ও শিলাবৃষ্টির মাধ্যমে এই গরম থেকে কিছুটা মুক্তি মিলতে পারে।
কবির আহমেদ/ইবিটাইমস/এম আর



















