নিস্তব্ধ লন্ডনের ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে ইতালির শিরোপা বিজয়ের উৎসব
স্পোর্টস ডেস্কঃ অধিকাংশ ইংল্যান্ডবাসী ধরেই নিয়েছিল ৫৫ বছর পর ইংল্যান্ড ইউরো জয় করে ট্রফি হোমে নিয়ে আসবে কিন্ত বিধিবাম ইউরো ট্রফি হোমের পরিবর্তে চলে গেল
রোমে। বৃটিশ সরকার ১৯৬৬ সালের পর এই প্রথম ইংল্যান্ড কোন বড় ধরণের ফাইনালে খেলায় উঠায় এবং জয়লাভ করলে ইংল্যান্ডে ব্যাপক উৎসবের আয়োজনের পরিকল্পনা করে রেখেছিল। তারমধ্যে অন্যতম ছিল আজ সোমবার ইংল্যান্ডে সাধারণ বা সরকারি ছুটি ঘোষণা। ইংল্যান্ডের শিরোপা পাওয়ার স্বপ্ন এখন স্বপ্নই রয়ে গেল।
গতকাল রবিবার ১১ জুলাই লন্ডনের ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে আরেকটি টাইব্রেকারে স্বপ্নভঙ্গ হলো স্বাগতিক ইংল্যান্ডের। ১৯৯৬ সালের ইউরো কাপের সেমিফাইনালে এই পেনাল্টি শুটআউটেই জার্মানির কাছে হেরে বিদায় নিয়েছিল তারা। আবারও ভেঙে পড়ল টাইব্রেকারের চাপে। ঘরের মাঠে দর্শকদের পাশে নিয়েও ৫৫ বছরের শিরোপা খরা ঘুচলো না। প্রথমবার ইউরোর ফাইনাল রূপ নিলো বিষাদে। টাইব্রেকারে ৩-২ গোলে জিতে ৫৩ বছর পর ইতিহাসে দ্বিতীয় বারের মত ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন্সশীপের শিরোপা পেল ইতালি।
গতকাল রবিবার রাতে ইউরো কাপ ফুটবলের ফাইনাল খেলাটি নির্ধারিত সময়ে ১-১ গোলে অমীমাংসিত ভাবে শেষ হলে তা অতিরিক্ত সময়ে গড়ায়। অতিরিক্ত ৩০ মিনিটেও খেলার জয়পরাজয় নির্ধারণ না হওয়ায় শেষ প্রচেষ্টা পেনাল্টি কিক বা ট্রাইব্রেকারে গড়ায়।
ইংল্যান্ডের স্থানীয় সংবাদ মাধ্যম জানিয়েছেন, ইংল্যান্ডে জয়লাভ করার আশা নিয়ে বিজয় উৎসবের ব্যাপক প্রস্ততি নিয়ে রাখা হয়েছিল। গভীর রাত পর্যন্ত পানশালা খোলা রাখা, গাড়িতে পতাকা লাগিয়ে হৈ-হুল্লোড় করা। সোমবার দেশের সবগুলো ব্যাংক বন্ধ রাখতে এবং সাধারণ ছুটি ঘোষণার জন্য প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনকে অনুরোধ করেছিল ইংল্যান্ডবাসী। তাদের ঘরে ফিরবে ট্রফি, আর সেই আনন্দে সারাদিন মাতোয়ারা হয়ে থাকবে। ৫৫ বছর পর ইংল্যান্ডের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মুহূর্তটুকুর স্বাক্ষী হতে ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে গেট ভেঙে ঢোকার চেষ্টা করেছেন ভক্ত-সমর্থকরা। নিরাপত্তাকর্মীদের হিমশিম খেতে হয়েছে তাদের নিয়ন্ত্রণে।
আর গতকালের ফাইনাল খেলার প্রথম ২ মিনিটে ইতালির বিরুদ্ধে ১-০ গোলে ইংল্যান্ডের এগিয়ে থাকাকে প্রথমে সকলেই ইংল্যান্ডের ভাগ্যাকাশে শিরোপা জেতার ঈন্গিতই মনে করেছিলেন। খেলার দ্বিতীয় মিনিটের গোলে ওয়েম্বলির ফেটে পড়া আওয়াজ বাইরের ভক্ত-সমর্থকদের আরও উতলা করে তুলেছিল। ইউরোর ফাইনালে দ্রুততম গোল করে লুক শ তাদের স্বপ্নপূরণের পথে ছিলেন। তবে বর্তমান সময়ে ইউরোপের অন্যতম ফেভারিট শক্তিশালী ইতালি হুঙ্কার ছেড়ে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে মুহুর্মুহু আক্রমণ চালালেও ইংল্যান্ড প্রথমার্ধে ১-০ গোলে জয়লাভ করে বিরতিতে যায়।
প্রথমার্ধের ৪৫ মিনিটে পাঁচবার গোলের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে আজ্জুরিরা দ্বিতীয়ার্ধে আরও মরিয়া হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত তারা পায়ও সমতা ফেরানোর গোলের দেখা। খেলার ৬৭ মিনিটের মাথায় লিওনার্দো বোনুচ্চির সুযোগ সন্ধানি গোলে (১-১) ইতালি খেলায় সমতা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়। নির্ধারিত ৯০ মিনিট এবং অতিরিক্ত আরও ৩০ মিনিটেও খেলার ফলাফল অমীমাংসিতই থাকে।
টাইব্রেকারে ম্যাচ গড়ালেও ইংল্যান্ড তখন ট্রফি ঘরে ফেরার স্বপ্নে বিভোর। এমনকি প্রথম শটে ইতালির বেরার্দি জালে বল জড়ালেও। ইংল্যান্ডও প্রথম শটে জাল খুঁজে পায় হ্যারি কেইনের ডান পায়ে। ইতালির দ্বিতীয় শটে বেলোত্তিকে পিকফোর্ড ঠেকালে যেন চ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্ন আরও গভীর হতে থাকে। ম্যাগুইরের গোলে এগিয়ে যায় ইংল্যান্ড। বোনুচ্চি গোল করে ইতালিরও আশা জাগিয়ে রাখেন। তৃতীয় শটে র্যাশফোর্ডের ক্রসবারে আঘাত যেন ইংল্যান্ড বাসীর বুকে লেগেছিল। বের্নার্ডেশচি ইতালির তৃতীয় গোল করেন। ইংল্যান্ডের বদলি খেলোয়াড় জ্যাডন সানচোকে রুখে দেন ইতালি গোলকিপার দোনারুম্মা। জর্জিনহোকে ঠেকিয়ে পিকফোর্ডও লড়াই টিকিয়ে রাখেন। তবে বুকায়ো সাকাকে সেভ করে ইতালিকে আনন্দে ভাসান দোনারুম্মা। আর ৬০ হাজারেরও বেশি দর্শকে ঠাসা ওয়েম্বলি হয়ে পড়ে নিস্তব্ধ।
ইংল্যান্ডকে তাদের মাটিতে হারিয়ে শ্রেষ্ঠত্ব পুনরুদ্ধার করলো ইতালি। টানা ৩৪ ম্যাচ অজেয় থেকে ৫৩ বছর পর প্রথম ইউরো কাপ জিতলো তারা। শেষবার ১৯৬৮ সালে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল তারা যুগোস্লাভিয়াকে হারিয়ে। পরে ২০০০ ও ২০১২ সালে ফাইনালে উঠলেও ট্রফিতে হাতছোঁয়া হয়নি।
খেলাশেষে বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন এক টুইট বার্তায় বলেন,ইউরো ২০২০ এর ফাইনাল খেলার ফলাফল আমাদের সকলের জন্য হৃদয় বিদারক ফলাফল ছিল তবে গ্যারেথ সাউথগেট এবং তার ইংল্যান্ড দল নায়কের মতো খেলেছিল। তারা সমগ্রজাতিকে গর্বিত করেছে এবং আমরা তাদের কাছে ঋণী হয়ে রইলাম।
ইতালির প্রধানমন্ত্রী মারিও দ্রাঘী ইতালির শিরোপা জয়ের সাথে সাথেই এক ফেসবুক স্ট্যাটাসের মাধ্যমে দলকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন,আমরা ফুটবলে ইউরোর শ্রেষ্ঠত্বের পাশাপাশি সবদিক দিয়েও শ্রেষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রাখবো।
কবির আহমেদ/ ইবিটাইমস