নির্ধারিত সময়ে উৎপাদনে আসা নিয়ে সংশয়, সঞ্চালন জটিলতায় রূপপুর

মোঃ নাসরুল্লাহ, ঢাকা: নির্মাণ কাজে দৃশ্যমান অগ্রগতি থাকলেও নির্ধারিত সময়ে উৎপাদনে আসতে পারছে না রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। সঞ্চালন ও গ্রিড লাইন, সাবস্টেশন নির্মাণ, রিভারক্রসিং কার্যক্রম পিছিয়ে যাওয়ায় এ সংশয় দেখা দিয়েছে। ডলার মূল্য এবং  রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক লেনদেনে জটিলতাও রূপপুর প্রকল্পের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। নানামুখী এসব জটিলতায় বিলম্ব হবে রূপপুরের কাজ শেষ করে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। সরকারের লক্ষ্য ছিল ২০২৩ সালের মধ্যে প্রথম ইউনিট থেকে ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা। এখন সেটা ২০২৪ সালের আগে সম্ভব নয় বলেই মনে করেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন,  রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটির কাজের অগ্রগতি ছিল চোখে পড়ার মতো। করোনার মধ্যেও কাজ এগিয়েছিল বেশ ভালোভাবেই। কিন্তু রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর আন্তর্জাতিক লেনদেনে রুশ প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞায় জটিলতায় পরে প্রকল্পের কাজে ধীরগতি তৈরি হয়।

সংশ্লিষ্টরা জানান, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঞ্চালন অবকাঠামো নির্মাণ ভারতীয় নমনীয় ঋণ (এলওসি) লাইন অব ক্রেডিডের অর্থায়নে করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। কিন্তু এই ঋণের অর্থ দ্রুততম সময়ের মধ্যে ছাড় করানো সম্ভব হয়নি। ফলে শুরুতেই পিছিয়ে যায় গ্রিড ও সঞ্চালন লাইনের নির্মাণ কাজ।

প্রকল্পের তথ্য অনুসারে গ্রিডলাইন নির্মাণকাজ সম্পন্ন করতে বিভিন্ন প্যাকেজের কাজের মেয়াদ ২০২২ সালে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও পরে সেটা ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়। কিন্তু সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০২৩ সালের মধ্যে সবগুলো সঞ্চালন লাইন বাস্তবায়ন করা যাবে না। কারণ প্রকল্পের সার্বিক ভৌত অগ্রগতি ৪৫.০৫ শতাংশ (সেপ্টেস্বর পর্যন্ত)।

প্রকল্পের অগ্রগতি প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, সাতটি প্যাকেজের আওতায় গ্রিড ও সঞ্চালন লাইন নির্মাণ কাজ চলছে রূপুপর প্রকল্পে। এরমধ্যে প্যাকেজ ১-এ রয়েছে রূপপুর থেকে বাঘাবাড়ী ২৩০ কেভির ৬০ কিলোমিটার সঞ্চালন লাইন নির্মাণকাজ। এ প্রকল্পে ভৌত অগ্রগতি হয়েছে প্রায় শতভাগ, আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ৮৯ শতাংশ। এটির ব্যয় ২৪৫ দশমিক ৮২ কোটি টাকা। এ ছাড়া রয়েছে আমিন বাজার থেকে কালিয়াকৈর পর্যন্ত ৫১ কিলোমিটার ৪০০ কেভি ডাবল সার্কিট সঞ্চালন লাইন নির্মাণ। এ প্রকল্পে ভৌত অগ্রগতি হয়েছে ৮৭ শতাংশ, আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ৭৫ শতাংশ। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৭৬ কোটি টাকা। প্যাকেজ ২-এ রয়েছে রূপপুর থেকে ঢাকা (আমিনবাজার-কালিয়াকৈর) পর্যন্ত ১৪৭ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে ৪০০ কেভি ডাবল সার্কিট সঞ্চালন লাইন নির্মাণ এবং রূপপুর থেকে গোপালগঞ্জ পর্যন্ত ৪০০ কেভি ১৪৬ কিলোমিটারের সিঙ্গেল সার্কিট সঞ্চালন লাইন নির্মাণ। দুটো প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১২শ কোটি টাকা। এ দুটো প্রকল্পের আর্থিক এবং ভৌত অগ্রগতি হয়েছে ৫০ শতাংশের মতো। প্যাকেজ ৩-এর আওতায় রয়েছে রূপপুর থেকে ধামরাই পর্যন্ত ১৪৫ কিলোমিটার ২৩০ কেভি ডাবল সার্কিন সঞ্চালন লাইন নির্মাণ এবং রূপপুর থেকে বগুড়া পর্যন্ত ১০২ কিলোমিটার ৪০০ কেভি সিঙ্গেল সার্কিট সঞ্চালন লাইন নির্মাণ। দুটো সঞ্চালন লাইন নির্মাণে ব্যয় হতে পারে এক হাজার ৮২১ কোটি টাকা। এ দুটো প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি হয়েছে পর্যায়ক্রমে ৪৪ শতাংশ এবং ৬০ শতাংশ। আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ৪৩ শতাংশ ও ৫৬ শতাংশ।

এ ছাড়া অন্য প্যাকেজের অধীনে যমুনা ও পদ্মা নদীতে ১৬ কিলোমিটার রিভার ক্রসিং সঞ্চালন লাইন নির্মাণ, ৪০০ কেভি বে-সম্প্রসারণ এবং ২৩০ কেভি বে-সম্প্রসারণের কথা রয়েছে। রিভার ক্রসিং সঞ্চালন লাইন নির্মাণ প্রকল্পটি ভারতীয় লাইন অব ক্রেডিট (এলওসি) ঋণ থেকে অবমুক্ত করে গত আগস্টে চুক্তি করা হয়। এটির অগ্রগতি মাত্র দুই শতাংশ। আর বে-সম্প্রসারণ কাজের ভৌত অগ্রগতি হয়েছে ২৩ শতাংশ, আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ১৩ শতাংশ।

গ্রিড ও সঞ্চালন লাইনের পাশাপাশি আছে যন্ত্রাংশ সরবরাহ জটিলতাও। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, চুক্তি অনুযায়ী রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক উপকেন্দ্র এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ রাশিয়ার সরবরাহের কথা ছিল। এসব উপকরণ ও যন্ত্রাংশ রাশিয়া নিজে উৎপাদন করেনা। তারা বিভিন্ন দেশের বহুজাতিক কোম্পানি থেকে সংগ্রহ করে সরবরাহ করত। কিন্তু যুদ্ধের কারণে সরবরাহকারী বিভিন্ন দেশের সাথে রাশিয়ার সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। এছাড়া অর্থ লেনদেনে জটিলতাও রয়েছে। তাই রাশিয়া অন্যদেশ থেকে আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশকে উপকেন্দ্রের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ সংগ্রহ করার অনুরোধ করেছে। চুক্তি অনুযায়ী সেসবের মূল্য পরিশোধ করতে সম্মতিও জানিয়েছে রাশিয়াই। এছাড়া প্রকল্পে রাশিয়ার যেসব পরার্মশক কাজ করতেন তাদের অর্থ পরিশোধে কিছু জটিলতা তৈরি হয়েছে বলেও জানান এই কর্মকর্তা।

এদিকে, রূপপুর বিদ্যুৎ প্রকল্পের অগ্রগতি ও করণীয় নিয়ে বুধবার বৈঠক করে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রনালয়ের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা। বৈঠকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদও উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক শেষে তারা প্রকল্পের অগ্রগতির সার্বিক তথ্য জানান সাংবাদিকদের।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান বলেন, রূপপুরের সঞ্চালন ব্যবস্থাপনার কাজ যথাসময়ে শেষ করতে সমন্বিতভাবে কাজ করছে বিদ্যুৎ বিভাগ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়। সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাচ্ছে নিরাপত্তা। বলেন, ডলারের দাম বৃদ্ধিসহ সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হলেও কাছাকাছি সময়ের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়ন হবে বলে আশা করেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী।

অন্যদিকে, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, কাজ চলছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে না হলেও খুব একটা বিলম্ব হবে না। কোভিড ও ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে কিছুটা পিছিয়েছে। সাবস্টেশনের কাজ দুপক্ষের কারণে একটু দেরি হয়েছে। তিনি বলেন, এখন প্রকল্প বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। বলেন, সঞ্চালন লাইনের পদ্মা নদী ক্রসিং প্রকল্পের একটি বড় কাজ যা শেষ হতে আরও দেড় বছর সময় লাগতে পারে। প্রতিমন্ত্রী বলেন, আশা করি বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার আগেই সঞ্চালন লাইনের কাজ শেষ করা সম্ভব হবে।

২০১০ সালে হাতে নেয়া দুই হাজার ৪০০ মেগাওয়াট রূপপুর এনপিপি প্রকল্পের দুটি ইউনিট রয়েছে। যার প্রতিটি এক হাজার ২০০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতা সম্পন্ন। ২০১৭ সালের ৩০ নভেম্বর রূপপুর প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক নির্মাণকাজ শুরু হয়। তৃতীয় প্রজন্মের রুশ প্রযুক্তিতে নির্মাণাধীন রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের মোট ব্যয় এক লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে ৯০ শতাংশ অর্থায়ন করছে রাশিয়া। বাকি ১০ শতাংশ অর্থায়ন করবে বাংলাদেশ সরকার।

ঢাকা/ইবিটাইমস/আরএন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit exceeded. Please complete the captcha once again.

Translate »