৫ম পর্ব
ড. মোঃ ফজলুর রহমানঃ ৪১। ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে যারা সশরীরে উপস্থিত ছিলেন তারা নিশ্চয়ই জানেন যে, ঐদিন দেশের সর্বস্তরের ১০ (দশ) লক্ষাধিক জনসাধারণের উপস্থিতিতে অত্যাসন্ন মুক্তিযুদ্ধের সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত প্রাঞ্জল এবং পরিচ্ছন্ন ভাষায় ব্যক্ত করেছেন। জনসভায় উপস্থিত উপরোক্ত বিপুল সংখ্যক নরনারীর মধ্যে অনেকেরই হাতে ছিল বাঁশের লাঠি, নৌকার বৈঠা, বিভিন্ন ধরনের পোস্টার, ফেস্টুন এবং রং বেরং এর ব্যানার। বঙ্গবন্ধুর সম্মোহনী ভাষণের প্রতিটি বক্তব্য জনসমুদ্রের সবাই পিন পতন নিরবতার মধ্যে মন্ত্রমুগ্ধের মতো শ্রবণ করেন। কিন্তু ভাষণ শেষ হওয়ার পর সবাই স্বাধীনতার দাবিতে স্লোগানে স্লোগানে আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করে তুলেন। কালজয়ী এই ভাষণ পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, অধিকার হারা বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাস বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত সুচিন্তিত, পরিমার্জিত এবং পরিচ্ছন্ন ভাষায় জনসমক্ষে তুলে ধরেন। এরই পাশাপাশি অত্যাসন্ন মুক্তিযুদ্ধে আমাদের ভূমিকা এবং করণীয় সম্পর্কেও দিকনির্দেশনা প্রদান করেন।
৪২। অখণ্ড এবং অবিভক্ত পাকিস্তানের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের নির্বাচিত নেতা হিসেবে প্রচণ্ড চাপের মধ্যে থেকেও জনসভাস্থলে কোন হঠকারী সিদ্ধান্ত ঘোষণা না করে ক্ষুব্ধ কণ্ঠে এবং ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত জ্বালাময়ী ভাষণ দিলেও
উক্ত ভাষণের মাধ্যমে তিনি সরাসরি স্বাধীনতার কোন ঘোষণা দেননি। কিন্তু তা সত্ত্বেও পরবর্তীকালে পাকিস্তানী সৈন্যদের সাথে লড়াইটা যে স্বাধীনতা যুদ্ধের ময়দানেই লড়াই হবে সে ব্যাপারে কোন রাখ ঢাক না করে অত্যন্ত পরিচ্ছন্নভাবে তিনি তাঁর ভাষণে
আলোকপাত করেছেন। বঙ্গবন্ধুর এহেন সুদূরপ্রসারী এবং দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ভাষণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, তিনি তাঁর ভাষণে-
১। পাকিস্তানী শাসকদের বৈষম্যমূলক এবং নিপীড়নমূলক শাসন ব্যবস্থার আনুপূর্বিক বর্ণনা দিয়েছেন।
২। বাঙালিদের ব্যাপারে পশ্চিম পাকিস্তানী রাজনীতিকদের মনোভাব এবং দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপারে তিনি জোরালোভাবে আলোকপাত করেছেন।
৩। বাঙালি জাতির স্বাধিকার এবং স্বাধীনতার প্রশ্নে বঙ্গবন্ধু তাঁর নিজের এবং দেশবাসীর ভূমিকা ও অবস্থান বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করেছেন।
৪। দেশে বিদ্যমান সামরিক আইন প্রত্যাহার করে নিয়ে সামরিক বাহিনীর লোকদেরকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নেয়ার জন্য আবেদন জানিয়েছেন।
৫। জনগণের প্রতিনিধির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করার জন্য আহবান জানিয়েছেন।
৬। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত হরতাল এবং অসহযোগ আন্দোলন চালিয়ে
যাওয়ার জন্য দেশবাসীর নিকট আবেদন জানিয়েছেন।
৪৩। বঙ্গবন্ধু আজীবন নিয়মতান্ত্রিক পথে অত্যন্ত সুশৃঙ্খল এবং অহিংস ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে বিশ্বাস করতেন এবং এভাবেই তিনি অভ্যস্ত ছিলেন। আর এহেন নিয়মতান্ত্রিকভাবে আন্দোলন করতে গিয়ে তিনি বারবারই আক্রান্ত হয়েছেন। কিন্তু কখনো আক্রমণকারী হননি এবং তা হতেও চাননি। কিন্তু তা সত্ত্বেও বিবেকের দায়বদ্ধতা থেকে এবং ইতিহাসের অনিবার্য প্রয়োজনেই তিনি ৭ই মার্চ অসাধারণ ছন্দময় এবং কাব্যিক ভাষণ প্রদান করেন। ঐদিন বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং কালোত্তীর্ণ ভাষণ দিলেও তিনি স্বাধীনতা ঘোষণা করেননি। এহেন ঘোষণা প্রদান করলে পাকিস্তান সরকার তাদের ছক এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী অবশ্যই বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধুকে দোষী সাব্যস্ত করতেন এবং পাকিস্তান ভাঙ্গার পুরো দায়দায়িত্ব তাঁর উপর চাপিয়ে দিতেন। তাদের এহেন পরিকল্পনার প্রেক্ষিতে ৭ই মার্চ রেসকোর্সের চারিপাশে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর সশস্ত্র অবস্থান ছিল। এরই পাশাপাশি ঐ দিন আকাশে সামরিক হেলিকপ্টার টহল দিতেছিল। পাকিস্তান সরকারের এহেন কূটকৌশল এবং রণপ্রস্তুতি সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু পূর্ব থেকেই অবগত ছিলেন। তাই বঙ্গবন্ধুর সচেতনতা, তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা এবং দূরদর্শিতার কারণে পাকিস্তান সরকারের এহেন প্রচেষ্টা ও তৎপরতা নিদারুণভাবে ব্যর্থ হয়।
৪৪। দেশের সচেতন নাগরিকবৃন্দ নিশ্চয়ই জানেন পূর্ব নির্ধারিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ রেসকোর্স ময়দান থেকে রেডিও পাকিস্তানের ঢাকা কেন্দ্র থেকে সরাসরি সম্প্রচার করার সিদ্ধান্ত হয়েছিল এবং তা যথারীতি সম্প্রচার ও করা
হচ্ছিল বটে। কিন্তু ঐ সময়ে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ছিলেন “বেলুচিস্তানের কসাই” বলে পরিচিত জেনারেল টিক্কা খান। রেডিওর মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ সম্প্রচার করা অবস্থায় টিক্কা খানের নির্দেশে তা মাঝ পথে বন্ধ করে দেয়া হয়। ফলে রেডিও স্টেশনের বাঙালি কর্মকর্তা-কর্মচারীগণ প্রতিবাদে মুখর হয়ে উঠেন। এহেন প্রতিবাদের অংশ হিসেবে তাদের মধ্যে কেউ কেউ রেডিও স্টেশন থেকে বের হয়ে রাজপথে নেমে আসেন এবং কেউ কেউ জনতার সাথে মিছিলে শামিল হন। এমতাবস্থায় রেডিওর ঢাকাস্থ শাহবাগ কেন্দ্র থেকে অনুষ্ঠান প্রচার বন্ধ হয়ে যায়। এহেন অচল অবস্থার প্রেক্ষিতে সরকারের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্ত মোতাবেক পরের দিন সকালে রেডিও থেকে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রচারে রেডিও কর্তৃপক্ষ সম্মত হন। এমতাবস্থায় উক্ত স্টেশন থেকে পুনরায় অনুষ্ঠান প্রচার শুরু করা হয় এবং সেখান থেকে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ও সম্প্রচার করা হয়।
৪৫। একথা ঐতিহাসিকভাবেই সত্য যে অবিভক্ত পাকিস্তানের অবকাঠামোতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু নিরঙ্কুশ সংখ্যা- গরিষ্ঠতা অর্জন করেছেন। এহেন অবস্থায় পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ডাকা না ডাকা এবং বাঙালিদের প্রাণের দাবি স্বাধিকার ও স্বাধীনতার প্রশ্নে তৎকালীন পাকিস্তানী শাসকবর্গের সাথে সকল প্রকার দেন-দরবার এবং আলাপ আলোচনা পরিপূর্ণভাবে সমাপ্ত তথা Properly exhausted না হওয়া পর্যন্ত আইনের প্রতি আপাদমস্তক শ্রদ্ধাশীল বঙ্গবন্ধুর পক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করা কোনভাবেই সম্ভব ছিল না। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর অন্ধ সমালোচকগণ এই জলজ্ব্যান্ত সত্যটি কিছুতেই বুঝতে চাননা। আর বুঝলেও তা প্রকাশ্যে স্বীকার করেননা। তাই ৭ই মার্চের ভাষণে স্বাধীনতার ঘোষণা ছিলনা বলে তারা বঙ্গবন্ধুকে দোষারোপ করেন এবং কখনো কখনো কটাক্ষ করার ধৃষ্টতাও দেখান। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এহেন অনভিপ্রেত এবং অসংযত মন্তব্য করার পূর্বে ঐ সময়ে সারা দেশে বিদ্যমান পরিবেশ ও পরিস্থিতি এবং অন্তর্জাতিক আইন ও নিয়ম কানুন উপরোক্ত জ্ঞানপাপীগণ কখনো বিবেচনায় নেয়ার কোন প্রয়োজনীয়তাই অনুধাবন করেন না।
৪৬। ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ বাঙালি জাতির পরিচয়ের উন্মেষ ঘটায়। এই ভাষণ বাঙালির মুক্তির দলিল এবং পথ প্রদর্শক। ইতিহাসের অমোঘ নিয়মেই এই ভাষণ আমাদের স্বাধীনতার Magna Carta হিসেবে বিবেচিত। এই ভাষণের প্রতিটি উক্তি ছিল রণাঙ্গনে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বড় ধরনের অনুপ্রেরণা। এই ভাষণের পর সারা দেশের প্রতিটি এলাকা হয়ে যায় বারুদাগার। পাকিস্তানী শাসকদের সাথে যে আর থাকা সম্ভব নয় এই ভাষণের মাধ্যমে তা দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে যায়। তাই এই ভাষণ শুধুমাত্র একটি ভাষণই নয়, এটি যেন একটি মহাকাব্য। বঙ্গবন্ধুর এই জ্বালাময়ী এবং কালজয়ী ভাষণের মাধ্যমে বাঙালি তার ভাষার অধিকার, রাজনৈতিক অধিকার, অর্থনৈতিক অধিকার এবং সাংস্কৃতিক অধিকার সর্বোপরি বিজাতীয় পাকিস্তানী শাসকদের নির্মম অত্যাচার, লুন্ঠন এবং নিপীড়নের বেড়াজাল ছিন্ন করে বাঙালি জাতি পৃথিবীর বুকে একটি স্বতন্ত্র আবাসভূমি এবং লাল সবুজ পতাকার অধিকারী হয়। তাই আমাদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসকে অনন্তকাল ধরে সমুজ্জ্বল রাখার অমোঘ প্রয়োজনেই ৭ই মার্চের বঙ্গবন্ধুর এই কালোত্তীর্ণ ভাষণ আমাদের জাতীয় চেতনার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে আজ আমাদের
পবিত্র সংবিধানের অংশ বটে [দ্রঃ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের পঞ্চম তফসিল]।
৪৭। ইতিহাস সচেতন ব্যক্তিমাত্রই জানেন, ৭ই মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতির শোষণ বঞ্চনার দীর্ঘদিনের ইতিহাস অনুপম ভাষায় বর্ণনা করেছেন। এরই পাশাপাশি তিনি রাজনৈতিক, প্রশাসনিক এবং গেরিলা যুদ্ধের দিক নির্দেশনামূলক বক্তব্য ও প্রদান
করেছেন। এহেন নির্দেশ প্রদান করতে গিয়ে তিনি বলেন- “… প্রত্যেক গ্রামে, প্রত্যেক মহল্লায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তুলো এবং তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো। মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরও দিব। এই দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাআল্লাহ্।” অসাধারণ বাগ্মিতাপূর্ণ বঙ্গবন্ধুর বজ্রকণ্ঠের এই একটি মাত্র ভাষণ পুরো দেশ এবং জাতিকে সশস্ত্র যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে দারুণভাবে উদ্বুদ্ধ এবং অনুপ্রাণিত করে। এহেন তেজোদীপ্ত, প্রেরণাদায়ক এবং
উদ্দীপনামূলক ভাষণের দৃষ্টান্ত বিশ্বের ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া যায় না। তাই বিশ্বের বরেণ্য এবং প্রাতঃস্মরণীয় অন্যসব শ্রদ্ধাভাজন নেতৃবৃন্দের তুলনায় বঙ্গবন্ধুর অনন্য বৈশিষ্ট্য এবং শ্রেষ্ঠত্ব যে তিনি শুধুমাত্র বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের স্বপ্নদ্রষ্টাই
ছিলেন না বরং একটি জাতিকে অভূতপূর্ব ঐক্যের বন্ধনে একতাবদ্ধ করে একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে বিজয় অর্জন করার সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা প্রদান করেছেন। আর এহেন বিজয় অর্জনের ফলে তাঁর আজীবনের স্বপ্ন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি
তাঁর স্বপ্নকে সফলভাবে বাস্তবায়নের সার্থক রূপকার ও ছিলেন। আর ঠিক একারণেই তিনি আমাদের মহান জাতির জনক ও বটেন।
৪৮। মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের ব্যক্তি মাত্রই জানেন যে, ১৯৭১ সনের ১লা মার্চ ইয়াহিয়া খানের ভাষণের প্রতিক্রিয়ায় পুরো বাঙালি জাতি চরমভাবে বিক্ষুব্ধ এবং প্রতিবাদমুখর হয়ে পড়ে। ফলে বঙ্গবন্ধুর ডাকে ২রা মার্চ থেকে ৭ই মার্চ পর্যন্ত প্রতিদিন সারা দেশে
অর্ধদিবস করে হরতাল পালিত হতে থাকে। পরবর্তীকালে আসে সেই বহুল আকাঙ্ক্ষিত মাহেন্দ্রক্ষণ ৭ই মার্চ। এই দিন বঙ্গবন্ধু তাঁর কালজয়ী ভাষণের মাধ্যমে সারা দেশব্যাপী অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন। উপরোক্ত ভাষণের এক পর্যায়ে বঙ্গবন্ধু
বলেন- “আর এই সাতদিনের হরতালে যে সমস্ত শ্রমিক ভাইয়েরা যোগদান করেছে, প্রত্যেক শিল্পের মালিক তাদের বেতন পৌঁছে দিবেন। সরকারী কর্মচারীদেরকে বলি, আমি যা বলি তা মানতে হবে। যে পর্যন্ত আমার এই দেশের মুক্তি না হয়, ততদিন পর্যন্ত
খাজনা-ট্যাক্স বন্ধ করে দেয়া হলো, কেউ দিবেনা …।” উপরোল্লিখিত দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্যসম্বলিত ভাষণ দেশের আপামর
জনসাধারণ সোৎসাহে এবং স্বতঃস্ফূর্তভাবে গ্রহণ করেন। এহেন অবস্থায় সারা দেশ কার্যত অচল হয়ে পড়ে। শুধুমাত্র ক্যান্টনমেন্ট ছাড়া দেশের সর্বত্র পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরিভাবে শিথিল এবং অকার্যকর হয়ে পড়ে।
পক্ষান্তরে ৭ই মার্চের পর থেকে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশেই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সর্বত্র সমান্তরাল সরকার (Parallel government) পরিচালিত হতে থাকে। এমতাবস্থায় ৭ই মার্চের পর থেকে বঙ্গবন্ধু হয়ে যান De facto সরকার প্রধান।
৪৯। রাষ্ট্রীয় প্রশাসন পরিচালনার ব্যাপারে বঙ্গবন্ধুর উপরোক্ত দিকনির্দেশনার পাশাপাশি তিনি আরও বলেন- “মনে রাখবেন, রেডিও টেলিভিশনের কর্মচারীরা যদি রেডিওতে আমাদের কথা না শুনে তাহলে কোন বাঙালি রেডিও স্টেশনে যাবেন না। যদি টেলিভিশনে আমাদের নিউজ না দেয়, কোন বাঙালি টেলিভিশনে যাবেন না। দুই ঘণ্টা ব্যাংক খোলা থাকবে যাতে মানুষ তাদের মাইনে পত্র নিতে পারে। কিন্তু পূর্ব বাংলা থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে এক পয়সাও চালান হতে পারবে না। টেলিফোন-টেলিগ্রাম আমাদের এই পূর্ব বাংলায় চলবে এবং বিদেশের সাথে দেয়া নেয়া চলবে না। কিন্তু যদি এই দেশের মানুষকে খতম করার চেষ্টা করা হয়, বাঙালিরা বুঝে সুঝে কাজ করবেন …।” সুতরাং একথা অনস্বীকার্যভাবেই প্রমাণিত হয় যে, সারা জীবন ধরে অবহেলিত
একটি জাতির অতীত ইতিহাস, বর্তমান প্রেক্ষাপট এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার পাশাপাশি একটি অত্যাসন্ন গেরিলা যুদ্ধের দিক নির্দেশনা বঙ্গবন্ধু তাঁর ৭ই মার্চের অনবদ্য ভাষণে অত্যন্ত সুনিপুণভাবে বর্ণনা করেছেন। সারা বিশ্বের প্রথিতযশা অন্য কোন
সংগ্রামী নেতা কিংবা প্রাতঃস্মরণীয় অন্য কোন জাতীয়তাবাদী নেতার পক্ষে তা সম্ভব হয়নি। আর ঠিক একারণেই বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের অনন্য সাধারণ ভাষণ বিশ্বের ইতিহাসে বিস্ময়কর বটে।
৫০। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সপক্ষের সচেতন ব্যক্তিগণ নিশ্চয়ই জানেন যে, বঙ্গবন্ধু কর্তৃক উপরোক্ত কৌশলী এবং তুখোর বুদ্ধিদীপ্ত ভাষণ দেয়ার পরের দিন ৮ই মার্চ পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা (Inter Service Intelligence- ISI) পাকিস্তান
সদর দপ্তরে একটি প্রতিবেদন পাঠান। উক্ত প্রতিবেদনে তারা উল্লেখ করেন- “চতুর শেখ মুজিব চতুরতার সাথে বক্তৃতা করে গেল। একদিকে স্বাধীনতা ঘোষণা করলো, আরেকদিকে ৪ (চার) টি শর্ত আরোপ করে বিচ্ছিন্নতাবাদী আখ্যায় আখ্যায়িত হলোনা
এবং পাকিস্তান ভাঙ্গার দায়িত্ব ও নিল না। আমাদের নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করা ছাড়া আর কোন উপায় ছিলনা। আমরা যে প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিলাম সেটা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হলো।” [দ্রঃ মুক্তিযুদ্ধের মহাকাব্য- তোফায়েল আহমেদ, দৈনিক জনকণ্ঠ, ৭ই মার্চ, ২০২০]। সুতরাং পাকিস্তান সরকারের সচেতন ও পরিকল্পিত অপপ্রয়াস এবং এই মর্মে তাদের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা সম্পর্কে তাদের চৌকস সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার উপরোক্ত হতাশাব্যঞ্জক প্রতিবেদনের মাধ্যমে সহজেই অনুধাবন করা যায়।
ড. মোঃ ফজলুর রহমান, সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ (অবঃ), লেখক ও কলামিস্ট
(চলবে)
বি/ইবিটাইমস/এম আর