ভিয়েনা ১১:৫০ অপরাহ্ন, বুধবার, ২০ মে ২০২৬, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম :
লালমোহনে দুদকের উদ্যোগে বিতর্ক প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত শৈলকুপায় মেছোবাঘ পিটিয়ে হত্যা মাঠে নেই আশ্রয়-বজ্র নিরোধক দণ্ড: ঝিনাইদহে বজ্রপাতে বাড়ছে কৃষকের মৃত্যু ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে ট্রাক উল্টে চালকের মৃত্যু আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ৪৬ তম জাতীয় সমাবেশে প্রধানমন্ত্রীর যোগদান টাঙ্গাইলে জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহে শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক হোসেন আল মনসুর চরফ্যাশনে ভূমি সেবা মেলা ২০২৬-এর উদ্বোধন চাকরি রাজস্ব খাতে স্থানান্তরের দাবিতে টাঙ্গাইলে মউশিক শিক্ষকদের স্মারকলিপি প্রদান ভিয়েনায় মুন্সিগঞ্জ বিক্রমপুর অস্ট্রিয়া সমিতির নতুন কমিটির নাম ঘোষণা ইউরোপীয়ান বাংলা জার্নালিস্ট এসোসিয়েশনের নতুন কমিটি গঠিত, মাহবুবুর রহমান সভাপতি- জহিরুল ইসলাম সাঃ সম্পাদক

মাঠে নেই আশ্রয়-বজ্র নিরোধক দণ্ড: ঝিনাইদহে বজ্রপাতে বাড়ছে কৃষকের মৃত্যু

  • EuroBanglaTimes
  • আপডেটের সময় ০৪:৩০:০৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ২০ মে ২০২৬
  • ১৪ সময় দেখুন

শেখ ইমন, ঝিনাইদহ : আকাশে কালো মেঘ জমলেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে ঝিনাইদহের মাঠে-ঘাটে। হঠাৎ ঝলসে ওঠা বিদ্যুৎ আর বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে জনপদ। তারপরই আসে কান্নার খবর। কখনও পেঁয়াজ ক্ষেত থেকে,কখনও ধানের জমি থেকে,আবার কখনও গরু আনতে যাওয়া কৃষকের নিথর দেহ পড়ে থাকে মাঠের মাঝে। প্রতি বছরই বজ্রপাতে প্রাণ হারাচ্ছেন জেলার কৃষকরা। অথচ তাদের নিরাপত্তায় নেই কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা। নেই বজ্র নিরোধক দণ্ড,নেই জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র,এমনকি পরিকল্পিতভাবে তালগাছ রোপণের উদ্যোগও নেই। ফলে জীবিকার তাগিদে মৃত্যুঝুঁকি নিয়েই খোলা মাঠে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকরা।
কালবৈশাখী মৌসুমের শুরু থেকেই ঝিনাইদহে বাড়ে বজ্রপাত ও প্রাণহানির ঘটনা। চলতি বছর এখন পর্যন্ত জেলায় বজ্রপাতে মারা গেছেন ৫ জন এবং আহত হয়েছেন অন্তত ১৭ জন। এর আগে ২০২৫ সালে জেলায় বজ্রপাতে মৃত্যু হয়েছিল ৭ জনের। নিহতদের অধিকাংশই কৃষক বা মাঠে কাজ করা শ্রমজীবী মানুষ।
চলতি বছরের ২৮মার্চ জেলার শৈলকুপা উপজেলার খড়িবাড়িয়া গ্রামের বিস্তীর্ণ মাঠে ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে পেঁয়াজ গোছাতে গিয়ে বজ্রপাতে ঘটনাস্থলেই মারা যান দুই কৃষক। আহত হন আরও চারজন। পরদিন ২৯ মার্চ একই উপজেলায় বজ্রপাতে আহত হন আরও তিনজন। এরপর ১৬ এপ্রিল মহেশপুর উপজেলায় বজ্রপাতে প্রাণ হারান এক গৃহবধূ।
সবশেষ সোমবার (১৮ মে) বিকেলে সদরের মায়াধরপুর ও শৈলকুপা উপজেলার দামুকদিয়া গ্রামে বজ্রপাতে একজন কৃষক ও একজন গৃহবধূ প্রাণ হারান। মৃতরা হলেন-কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার নফরকান্দি গ্রামের দিনমজুর আসাদুল ইসলাম (৪০) ও শৈলকুপা উপজেলার দামুদকিয়া গ্রামের আনিসুর রহমানের স্ত্রী আন্না খাতুন (৪৫)। আসাদুল ইসলাম সদরের মায়াধরপুর গ্রামের মাসুদ রানার বাড়িতে দিনমজুর হিসেবে ধান কাটার কাজ করতে যায়।
জানা যায়, সদর উপজেলার মায়াধরপুর গ্রামের মাঠে কাজ করছিলেন দিনমজুর আসাদুল ইসলাম। বিকেলে ঝড়-বৃষ্টি শুরু হলে তিনি মাঠ থেকে বাড়ির দিকে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ বজ্রপাতে গুরুতর আহত হন তিনি। সেখান থেকে তাকে উদ্ধার করে ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষনা করে।
অপরদিকে বিকেলে ঝড় শুরু হলে শৈলকুপার দামুকদিয়া গ্রামের আনিসুর রহমানের স্ত্রী আন্না খাতুন বাড়ির পাশের একটি আম বাগানে আম কুড়াতে যায়। সেসময় বজ্রপাতে তার মৃত্যু হয়। এছাড়াও একইদিনে ঝিনাইদহ সদরের নারিকেলবাড়িয়া ও শৈলকুপার বিভিন্ন এলাকায় বজ্রপাতে নারীসহ আহত হয়েছে আরও ১০ জন।

স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রতিবছরই এমন দুর্ঘটনা ঘটছে। কিন্তু মৃত্যুর মিছিল থামাতে কার্যকর কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ে না।

খড়িবাড়িয়া গ্রামের কৃষক সুশীল বিশ্বাস। যিনি বজ্রপাতে নিহত সমীর বিশ্বাসের বাবা। ছেলের স্মৃতি মনে করে কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন,’সেদিন আকাশে মেঘ দেখে সবাই তাড়াহুড়া করে পেঁয়াজ তুলছিল। বৃষ্টি নামলে সব নষ্ট হয়ে যেত। হঠাৎ বিকট শব্দ হলো। পরে দেখি আমার ছেলে মাটিতে পড়ে আছে। ডাকাডাকিও করছিলাম,কোনো সাড়া দেয়নি। হাসপাতালে নেওয়ার আগেই সব শেষ। মাঠে যদি কোনো নিরাপদ আশ্রয়ের জায়গা থাকতো,তাহলে হয়তো আজ আমার ছেলে বেঁচে থাকতো।’

একই গ্রামের কৃষক আব্দুল জলিল বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। মাঠে না গেলে সংসার চলবে না। মেঘ জমলে ভয় লাগে,কিন্তু ফসল ফেলে চলে আসতেও পারি না। কারণ একদিনের বৃষ্টি মানেই কয়েক মাসের কষ্ট শেষ হয়ে যাওয়া। তাই জীবন হাতে নিয়েই কাজ করতে হয়।’
কৃষক রহিম উদ্দিনের কণ্ঠেও ছিল হতাশা। তিনি বলেন,প্রতিবছর মানুষ মারা যায়,তারপর কিছুদিন আলোচনা হয়,পরে সব চুপ। মাঠে যদি বজ্র নিরোধক শেল্টার থাকতো,তালগাছ থাকতো,তাহলে আমরা অন্তত আশ্রয় নিতে পারতাম। এখন তো খোলা আকাশের নিচেই থাকতে হয়।’

শুধু শৈলকুপা নয়,সদর,মহেশপুর,হরিণাকুন্ডু ও কালীগঞ্জ ও কোটচাঁদপুর উপজেলার বিভিন্ন মাঠেও একই চিত্র। কোথাও নেই বজ্রপাত প্রতিরোধে আধুনিক ব্যবস্থা। অনেক কৃষক জানান,বজ্রপাতের সময় কোথায় আশ্রয় নেবেন,সেটিও তারা জানেন না।

সচেতন নাগরিক সুজন বিপ্লব বলেন,’জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বজ্রপাতের তীব্রতা ও সংখ্যা বাড়লেও সে অনুযায়ী বাড়েনি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। বজ্রপাত এখন গ্রামাঞ্চলের নীরব দুর্যোগে পরিণত হয়েছে। বজ্রপাত এখন আর শুধু প্রাকৃতিক ঘটনা নয়,এটি বড় ধরনের জননিরাপত্তা সংকটে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে কৃষিনির্ভর এ জেলায় বজ্রপাত প্রতিরোধে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া প্রাণহানি কমানো সম্ভব নয়। এজন্য মাঠভিত্তিক বজ্র নিরোধক শেল্টার নির্মাণ,পর্যাপ্ত তালগাছ রোপণ,আধুনিক সতর্কীকরণ ব্যবস্থা চালু এবং কৃষকদের প্রশিক্ষণের ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন।

অভিযোগ রয়েছে,জেলা ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের পক্ষ থেকে বজ্রপাত নিরোধে কার্যকর কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়নি। ২০২৫ সাল এবং চলতি বছরেও জেলার কোথাও বজ্র নিরোধক দণ্ড স্থাপন,বজ্র নিরোধক শেল্টার নির্মাণ কিংবা বড় পরিসরে সচেতনতামূলক কার্যক্রমের উদ্যোগ দেখা যায়নি।
তবে কৃষি বিভাগ বলছে,কৃষকের জীবন বাঁচাতে জরুরি ভিত্তিতে মাঠ পর্যায়ে নিরাপদ আশ্রয়ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
ঝিনাইদহ সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নূর-এ-নবী বলেন,’খোলা মাঠে কাজ করা কৃষকরা বজ্রপাতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। তাই কৃষি জমির আশপাশে বজ্র নিরোধক শেল্টার ও বজ্র নিরোধক দণ্ড স্থাপন করা অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি কৃষকদের সচেতন করতে হবে-আকাশে কালো মেঘ বা বজ্রপাত শুরু হলে যেন দ্রুত নিরাপদ স্থানে চলে যান।
তিনি আরও বলেন,তালগাছ বজ্রপাত প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখে। সে কারণে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় জেলার বিভিন্ন স্থানে প্রায় ১ হাজার ৬শ’ তালবীজ রোপণ করা হয়েছিল। কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অনেক গাছ নষ্ট হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও সেই গাছের আর অস্তিত্বই নেই।’

এদিকে জেলা প্রশাসক নোমান হোসেন বলেন,’বজ্রপাত রোধে তালগাছ রোপণ কার্যক্রমকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির আওতায় দ্রুত তালগাছ রোপণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এছাড়া জেলা ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তার পদ শূন্য থাকায় কিছু প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হয়েছে। বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার জন্যও যোগাযোগ করা হয়েছে।’
ঢাকা/ইবিটাইমস/এসএস

জনপ্রিয়

লালমোহনে দুদকের উদ্যোগে বিতর্ক প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত

Address : Erlaaer Strasse 49/8/16 A-1230 Vienna,Austria. Mob : +43676848863279, 8801719316684 (BD) 8801911691101 ( Ads) Email : eurobanglatimes123@gmail.com
Translate »

মাঠে নেই আশ্রয়-বজ্র নিরোধক দণ্ড: ঝিনাইদহে বজ্রপাতে বাড়ছে কৃষকের মৃত্যু

আপডেটের সময় ০৪:৩০:০৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ২০ মে ২০২৬

শেখ ইমন, ঝিনাইদহ : আকাশে কালো মেঘ জমলেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে ঝিনাইদহের মাঠে-ঘাটে। হঠাৎ ঝলসে ওঠা বিদ্যুৎ আর বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে জনপদ। তারপরই আসে কান্নার খবর। কখনও পেঁয়াজ ক্ষেত থেকে,কখনও ধানের জমি থেকে,আবার কখনও গরু আনতে যাওয়া কৃষকের নিথর দেহ পড়ে থাকে মাঠের মাঝে। প্রতি বছরই বজ্রপাতে প্রাণ হারাচ্ছেন জেলার কৃষকরা। অথচ তাদের নিরাপত্তায় নেই কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা। নেই বজ্র নিরোধক দণ্ড,নেই জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র,এমনকি পরিকল্পিতভাবে তালগাছ রোপণের উদ্যোগও নেই। ফলে জীবিকার তাগিদে মৃত্যুঝুঁকি নিয়েই খোলা মাঠে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকরা।
কালবৈশাখী মৌসুমের শুরু থেকেই ঝিনাইদহে বাড়ে বজ্রপাত ও প্রাণহানির ঘটনা। চলতি বছর এখন পর্যন্ত জেলায় বজ্রপাতে মারা গেছেন ৫ জন এবং আহত হয়েছেন অন্তত ১৭ জন। এর আগে ২০২৫ সালে জেলায় বজ্রপাতে মৃত্যু হয়েছিল ৭ জনের। নিহতদের অধিকাংশই কৃষক বা মাঠে কাজ করা শ্রমজীবী মানুষ।
চলতি বছরের ২৮মার্চ জেলার শৈলকুপা উপজেলার খড়িবাড়িয়া গ্রামের বিস্তীর্ণ মাঠে ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে পেঁয়াজ গোছাতে গিয়ে বজ্রপাতে ঘটনাস্থলেই মারা যান দুই কৃষক। আহত হন আরও চারজন। পরদিন ২৯ মার্চ একই উপজেলায় বজ্রপাতে আহত হন আরও তিনজন। এরপর ১৬ এপ্রিল মহেশপুর উপজেলায় বজ্রপাতে প্রাণ হারান এক গৃহবধূ।
সবশেষ সোমবার (১৮ মে) বিকেলে সদরের মায়াধরপুর ও শৈলকুপা উপজেলার দামুকদিয়া গ্রামে বজ্রপাতে একজন কৃষক ও একজন গৃহবধূ প্রাণ হারান। মৃতরা হলেন-কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার নফরকান্দি গ্রামের দিনমজুর আসাদুল ইসলাম (৪০) ও শৈলকুপা উপজেলার দামুদকিয়া গ্রামের আনিসুর রহমানের স্ত্রী আন্না খাতুন (৪৫)। আসাদুল ইসলাম সদরের মায়াধরপুর গ্রামের মাসুদ রানার বাড়িতে দিনমজুর হিসেবে ধান কাটার কাজ করতে যায়।
জানা যায়, সদর উপজেলার মায়াধরপুর গ্রামের মাঠে কাজ করছিলেন দিনমজুর আসাদুল ইসলাম। বিকেলে ঝড়-বৃষ্টি শুরু হলে তিনি মাঠ থেকে বাড়ির দিকে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ বজ্রপাতে গুরুতর আহত হন তিনি। সেখান থেকে তাকে উদ্ধার করে ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষনা করে।
অপরদিকে বিকেলে ঝড় শুরু হলে শৈলকুপার দামুকদিয়া গ্রামের আনিসুর রহমানের স্ত্রী আন্না খাতুন বাড়ির পাশের একটি আম বাগানে আম কুড়াতে যায়। সেসময় বজ্রপাতে তার মৃত্যু হয়। এছাড়াও একইদিনে ঝিনাইদহ সদরের নারিকেলবাড়িয়া ও শৈলকুপার বিভিন্ন এলাকায় বজ্রপাতে নারীসহ আহত হয়েছে আরও ১০ জন।

স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রতিবছরই এমন দুর্ঘটনা ঘটছে। কিন্তু মৃত্যুর মিছিল থামাতে কার্যকর কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ে না।

খড়িবাড়িয়া গ্রামের কৃষক সুশীল বিশ্বাস। যিনি বজ্রপাতে নিহত সমীর বিশ্বাসের বাবা। ছেলের স্মৃতি মনে করে কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন,’সেদিন আকাশে মেঘ দেখে সবাই তাড়াহুড়া করে পেঁয়াজ তুলছিল। বৃষ্টি নামলে সব নষ্ট হয়ে যেত। হঠাৎ বিকট শব্দ হলো। পরে দেখি আমার ছেলে মাটিতে পড়ে আছে। ডাকাডাকিও করছিলাম,কোনো সাড়া দেয়নি। হাসপাতালে নেওয়ার আগেই সব শেষ। মাঠে যদি কোনো নিরাপদ আশ্রয়ের জায়গা থাকতো,তাহলে হয়তো আজ আমার ছেলে বেঁচে থাকতো।’

একই গ্রামের কৃষক আব্দুল জলিল বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। মাঠে না গেলে সংসার চলবে না। মেঘ জমলে ভয় লাগে,কিন্তু ফসল ফেলে চলে আসতেও পারি না। কারণ একদিনের বৃষ্টি মানেই কয়েক মাসের কষ্ট শেষ হয়ে যাওয়া। তাই জীবন হাতে নিয়েই কাজ করতে হয়।’
কৃষক রহিম উদ্দিনের কণ্ঠেও ছিল হতাশা। তিনি বলেন,প্রতিবছর মানুষ মারা যায়,তারপর কিছুদিন আলোচনা হয়,পরে সব চুপ। মাঠে যদি বজ্র নিরোধক শেল্টার থাকতো,তালগাছ থাকতো,তাহলে আমরা অন্তত আশ্রয় নিতে পারতাম। এখন তো খোলা আকাশের নিচেই থাকতে হয়।’

শুধু শৈলকুপা নয়,সদর,মহেশপুর,হরিণাকুন্ডু ও কালীগঞ্জ ও কোটচাঁদপুর উপজেলার বিভিন্ন মাঠেও একই চিত্র। কোথাও নেই বজ্রপাত প্রতিরোধে আধুনিক ব্যবস্থা। অনেক কৃষক জানান,বজ্রপাতের সময় কোথায় আশ্রয় নেবেন,সেটিও তারা জানেন না।

সচেতন নাগরিক সুজন বিপ্লব বলেন,’জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বজ্রপাতের তীব্রতা ও সংখ্যা বাড়লেও সে অনুযায়ী বাড়েনি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। বজ্রপাত এখন গ্রামাঞ্চলের নীরব দুর্যোগে পরিণত হয়েছে। বজ্রপাত এখন আর শুধু প্রাকৃতিক ঘটনা নয়,এটি বড় ধরনের জননিরাপত্তা সংকটে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে কৃষিনির্ভর এ জেলায় বজ্রপাত প্রতিরোধে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া প্রাণহানি কমানো সম্ভব নয়। এজন্য মাঠভিত্তিক বজ্র নিরোধক শেল্টার নির্মাণ,পর্যাপ্ত তালগাছ রোপণ,আধুনিক সতর্কীকরণ ব্যবস্থা চালু এবং কৃষকদের প্রশিক্ষণের ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন।

অভিযোগ রয়েছে,জেলা ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের পক্ষ থেকে বজ্রপাত নিরোধে কার্যকর কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়নি। ২০২৫ সাল এবং চলতি বছরেও জেলার কোথাও বজ্র নিরোধক দণ্ড স্থাপন,বজ্র নিরোধক শেল্টার নির্মাণ কিংবা বড় পরিসরে সচেতনতামূলক কার্যক্রমের উদ্যোগ দেখা যায়নি।
তবে কৃষি বিভাগ বলছে,কৃষকের জীবন বাঁচাতে জরুরি ভিত্তিতে মাঠ পর্যায়ে নিরাপদ আশ্রয়ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
ঝিনাইদহ সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নূর-এ-নবী বলেন,’খোলা মাঠে কাজ করা কৃষকরা বজ্রপাতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। তাই কৃষি জমির আশপাশে বজ্র নিরোধক শেল্টার ও বজ্র নিরোধক দণ্ড স্থাপন করা অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি কৃষকদের সচেতন করতে হবে-আকাশে কালো মেঘ বা বজ্রপাত শুরু হলে যেন দ্রুত নিরাপদ স্থানে চলে যান।
তিনি আরও বলেন,তালগাছ বজ্রপাত প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখে। সে কারণে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় জেলার বিভিন্ন স্থানে প্রায় ১ হাজার ৬শ’ তালবীজ রোপণ করা হয়েছিল। কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অনেক গাছ নষ্ট হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও সেই গাছের আর অস্তিত্বই নেই।’

এদিকে জেলা প্রশাসক নোমান হোসেন বলেন,’বজ্রপাত রোধে তালগাছ রোপণ কার্যক্রমকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির আওতায় দ্রুত তালগাছ রোপণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এছাড়া জেলা ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তার পদ শূন্য থাকায় কিছু প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হয়েছে। বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার জন্যও যোগাযোগ করা হয়েছে।’
ঢাকা/ইবিটাইমস/এসএস