বিশ্বকাপ ফুটবল শুরুর আগের দিন ফিফার প্রেসিডেন্ট জিয়ানি ইনফান্তিনো স্বাগতিক দেশ কাতারের মানবাধিকার রেকর্ড নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর সমালোচনাকে ভণ্ডামি বলে অভিযোগ করেছেন
আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ শনিবার (১৯ নভেম্বর) কাতারের রাজধানী দোহায় ২২ তম ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২২ শুরুর একদিন পূর্বে ফিফা কর্তৃক আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে উপরোক্ত মন্তব্য করেন ফিফার বর্তমান প্রেসিডেন্ট বা সভাপতি সুইজারল্যান্ডে জন্ম নেওয়া জিয়ানি ইনফান্তিনো।
দোহাই থেকে বিবিসি,আল জাজিরা সহ অন্যান্য সংবাদ মাধ্যম জানায়,প্রায় ঘণ্টা খানেক একনাগাড়ে দেয়া এক বক্তৃতায় মি. ইনফান্তিনো বলেছেন নৈতিকতা নিয়ে কাতারকে উপদেশ দেবার আগে ইউরোপের দেশগুলোর উচিত তারা অতীতে যা করেছে তার জন্য ক্ষমা চাওয়া।
ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ানি ইনফান্তিনো নজিরবিহীনভাবে একটানা প্রায় এক ঘণ্টা ধরে একাই কথা বলেন এবং কাতার ও এই টুর্নামেন্টের পক্ষ সমর্থন করে আবেগপূর্ণ মন্তব্য করেন। কাতারে ফিফার বিশ্বকাপ শুরু হবার আগে দেশটিতে অভিবাসী শ্রমিকদের মৃত্যু এবং এলজিবিটি সম্প্রদায়ের মানুষদের প্রতি দেশটির আচরণের বিষয়গুলো নিয়ে যেভাবে সমালোচনার ঝড় উঠেছে, তা আসল টুর্নামেন্টকে অনেকটাই ম্লান করে দিয়েছে বলে জানান তিনি।
ইনফান্তিনো আরও বলেন, কাতারে অভিবাসী শ্রমিকদের বিষয় নিয়ে কথা বলার আগে ইউরোপের দেশগুলোর উচিত তাদের অতীত ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকানো এবং তারা যা করেছে তার জন্য দুঃখপ্রকাশ করা।
তিনি বলেন, “আমিও ইউরোপীয়। আমরা তিন হাজার বছর ধরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যা করেছি, নৈতিক শিক্ষা দেবার আগে আমাদের উচিত আগামী তিন হাজার বছর ধরে তার জন্য দুঃখ প্রকাশ করা।”
বিশ্বকাপ ফুটবলের উন্মাদনায় মেতে উঠছে সারা বিশ্ব৷ কাতারের এ আয়োজন উৎসবের আমেজ ছড়িয়েছে কোটি মানুষের মাঝে৷ তবে ফুটবলের সবচেয়ে বড় এই আসরের এবারের আয়োজনের পেছনে রয়েছে কালো এক অধ্যায়৷ আয়োজনের প্রস্তুতি পর্যায়ে ঘটেছে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও হাজারো প্রবাসী শ্রমিকের প্রাণহানির ঘটনা ৷
২০১০ সালে বিশ্বকাপের আয়োজক হওয়ার পর থেকে খনিজ তেলসমৃদ্ধ দেশটি শুরু করে ব্যাপক প্রস্তুতি৷ নতুন অবকাঠামো তৈরির অংশ হিসেবে সুবিশাল স্টেডিয়াম, নুতন বিমানবন্দর, অতিথিশালা ইত্যাদির জন্য কাতার বিপুল সংখ্যক বিদেশি শ্রমিক নিয়োগ করে৷
বড় সব প্রকল্পের নির্মাণ কাজ সময়মতো শেষ করার জন্য মরিয়া কাতার অপেক্ষাকৃত সস্তা মজুরির অভিবাসী শ্রমিকদের উপর নির্ভর করলেও তাদের কাজ ও আবাসনের পরিবেশের দিকে নজর দেয়নি৷ ফলে ঘটেছে বহু শ্রমিকের অকাল মৃত্যু৷
কতজন মারা গেছে? বিভিন্ন নির্মাণ প্রকল্পের জন্য কাতার ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, নেপাল এবং শ্রীলঙ্কার শ্রমিকদের নিয়োজিত করে৷ এসব দেশেরর শ্রমিকরা বেশি মারা গেছে৷ মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা জানা যায়নি৷ তবে সংখ্যাটি বেশ বড়৷ বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, গত ১২ বছরে সাড়ে ৬ হাজার থেকে ১৫ হাজার অভিবাসী শ্রমিকের মৃত্যু ঘটেছে দেশটিতে।
মৃত্যুবরণকারীদের অধিকাংশই বয়সে তরুণ শ্রমিক ছিলেন বলে জানা গেছে। তাদের মধ্যে ১ হাজার ১৮ জন বাংলাদেশি শ্রমিকও প্রাণ হারিয়েছেন বলে জানা গেছে৷ ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদন বলছে, গত ১০ বছরে ৬,৭৫১ জন শ্রমিক মৃত্যুবরণ করে৷ তবে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের হিসাবে এই সংখ্যা দিগুণেরও বেশি৷ কাতারের অফিশিয়াল সুত্র থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এই মানবাধিকার সংস্থা বলছে, ১৫,০০০ প্রবাসী শ্রমিকের মৃত্যু ঘটেছে গত এক দশকে৷
বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার সরকারি পরিসংখ্যানের বরাত দিয়ে গার্ডিয়ান বলছে, ২০১০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ভারতের ২,৭১১ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে৷ অন্যদিকে বাংলাদেশের ১,০১৮ শ্রমিক, নেপালের ১,৬৪১, পাকিস্তানের ৮২৪ এবং শ্রীলংকার ৫৫৭ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে এই সময়ে৷
কাতারে জনশক্তির অপর দুই বৃহৎ উৎস হলো ফিলিপাইন্স ও কেনিয়া৷ দেশ দুটি থেকে যাওয়া শ্রমিকদের মধ্যে যারা মারা গেছেন, তাদের সংখ্যা যুক্ত করলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়বে৷ এছাড়া গত এক বছরে যারা মারা গেছেন তাদের সংখাও জানা সম্ভব হয়নি৷ ফলে প্রকৃতপক্ষে এ পর্যন্ত কতজন প্রবাসী শ্রমিক কাতারে মৃত্যুবরণ করেছেন তা সঠিকভাবে জানা সম্ভব নয়৷
বিধ্বস্ত পরিবারের অগণিত গল্প: প্রবাসী হিসেবে যারা কাজ করতে যায় তারা সাধারণত গরিব পরিবারের সন্তান৷ অধিকাংশ পিতা-মাতা তাদের সন্তানদের বিদেশে পাঠাতে ঋণ বা কর্জ করতেও দ্বিধা করে না৷ কেননা, তারা জানেন যে, তাদের সন্তান বিদেশ গিয়ে টাকা উপার্জন করে পাঠাবে৷ এতে করে ঋণ শোধ হবে আর পরিবারও আর্থিকভাবে উপকৃত হবে৷
কাতারে মারা যাওয়া সুজনের পরিবারের দুঃখ গাথা কিন্তু কাজ করতে গিয়ে যদি তাদের সন্তান মারা যায় তবে তাদের বড় ধরনের বিপদের মুখোমুখি হতে হয়৷ কাতারে মৃত্যুবরণ করা প্রতিটি পরিবারের ক্ষেত্রেই এমনটি ঘটেছে৷ পরিবারের প্রধান উপার্জনকারীকে হারিয়ে তাদের অনেকেই দিশেহারা ৷
এদের মধ্যে আছে বাংলাদেশের ২৯ বছর বয়সি মোঃ শহিদ মিয়া৷ ২০১৭ সালে কাতারে কাজ করতে যাওয়ার জন্য প্রায় চার লাখ টাকা খরচ করতে হয়েছিল তার পরিবারকে৷ এ জন্য টাকা ধার করতে হয়৷ তার অকাল মৃত্যু তার পরিবারকে বিপদে ফেলে দিয়েছে৷ এই অর্থের বোঝা এখন তার বাবা-মাকে বহন করতে হবে৷ কাতার থেকেও মেলেনি ক্ষতিপূরণ৷
স্বাভাবিক মৃত্যু? কিন্তু এসব মৃত্যুকে স্বাভাবিক মৃত্যু বলে দাবি করেছে বিশ্বকাপ আয়োজক দেশটি আর তা নিয়েও রয়েছে সমালোচনা৷ গার্ডিয়ানের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালের যতজন মারা গেছেন, তাদের শতকরা ৬৯ ভাগের স্বাভাবিক মৃত্যু ও ১২ ভাগের মৃত্যু সড়ক দুর্ঘটনায়৷ শুধু ৭ ভাগের মৃত্যুর সঙ্গে কাজের পরিবেশ জড়িত৷ আর ৭ ভাগ কর্মী করেছেন আত্মহত্যা৷
তবে বেশিরভাগ মৃত্যুর ক্ষেত্রেই মরদেহের ময়নাতদন্ত করা হয়নি৷ আবার দেশটি এত বড় সংখ্যক শ্রমিকের মৃত্যুর ব্যাপারে কোনো ধরনের অনুসন্ধান করেনি৷ ফলে মৃত্যুর আসল কারণ চাপা পড়ে যায়৷ এদিকে শ্রমিকদের মৃত্যুর ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর আহ্বানকেও এড়িয়ে গেছে কাতার৷ বর্তমানে কাতারে প্রায় ২০ লক্ষ প্রবাসী শ্রমিক কাজ করে ৷
কবির আহমেদ/ইবিটাইমস