ভিয়েনা ০৭:৩৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৮ মে ২০২৬, ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম :
এনইসি সভায় সভাপতিত্ব করছেন প্রধানমন্ত্রী মাভাবিপ্রবিতে জাতীয় হাইস্কুল প্রোগ্রামিং ও কুইজ প্রতিযোগিতা-২০২৬ অনুষ্ঠিত পদত্যাগের পথে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এমপি আমির হামজাকে আদালতে হাজিরে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তির নির্দেশ হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল নিয়ে তেহরানের সঙ্গে ইউরোপের আলোচনা বাংলাদেশ থেকে ৬ হাজার ড্রাইভার নেবে দুবাই সাবেক প্রতিমন্ত্রী মিজানুর রহমান সিনহার জানাজায় প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণ বাংলাদেশ-অ্যাঙ্গোলা জ্বালানি সহযোগিতা আলোচনা শুরু চাঁদপুরে বিশ্ব খাল পুনঃখনন কর্মসূচির উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী ঝিনাইদহে নব-গঠিত কমিটি থেকে ছাত্রদলের ৩ নেতার পদত্যাগ

ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ

  • EuroBanglaTimes
  • আপডেটের সময় ০৩:০০:৫২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩ মার্চ ২০২২
  • ৪৯ সময় দেখুন

৭ম পর্ব 

 ড. মোঃ ফজলুর রহমানঃ ৬১। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে, প্রাচীন সভ্যতার তীর্থস্থান এথেন্সের সুবক্তা এবং রাষ্ট্রনায়ক Pericles (C. 499-429 B.C) খ্রিষ্টপূর্ব ৪৩১ অব্দে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দিয়েছেন। সেই ঐতিহাসিক ভাষণ থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন গুণীজনদের পাশাপাশি বিগত ১৯৮৭ সনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট Ronald Regan জার্মানির বার্লিন ওয়ালের সম্মুখে দাঁড়িয়ে একটি সুবিখ্যাত ভাষণ দিয়েছেন। এই সুদীর্ঘ সময়কালের মধ্যে সারা বিশ্বের প্রথিতযশা যে সমস্ত গুণীজনেরা কালোত্তীর্ণ এবং মর্যাদাপূর্ণ যে সমস্ত ভাষণ দিয়েছেন, তন্মধ্যে বিশ্ব ইতিহাসে সবচেয়ে প্রভাব বিস্তারকারী এবং আলোড়ন সৃষ্টিকারী বরেণ্য ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ এবং মর্যাদাপূর্ণ ভাষণসমূহের মধ্য থেকে মোট ৪১ জন সামরিক-বেসামরিক জাতীয় বীরদের বিখ্যাত ভাষণ নিয়ে এই সংকলনটি প্রকাশ করা হয়েছে। এই সংকলনটি ইতিমধ্যেই দেশে-বিদেশে বিপুলভাবে সমাদৃত হয়েছে এবং সুধীজনদের প্রশংসা অর্জন করেছে।

৬২। দেশের সুশিক্ষিত এবং সচেতন ব্যক্তিগণ অবশ্যই জানেন জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা UNESCO বিগত ২০১৭ ইং সনের ৩০শে অক্টোবর প্যারিসে অনুষ্ঠিত তাদের দ্বিবার্ষিক সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণকে
“বিশ্ব ঐতিহ্য দলিল” হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। এরই পোষকতায় এই ভাষণকে উক্ত সংস্থা তাদের Memory of the International World Register -এ অন্তর্ভুক্ত করেছে। ১৫ জন সদস্য বিশিষ্ট একটি আন্তর্জাতিক উপদেষ্টা তথা বিশেষজ্ঞ কমিটি কর্তৃক দু’ বছর ধরে প্রামাণ্য দালিলিক বিষয়বস্তু সমূহ যাচাই-বাছাই শেষে UNESCO-এর মহাপরিচালকের সম্মতিক্রমে এটি সংস্থার নির্বাহী কমিটি কর্তৃক চূড়ান্তভাবে গৃহীত হয়। বিগত ১৯৭১ সনের ৭ই মার্চের সুদীর্ঘ ৪৬ বছরের ও বেশি সময় পরে জাতিসংঘের মতো বিশ্ব সংস্থার এহেন সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। বাঙালি জাতি হিসেবে আমাদের জন্য এটি অত্যন্ত আনন্দের বিষয় এবং বিরল সম্মানজনক ঘটনা বলে দেশের আপামর জনসাধারণ মনে করেন। এরই পাশাপাশি দেশবাসী নিশ্চয়ই অনুধাবন করতে পারবেন যে, স্বাধীনতা বিরোধী অপশক্তি সমূহ এবং প্রচণ্ড রকমের মুজিব বিদ্বেষী যে সমস্ত খলনায়কগণ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রচার নিষিদ্ধ করেছিলেন এবং এই ভাষণটিকে বিনষ্ট করে ফেলার জন্য প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালিয়েছেন তাদের মুখে ছাই দিয়ে ইতিহাসের অমোঘ প্রয়োজনেই এই ভাষণ মহাকালের ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে।

৬৩। ইতিহাসের আলোকে দেখা যায় যে, জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর বিগত ১৯৪৮ সনের ১০ই ডিসেম্বর বিশ্ব মানবাধিকারের ঘোষণাপত্র প্রণয়ন করা হয়। উপরোক্ত ঘোষণাপত্রের ভাষ্য মোতাবেক ঔপনিবেশবাদ, বর্ণবৈষম্যবাদ এবং জাতিগত নিপীড়ন সহ পৃথিবীর যে কোন স্থানে যে কোন জাতি এবং জনগোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রণের নীতি গৃহীত হয় এবং স্বীকৃত হয়। একথা সর্বজনবিদিত যে, পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকেই দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি জনগোষ্ঠী রাষ্ট্রের প্রতিটি ক্ষেত্রেই শোষণ, বঞ্চনা, নির্যাতন, নিপীড়ন এবং চরম বৈষম্যের শিকার হয়েছে। তাই বিজাতীয় পাকিস্তানী শাসকবর্গের ঔপনিবেশিক মনোভাবাপন্ন অভ্যন্ত্যরীণ শাসন-শোষণ, নিগ্রহ এবং নিপীড়ন থেকে বাঙালি জাতির সার্বিক মুক্তির লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধুর আন্দোলন ও সংগ্রাম ছিল
উপরোল্লিখিত নীতির সহিত পুরোপুরিভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং সঙ্গতিপূর্ণ। তদুপরি পাকিস্তানী স্বৈরাচারী শাসকবর্গের অপরিণামদর্শী মনোভাব এবং হঠকারী সিদ্ধান্ত এবং তৎপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন কার্যক্রম সমূহের কারণে ১৯৭১ সনের ৭ই মার্চ বাঙালিদের মনোভাব ছিল প্রচণ্ড রকমের বিক্ষুব্ধ, অপ্রতিরোধ্য এবং বিস্ফোরণোন্মুখ।

৬৪। হাজার বছর ধরে উপেক্ষিত, অবহেলিত এবং অধিকার বঞ্চিত বাঙালি জাতির এহেন ক্ষুব্ধ এবং বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা বুকে ধারণ করে দেশের টালমাটাল এবং বিস্ফোরণোন্মুখ পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়িয়েই বঙ্গবন্ধু তাঁর ৭ই মার্চের ভাষণ প্রদান
করেন। দেশে ঐদিন সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা করার মতো অবস্থা বিরাজমান থাকা সত্ত্বেও তিনি তা করেননি। বরং অধিকার বঞ্চিত বাঙালি জাতির অধিকার আদায়ের জন্য তথা শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য পাকিস্তানের সামরিক জান্তাকে পথ
বাতলে দেন। এরই পাশাপাশি যে কোন ধরনের সংঘাত কিংবা সহিংসতার পথ পরিহার করে নিরাপদ সড়ক দিয়ে পিছনে ফিরে আসার জন্য আইনানুগ পথ এবং উপায় ও তিনি বলে দেন। পাকিস্তানী শাসকবর্গ তা করতে ব্যর্থ হলে তাদের বিরুদ্ধে খুবই ধীর-স্থির কিন্তু অত্যন্ত বলিষ্ঠ, প্রাণবন্ত এবং তেজোদীপ্ত ভাষায় সর্বাত্মক প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য তিনি আহবান জানান। দুঃখজনক হলেও সত্য যে পাকিস্তানের তৎকালীন সামরিক জান্তা বঙ্গবন্ধু কর্তৃক প্রদর্শিত উপরোক্ত পথে অগ্রসর হননি। তদস্থলে তারা বিভিন্ন ধরনের কূটচাল, দুরভিসন্ধি এবং অস্ত্রের ভাষায় বাঙালি জাতিকে অবদমন করার পথ বেছে নিয়েছেন।

৬৫। দেশবাসী নিশ্চয়ই জানেন বিগত ১৯৭১ সনে অবিভক্ত পাকিস্তানে মোট জনসংখ্যার ৫৬% ছিল বাঙালি। এই বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সবারই ভাষা ছিল বাংলা। পক্ষান্তরে বাদবাকি ৪৪% জনগণ ছিলেন তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের অধিবাসী। বাঙালিদের শিক্ষা- সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও কৃষ্টি এবং মূল্যবোধ পশ্চিম পাকিস্তানীদের চেয়ে সম্পূর্ণ রকমের আলাদা এবং ভিন্ন প্রকৃতির ছিল। তাই দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীকে সংখ্যালঘিষ্ঠ জনসাধারণ থেকে বিচ্ছিন্ন করার কোন অভিপ্রায় কিংবা কোন চিন্তা চেতনা অথবা এরকম কোন প্রচেষ্টাই বঙ্গবন্ধুর ছিল না। তদুপরি বঙ্গবন্ধু ছিলেন অত্যন্ত প্রাজ্ঞ, বিচক্ষণ এবং দূরদৃষ্টিসম্পন্ন রাজনীতিক। এছাড়া ১৯৭১ সনের বাস্তবতায় এবং ঐ সময়ে মার্কিন সোভিয়েত পরাশক্তিসমূহের দ্বন্দ্ব এবং প্রভাব বলয়ের রাজনীতির প্রেক্ষিতে স্নায়ুযুদ্ধকালীন বিশ্ব রাজনীতির গতিধারা তথা মেরুকরণ সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু সম্পূর্ণভাবে ওয়াকিবহাল ছিলেন। উপরন্তু দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে দেশের অভ্যন্তরে কিংবা বহির্বিশ্বে তাঁকে যেন কেউ বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতার অপবাদ দিতে না পারে সে ব্যাপারে তিনি খুবই সাবধান এবং সতর্ক ছিলেন। তাঁর কোন রকম অসতর্কতার কারণে অনভিপ্রেত এবং অপ্রীতিকর কিছু ঘটে গেলে তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন অনেকটা অসম্ভব হয়ে পড়তো কিংবা অনেক পিছিয়ে যেত।

৬৬। সারা জীবন ধরে রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রাম করে অভ্যস্ত এবং দীর্ঘদিন কারা নির্যাতন ভোগকারী একজন আপাদমস্তক জাতীয়তাবাদী নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধু খুব ভালভাবেই জানতেন যে, বিগত ১৯৬৭ – ১৯৭০ সনে নাইজেরিয়ার “বিয়াফ্রা” (Biafra) বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন বৃহৎ শক্তিবর্গের সহায়তায় অত্যন্ত কঠোরভাবে দমন করা হয়েছিল। এহেন নিষ্ঠুর দমন পীড়নের বিরুদ্ধে বিশ্বের কোন দেশই জোরালোভাবে কোন নিন্দা করেনি কিংবা সোচ্চারভাবে কোন প্রতিবাদ ও করেনি। এমনকি আন্দোলনকারীদের প্রতি কেউ কোনভাবে কোন সমর্থন ও ব্যক্ত করেননি। তাই বঙ্গবন্ধু সে পথে অর্থাৎ Unilateral Declaration of Independence (UDI) -এর পথে পা বাড়াননি। আর ঠিক একারণেই তিনি কৌশলের আশ্রয় নিয়েছেন। এহেন কৌশলের অংশ হিসেবে নিজের জীবনের নিরাপত্তার কথা চিন্তা না করে তিনি নিজে এবং তাঁর দেশবাসী আক্রান্ত হয়ে পাকিস্তানকে বর্বর
আক্রমণকারী হিসেবে চিহ্নিত এবং প্রতিপন্ন করতে সক্ষম হয়েছেন। এরই পাশাপাশি পাকিস্তানী শাসকবর্গ যে আদৌ গণতান্ত্রিক মনোভাবাপন্ন কিংবা নিয়মতান্ত্রিক মূল্যবোধ সম্পন্ন ছিলেন না বঙ্গবন্ধু তাঁর রাষ্ট্রনায়কোচিত প্রজ্ঞা দ্বারা তিনি তা বিশ্ববাসীকে দেখিয়ে দিয়েছেন।

৬৭। বঙ্গবন্ধু অবিভক্ত পাকিস্তানের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর ব্যাপক সমর্থনপুষ্ট এবং ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত অবিসংবাদিত নেতা হওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তানী সেনাবাহিনী আক্রমণ করার পূর্বেই তিনি একতরফাভাবে দেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করলে পাকিস্তানী
শাসকবর্গ তাঁকে বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে অভিযুক্ত করার প্রচেষ্টা চালাতো। এহেন অবস্থায় আমাদের স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তি ও বৈরী রাষ্ট্র সমূহের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আইন এবং বিশ্ব জনমত ও আমাদের বিপক্ষে চলে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ক্ষুরধার বুদ্ধিমত্তা এবং মেধাবী কৌশলের মাধ্যমে ক্রোধান্ধ ইয়াহিয়া-ভুট্টোদের সে কূটচাল সফল হয়নি। আর ঠিক এভাবেই নিজের জীবন বিপন্ন করে এবং নিরাপত্তার কথা চিন্তা না করে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং সুদূরপ্রসারী কৌশলের মাধ্যমে তিনি বিশ্ববাসীকে দেখিয়ে দিয়েছেন যে, হানাদার পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর পরিকল্পিত এবং বর্বর আক্রমণের পরিপ্রেক্ষিতে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে স্বাধীনতা ঘোষণা করা ছাড়া তাঁর সামনে আর কোন বিকল্প ছিলনা। বঙ্গবন্ধুর এহেন প্রখর দূরদৃষ্টিসম্পন্ন কৌশল এবং তুখোড় বুদ্ধিমত্তার কাছে পরাভূত হয়েছে পাকিস্তানের অবিমৃষ্যকারী শাসকবর্গ। এমতাবস্থায় বঙ্গবন্ধুকে বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে প্রমাণ করতে গিয়ে অপরিণামদর্শী পাকিস্তানী শাসকবর্গ নিজেরাই তাদের নিজেদের ফাঁদে আটকে গিয়েছেন। ফলে পাকিস্তান ভাঙ্গার দায়দায়িত্ব অবধারিতভাবে তাদের উপরই নিপতিত হয়েছে।

৬৮। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সামগ্রিক দিকনির্দেশনার এক অনন্য এবং অসাধারণ দলিল। এই ভাষণ বহুমাত্রিকতায় ভরপুর এবং বিভিন্ন ধরনের বৈশিষ্ট্যমণ্ডতায় পরিপূর্ণ। এই জ্বালাময়ী ভাষণ আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে প্রবলভাবে
আলোড়িত করেছে এবং পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমাদের বিজয়কে অবশ্যম্ভাবী করে তুলেছে। এই হৃদয়গ্রাহী ভাষণের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর অতুলনীয় ব্যক্তিত্ব, অনমনীয় বাগ্মিতা এবং তাঁর পাণ্ডিত্যপূর্ণ বক্তব্যের অসাধারণ নান্দনিক শৌর্য ও সৌন্দর্য উদ্ভাসিত হয়েছে। এই ভাষণে বঙ্গবন্ধু গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে সমুন্নত রাখার পাশাপাশি অন্যদের ন্যায়সঙ্গত মতামতকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করার নিমিত্তে প্রতিশ্রুতি ও ব্যক্ত করেছেন। এছাড়া তিনি নৈতিকতা এবং মানবতাকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার মাধ্যমে অসাম্প্রদায়িক চিন্তাচেতনা ও মূল্যবোধকে সবার উপরে স্থান দেয়ার জন্য উদাত্ত আহবান জানিয়েছেন। এমনকি তিনি নিজে সারা জীবন ধরে গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন সংগ্রাম করে যাওয়া সত্ত্বেও বিপ্লবী সমর কুশলীদের মতো গেরিলাযুদ্ধের সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনাও প্রদান করেছেন। উপরোল্লিখিত নান্দনিক এবং মহাকাব্যিক বক্তব্যসমূহের কারণেই জাতিসংঘ এই ভাষণকে বিশ্ব ঐতিহ্য সম্পদ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেছে।

৬৯। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, আমেরিকার অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং ষোড়শ প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন বিগত ১৮৬৩ সালের ১৯শে নভেম্বর পেনসিলভানিয়া অঙ্গরাজ্যের গেটিসবার্গে তার বিখ্যাত ভাষণ দিয়েছেন। এই ভাষণের স্থায়িত্বকাল ছিল মাত্র ৩ (তিন) মিনিটের ও কম। এই ভাষণের শব্দ সংখ্যা ছিল ২৭২। উপরন্তু এই ভাষণ হোয়াইট হাউজ থেকে লিখে আনা হয়েছিল। তদুপরি এই ভাষণ প্রদানের দিন লিংকন মূল বক্তা ছিলেন না। আমেরিকার গৃহযুদ্ধে নিহত ইউনিয়নপন্থী সৈনিকদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিসৌধের ফলক উন্মোচন অনুষ্ঠানে ঐদিন মূল বক্তা ছিলেন সিনেটর এডওয়ার্ড এভারেট। এভারেটের দুই ঘণ্টা ব্যাপী বক্তৃতার পর লিংকন তার উপরোক্ত সংক্ষিপ্ত বক্তৃতা প্রদান করেন। গুরুত্ব এবং তাৎপর্যের দিক দিয়ে তার উপরোক্ত ভাষণ যুগান্তকারী হলেও আকৃতি এবং প্রকৃতির দিক দিয়ে খুবই সংক্ষিপ্ত বটে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বিগত ১৮৬৫ সালের ১৪ই এপ্রিল জন উইকস্‌ বোথ নামের এক রাজনৈতিক কর্মীর গুলিতে নিহত হন ইতিহাসের এই অমর বক্তা।

৭০। গ্রেট ব্রিটেনের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী চেম্বারলিন ব্যর্থতার দায়ে পদত্যাগের পর বিগত ১৯৪০ সনের ১০ই মে উইনস্টন চার্চিল কোয়ালিশন সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। দুই আঙ্গুল উঁচিয়ে “ভি” বা বিজয় চিহ্ন দেখিয়ে সারা বিশ্বে ব্যাপকভাবে সাড়া জাগানো এই প্রধানমন্ত্রী ব্রিটিশ কমন্স সভায় একই বিষয়ে বিগত ১৯৪০ সনের ১৩ই মে থেকে ১৮ই জুন পর্যন্ত মোট ৪ (চার) টি ভাষণ দেন। উপরোক্ত ভাষণগুলির ধারাবাহিকতায় ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বিগত ১৯৪০ সনের ৪ঠা জুন ইংল্যান্ডের পার্লামেন্টে উইনস্টন চার্চিল যে উৎসাহব্যঞ্জক এবং উদ্দীপনামূলক ভাষণ দিয়েছেন সেটিই তার সুবিখ্যাত ভাষণ হিসেবে বিশ্বব্যাপী সুখ্যাতি অর্জন করেছে। এই ভাষণের স্থায়িত্বকাল ছিল মাত্র ৭ (সাত) মিনিট। তদুপরি এই ভাষণ ও ছিল দীর্ঘদিনের গবেষণালব্ধ একটি লিখিত ভাষণ। একথা সর্বজনস্বীকৃত যে তার এই জ্বালাময়ী ভাষণের মাধ্যমে ব্রিটিশ জাতি দারুণভাবে উজ্জীবিত হয়েছে এবং অনুপ্রাণিত হয়েছে।

৭১। সুমহান আব্রাহাম লিংকনের উপরোক্ত ভাষণের প্রায় ১০০ বছর পর বিগত ১৯৬৩ সালের ২৮শে আগস্ট আমেরিকার বর্ণবাদ বিরোধী জনপ্রিয় কৃষ্ণাঙ্গ নেতা মার্টিন লুথার কিং “I have a dream” শিরোনামে একটি সুবিখ্যাত ভাষণ দিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। এই ভাষণের স্থায়িত্বকাল ছিল ১৭ (সতের) মিনিট। এই ভাষণের শব্দ সংখ্যা ছিল ১৬৬৭। এই ভাষণ প্রদানের দিনের অনুষ্ঠানে মার্টিন লুথার কিং কোন একক বক্তা ছিলেন না। তিনি ঐদিনের অনুষ্ঠানের অনেক বক্তার মধ্যে একজন ছিলেন। কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকানদের সম অধিকার নিয়ে আন্দোলনকারী আরও ২০ (বিশ) টি সংগঠনের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে মার্টিন তার বক্তৃতা শেষ করেন। তার এই ভাষণটিও সুলিখিত, সুপরিকল্পিত এবং দীর্ঘদিনের গবেষণালব্ধ ভাষণ ছিল বটে। এই ভাষণের শেষের দিকে বিশিষ্ট সঙ্গীত শিল্পী মাহালিয়া জ্যাকসনের অনুরোধে বক্তৃতা বাড়িয়ে আমেরিকাকে নিয়ে মার্টিন লুথার কিং তার স্বপ্নের কথা ব্যক্ত করেন। বিগত ১৯৬৮ সালের ৪ঠা এপ্রিল সন্ধ্যা ০৬-০১ মিনিটে জেমসং আর্ল রে -নামক এক আততায়ীর গুলিতে প্রাণ হারান এই কৃষ্ণাঙ্গ মহানায়ক।

৭৫। পক্ষান্তরে একথা সর্বজনবিদিত যে, স্বাধীনতার উত্তাল তরঙ্গে দোদুল্যমান, বিজাতীয় পাকিস্তানী স্বৈরশাসক এবং তাদের তাবেদার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে মরণপণ লড়াইয়ের জন্য উন্মুখ ১০ (দশ) লক্ষাধিক নরনারীর সামনে দাঁড়িয়ে বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত এবং অকুতোভয় নেতা বঙ্গবন্ধুর তাৎক্ষণিক, অলিখিত এবং স্বতঃস্ফূর্ত ভাষণটির স্থায়িত্বকাল ছিল প্রায় ১৯ (ঊনিশ) মিনিট। ৭ই মার্চ বিকাল ৩-২৩ মিনিটে তিনি তাঁর ভাষণ শুরু করেন এবং শেষ করেন ৩-৪২ মিনিটে। এই ভাষণের শব্দ সংখ্যা ছিল ১৩০৮। এই দিন অন্যান্য নেতৃবৃন্দ মঞ্চে উপবিষ্ট থাকলেও বঙ্গবন্ধু ছিলেন একক বক্তা। তদুপরি স্বীকৃত মতেই এটি ছিল একটি পূর্ব প্রস্তুতিহীন (Extemporary) ভাষণ। উপরন্তু পুরো ভাষণটিই ছিল দীর্ঘদিন ধরে অধিকার বঞ্চিত একটি জাতিকে স্বাধীনতার দাবিতে জাগিয়ে তোলার নিমিত্তে সম্পূর্ণভাবে স্বতঃস্ফূর্ত (Spontaneous) একটি জ্বালাময়ী ভাষণ। তাই উপরোল্লিখিত মহান এবং প্রাতঃস্মরণীয় নেতৃবৃন্দের সহিত তুলনামূলক বিচারে বঙ্গবন্ধুর উপরোক্ত ভাষণ যে কোন বিবেচনাতেই অনেক বেশি অনবদ্য এবং অনন্য সাধারণ ভাষণ বটে।

৭৩। পাকিস্তানী সামরিক জান্তা সম্পূর্ণ পরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন ধরনের উস্কানি, হত্যা, রক্তপাত এবং অবাঙালি বিহারীদেরকে দিয়ে বিভিন্ন স্থানে দাঙ্গা হাঙ্গামা সৃষ্টি করা সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধু পূর্বাপর অহিংস এবং শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার নিমিত্তে
পরামর্শ দিয়েছেন। পরিকল্পিত হিংসা-বিদ্বেষের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি কোন সহিংসতার পথে পা বাড়াননি। কোন আক্রমণ কিংবা হামলাকে প্রতিরোধ অথবা প্রতিহত করার জন্য কোন তাগিদ ও দেননি। প্রতিশোধ স্পৃহা চরিতার্থ করার কথাও কখনো বলেননি। অর্থাৎ কারও কোন ব্যক্তিগত ক্ষোভের বশবর্তী হয়ে কোন হঠকারী সিদ্ধান্ত ও তিনি গ্রহণ করেননি। উপরন্তু দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিকল্পিতভাবে দাঙ্গা হাঙ্গামা সৃষ্টি করা সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধু অহিংস এবং শান্তিপূর্ণ আন্দোলন থেকে এক চুল ও সরে আসেননি। এ
প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু তাঁর উপরোক্ত ঐতিহাসিক ভাষণের শেষ দিকে বলেন- “… শুনুন, মনে রাখবেন শত্রুবাহিনী ঢুকেছে। নিজেদের মধ্যে আত্মকলহ সৃষ্টি করবে, লুটতরাজ করবে। এই বাংলায় হিন্দু-মুসলমান, বাঙালি-অবাঙালি যারা আছে তারা আমাদের ভাই। তাদেরকে রক্ষা করার দায়িত্ব আপনাদের উপর। আমাদের যেন বদনাম না হয়…।” দেশের অভ্যন্তরে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার জন্য এবং আঞ্চলিক ও জাতিগত বিরোধ, বিদ্বেষ এবং সংঘাত পরিহার করার নিমিত্তে বঙ্গবন্ধু কতটা সচেতন, আন্তরিক, অমায়িক ও মানবিক ছিলেন তা তাঁর উপরোক্ত বক্তব্য থেকেই পরিলক্ষিত হয়।

৭৪। পাকিস্তান সরকারের সিদ্ধান্ত এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী ২৫শে মার্চের কালরাত্রিতে Operation Search Light শুরু করা হবে বলে বঙ্গবন্ধু আগেই সংবাদ পেয়েছিলেন। তাই ঐ বিভীষিকাময় কালরাত্রিতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী কর্তৃক বর্বরোচিত গণহত্যা শুরু করার পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত তিনি স্বাধীনতা ঘোষণা করেননি। আবার একথাও সবিশেষ প্রণিধানযোগ্য যে, পাকিস্তান সেনাবাহিনী কর্তৃক ঐ রাতে নির্বিচারে গণহত্যা শুরু করার সংবাদ পাওয়ার পর কালবিলম্ব না করে ইতিপূর্বে বঙ্গবন্ধুর স্বকণ্ঠে রেকর্ড করে রাখা স্বাধীনতার ঘোষণা উপরোক্ত ২৫শে মার্চের মধ্যরাত শেষে তথা ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে তিনি দেশ এবং জাতির উদ্দেশ্যে প্রদান করেন। উক্ত ঘোষণায় বঙ্গবন্ধু বলেন- Declaration of Independence- “This may be my last message. From today Bangladesh is independent. I call upon the people of Bangladesh wherever you might be and with whatever you have, to resist the army of occupation to the last. Your fight must go on until the last soldier of the Pakistan occupation army is expelled from the soil of Bangladesh and final victory is achieved. Joy Bangla. [দ্রঃ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিল; সূত্রঃ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধঃ দলিলপত্র, তৃতীয় খণ্ড, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, পৃষ্ঠা- ১]।”

৭৫। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ব্যাপারে পূর্বেই রেকর্ডকৃত উপরোক্ত সুস্পষ্ট ঘোষণায় বঙ্গবন্ধু বলেন- “এটাই হয়তো আমার শেষ বার্তা। আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। বাংলাদেশের জনগণ যে যেখানে আছেন, আপনাদের যা কিছু আছে, তা দিয়ে সেনাবাহিনীর দখলদারির মোকাবিলা করার জন্য আমি আহবান জানাচ্ছি। পাকিস্তানী দখলদার বাহিনীর শেষ সৈন্যটিকে বাংলাদেশের মাটি থেকে উৎখাত করা এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত আপনাদের সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে। জয় বাংলা।” [দ্রঃ বাংলাদেশ সরকারের প্রকাশনা- বঙ্গবন্ধু স্পিকস্‌, (মূলঃ ইংরেজী) ১৯৭২]। সুতরাং একথা ঐতিহাসিকভাবেই প্রমাণিত হয় যে, পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে ইতিপূর্বে রেকর্ড করা থাকলেও পাকিস্তান সেনাবাহিনী কর্তৃক আক্রমণ পরিচালনা না করা
পর্যন্ত এবং দেশবাসীর উপর সশস্ত্রভাবে ঝাঁপিয়ে না পড়া পর্যন্ত তথা আমরা আক্রান্ত না হওয়া পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু দেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেননি। এরই পাশাপাশি একথাও সত্য যে, পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী বাঙালি জাতিকে আক্রমণ শুরু করার পর
এক মুহূর্ত ও বিলম্ব না করে বঙ্গবন্ধু নিজে স্বয়ং দেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন। সুতরাং যে কোন বিবেচনাতেই এটা প্রমাণিত হয় যে, বঙ্গবন্ধু এই মাহেন্দ্রক্ষণটির জন্য সকাতরে এবং অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় ছিলেন। পরবর্তীকালে সেই সুযোগটি তিনি
তাৎক্ষণিকভাবে কাজে লাগিয়েছেন। এটি বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শিতা এবং প্রত্যুৎপন্নমতিত্বের জ্বলজ্যান্ত প্রমাণ বলে অকাট্ট এবং জোরালো (Unquestionably and unhesitatingly) ভাবেই প্রমাণিত হয়।

ড. মোঃ ফজলুর রহমান, সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ (অবঃ), লেখক ও কলামিস্ট
(চলবে)
বি/ইবিটাইমস /এম আর
জনপ্রিয়

এনইসি সভায় সভাপতিত্ব করছেন প্রধানমন্ত্রী

Address : Erlaaer Strasse 49/8/16 A-1230 Vienna,Austria. Mob : +43676848863279, 8801719316684 (BD) 8801911691101 ( Ads) Email : eurobanglatimes123@gmail.com
Translate »

ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ

আপডেটের সময় ০৩:০০:৫২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩ মার্চ ২০২২

৭ম পর্ব 

 ড. মোঃ ফজলুর রহমানঃ ৬১। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে, প্রাচীন সভ্যতার তীর্থস্থান এথেন্সের সুবক্তা এবং রাষ্ট্রনায়ক Pericles (C. 499-429 B.C) খ্রিষ্টপূর্ব ৪৩১ অব্দে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দিয়েছেন। সেই ঐতিহাসিক ভাষণ থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন গুণীজনদের পাশাপাশি বিগত ১৯৮৭ সনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট Ronald Regan জার্মানির বার্লিন ওয়ালের সম্মুখে দাঁড়িয়ে একটি সুবিখ্যাত ভাষণ দিয়েছেন। এই সুদীর্ঘ সময়কালের মধ্যে সারা বিশ্বের প্রথিতযশা যে সমস্ত গুণীজনেরা কালোত্তীর্ণ এবং মর্যাদাপূর্ণ যে সমস্ত ভাষণ দিয়েছেন, তন্মধ্যে বিশ্ব ইতিহাসে সবচেয়ে প্রভাব বিস্তারকারী এবং আলোড়ন সৃষ্টিকারী বরেণ্য ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ এবং মর্যাদাপূর্ণ ভাষণসমূহের মধ্য থেকে মোট ৪১ জন সামরিক-বেসামরিক জাতীয় বীরদের বিখ্যাত ভাষণ নিয়ে এই সংকলনটি প্রকাশ করা হয়েছে। এই সংকলনটি ইতিমধ্যেই দেশে-বিদেশে বিপুলভাবে সমাদৃত হয়েছে এবং সুধীজনদের প্রশংসা অর্জন করেছে।

৬২। দেশের সুশিক্ষিত এবং সচেতন ব্যক্তিগণ অবশ্যই জানেন জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা UNESCO বিগত ২০১৭ ইং সনের ৩০শে অক্টোবর প্যারিসে অনুষ্ঠিত তাদের দ্বিবার্ষিক সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণকে
“বিশ্ব ঐতিহ্য দলিল” হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। এরই পোষকতায় এই ভাষণকে উক্ত সংস্থা তাদের Memory of the International World Register -এ অন্তর্ভুক্ত করেছে। ১৫ জন সদস্য বিশিষ্ট একটি আন্তর্জাতিক উপদেষ্টা তথা বিশেষজ্ঞ কমিটি কর্তৃক দু’ বছর ধরে প্রামাণ্য দালিলিক বিষয়বস্তু সমূহ যাচাই-বাছাই শেষে UNESCO-এর মহাপরিচালকের সম্মতিক্রমে এটি সংস্থার নির্বাহী কমিটি কর্তৃক চূড়ান্তভাবে গৃহীত হয়। বিগত ১৯৭১ সনের ৭ই মার্চের সুদীর্ঘ ৪৬ বছরের ও বেশি সময় পরে জাতিসংঘের মতো বিশ্ব সংস্থার এহেন সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। বাঙালি জাতি হিসেবে আমাদের জন্য এটি অত্যন্ত আনন্দের বিষয় এবং বিরল সম্মানজনক ঘটনা বলে দেশের আপামর জনসাধারণ মনে করেন। এরই পাশাপাশি দেশবাসী নিশ্চয়ই অনুধাবন করতে পারবেন যে, স্বাধীনতা বিরোধী অপশক্তি সমূহ এবং প্রচণ্ড রকমের মুজিব বিদ্বেষী যে সমস্ত খলনায়কগণ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রচার নিষিদ্ধ করেছিলেন এবং এই ভাষণটিকে বিনষ্ট করে ফেলার জন্য প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালিয়েছেন তাদের মুখে ছাই দিয়ে ইতিহাসের অমোঘ প্রয়োজনেই এই ভাষণ মহাকালের ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে।

৬৩। ইতিহাসের আলোকে দেখা যায় যে, জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর বিগত ১৯৪৮ সনের ১০ই ডিসেম্বর বিশ্ব মানবাধিকারের ঘোষণাপত্র প্রণয়ন করা হয়। উপরোক্ত ঘোষণাপত্রের ভাষ্য মোতাবেক ঔপনিবেশবাদ, বর্ণবৈষম্যবাদ এবং জাতিগত নিপীড়ন সহ পৃথিবীর যে কোন স্থানে যে কোন জাতি এবং জনগোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রণের নীতি গৃহীত হয় এবং স্বীকৃত হয়। একথা সর্বজনবিদিত যে, পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকেই দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি জনগোষ্ঠী রাষ্ট্রের প্রতিটি ক্ষেত্রেই শোষণ, বঞ্চনা, নির্যাতন, নিপীড়ন এবং চরম বৈষম্যের শিকার হয়েছে। তাই বিজাতীয় পাকিস্তানী শাসকবর্গের ঔপনিবেশিক মনোভাবাপন্ন অভ্যন্ত্যরীণ শাসন-শোষণ, নিগ্রহ এবং নিপীড়ন থেকে বাঙালি জাতির সার্বিক মুক্তির লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধুর আন্দোলন ও সংগ্রাম ছিল
উপরোল্লিখিত নীতির সহিত পুরোপুরিভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং সঙ্গতিপূর্ণ। তদুপরি পাকিস্তানী স্বৈরাচারী শাসকবর্গের অপরিণামদর্শী মনোভাব এবং হঠকারী সিদ্ধান্ত এবং তৎপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন কার্যক্রম সমূহের কারণে ১৯৭১ সনের ৭ই মার্চ বাঙালিদের মনোভাব ছিল প্রচণ্ড রকমের বিক্ষুব্ধ, অপ্রতিরোধ্য এবং বিস্ফোরণোন্মুখ।

৬৪। হাজার বছর ধরে উপেক্ষিত, অবহেলিত এবং অধিকার বঞ্চিত বাঙালি জাতির এহেন ক্ষুব্ধ এবং বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা বুকে ধারণ করে দেশের টালমাটাল এবং বিস্ফোরণোন্মুখ পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়িয়েই বঙ্গবন্ধু তাঁর ৭ই মার্চের ভাষণ প্রদান
করেন। দেশে ঐদিন সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা করার মতো অবস্থা বিরাজমান থাকা সত্ত্বেও তিনি তা করেননি। বরং অধিকার বঞ্চিত বাঙালি জাতির অধিকার আদায়ের জন্য তথা শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য পাকিস্তানের সামরিক জান্তাকে পথ
বাতলে দেন। এরই পাশাপাশি যে কোন ধরনের সংঘাত কিংবা সহিংসতার পথ পরিহার করে নিরাপদ সড়ক দিয়ে পিছনে ফিরে আসার জন্য আইনানুগ পথ এবং উপায় ও তিনি বলে দেন। পাকিস্তানী শাসকবর্গ তা করতে ব্যর্থ হলে তাদের বিরুদ্ধে খুবই ধীর-স্থির কিন্তু অত্যন্ত বলিষ্ঠ, প্রাণবন্ত এবং তেজোদীপ্ত ভাষায় সর্বাত্মক প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য তিনি আহবান জানান। দুঃখজনক হলেও সত্য যে পাকিস্তানের তৎকালীন সামরিক জান্তা বঙ্গবন্ধু কর্তৃক প্রদর্শিত উপরোক্ত পথে অগ্রসর হননি। তদস্থলে তারা বিভিন্ন ধরনের কূটচাল, দুরভিসন্ধি এবং অস্ত্রের ভাষায় বাঙালি জাতিকে অবদমন করার পথ বেছে নিয়েছেন।

৬৫। দেশবাসী নিশ্চয়ই জানেন বিগত ১৯৭১ সনে অবিভক্ত পাকিস্তানে মোট জনসংখ্যার ৫৬% ছিল বাঙালি। এই বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সবারই ভাষা ছিল বাংলা। পক্ষান্তরে বাদবাকি ৪৪% জনগণ ছিলেন তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের অধিবাসী। বাঙালিদের শিক্ষা- সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও কৃষ্টি এবং মূল্যবোধ পশ্চিম পাকিস্তানীদের চেয়ে সম্পূর্ণ রকমের আলাদা এবং ভিন্ন প্রকৃতির ছিল। তাই দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীকে সংখ্যালঘিষ্ঠ জনসাধারণ থেকে বিচ্ছিন্ন করার কোন অভিপ্রায় কিংবা কোন চিন্তা চেতনা অথবা এরকম কোন প্রচেষ্টাই বঙ্গবন্ধুর ছিল না। তদুপরি বঙ্গবন্ধু ছিলেন অত্যন্ত প্রাজ্ঞ, বিচক্ষণ এবং দূরদৃষ্টিসম্পন্ন রাজনীতিক। এছাড়া ১৯৭১ সনের বাস্তবতায় এবং ঐ সময়ে মার্কিন সোভিয়েত পরাশক্তিসমূহের দ্বন্দ্ব এবং প্রভাব বলয়ের রাজনীতির প্রেক্ষিতে স্নায়ুযুদ্ধকালীন বিশ্ব রাজনীতির গতিধারা তথা মেরুকরণ সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু সম্পূর্ণভাবে ওয়াকিবহাল ছিলেন। উপরন্তু দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে দেশের অভ্যন্তরে কিংবা বহির্বিশ্বে তাঁকে যেন কেউ বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতার অপবাদ দিতে না পারে সে ব্যাপারে তিনি খুবই সাবধান এবং সতর্ক ছিলেন। তাঁর কোন রকম অসতর্কতার কারণে অনভিপ্রেত এবং অপ্রীতিকর কিছু ঘটে গেলে তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন অনেকটা অসম্ভব হয়ে পড়তো কিংবা অনেক পিছিয়ে যেত।

৬৬। সারা জীবন ধরে রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রাম করে অভ্যস্ত এবং দীর্ঘদিন কারা নির্যাতন ভোগকারী একজন আপাদমস্তক জাতীয়তাবাদী নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধু খুব ভালভাবেই জানতেন যে, বিগত ১৯৬৭ – ১৯৭০ সনে নাইজেরিয়ার “বিয়াফ্রা” (Biafra) বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন বৃহৎ শক্তিবর্গের সহায়তায় অত্যন্ত কঠোরভাবে দমন করা হয়েছিল। এহেন নিষ্ঠুর দমন পীড়নের বিরুদ্ধে বিশ্বের কোন দেশই জোরালোভাবে কোন নিন্দা করেনি কিংবা সোচ্চারভাবে কোন প্রতিবাদ ও করেনি। এমনকি আন্দোলনকারীদের প্রতি কেউ কোনভাবে কোন সমর্থন ও ব্যক্ত করেননি। তাই বঙ্গবন্ধু সে পথে অর্থাৎ Unilateral Declaration of Independence (UDI) -এর পথে পা বাড়াননি। আর ঠিক একারণেই তিনি কৌশলের আশ্রয় নিয়েছেন। এহেন কৌশলের অংশ হিসেবে নিজের জীবনের নিরাপত্তার কথা চিন্তা না করে তিনি নিজে এবং তাঁর দেশবাসী আক্রান্ত হয়ে পাকিস্তানকে বর্বর
আক্রমণকারী হিসেবে চিহ্নিত এবং প্রতিপন্ন করতে সক্ষম হয়েছেন। এরই পাশাপাশি পাকিস্তানী শাসকবর্গ যে আদৌ গণতান্ত্রিক মনোভাবাপন্ন কিংবা নিয়মতান্ত্রিক মূল্যবোধ সম্পন্ন ছিলেন না বঙ্গবন্ধু তাঁর রাষ্ট্রনায়কোচিত প্রজ্ঞা দ্বারা তিনি তা বিশ্ববাসীকে দেখিয়ে দিয়েছেন।

৬৭। বঙ্গবন্ধু অবিভক্ত পাকিস্তানের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর ব্যাপক সমর্থনপুষ্ট এবং ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত অবিসংবাদিত নেতা হওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তানী সেনাবাহিনী আক্রমণ করার পূর্বেই তিনি একতরফাভাবে দেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করলে পাকিস্তানী
শাসকবর্গ তাঁকে বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে অভিযুক্ত করার প্রচেষ্টা চালাতো। এহেন অবস্থায় আমাদের স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তি ও বৈরী রাষ্ট্র সমূহের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আইন এবং বিশ্ব জনমত ও আমাদের বিপক্ষে চলে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ক্ষুরধার বুদ্ধিমত্তা এবং মেধাবী কৌশলের মাধ্যমে ক্রোধান্ধ ইয়াহিয়া-ভুট্টোদের সে কূটচাল সফল হয়নি। আর ঠিক এভাবেই নিজের জীবন বিপন্ন করে এবং নিরাপত্তার কথা চিন্তা না করে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং সুদূরপ্রসারী কৌশলের মাধ্যমে তিনি বিশ্ববাসীকে দেখিয়ে দিয়েছেন যে, হানাদার পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর পরিকল্পিত এবং বর্বর আক্রমণের পরিপ্রেক্ষিতে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে স্বাধীনতা ঘোষণা করা ছাড়া তাঁর সামনে আর কোন বিকল্প ছিলনা। বঙ্গবন্ধুর এহেন প্রখর দূরদৃষ্টিসম্পন্ন কৌশল এবং তুখোড় বুদ্ধিমত্তার কাছে পরাভূত হয়েছে পাকিস্তানের অবিমৃষ্যকারী শাসকবর্গ। এমতাবস্থায় বঙ্গবন্ধুকে বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে প্রমাণ করতে গিয়ে অপরিণামদর্শী পাকিস্তানী শাসকবর্গ নিজেরাই তাদের নিজেদের ফাঁদে আটকে গিয়েছেন। ফলে পাকিস্তান ভাঙ্গার দায়দায়িত্ব অবধারিতভাবে তাদের উপরই নিপতিত হয়েছে।

৬৮। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সামগ্রিক দিকনির্দেশনার এক অনন্য এবং অসাধারণ দলিল। এই ভাষণ বহুমাত্রিকতায় ভরপুর এবং বিভিন্ন ধরনের বৈশিষ্ট্যমণ্ডতায় পরিপূর্ণ। এই জ্বালাময়ী ভাষণ আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে প্রবলভাবে
আলোড়িত করেছে এবং পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমাদের বিজয়কে অবশ্যম্ভাবী করে তুলেছে। এই হৃদয়গ্রাহী ভাষণের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর অতুলনীয় ব্যক্তিত্ব, অনমনীয় বাগ্মিতা এবং তাঁর পাণ্ডিত্যপূর্ণ বক্তব্যের অসাধারণ নান্দনিক শৌর্য ও সৌন্দর্য উদ্ভাসিত হয়েছে। এই ভাষণে বঙ্গবন্ধু গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে সমুন্নত রাখার পাশাপাশি অন্যদের ন্যায়সঙ্গত মতামতকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করার নিমিত্তে প্রতিশ্রুতি ও ব্যক্ত করেছেন। এছাড়া তিনি নৈতিকতা এবং মানবতাকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার মাধ্যমে অসাম্প্রদায়িক চিন্তাচেতনা ও মূল্যবোধকে সবার উপরে স্থান দেয়ার জন্য উদাত্ত আহবান জানিয়েছেন। এমনকি তিনি নিজে সারা জীবন ধরে গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন সংগ্রাম করে যাওয়া সত্ত্বেও বিপ্লবী সমর কুশলীদের মতো গেরিলাযুদ্ধের সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনাও প্রদান করেছেন। উপরোল্লিখিত নান্দনিক এবং মহাকাব্যিক বক্তব্যসমূহের কারণেই জাতিসংঘ এই ভাষণকে বিশ্ব ঐতিহ্য সম্পদ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেছে।

৬৯। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, আমেরিকার অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং ষোড়শ প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন বিগত ১৮৬৩ সালের ১৯শে নভেম্বর পেনসিলভানিয়া অঙ্গরাজ্যের গেটিসবার্গে তার বিখ্যাত ভাষণ দিয়েছেন। এই ভাষণের স্থায়িত্বকাল ছিল মাত্র ৩ (তিন) মিনিটের ও কম। এই ভাষণের শব্দ সংখ্যা ছিল ২৭২। উপরন্তু এই ভাষণ হোয়াইট হাউজ থেকে লিখে আনা হয়েছিল। তদুপরি এই ভাষণ প্রদানের দিন লিংকন মূল বক্তা ছিলেন না। আমেরিকার গৃহযুদ্ধে নিহত ইউনিয়নপন্থী সৈনিকদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিসৌধের ফলক উন্মোচন অনুষ্ঠানে ঐদিন মূল বক্তা ছিলেন সিনেটর এডওয়ার্ড এভারেট। এভারেটের দুই ঘণ্টা ব্যাপী বক্তৃতার পর লিংকন তার উপরোক্ত সংক্ষিপ্ত বক্তৃতা প্রদান করেন। গুরুত্ব এবং তাৎপর্যের দিক দিয়ে তার উপরোক্ত ভাষণ যুগান্তকারী হলেও আকৃতি এবং প্রকৃতির দিক দিয়ে খুবই সংক্ষিপ্ত বটে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বিগত ১৮৬৫ সালের ১৪ই এপ্রিল জন উইকস্‌ বোথ নামের এক রাজনৈতিক কর্মীর গুলিতে নিহত হন ইতিহাসের এই অমর বক্তা।

৭০। গ্রেট ব্রিটেনের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী চেম্বারলিন ব্যর্থতার দায়ে পদত্যাগের পর বিগত ১৯৪০ সনের ১০ই মে উইনস্টন চার্চিল কোয়ালিশন সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। দুই আঙ্গুল উঁচিয়ে “ভি” বা বিজয় চিহ্ন দেখিয়ে সারা বিশ্বে ব্যাপকভাবে সাড়া জাগানো এই প্রধানমন্ত্রী ব্রিটিশ কমন্স সভায় একই বিষয়ে বিগত ১৯৪০ সনের ১৩ই মে থেকে ১৮ই জুন পর্যন্ত মোট ৪ (চার) টি ভাষণ দেন। উপরোক্ত ভাষণগুলির ধারাবাহিকতায় ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বিগত ১৯৪০ সনের ৪ঠা জুন ইংল্যান্ডের পার্লামেন্টে উইনস্টন চার্চিল যে উৎসাহব্যঞ্জক এবং উদ্দীপনামূলক ভাষণ দিয়েছেন সেটিই তার সুবিখ্যাত ভাষণ হিসেবে বিশ্বব্যাপী সুখ্যাতি অর্জন করেছে। এই ভাষণের স্থায়িত্বকাল ছিল মাত্র ৭ (সাত) মিনিট। তদুপরি এই ভাষণ ও ছিল দীর্ঘদিনের গবেষণালব্ধ একটি লিখিত ভাষণ। একথা সর্বজনস্বীকৃত যে তার এই জ্বালাময়ী ভাষণের মাধ্যমে ব্রিটিশ জাতি দারুণভাবে উজ্জীবিত হয়েছে এবং অনুপ্রাণিত হয়েছে।

৭১। সুমহান আব্রাহাম লিংকনের উপরোক্ত ভাষণের প্রায় ১০০ বছর পর বিগত ১৯৬৩ সালের ২৮শে আগস্ট আমেরিকার বর্ণবাদ বিরোধী জনপ্রিয় কৃষ্ণাঙ্গ নেতা মার্টিন লুথার কিং “I have a dream” শিরোনামে একটি সুবিখ্যাত ভাষণ দিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। এই ভাষণের স্থায়িত্বকাল ছিল ১৭ (সতের) মিনিট। এই ভাষণের শব্দ সংখ্যা ছিল ১৬৬৭। এই ভাষণ প্রদানের দিনের অনুষ্ঠানে মার্টিন লুথার কিং কোন একক বক্তা ছিলেন না। তিনি ঐদিনের অনুষ্ঠানের অনেক বক্তার মধ্যে একজন ছিলেন। কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকানদের সম অধিকার নিয়ে আন্দোলনকারী আরও ২০ (বিশ) টি সংগঠনের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে মার্টিন তার বক্তৃতা শেষ করেন। তার এই ভাষণটিও সুলিখিত, সুপরিকল্পিত এবং দীর্ঘদিনের গবেষণালব্ধ ভাষণ ছিল বটে। এই ভাষণের শেষের দিকে বিশিষ্ট সঙ্গীত শিল্পী মাহালিয়া জ্যাকসনের অনুরোধে বক্তৃতা বাড়িয়ে আমেরিকাকে নিয়ে মার্টিন লুথার কিং তার স্বপ্নের কথা ব্যক্ত করেন। বিগত ১৯৬৮ সালের ৪ঠা এপ্রিল সন্ধ্যা ০৬-০১ মিনিটে জেমসং আর্ল রে -নামক এক আততায়ীর গুলিতে প্রাণ হারান এই কৃষ্ণাঙ্গ মহানায়ক।

৭৫। পক্ষান্তরে একথা সর্বজনবিদিত যে, স্বাধীনতার উত্তাল তরঙ্গে দোদুল্যমান, বিজাতীয় পাকিস্তানী স্বৈরশাসক এবং তাদের তাবেদার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে মরণপণ লড়াইয়ের জন্য উন্মুখ ১০ (দশ) লক্ষাধিক নরনারীর সামনে দাঁড়িয়ে বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত এবং অকুতোভয় নেতা বঙ্গবন্ধুর তাৎক্ষণিক, অলিখিত এবং স্বতঃস্ফূর্ত ভাষণটির স্থায়িত্বকাল ছিল প্রায় ১৯ (ঊনিশ) মিনিট। ৭ই মার্চ বিকাল ৩-২৩ মিনিটে তিনি তাঁর ভাষণ শুরু করেন এবং শেষ করেন ৩-৪২ মিনিটে। এই ভাষণের শব্দ সংখ্যা ছিল ১৩০৮। এই দিন অন্যান্য নেতৃবৃন্দ মঞ্চে উপবিষ্ট থাকলেও বঙ্গবন্ধু ছিলেন একক বক্তা। তদুপরি স্বীকৃত মতেই এটি ছিল একটি পূর্ব প্রস্তুতিহীন (Extemporary) ভাষণ। উপরন্তু পুরো ভাষণটিই ছিল দীর্ঘদিন ধরে অধিকার বঞ্চিত একটি জাতিকে স্বাধীনতার দাবিতে জাগিয়ে তোলার নিমিত্তে সম্পূর্ণভাবে স্বতঃস্ফূর্ত (Spontaneous) একটি জ্বালাময়ী ভাষণ। তাই উপরোল্লিখিত মহান এবং প্রাতঃস্মরণীয় নেতৃবৃন্দের সহিত তুলনামূলক বিচারে বঙ্গবন্ধুর উপরোক্ত ভাষণ যে কোন বিবেচনাতেই অনেক বেশি অনবদ্য এবং অনন্য সাধারণ ভাষণ বটে।

৭৩। পাকিস্তানী সামরিক জান্তা সম্পূর্ণ পরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন ধরনের উস্কানি, হত্যা, রক্তপাত এবং অবাঙালি বিহারীদেরকে দিয়ে বিভিন্ন স্থানে দাঙ্গা হাঙ্গামা সৃষ্টি করা সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধু পূর্বাপর অহিংস এবং শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার নিমিত্তে
পরামর্শ দিয়েছেন। পরিকল্পিত হিংসা-বিদ্বেষের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি কোন সহিংসতার পথে পা বাড়াননি। কোন আক্রমণ কিংবা হামলাকে প্রতিরোধ অথবা প্রতিহত করার জন্য কোন তাগিদ ও দেননি। প্রতিশোধ স্পৃহা চরিতার্থ করার কথাও কখনো বলেননি। অর্থাৎ কারও কোন ব্যক্তিগত ক্ষোভের বশবর্তী হয়ে কোন হঠকারী সিদ্ধান্ত ও তিনি গ্রহণ করেননি। উপরন্তু দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিকল্পিতভাবে দাঙ্গা হাঙ্গামা সৃষ্টি করা সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধু অহিংস এবং শান্তিপূর্ণ আন্দোলন থেকে এক চুল ও সরে আসেননি। এ
প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু তাঁর উপরোক্ত ঐতিহাসিক ভাষণের শেষ দিকে বলেন- “… শুনুন, মনে রাখবেন শত্রুবাহিনী ঢুকেছে। নিজেদের মধ্যে আত্মকলহ সৃষ্টি করবে, লুটতরাজ করবে। এই বাংলায় হিন্দু-মুসলমান, বাঙালি-অবাঙালি যারা আছে তারা আমাদের ভাই। তাদেরকে রক্ষা করার দায়িত্ব আপনাদের উপর। আমাদের যেন বদনাম না হয়…।” দেশের অভ্যন্তরে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার জন্য এবং আঞ্চলিক ও জাতিগত বিরোধ, বিদ্বেষ এবং সংঘাত পরিহার করার নিমিত্তে বঙ্গবন্ধু কতটা সচেতন, আন্তরিক, অমায়িক ও মানবিক ছিলেন তা তাঁর উপরোক্ত বক্তব্য থেকেই পরিলক্ষিত হয়।

৭৪। পাকিস্তান সরকারের সিদ্ধান্ত এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী ২৫শে মার্চের কালরাত্রিতে Operation Search Light শুরু করা হবে বলে বঙ্গবন্ধু আগেই সংবাদ পেয়েছিলেন। তাই ঐ বিভীষিকাময় কালরাত্রিতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী কর্তৃক বর্বরোচিত গণহত্যা শুরু করার পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত তিনি স্বাধীনতা ঘোষণা করেননি। আবার একথাও সবিশেষ প্রণিধানযোগ্য যে, পাকিস্তান সেনাবাহিনী কর্তৃক ঐ রাতে নির্বিচারে গণহত্যা শুরু করার সংবাদ পাওয়ার পর কালবিলম্ব না করে ইতিপূর্বে বঙ্গবন্ধুর স্বকণ্ঠে রেকর্ড করে রাখা স্বাধীনতার ঘোষণা উপরোক্ত ২৫শে মার্চের মধ্যরাত শেষে তথা ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে তিনি দেশ এবং জাতির উদ্দেশ্যে প্রদান করেন। উক্ত ঘোষণায় বঙ্গবন্ধু বলেন- Declaration of Independence- “This may be my last message. From today Bangladesh is independent. I call upon the people of Bangladesh wherever you might be and with whatever you have, to resist the army of occupation to the last. Your fight must go on until the last soldier of the Pakistan occupation army is expelled from the soil of Bangladesh and final victory is achieved. Joy Bangla. [দ্রঃ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিল; সূত্রঃ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধঃ দলিলপত্র, তৃতীয় খণ্ড, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, পৃষ্ঠা- ১]।”

৭৫। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ব্যাপারে পূর্বেই রেকর্ডকৃত উপরোক্ত সুস্পষ্ট ঘোষণায় বঙ্গবন্ধু বলেন- “এটাই হয়তো আমার শেষ বার্তা। আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। বাংলাদেশের জনগণ যে যেখানে আছেন, আপনাদের যা কিছু আছে, তা দিয়ে সেনাবাহিনীর দখলদারির মোকাবিলা করার জন্য আমি আহবান জানাচ্ছি। পাকিস্তানী দখলদার বাহিনীর শেষ সৈন্যটিকে বাংলাদেশের মাটি থেকে উৎখাত করা এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত আপনাদের সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে। জয় বাংলা।” [দ্রঃ বাংলাদেশ সরকারের প্রকাশনা- বঙ্গবন্ধু স্পিকস্‌, (মূলঃ ইংরেজী) ১৯৭২]। সুতরাং একথা ঐতিহাসিকভাবেই প্রমাণিত হয় যে, পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে ইতিপূর্বে রেকর্ড করা থাকলেও পাকিস্তান সেনাবাহিনী কর্তৃক আক্রমণ পরিচালনা না করা
পর্যন্ত এবং দেশবাসীর উপর সশস্ত্রভাবে ঝাঁপিয়ে না পড়া পর্যন্ত তথা আমরা আক্রান্ত না হওয়া পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু দেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেননি। এরই পাশাপাশি একথাও সত্য যে, পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী বাঙালি জাতিকে আক্রমণ শুরু করার পর
এক মুহূর্ত ও বিলম্ব না করে বঙ্গবন্ধু নিজে স্বয়ং দেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন। সুতরাং যে কোন বিবেচনাতেই এটা প্রমাণিত হয় যে, বঙ্গবন্ধু এই মাহেন্দ্রক্ষণটির জন্য সকাতরে এবং অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় ছিলেন। পরবর্তীকালে সেই সুযোগটি তিনি
তাৎক্ষণিকভাবে কাজে লাগিয়েছেন। এটি বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শিতা এবং প্রত্যুৎপন্নমতিত্বের জ্বলজ্যান্ত প্রমাণ বলে অকাট্ট এবং জোরালো (Unquestionably and unhesitatingly) ভাবেই প্রমাণিত হয়।

ড. মোঃ ফজলুর রহমান, সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ (অবঃ), লেখক ও কলামিস্ট
(চলবে)
বি/ইবিটাইমস /এম আর