ভিয়েনা ০২:১২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ২ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

আলোর পথে লালমোহন বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়

  • EuroBanglaTimes
  • আপডেটের সময় ০১:৫০:১৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৬ সময় দেখুন

লালমোহনের এক শান্ত কোণে দাঁড়িয়ে আছে একটি স্বপ্নের নাম—লালমোহন বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়। দূর থেকে দেখলে সাধারণ একটি স্কুল ভবন মনে হলেও ভেতরে ঢুকলেই বোঝা যায়, এটি কেবল ইট-সিমেন্টের গাঁথুনি নয়; এটি অসংখ্য মেয়ের স্বপ্ন, সাহস ও সম্ভাবনার ঠিকানা। প্রতিদিন সকাল হলেই স্কুল প্রাঙ্গণ মুখরিত হয়ে ওঠে ছাত্রীদের হাসি, কোলাহল আর শেখার আগ্রহে।

এই বিদ্যালয়ের প্রাণকেন্দ্রে আছেন প্রধান শিক্ষক মাছুমা খানম। তাঁর ব্যক্তিত্বেই যেন স্কুলের মূল দর্শন গাঁথা—শৃঙ্খলা, মমতা ও অদম্য প্রত্যয়। তিনি বিশ্বাস করেন, একটি মেয়ে শিক্ষিত হলে একটি পরিবার নয়, একটি সমাজ শিক্ষিত হয়। তাই তাঁর নেতৃত্বে বিদ্যালয়টি শুধু পরীক্ষার ফলাফলের দিকে নয়, বরং নৈতিকতা, আত্মবিশ্বাস ও মানবিক মূল্যবোধ গঠনের দিকেও সমান গুরুত্ব দেয়। প্রতিটি ছাত্রী তাঁর কাছে কেবল রোল নম্বর নয়, বরং একেকটি আলাদা গল্প।

প্রধান শিক্ষকের ডান হাত হয়ে বিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমাস্টার ইয়াসিন স্যার। তাঁর কণ্ঠে যেমন কঠোরতার ছাপ, তেমনি অন্তরে রয়েছে অসীম দরদ। সকালে অ্যাসেম্বলিতে তাঁর বক্তব্য ছাত্রীদের মধ্যে দায়িত্ববোধ জাগিয়ে তোলে। তিনি নিয়মিত ছাত্রীদের পড়াশোনার পাশাপাশি সময়ানুবর্তিতা, পরিচ্ছন্নতা ও পারস্পরিক সম্মানের গুরুত্ব শেখান। অনেক ছাত্রীই বলেন, “ইয়াসিন স্যার বকেন ঠিকই, কিন্তু সেই বকুনির মাঝেই আমাদের ভালো থাকার পথ দেখান।”

বিদ্যালয়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর সুশৃঙ্খল শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ। প্রতিটি শ্রেণিকক্ষ পরিচ্ছন্ন, দেয়ালে শিক্ষণীয় পোস্টার, জাতীয় নেতৃবৃন্দের উক্তি ও প্রেরণামূলক বাণী টাঙানো। লাইব্রেরিতে রয়েছে পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি গল্প, কবিতা ও সাধারণ জ্ঞানভিত্তিক বই, যা ছাত্রীদের পাঠাভ্যাস গড়ে তুলতে সাহায্য করে। বিজ্ঞানাগারে হাতে-কলমে শেখার সুযোগ পেয়ে ছাত্রীদের চোখে জ্বলে ওঠে আবিষ্কারের আনন্দ।

লালমোহন বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয় শুধু পড়াশোনাতেই সীমাবদ্ধ নয়; এখানে সহশিক্ষা কার্যক্রমেরও বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিতর্ক ও দেয়াল পত্রিকা প্রকাশের মাধ্যমে ছাত্রীদের লুকিয়ে থাকা প্রতিভা বিকশিত হয়। অনেক লাজুক ছাত্রী মঞ্চে উঠে কবিতা আবৃত্তি করে বা নাটকে অভিনয় করে আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে। বিদ্যালয়ের এই পরিবেশ মেয়েদের ভেতরের ভয় ভেঙে সাহসী করে তোলে।

এই স্কুলের শিক্ষিকাবৃন্দও আলাদা করে উল্লেখযোগ্য। তাঁরা কেবল পাঠ্যবই শেষ করাই তাঁদের দায়িত্ব মনে করেন না; বরং একজন অভিভাবকের মতো ছাত্রীদের পাশে দাঁড়ান। কোনো ছাত্রী অসুস্থ হলে, কোনো পারিবারিক সমস্যায় পড়লে শিক্ষিকারা তার খোঁজ নেন, সাহস দেন। অনেক দরিদ্র ও মেধাবী ছাত্রী এই শিক্ষকদের অনুপ্রেরণায় পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পেরেছে।

গ্রাম ও সমাজের সঙ্গে বিদ্যালয়ের সম্পর্কও খুব দৃঢ়। অভিভাবকরা নিয়মিত স্কুলে এসে শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলেন, মেয়েদের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চান। বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ যেন হয়ে উঠেছে একটি ছোট সমাজ, যেখানে সবাই মিলেই ভবিষ্যৎ গড়ে তোলে। সমাজের নানা কুসংস্কার ভেঙে মেয়েদের স্কুলে পাঠাতে এই বিদ্যালয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

সবচেয়ে গর্বের বিষয় হলো, এই বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্রীরা আজ কেউ শিক্ষক, কেউ নার্স, কেউ উদ্যোক্তা, কেউ আবার সমাজকর্মী। তারা যখনই ফিরে আসে স্কুলে, চোখ ভিজে ওঠে কৃতজ্ঞতায়। তারা জানে, লালমোহন বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয় না থাকলে হয়তো তাদের স্বপ্নগুলো ডানা মেলতে পারত না।

দিন শেষে সূর্য অস্ত গেলে স্কুল প্রাঙ্গণ নীরব হয়ে আসে, কিন্তু থেকে যায় এক গভীর প্রত্যাশা—আগামী দিনের। কারণ লালমোহন বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিদিন নতুন করে গড়ে তোলে আলোকিত নারী, যারা নিজেদের আলোয় পরিবার, সমাজ ও দেশকে উজ্জ্বল করবে। এই বিদ্যালয় তাই শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়; এটি এক নিরব বিপ্লব, মেয়েদের এগিয়ে যাওয়ার সাহসী ঠিকানা।

লেখক: খাদিজা তাবাসসুম (সহি)
দশম শ্রেণি
রোল নম্বর ৫
লালমোহন বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়।

জনপ্রিয়
Address : Erlaaer Strasse 49/8/16 A-1230 Vienna,Austria. Mob : +43676848863279, 8801719316684 (BD) 8801911691101 ( Ads) Email : eurobanglatimes123@gmail.com
Translate »

আলোর পথে লালমোহন বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়

আপডেটের সময় ০১:৫০:১৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬

লালমোহনের এক শান্ত কোণে দাঁড়িয়ে আছে একটি স্বপ্নের নাম—লালমোহন বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়। দূর থেকে দেখলে সাধারণ একটি স্কুল ভবন মনে হলেও ভেতরে ঢুকলেই বোঝা যায়, এটি কেবল ইট-সিমেন্টের গাঁথুনি নয়; এটি অসংখ্য মেয়ের স্বপ্ন, সাহস ও সম্ভাবনার ঠিকানা। প্রতিদিন সকাল হলেই স্কুল প্রাঙ্গণ মুখরিত হয়ে ওঠে ছাত্রীদের হাসি, কোলাহল আর শেখার আগ্রহে।

এই বিদ্যালয়ের প্রাণকেন্দ্রে আছেন প্রধান শিক্ষক মাছুমা খানম। তাঁর ব্যক্তিত্বেই যেন স্কুলের মূল দর্শন গাঁথা—শৃঙ্খলা, মমতা ও অদম্য প্রত্যয়। তিনি বিশ্বাস করেন, একটি মেয়ে শিক্ষিত হলে একটি পরিবার নয়, একটি সমাজ শিক্ষিত হয়। তাই তাঁর নেতৃত্বে বিদ্যালয়টি শুধু পরীক্ষার ফলাফলের দিকে নয়, বরং নৈতিকতা, আত্মবিশ্বাস ও মানবিক মূল্যবোধ গঠনের দিকেও সমান গুরুত্ব দেয়। প্রতিটি ছাত্রী তাঁর কাছে কেবল রোল নম্বর নয়, বরং একেকটি আলাদা গল্প।

প্রধান শিক্ষকের ডান হাত হয়ে বিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমাস্টার ইয়াসিন স্যার। তাঁর কণ্ঠে যেমন কঠোরতার ছাপ, তেমনি অন্তরে রয়েছে অসীম দরদ। সকালে অ্যাসেম্বলিতে তাঁর বক্তব্য ছাত্রীদের মধ্যে দায়িত্ববোধ জাগিয়ে তোলে। তিনি নিয়মিত ছাত্রীদের পড়াশোনার পাশাপাশি সময়ানুবর্তিতা, পরিচ্ছন্নতা ও পারস্পরিক সম্মানের গুরুত্ব শেখান। অনেক ছাত্রীই বলেন, “ইয়াসিন স্যার বকেন ঠিকই, কিন্তু সেই বকুনির মাঝেই আমাদের ভালো থাকার পথ দেখান।”

বিদ্যালয়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর সুশৃঙ্খল শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ। প্রতিটি শ্রেণিকক্ষ পরিচ্ছন্ন, দেয়ালে শিক্ষণীয় পোস্টার, জাতীয় নেতৃবৃন্দের উক্তি ও প্রেরণামূলক বাণী টাঙানো। লাইব্রেরিতে রয়েছে পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি গল্প, কবিতা ও সাধারণ জ্ঞানভিত্তিক বই, যা ছাত্রীদের পাঠাভ্যাস গড়ে তুলতে সাহায্য করে। বিজ্ঞানাগারে হাতে-কলমে শেখার সুযোগ পেয়ে ছাত্রীদের চোখে জ্বলে ওঠে আবিষ্কারের আনন্দ।

লালমোহন বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয় শুধু পড়াশোনাতেই সীমাবদ্ধ নয়; এখানে সহশিক্ষা কার্যক্রমেরও বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিতর্ক ও দেয়াল পত্রিকা প্রকাশের মাধ্যমে ছাত্রীদের লুকিয়ে থাকা প্রতিভা বিকশিত হয়। অনেক লাজুক ছাত্রী মঞ্চে উঠে কবিতা আবৃত্তি করে বা নাটকে অভিনয় করে আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে। বিদ্যালয়ের এই পরিবেশ মেয়েদের ভেতরের ভয় ভেঙে সাহসী করে তোলে।

এই স্কুলের শিক্ষিকাবৃন্দও আলাদা করে উল্লেখযোগ্য। তাঁরা কেবল পাঠ্যবই শেষ করাই তাঁদের দায়িত্ব মনে করেন না; বরং একজন অভিভাবকের মতো ছাত্রীদের পাশে দাঁড়ান। কোনো ছাত্রী অসুস্থ হলে, কোনো পারিবারিক সমস্যায় পড়লে শিক্ষিকারা তার খোঁজ নেন, সাহস দেন। অনেক দরিদ্র ও মেধাবী ছাত্রী এই শিক্ষকদের অনুপ্রেরণায় পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পেরেছে।

গ্রাম ও সমাজের সঙ্গে বিদ্যালয়ের সম্পর্কও খুব দৃঢ়। অভিভাবকরা নিয়মিত স্কুলে এসে শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলেন, মেয়েদের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চান। বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ যেন হয়ে উঠেছে একটি ছোট সমাজ, যেখানে সবাই মিলেই ভবিষ্যৎ গড়ে তোলে। সমাজের নানা কুসংস্কার ভেঙে মেয়েদের স্কুলে পাঠাতে এই বিদ্যালয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

সবচেয়ে গর্বের বিষয় হলো, এই বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্রীরা আজ কেউ শিক্ষক, কেউ নার্স, কেউ উদ্যোক্তা, কেউ আবার সমাজকর্মী। তারা যখনই ফিরে আসে স্কুলে, চোখ ভিজে ওঠে কৃতজ্ঞতায়। তারা জানে, লালমোহন বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয় না থাকলে হয়তো তাদের স্বপ্নগুলো ডানা মেলতে পারত না।

দিন শেষে সূর্য অস্ত গেলে স্কুল প্রাঙ্গণ নীরব হয়ে আসে, কিন্তু থেকে যায় এক গভীর প্রত্যাশা—আগামী দিনের। কারণ লালমোহন বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিদিন নতুন করে গড়ে তোলে আলোকিত নারী, যারা নিজেদের আলোয় পরিবার, সমাজ ও দেশকে উজ্জ্বল করবে। এই বিদ্যালয় তাই শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়; এটি এক নিরব বিপ্লব, মেয়েদের এগিয়ে যাওয়ার সাহসী ঠিকানা।

লেখক: খাদিজা তাবাসসুম (সহি)
দশম শ্রেণি
রোল নম্বর ৫
লালমোহন বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়।