গত কয়েক সপ্তাহ যাবত অনুষ্ঠিত ইরানে সরকার বিরোধী বিক্ষোভ এখন সমগ্র ইরানের রাজপথে রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে
আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ রোববার (১১ জানুয়ারী) বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম জানায়,গত কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা এই বিক্ষোভে নতুন মাত্রা যোগ করেছে মসজিদের মতো পবিত্র ধর্মীয় স্থাপনায় অগ্নিসংযোগ এবং ১৯৭৯ সালের বিপ্লব-পূর্ববর্তী ‘সিংহাসন ও সূর্য’ খচিত পাহলভী পতাকা প্রদর্শন।
তেহরানসহ বড় শহরগুলোতে ছড়িয়ে পড়া এই সহিংসতাকে দেশটির সরকার কেবল অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ নয়, বরং সরাসরি ইহুদিবাদী ইসরায়েল ও নির্বাসিত রাজপুত্র রেজা পাহলভীর ইন্ধদে সৃষ্ট ‘সফট ওয়ার’ বা ছায়াযুদ্ধ হিসেবে চিহ্নিত করছে।
সাম্প্রতিক এই বিক্ষোভে নির্বাসিত যুবরাজ রেজা পাহলভির (প্রয়াত শাহ-এর ছেলে) সমর্থকরা ইসলামি প্রজাতন্ত্রের নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে। বিক্ষোভকারীদের অনেককে পতাকা ও মসজিদ পুড়িয়ে দিতে এবং বিপ্লব-পূর্ব পাহলভি পতাকা ওড়াতে দেখা গেছে। এনিয়ে ব্যাপক ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে নেটজুড়ে।
ইসরায়েল পাহলভির এই সরকার উৎখাতের আন্দোলনে সরাসরি সমর্থন দিচ্ছে এবং তাকে একটি নির্ভরযোগ্য বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করছে। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে ইরানের ওপর ইসরায়েলি হামলার পর থেকে তেহরান সরকার এই বিক্ষোভকে বিদেশি হস্তক্ষেপের অংশ হিসেবে অভিহিত করছে।
বিক্ষোভের শুরুটা অর্থনৈতিক মন্দা ও মুদ্রাস্ফীতি নিয়ে হলেও বর্তমানে তা সরাসরি শাসকগোষ্ঠী পরিবর্তনের আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। আন্দোলনকারীদের একটি বড় অংশ ১৯৭৯ সালে ক্ষমতাচ্যুত পাহলভি রাজবংশের ফিরে আসার স্লোগান দিচ্ছে। যদিও বর্তমানে ইরানে এই রাজবংশের উল্লেখযোগ্য তেমন কোনো সমর্থক গোষ্ঠী নেই। তবে নির্বাসিত রাজপুত্র রেজা পাহলভি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করলেও ইসরায়েলের সাথে তার সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর।
পাহলভির সাথে ঐতিহাসিক ইসরায়েলি যোগসাজশ: ইরানের শেষ সম্রাট (শাহ) মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভি এবং ইসরায়েলের মধ্যকার সম্পর্ক ছিল মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসের এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। যদিও ইরান একটি মুসলিম প্রধান দেশ ছিল, তবুও ১৯৪৮ থেকে ১৯৭৯ সালে ইরানি বিপ্লবের আগ পর্যন্ত তৎকালীন রাংজবংশের সাথে ইসলায়েলের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল, তবে তা ছিল মূলত ‘অপ্রাতিষ্ঠানিক’।
পাহলভি প্রস্তাব করেছেন ‘সাইরাস অ্যাকর্ডস’ , যা আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের বর্ধিত রূপ হিসেবে ইরান ও ইসরায়েলের ঐতিহাসিক বন্ধুত্ব পুনরুদ্ধারের কথা বলে। ২০২৩ সালে পাহলভি ইসরায়েল সফর করে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সাথে বৈঠক করেন। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে হওয়া ইসরায়েল-ইরান প্রত্যক্ষ সামরিক সংঘাতের সময়ও ইসরায়েলি মন্ত্রীরা প্রকাশ্যেই পাহলভীকে ইরানের ‘বিশ্বস্ত বিকল্প’ নেতা হিসেবে সমর্থন দিয়েছেন।
মসজিদ পোড়ানো ও ধর্মীয় চিহ্নে আঘাত: বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিক্ষোভকারীরা তেহরানের বিভিন্ন স্থানে মসজিদে অগ্নিসংযোগ করেছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি কোনো ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং ইসলাম-বিদ্বেষী ইহুদি শাসক গোষ্ঠীর ইন্ধন রয়েছে। কারণ কোনো ধর্মপ্রাণ মুসলিমের পক্ষে কোনো অবস্থাতেই মসজিদের মতো পবিত্র স্থানে আগুন দেওয়া সম্ভব নয়।
এর মাধ্যমে ইসরায়েল বর্তমান ধর্মীয় শাসনের প্রতি চরম অনাস্থা তুলে ধরতে এবং নিজেদের অনুগত রাজতন্ত্রের ধর্মনিরপেক্ষ ভাবমূর্তিতে ফিরে যাওয়ার একটি প্রতীকী চেষ্টা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, বিক্ষোভকারীরা পাহলভি আমলের পতাকা উড়িয়ে বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনেইর বিরুদ্ধে ‘স্বৈরশাসকের মৃত্যু’ স্লোগান দিচ্ছে।
ইসরায়েলি ‘সফট ওয়ার’ ও ইরানের অভিযোগ: ইরানি কর্মকর্তারা দাবি করছেন, ২০২৫ সালের জুনে হওয়া ‘১২ দিনের যুদ্ধে’ সামরিকভাবে সুবিধা করতে না পেরে ইসরায়েল এখন গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের মাধ্যমে ইরানের ভেতরে অস্থিরতা ছড়াচ্ছে। ইসরায়েল পাহলভি সমর্থিত দলগুলোকে অর্থ ও কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে বলে তেহরান অভিযোগ করেছে। বিশেষ করে পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং প্রযুক্তিগত সহায়তার নামে পাহলভীর দল ইসরায়েলি বিশেষজ্ঞদের সাথে যে সমন্বয় করছে, তাকে ‘শাসন পরিবর্তনের নীল নকশা’ হিসেবে দেখছে ইরান সরকার।
ইরানের এই বিক্ষোভ এখন আর কেবল রুটি-রুজির লড়াই নেই; এটি ভূ-রাজনৈতিক এক বিশাল লড়াইয়ের ময়দান হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে যেমন ইসরায়েল ও পাহলভি একটি ‘মুক্ত ও গণতান্ত্রিক’ ইরানের স্বপ্ন দেখাচ্ছে, অন্যদিকে তেহরান এটিকে দেখছে বিদেশি শক্তির মাধ্যমে দেশের সার্বভৌমত্ব ধ্বংস ও ইসরায়েলি দাসত্ববরণের চেষ্টা হিসেবে।
অনেক বিশ্লেষক সতর্ক করেছেন, ইরানের ভেতরে রাজতন্ত্রের সমর্থন এখনো নগন্য এবং পাহলভি একক বিরোধী নেতা হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। তবুও, এই প্রতীকী আন্দোলনের গুরুত্ব অপরিসীম। বর্তমান বিক্ষোভের চালিকাশক্তি তরুণ প্রজন্ম, যাদের পাহলভি আমল সম্পর্কে কোনো প্রত্যক্ষ স্মৃতি নেই।
কবির আহমেদ/ইবিটাইমস/এম আর



















