শেখ ইমন, ঝিনাইদহ : ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার বাথানগাছি গ্রামের কৃষক আরুল হকের হাত ধরে স্থানীয় পর্যায়ে গুটি সার উৎপাদনে নতুন সম্ভাবনার সূচনা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত ছিটানো সারের উচ্চমূল্য ও অপচয়ের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য তার এই উদ্যোগ এখন আশার আলো হয়ে উঠছে।
২০১১ সালে কৃষি অফিসের আয়োজিত একটি প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণের মাধ্যমে ইউরিয়া,পটাশ ও ডিএপি সার মিশ্রণের আধুনিক পদ্ধতিতে গুটি সার তৈরির কৌশল শেখেন আরুল হক। প্রশিক্ষণ শেষে নিজ উদ্যোগে পরীক্ষামূলকভাবে গুটি সার উৎপাদন শুরু করেন তিনি। মহেশপুর উপজেলায় তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি বাণিজ্যিকভাবে গুটি সার উৎপাদনের উদ্যোগ নেন বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ।
নির্ধারিত অনুপাতে ইউরিয়া,পটাশ ও ডিওপি সার একত্রে ঢেলে প্রথমে তৈরি করা হচ্ছে একটি সুষম মিশ্রণ। এই মিশ্রণটি স্থানীয়ভাবে তৈরি একটি বিশেষ মেশিনে ঢালা হলে শুরু হয় প্রক্রিয়াজাতকরণ। যান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মিশ্রিত সার ধীরে ধীরে গুটি আকার ধারণ করে বের হয়ে আসে। প্রস্তুত হওয়া এসব গুটি সার পরে কিছুটা শুকিয়ে সংরক্ষণ করা হয়।
গুটি সার মূলত ইউরিয়া,পটাশ ও ডিএপি সার নির্দিষ্ট অনুপাতে মিশিয়ে বিশেষ পদ্ধতিতে ছোট ছোট দানার আকারে তৈরি করা হয়। এই সার সরাসরি গাছের গোড়ায় প্রয়োগ করা হয়,ফলে সারের অপচয় কম হয় এবং মাটির গভীরে ধীরে ধীরে গলে শিকড়ে পৌঁছে যায়।
কৃষক আরুল হক বলেন,‘ছিটানো সার দিলে বেশিরভাগ সার বাতাসে উড়ে যায় বা সেচের পানিতে ভেসে নষ্ট হয়। কিন্তু গুটি সার গাছের গোড়ায় দিলে একদম শিকড়ে পৌঁছায়। এতে অল্প সারেই ভালো ফলন পাওয়া যায়। আমার নিজের জমিতে ধান,গম ও সবজি চাষে এর ভালো ফল পেয়েছি।
তিনি আরও বলেন,গুটি সার ব্যবহারে একদিকে যেমন সারের পরিমাণ কম লাগে। ফলে সার খরচ কমে যায়।’
গুটি সার ব্যবহারের ফলে কৃষকের সার বাবদ খরচ কমে আসে। পাশাপাশি সারের কার্যকারিতা বাড়ায় ফসলের ফলন বৃদ্ধি পায়। এতে কৃষকের লাভজনকতা বাড়ছে এবং কৃষি উৎপাদন আরও টেকসই হচ্ছে।
আরুল হকের সাফল্য দেখে আশপাশের অনেক কৃষক এখন গুটি সারের দিকে ঝুঁকছেন। বাথানগাছি গ্রামের কৃষক আব্দুল মালেক বলেন,‘আগে এক বিঘা জমিতে যে পরিমাণ সার লাগতো,গুটি সার ব্যবহার করে তার চেয়ে কম সারেই ভালো ফলন পেয়েছি।’
একই গ্রামের কৃষক শফিকুল ইসলাম জানান,‘গুটি সার ব্যবহার করার পর জমির মাটিও আগের চেয়ে নরম ও উর্বর মনে হচ্ছে। আগের মতো বারবার সার দিতে হচ্ছে না।’
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে,সরকারিভাবে পৃষ্ঠপোষকতা ও সহজ ঋণের ব্যবস্থা করা গেলে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে গুটি সার উৎপাদন আরও বিস্তৃত করা সম্ভব। এতে একদিকে যেমন কর্মসংস্থান তৈরি হবে,অন্যদিকে কৃষক পর্যায়ে উৎপাদন খরচ কমে খাদ্য উৎপাদন বাড়বে। সব মিলিয়ে,বাথানগাছি গ্রামের কৃষক আরুল হকের গুটি সার উৎপাদনের উদ্যোগ মহেশপুরসহ ঝিনাইদহ জেলার কৃষিতে একটি টেকসই ও সম্ভাবনাময় দৃষ্টান্ত হয়ে উঠছে।
মহেশপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ইয়াসমিন সুলতানা বলেন,‘গুটি সার ব্যবহারে সারের অপচয় কম হয় এবং মাটির স্বাস্থ্য ভালো থাকে। পরিবেশবান্ধব এই পদ্ধতিটি কৃষকদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে আমরা নিয়মিত পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। গুটি সার প্রযুক্তি সম্প্রসারণ করা গেলে মহেশপুরসহ আশপাশের এলাকায় ফসল উৎপাদনে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। আরুল হকের মতো উদ্যোক্তারা এগিয়ে এলে স্থানীয় পর্যায়ে সার সংকটও অনেকটাই কমানো সম্ভব।’
ঢাকা/ইবিটাইম/এসএস





















