ভিয়েনা ১০:০৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৭ জানুয়ারী ২০২৬, ২৪ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম :

অযত্নে ম্লান ঝিনাইদহের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস

  • EuroBanglaTimes
  • আপডেটের সময় ১২:১৪:৩৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ৫ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৫২ সময় দেখুন

শেখ ইমন, ঝিনাইদহ : ঝিনাইদহের ইতিহাস মানেই শুধু অতীত নয়-এটি এই জনপদের আত্মপরিচয়। সময়ের স্রোতে কালের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ঝিনাইদহের শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহাসিক ও হেরিটেজ স্থাপনাগুলো আজ চরম অবহেলার শিকার। অযত্ন,অপরিকল্পিত ব্যবহারে ক্ষয় আর যথাযথ সংরক্ষণ ও তদারকির অভাবে জেলার ইতিহাস-ঐতিহ্যের গর্ব বহনকারী জেলার ৬ উপজেলায় ছড়িয়ে থাকা ২১টি হেরিটেজ স্থাপনাই এখন অস্তিত্ব সংকটে।
স্থানীয়দের আশঙ্কা,দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ না নিলে অমূল্য এসব স্থাপনার গল্প ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে খুঁজতে হবে কেবল ইতিহাসের বইয়ের পাতায়।

জেলার মহেশপুর উপজেলার খালিশপুরে অবস্থিত ১৯ শতকে নির্মিত প্রাচীন নীলকুঠি ভবনটি এক সময় ঔপনিবেশিক শাসনামলের সাক্ষী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক নিদর্শন ছিল। ২০১২ সালের ১৪ জুন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের গেজেটে তালিকাভুক্ত হলেও বাস্তবে ভবনটির রক্ষণাবেক্ষণে নেই কার্যকর কোনো উদ্যোগ। চুন-সুড়কি,ইট ও টালির তৈরি এই স্থাপনাটির ছাদ দিয়ে চুইয়ে পড়ে বৃষ্টির পানি,দেয়ালে ধরেছে শ্যাওলা ও বড় বড় ফাটল। অযত্নে পড়ে থাকায় ভবনের ভেতরে এখন সাপ,ব্যাঙ,শেয়াল ও কুকুরের অবাধ বিচরণ।
এটি শুধু একটি স্থাপনার চিত্র নয়। জেলার মিয়ার দালান,শৈলকুপার ঐতিহাসিক শাহী মসজিদ,নলডাঙ্গা রাজবাড়ি ও মন্দির,বারোবাজারের ঐতিহাসিক মসজিদ,কৃষক আন্দোলনের নেত্রী ইলা মিত্র ও গণিতবীদ কেপি বসুর বসতভিটাসহ জেলার তালিকাভুক্ত ২১টি হেরিটেজ স্থাপনার অধিকাংশই আজ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে মৃত্যুপথযাত্রী।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী,জেলার ৬টি উপজেলায় এখন পর্যন্ত মোট ২১টি ঐতিহাসিক ও প্রত্নসম্পদসমৃদ্ধ স্থাপনা হেরিটেজ তালিকাভুক্ত রয়েছে। কাগজে-কলমে এসব স্থাপনা রাষ্ট্রীয়ভাবে সংরক্ষিত হলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। মাঠপর্যায়ে দেখা যাচ্ছে,অধিকাংশ স্থাপনাই নেই কার্যকর রক্ষণাবেক্ষণ ও সুরক্ষার আওতায়। গেজেটভুক্ত হওয়া সত্ত্বেও বাস্তব সংরক্ষণ কার্যত অনুপস্থিত।
শতবর্ষী এসব স্থাপনার অনেকগুলোই আজ সময়ের সঙ্গে লড়াই করে টিকে আছে। নিয়মিত সংস্কার,নিরাপত্তা বেষ্টনী,সাইনবোর্ড কিংবা পর্যবেক্ষক না থাকায় অনেক স্থাপনাই ধীরে ধীরে বিলীন হওয়ার পথে।

তারা বলছেন,শুধু গেজেট প্রকাশ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো রক্ষায় প্রয়োজন নিয়মিত জরিপ,দ্রুত সংস্কার পরিকল্পনা,পর্যাপ্ত বরাদ্দ ও স্থানীয় জনগণের সম্পৃক্ততা। তা না হলে অদূর ভবিষ্যতে ঝিনাইদহ তার মূল্যবান ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য হারাতে পারে। এসব হেরিটেজ স্থাপনা শুধু অতীতের নিদর্শন নয়-এগুলো স্থানীয় পরিচয়,ইতিহাস ও সম্ভাবনাময় পর্যটন শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অথচ অবহেলা আর তদারকির অভাবে সেগুলো আজ নিঃশব্দে ধ্বংসের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে তালিকাভুক্ত ২১টি স্থাপনাই ভবিষ্যতে কেবল নথির পাতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে-বাস্তবে থাকবে না কোনো চিহ্ন। এখনই যদি কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়,তবে ঝিনাইদহের ইতিহাস-ঐতিহ্যের অমূল্য নিদর্শনগুলো অচিরেই হারিয়ে যাবে কালের গহ্বরে-থেকে যাবে শুধু স্মৃতি আর আফসোস।

তালিকাভুক্তির পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি কার্যত থেমে যায়। কোনো কোনো স্থাপনা ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে থাকায় সংরক্ষণ নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। আবার কোথাও স্থানীয় প্রশাসন,প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ও ভূমি অফিসের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম শুরুই হয়নি।
ইলা মিত্র স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদের সদস্য সচিব সুজন বিপ্লব বলেন,‘ইতিহাসের সাক্ষী এসব স্থাপনা রক্ষায় জরুরি ভিত্তিতে সংস্কার,নিয়মিত তদারকি ও জনসম্পৃক্ততা প্রয়োজন। শুধু গেজেটভুক্ত করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। না হলে অযত্নে এগুলো একদিন নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।”

এ বিষয়ে ঝিনাইদহের জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মাসউদ বলেন,‘হেরিটেজ স্থাপনাগুলো সংরক্ষণে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ধাপে ধাপে সংস্কার ও তদারকির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।’
ঢাকা/ইবিটাইমস/এসএস

জনপ্রিয়

টাঙ্গাইলে এসআইদের প্রশিক্ষণ সমাপনী কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠিত

Address : Erlaaer Strasse 49/8/16 A-1230 Vienna,Austria. Mob : +43676848863279, 8801719316684 (BD) 8801911691101 ( Ads) Email : eurobanglatimes123@gmail.com
Translate »

অযত্নে ম্লান ঝিনাইদহের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস

আপডেটের সময় ১২:১৪:৩৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ৫ জানুয়ারী ২০২৬

শেখ ইমন, ঝিনাইদহ : ঝিনাইদহের ইতিহাস মানেই শুধু অতীত নয়-এটি এই জনপদের আত্মপরিচয়। সময়ের স্রোতে কালের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ঝিনাইদহের শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহাসিক ও হেরিটেজ স্থাপনাগুলো আজ চরম অবহেলার শিকার। অযত্ন,অপরিকল্পিত ব্যবহারে ক্ষয় আর যথাযথ সংরক্ষণ ও তদারকির অভাবে জেলার ইতিহাস-ঐতিহ্যের গর্ব বহনকারী জেলার ৬ উপজেলায় ছড়িয়ে থাকা ২১টি হেরিটেজ স্থাপনাই এখন অস্তিত্ব সংকটে।
স্থানীয়দের আশঙ্কা,দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ না নিলে অমূল্য এসব স্থাপনার গল্প ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে খুঁজতে হবে কেবল ইতিহাসের বইয়ের পাতায়।

জেলার মহেশপুর উপজেলার খালিশপুরে অবস্থিত ১৯ শতকে নির্মিত প্রাচীন নীলকুঠি ভবনটি এক সময় ঔপনিবেশিক শাসনামলের সাক্ষী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক নিদর্শন ছিল। ২০১২ সালের ১৪ জুন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের গেজেটে তালিকাভুক্ত হলেও বাস্তবে ভবনটির রক্ষণাবেক্ষণে নেই কার্যকর কোনো উদ্যোগ। চুন-সুড়কি,ইট ও টালির তৈরি এই স্থাপনাটির ছাদ দিয়ে চুইয়ে পড়ে বৃষ্টির পানি,দেয়ালে ধরেছে শ্যাওলা ও বড় বড় ফাটল। অযত্নে পড়ে থাকায় ভবনের ভেতরে এখন সাপ,ব্যাঙ,শেয়াল ও কুকুরের অবাধ বিচরণ।
এটি শুধু একটি স্থাপনার চিত্র নয়। জেলার মিয়ার দালান,শৈলকুপার ঐতিহাসিক শাহী মসজিদ,নলডাঙ্গা রাজবাড়ি ও মন্দির,বারোবাজারের ঐতিহাসিক মসজিদ,কৃষক আন্দোলনের নেত্রী ইলা মিত্র ও গণিতবীদ কেপি বসুর বসতভিটাসহ জেলার তালিকাভুক্ত ২১টি হেরিটেজ স্থাপনার অধিকাংশই আজ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে মৃত্যুপথযাত্রী।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী,জেলার ৬টি উপজেলায় এখন পর্যন্ত মোট ২১টি ঐতিহাসিক ও প্রত্নসম্পদসমৃদ্ধ স্থাপনা হেরিটেজ তালিকাভুক্ত রয়েছে। কাগজে-কলমে এসব স্থাপনা রাষ্ট্রীয়ভাবে সংরক্ষিত হলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। মাঠপর্যায়ে দেখা যাচ্ছে,অধিকাংশ স্থাপনাই নেই কার্যকর রক্ষণাবেক্ষণ ও সুরক্ষার আওতায়। গেজেটভুক্ত হওয়া সত্ত্বেও বাস্তব সংরক্ষণ কার্যত অনুপস্থিত।
শতবর্ষী এসব স্থাপনার অনেকগুলোই আজ সময়ের সঙ্গে লড়াই করে টিকে আছে। নিয়মিত সংস্কার,নিরাপত্তা বেষ্টনী,সাইনবোর্ড কিংবা পর্যবেক্ষক না থাকায় অনেক স্থাপনাই ধীরে ধীরে বিলীন হওয়ার পথে।

তারা বলছেন,শুধু গেজেট প্রকাশ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো রক্ষায় প্রয়োজন নিয়মিত জরিপ,দ্রুত সংস্কার পরিকল্পনা,পর্যাপ্ত বরাদ্দ ও স্থানীয় জনগণের সম্পৃক্ততা। তা না হলে অদূর ভবিষ্যতে ঝিনাইদহ তার মূল্যবান ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য হারাতে পারে। এসব হেরিটেজ স্থাপনা শুধু অতীতের নিদর্শন নয়-এগুলো স্থানীয় পরিচয়,ইতিহাস ও সম্ভাবনাময় পর্যটন শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অথচ অবহেলা আর তদারকির অভাবে সেগুলো আজ নিঃশব্দে ধ্বংসের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে তালিকাভুক্ত ২১টি স্থাপনাই ভবিষ্যতে কেবল নথির পাতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে-বাস্তবে থাকবে না কোনো চিহ্ন। এখনই যদি কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়,তবে ঝিনাইদহের ইতিহাস-ঐতিহ্যের অমূল্য নিদর্শনগুলো অচিরেই হারিয়ে যাবে কালের গহ্বরে-থেকে যাবে শুধু স্মৃতি আর আফসোস।

তালিকাভুক্তির পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি কার্যত থেমে যায়। কোনো কোনো স্থাপনা ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে থাকায় সংরক্ষণ নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। আবার কোথাও স্থানীয় প্রশাসন,প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ও ভূমি অফিসের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম শুরুই হয়নি।
ইলা মিত্র স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদের সদস্য সচিব সুজন বিপ্লব বলেন,‘ইতিহাসের সাক্ষী এসব স্থাপনা রক্ষায় জরুরি ভিত্তিতে সংস্কার,নিয়মিত তদারকি ও জনসম্পৃক্ততা প্রয়োজন। শুধু গেজেটভুক্ত করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। না হলে অযত্নে এগুলো একদিন নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।”

এ বিষয়ে ঝিনাইদহের জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মাসউদ বলেন,‘হেরিটেজ স্থাপনাগুলো সংরক্ষণে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ধাপে ধাপে সংস্কার ও তদারকির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।’
ঢাকা/ইবিটাইমস/এসএস