বুলগেরিয়ান পুলিশের বিরুদ্ধে ইউরোপীয় ইউনিয়নের স্থল ও সমুদ্র সীমান্তে সীমান্ত নিরাপত্তা সংস্থা ফ্রন্টেক্স অভিযোগ এনেছেন
ইউরোপ ডেস্কঃ তুরস্ক-বুলগেরিয়া সীমান্তে তুষার ও ঠান্ডায় ১৫ থেকে ১৭ বছর বয়সি তিন মিশরীয় কিশোরের মৃত্যু নিয়ে বুলগেরিয়ান সীমান্ত পুলিশের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তুলেছে ইউরোপীয় সীমান্ত সংস্থা ফ্রন্টেক্স।
সংস্থাটি বলছে, সময়ের মধ্যে উদ্ধার না করা, গুরুতর অবহেলা এবং এনজিওগুলোর উদ্ধারকাজে বাধা দেওয়র কারণে এই প্রাণহানি ঘটেছে।
ফ্রন্টেক্সের মৌলিক অধিকার ব্যুরো (এফআরও) নভেম্বরের শুরুতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানায়, এ ঘটনার সময় বুলগেরিয়ান কর্তৃপক্ষের কাছে যথেষ্ট তথ্য ছিল যে অভিবাসীরা “জীবন–মরণ পরিস্থিতিতে” রয়েছে। অথচ পুলিশ যথাসময়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়নি।
সংস্থাটি আরও বলেছে, যেহেতু ভুক্তভোগীরা অপ্রাপ্তবয়স্ক, তাই শিশু–সুরক্ষা সংক্রান্ত বাধ্যবাধকতাও পালন করেনি বুলগেরিয়া এবং তাদের আচরণ ছিল অবহেলার।
ঘটনার বিবরণ: মানবাধিকার সংস্থা ‘কলেত্তিভো রোতে বালকানিকে’ এবং ‘নো নেম কিচেন’-এর জরুরি ফোনে বার্তায় বলা হয়, বুলগেরিয়ার দক্ষিণ–পূর্বাঞ্চলের গাবার এলাকার একটি বনভূমিতে তিন কিশোর মারাত্মক বিপদে আছে। সংস্থাগুলো জানায়, ভিডিওতে দু’জনকে বরফের ওপর অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়।
এনজিও কর্মীরা সঙ্গে সঙ্গেই ইউরোপীয় জরুরি নম্বর ১১২–তে ফোন করেন এবং জিপিএস–লোকেশন অনুসরণ করে জায়গায় পৌঁছানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু তাদের অভিযোগ, বুলগেরিয়ান সীমান্ত পুলিশ তাদের পথ আটকে দেয়।
এক কর্মী ইউরোপের অভিবাসন বিষয়ক গণমাধ্যম ইনফোমাইগ্র্যান্টসকেঞজানায়, “পুলিশ আমাদের দেখে গাড়ি আড়াআড়ি করে আটকায়। আমাদের ফিরে আসা ছাড়া উপায় ছিল না।”
প্রথম সতর্কবার্তার ২৪ ঘণ্টা পর, বিকল্প পথ ব্যবহার করে উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায় এবং দু’জনের মৃতদেহ খুঁজে পায়। যাদের একজন বরফে ঢাকা, আরেকজন পানিতে মুখ থুবড়ে। পরদিন পাওয়া যায় তৃতীয় জনকে।
পুলিশের অস্বীকার: বুলগেরিয়ান সীমান্ত পুলিশ ফ্রন্টেক্সকে জানায়, তারা উদ্ধার কাজে বাধা দেয়নি। তাদের দাবি, এনজিও যে জিপিএস দিয়েছিল তা নাকি “ভুল বা বিভ্রান্তিকর” ছিল এবং তারা পাওয়া সব সংকেতে “তাৎক্ষণিক সাড়া” দিয়েছে। কিন্তু তদন্ত শেষে ফ্রন্টেক্স বলছে, এনজিওর পাঠানো লোকেশন গুলোর সঙ্গে মৃতদেহ পাওয়া জায়গার মাত্র কয়েক মিটার ব্যবধান ছিল। সংস্থা উপসংহার টানে, বুলগেরিয়ান কর্তৃপক্ষ সক্রিয়ভাবে উদ্ধার বাধা দিয়েছে।
ফ্রন্টেক্স বলেছে, “এভাবে উদ্ধার বাধাগ্রস্ত করা মানুষের জীবনরক্ষার মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের শামিল।”
ফ্রন্টেক্সের উদ্বেগ ও বুলগেরিয়ার নীরবতা: ফ্রন্টেক্স জানায়, “বুলগেরিয়ান কর্তৃপক্ষ বহুবার জরুরি বিপদ–সংকেতে সঠিকভাবে সাড়া দেয়নি৷ এমন অভিযোগ উদ্বেগজনক।” সংস্থা বুলগেরিয়াকে আহ্বান জানায় সকল ব্যর্থ উদ্ধার–অভিযানের তদন্ত, তথ্য–বিনিময় ও সমন্বয় জোরদার করার জন্য।
এখনও পর্যন্ত বুলগেরিয়ার পক্ষ থেকে কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি ৷
ঘটনার অন্যতম প্রতিবেদক সংগঠন ‘কলেত্তিভো রোতে বালকানিকে’ ফ্রন্টেক্সের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালেও বলেছে, “কোনো পদক্ষেপ না নিলে এসব কেবল চোখে ধুলা দেওয়ার মতো।” সংগঠনটি দাবি করেছে, ফ্রন্টেক্স যদি সত্যিই বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়, তবে বুলগেরিয়ান কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সব সহযোগিতা বন্ধ করতে হবে।
তাদের অভিযোগ, ফ্রন্টেক্সের নিজস্ব কর্মকর্তারাও একইভাবে এনজিওর উদ্ধারকাজ বাধাগ্রস্ত করেন। “২০২৫ সালের মার্চ থেকে ফ্রন্টেক্সের এজেন্টরা কয়েকবার আমাদের ঘন্টার পর ঘন্টা অনুসরণ করেছে, বাধা দিয়েছে, ফলে বিপদে থাকা অভিবাসীদের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।”
বর্বরতার অভিযোগ নতুন নয়: সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বুলগেরিয়া সীমান্তে ফ্রন্টেক্সের সদস্য বাড়ানো হয়েছে। বুলগেরিয়াও ২০২৫ সালে শেনজেন অঞ্চলে যোগ দেওয়ার পর তুরস্ক সীমান্তে কড়াকড়ি বাড়িয়েছে। কিন্তু বহু এনজিও ও অভিবাসীর বর্ণনা থেকে জানা যায়, বুলগেরিয়ান সীমান্তরক্ষীরা নিয়মিত ‘পুশব্যাক’ ও সহিংসতা চালায়।
ইনফোমাইগ্রেন্টস তুরস্ক সীমান্তের কাছে স্বিলেনগ্রাদে চারজন তরুণ মরোক্কান অভিবাসীর সঙ্গে কথা বলেছিল। ২৪ বছর বয়সই আমিন বলেন, “আমাকে পাঁচবার পুশব্যাক করা হয়েছে। পুলিশের লোকজন আমাদের ফোন, জামাকাপড়, টাকাসহ সব নিয়ে নেয়।”
বলকান ইনভেস্টিগেটিভ রিপোর্টিং নেটওয়ার্ক (বিআইআরএন)-এর এক অনুসন্ধানে জানা যায়, ফ্রন্টেক্স নিজেও অভ্যন্তরীণ নথিতে স্বীকার করেছে যে, বুলগেরিয়ার পুলিশ নিয়মিত সহিংস পুশব্যাক করে।
কবির আহমেদ/ইবিটাইমস





















