সাবেক মন্ত্রী নারায়ন চন্দ্রসহ তিন মাসে মহেশপুর সীমান্তে মানবপাচার ও চোরাচালানের সময় আটক ৩৫৩ জন

ঝিনাইদহ প্রতিনিধি: ঝিনাইদহের সীমান্তবর্তী উপজেলা মহেশপুর। এ উপজেলার সীমান্তের বড় একটি অংশ জুড়ে রয়েছে ইছামতি নদী। বেশ কিছু এলাকায় ভারতীয় অংশে নেই কাটাতারের বেড়া। সুযোগ সন্ধানী কিছু অসাধু ব্যক্তি ও চোরাকারবারীরা সীমান্তের কাটাতার বিহীন অংশে মানুষ পাচার সহ অবৈধ কার্যকলাপের জন্য ব্যবহারের চেষ্টা করে। দেশের পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে সীমান্তের প্রতিটি এলাকায় জোরদার করা হয়েছে স্বাভাবিকের তুলনায় কয়েকগুন নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ফলে বিজিবি’র অভিযানে প্রায়ই আটক হচ্ছে সাবেক মন্ত্রী,হত্যা মামলার আসামী,দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে দালালের মাধ্যমে ভারতে পাচারের চেষ্টারত নারী-পুরুষ ও দালাল এবং ভারতীয় নাগরিক।

সীমান্তের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে ও স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়,মাটিলা,বাঘাডাঙ্গা, খোশালপুর,ভবনগর,সামন্তাসহ সীমান্তের কাটাতারবিহীন এলাকা দিয়ে ঘটছে বাংলাদেশী নারী-পুরুষ,রোহিঙ্গা পাচার ও পাচারের চেষ্টা। পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে দেশের বিভিন্ন এলাকার অনেক রাজনৈতিক নেতা,সাবেক মন্ত্রীও ভারতে পালানোর চেষ্টা করছেন এসব সীমান্ত এলাকা দিয়ে। তবে পাচারের চেষ্টার ঘটনায় বিজিবি’র অভিযানে আটককৃতদের অধিকাংশই নারী। তারা সন্ধ্যা,মধ্যরাত ও ভোররাতের সময়কেই বেছে নেয় সীমান্ত পারাপারের জন্য।

স্থানীয়রা বলেছেন, সীমান্ত থেকে একটু দুরের মানুষ অবৈধ পাচারের সাথে জড়িত,কারণ সীমান্ত এলাকায় বিজিবি’র হাতে আটকের ভয় রয়েছে। তারা বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এনে নিজেদের জিম্মায় রেখে রাতে নদী সাতরিয়ে ভারতে পাচারের চেষ্টা করে।

জানা যায়,এসব পাচারের কাজের মুল হোতারা থাকেন যশোর জেলার চৌগাছা ও ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলা শহর ও আশপাশের এলাকায়। তাদের মাধ্যমে সীমান্তবর্তী এলাকার দালালরা ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকার বিনিময়ে অবৈধভাবে ভারতে নারী-পুরুষ পাচারের জন্য বাহক হিসাবে কাজ করে।
বিজিবি’র দেওয়া তথ্য অনুযায়ী,ঝিনাইদহের মহেশপুরের ভারত সীমান্তবর্তী এলাকা রয়েছে ৭৮ কিলোমিটার। এর মধ্যে সাড়ে ১০ কিলোমিটার অংশে খন্ড খন্ড আকারে ভারতের অভ্যন্তরে নেই কাটাতার। ফলে কাটাতার বিহীন অংশে মানুষ পাচার সহ অপরাধমুলক কাজের প্রবণতার চেষ্টা থাকে বেশী। অন্য এলাকার সাথে এসব অংশে দিনে ও রাতে আগের তুলনায় বাড়ানো হয়েছে কয়েকগুন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি’র) টহল ব্যবস্তা,চলছে নিয়মিত তল্লাসী। ফলে চলতি বছরের ৫ আগস্ট থেকে অক্টোবর মাসের ১৫ তারিখ পর্যন্ত সীমান্তের বিভিন্ন এলাকা থেকে ভারতে পাচারের চেষ্টার সময় ৩৫৩ জনকে আটক করেছে বিজিবি। এর মধ্যে সাবেক ভ’মিমন্ত্রী নারায়ন চন্দ্র, ঢাকা মহানগরের ৩৮ নং ওয়ার্ড যুবলীগের কর্মী ও হত্যা মামলার আসামী কিলার অনিক, ৯ জন দালাল, ১০ ভারতীয় নাগরিক, ১০ জন রোহিঙ্গা এবং শিশুসহ বাংলাদেশী নারী-পুরুষ ২৯৬ জন। যা আটকের হারে গেল এক বছরের তুলনায় অনেক বেশী।

২০২৩ সালের ১ অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ৯শ’ (৮৭৪ এর বেশী) মানুষকে পাচারের চেষ্টার ঘটনায় আটক করে বিজিবি। ভারত থেকে আসার সময়ও অনেকে আটক হয়। এদের মধ্যে বাংলাদেশী, ভারতীয় নারী-পুরুষ ছিল। সেসময় পাচারের ঘটনায় অভিযুক্ত অনেক দালালও আটক হয়। তবে পাসপোর্ট অধ্যাদেশ আইনের দুর্বলতা সীমান্তে অবৈধপাচার রোধে অন্যতম অন্তরায় বলে দাবি করেন সিনিয়র আইনজীবীরা। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসের ১৬ তারিখে ঝিনাইদহের মহেশপুর সীমান্তের মাটিলা এলাকায় বিজিবি-৫৮ ব্যাটালিয়ন কমান্ডার এর সাথে ৬৮ ও ৮ বিএসএফ ব্যাটালিয়ন কমান্ডার পর্যায়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

সেখানে বিএসএফ এর পক্ষ থেকে জানানো হয় গেল দুই মাসে সীমান্তে কমেছে পাচারের ঘটনা। সাধারণত বাংলাদেশীরা পাসপোর্ট বিহীন অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতের যাওয়ার চেষ্টার সময় বিজিবি’র হাতে আটক হলে তাদেরকে ১৯৭৩ সালের পাসপোর্ট অধ্যাদেশ আইনে মামলা করে থানায় সোপর্দ করা হয়। এই আইনে সাজা তিন মাস কারাদন্ড অথবা ৫শ’ টাকা জরিমানা। ফলে আদালতে আসামীরা জামিন ধরলে সাথে সাথেই জামিন হয়ে যায়। এছাড়া কোন বিদেশী নাগরিক বা ভারতীয় নাগরিক যদি অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে এসে আটক হয় তাহলে তাদের ক্ষেত্রে ‘দি কন্ট্রোল অফ এন্ট্রি এ্যাক্ট-১৯৫২’ আইনে মামলা করে থানায় সোপর্দ করা হয়। এই আইনে আসামীকে এক বছরের কারাদন্ডের নিয়ম রয়েছে তবে এক্ষেত্রে জরিমানা কত টাকা তা উল্লেখ নেই। তবে দুটি মামলাই জামিনযোগ্য।

নামক প্রকাশে অনিচ্ছুক বাঘাডাঙ্গা এলাকার এক কৃষক জানান,কাটাতার বিহীন এলাকা দিয়েই মানুষের ভারতে যাওয়ার চেষ্টা থাকে বেশী। তবে জড়িতদের অনেককেই আটক করছে বিজিবি।

সাম্প্রতিক সময়ে বিজিবি’র অভিযানে আটক রোহিঙ্গা পল্লীর এক রোহিঙ্গা নারী বলেন,‘জুলুলী এলাকার রবিউলের মাধ্যমে ইন্ডিয়ান ১৮ হাজার এবং বাংলাদেশী ৫ হাজার টাকায় সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাঠিয়ে দেবে এমন চুক্তি হয়েছিল। পরে রাতে বিজিবি আমাদের আটক করে।’

বিভিন্ন মামলার তথ্যসূত্রে জানা যায়,মহেশপুর উপজেলার জলুলী গ্রামের মিজানুর রহমানের ছেলে সজল,কুলতলা গ্রামের সামছুউদ্দিন মিজানুর রহমান,লেবুতলা গ্রামের ফজর আলী ছেলে আব্দুল সালাম,বাঘাবাঙ্গা গ্রামের আজিজুল খলিফার ছেলে আফান খলিফা,পরমানিকের ছেলে হৃদয়, মাইলবাড়িয়া গ্রামের সুমন,নুর-ইসলামের ছেলে মফিজ খোড়া,নেপা গ্রামের ফজলু রহমানের লাল মিয়া,সলেমানপুর গ্রামের ইব্রাহীম ছেলে কদম আলী,একই গ্রামের সুজন আলী ও সোবহান সহ সীমান্ত এলাকার শর্তাধিক দালাল রয়েছে যারা মানব চোরাচালানের সাথে জড়িত। এদের বিরুদ্ধে মানবপাচার প্রতিরোধ আইনে একাধিক মামলা রয়েছে।

মানবাধিকার সংগঠন (আরডিসির) নিবার্হী প্রধান আব্দুর রহমান বলেন,‘মামলার আসামীদের আটক করতে পারলে সীমান্তের মানব চোরাচালান অনেকটাই কমে আসবে।’

ঝিনাইদহের সিনিয়র আইনজীবী শেখ আব্দুল্লাহ মিন্টু বলেন,‘আইনের মাধ্যমে মানুষকে সাজা দেওয়ার মানেই হল নজির স্থাপন করা বা ভীতি সঞ্চার করা। যাতে করে দন্ডিত ব্যক্তি বা অন্য যারা অপরাধের সাথে জড়িত তারা এটা দেখে ভয় পায় এবং ভবিষ্যতে অপরাধ মুলক কর্মকান্ড থেকে বেরিয়ে আসে।’

ঝিনাইদহের মহেশপুর বিজিবি-৫৮ ব্যাটালিয়নের পরিচালক শাহ মো: আজিজুস শহীদ বলেন, ‘আগের তুলনায় সীমান্তে অবৈধ পাচার কমেছে কয়েকগুন। বিজিবি নজরদারীতে পদ্ধতি বদলেছে। যার সফলতাও আসছে। পাচার রোধে ভারত অংশে কাটাতার নির্মাণে বিএসএফ এর সাথে ফলপ্রসু আলোচনা হয়েছে।’

শেখ ইমন/ইবিটাইমস 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit exceeded. Please complete the captcha once again.

Translate »