বিদেশি নাগরিকেরা যাতে তাদের পরিবারের সদস্যদের দেশটিতে আনতে না পারেন, সেজন্য আয়ের সীমা বাড়ানোসহ বিভিন্ন শর্ত আরোপ করতে যাচ্ছে দেশটির রক্ষণশীল সরকার
ইউরোপ ডেস্কঃ ইউরোপের বিভিন্ন ভাষায় প্রকাশিত অভিবাসন বিষয়ক অনলাইন পত্রিকা ইনফোমাইগ্র্যান্টস তাদের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে। পত্রিকাটি আরও জানায় যুক্তরাজ্য সরকারের নতুন এই কঠিন শর্তের কারণে অনেক পরিবার ভাঙ্গনের মুখে রয়েছে বলে উঠে এসেছে সাম্প্রতিক এক গবেষণায় ৷
নেট মাইগ্রেশন (একটি দেশে আসা এবং ওই দেশ ছেড়ে যাওয়া মানুষের পার্থক্য) কমাতে যুক্তরাজ্য সরকার গত ৪ ডিসেম্বর নতুন একটি পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে৷ দেশটিতে দীর্ঘমেয়াদি কাজের ভিসা নিয়ে বসবাসরত বিদেশিরা যাতে তাদের পরিবারের সদস্যদের যুক্তরাজ্যে আনতে না পারেন, সেজন্য ন্যূনতম আয়ের সীমাকে ৩৮ হাজার ৭০০ পাউন্ডে উন্নীত করা হয়েছে ৷
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইগ্রেশন অবজারভেটরি এর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, আয়ের সীমাটি বিশ্বে সর্বোচ্চ এবং এই অংকটি যুক্তরাজ্যের ৭০ শতাংশ স্থানীয় মানুষের বার্ষিক বেতনের চেয়েও বেশি৷এই সিদ্ধান্ত আগামী বছরের এপ্রিল থেকে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে ৷ কিন্তু ইতিমধ্যেই দেশটিতে বসবাসররত অভিবাসীরা আতঙ্কের মধ্যে পড়ে গেছেন ৷ পরিবারের সদস্যদের নিজের কাছে এনে রাখা সম্ভব হবে না, এমন শঙ্কায় দিন পার করছেন তারা ৷
ভিন্ন জাতীয়তা একজনকে বিয়ে করেছেন তুর্কি নারী রেবেকা কেয়া৷ তার বর একজন কুর্দিশ, নাম বারান৷ যুক্তরাজ্যের ভিসা পেতে অর্থ সংগ্রহ নিয়ে নানা কিছু করেছেন তারা৷ বারানের কর্মস্থল থেকে আসা মাসিক আয়ের একটি অংশ সঞ্চয় করা, পারিবারিকে আতিথেয়তা ব্যবসা থেকে কিছুটা অর্থ যোগাড় করা, রেবেকার অনলাইনে অলংকার বিক্রি, রেবেকার বাবার কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া অর্থ দিয়ে ন্যূনতম সঞ্চয়ের লক্ষ্য পূরণ করেছেন ৷
রয়টার্সকে তারা জানিয়েছেন, তারা যুক্তরাজ্যের একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে প্রয়োজনীয় সাড়ে ৬২ হাজার পাউন্ড জমা করেছেন৷ ভিসা পেতে সময় লাগবে ন্যূনতম ছয় মাস৷ এরপর তারা তুরস্ক থেকে দম্পতি হিসেবে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমাবেন৷ ন্যূনতম আয়সীমার মতো সঞ্চয়ের সীমাও বাড়ানো হবে কিনা তা এখনও স্পষ্ট নয়৷ তবে অভিবাসন বিষয়ক আইনজীবীরা আশা করছেন, যুক্তরাজ্য সরকার এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারে৷ ফলে, সঞ্চয় যথেষ্ট হবে কিনা, তা নিয়ে এখন ভয় পাচ্ছেন কায়া ৷
আগামী বছরের নির্বাচনকে সামনে রেখে অনিয়মিত অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি নিয়মিত অভিবাসীদের সংখ্যা কমাতে দিন দিন কঠোর সব নীতি গ্রহণ করছে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাকের প্রশাসন ৷ রিইউনাইট ফ্যামিলিজ ইউকে (আরএফইউকে) জানিয়েছে, যুক্তরাজ্য সরকারের এমন ঘোষণায় কেয়ার মতো আরো অনেক পরিবার এখন উদ্বিগ্ন ৷
সংস্থাটির সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বর্তমানে যে নীতিমালা আছে (যা আরো বেশি কঠোর হতে যাচ্ছে), তার কারণে অনেক পরিবারের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে, অবনতি হচ্ছে মানসিক স্বাস্থ্যের। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, বর্তমান নীতিমালার কারণে সিঙ্গল প্যারেন্ট পরিবার তৈরি হচ্ছে, অসমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন মায়েরা, নারী ও তরুণেরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন ৷ এছাড়া, যারা লন্ডনের বাইরে বসবাস করেন তাদের পক্ষে ন্যূনতম আয়সীমায় পৌঁছাতে আরো বেশি যুদ্ধ করতে হচ্ছে ৷ বর্তমান নীতিমালা কারণে সৃষ্ট আর্থিক কষ্ট এবং দীর্ঘ সময় দূরে থাকার কারণে অনেক বিবাহ বিচ্ছেদের ঘটনাও ঘটছে৷ কোনো কোনো ক্ষেত্রে সন্তানেরা বাবা বা মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ হারিয়ে ফেলছে ৷
এসব কারণে, শিশুদের ওপর আরো বেশি মানসিক চাপ পড়ছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা৷ আরএফইউকে এর মতে, সমীক্ষায় অংশ নেয়া ৯২ শতাংশ অভিভাবক জানিয়েছেন, তাদের সন্তানেরা খাদ্যগ্রহণ জনিত সমস্যা, হতাশায় ভোগাসহ নানা ধরনের আচরণগত সমস্যার কারণে নিজের ক্ষতি বা আত্মহত্যার মতো সংকটে ভুগছে ৷
ব্রাজিলের ম্যানুয়েলকে বিয়ে করেছেন ব্রিটিশ নারী রাকেল৷ তিনিও অংশ নিয়েছেন ওই সমীক্ষায়৷ জানিয়েছেন, আয়সীমা পূরণ করতে না পারায় তাদের বড় সন্তান গত চার বছরে একবার বাবাকে দেখার সুযোগ পেয়েছে ৷ বাবার সঙ্গে এই দূরত্বে মানসিক বিষাদে ভুগছে তার আদরের সন্তান ৷
যুক্তরাজ্য সরকারের এমন কঠোর নীতির কারণে ভিন্ন জাতীয়তার আরেকটি বিয়ে ভেঙে গেছে৷ সংসার ভাঙনের পর মা স্যালি এবং তার ১৩ বছর বয়সি মেয়ে ক্লারা—দুই জনই মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত হয়েছেন ৷
এসব বিবেচনায় নিয়ে আরএফইউকে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছে, পারিবারিক পুর্নমিলনের শর্তগুলো শিথিল করতে ৷ তা না হলে, এটির নেতিবাচক প্রভাবের শিকার হবেন অনেক দম্পতি ও তাদের সন্তানেরা ৷
কবির আহমেদ/ইবিটাইমস