বেলজিয়ামে খালের পাশে আশ্রয়প্রার্থীদের তাবুর বসতি স্থাপন

বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে আশ্রয়প্রার্থীদের আবাসন সংকট চরমে পৌঁছেছে

 কবির আহমেদঃ ইউরোপের অভিবাসন প্রত্যাশীদের নিয়ে বিভিন্ন ভাষায় প্রকাশিত অনলাইন পোর্টাল ইনফোমাইগ্র্যান্টস তাদের এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে,ব্রাসেলসে আশ্রয়হীন হয়ে শহরের যেখানে সেখানে তাঁবু খাঁটিয়ে কোনোরকম দিন পার করছেন নতুন আসা অভিবাসনপ্রত্যাশীরা।

ফ্লেমিশ রিফিউজি অ্যাকশন গ্রুপের উদ্ধৃতি দিয়ে তারা আরও জানায় সম্প্রতি একটি আশ্রয় শিবির উচ্ছেদ করায় শহরটির খালের পাড়ে এবং রাস্তায় তাঁবুর সংখ্যা বাড়ছে৷ গত ১৬ ফেব্রুয়ারি প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়েছে৷ জার্মানির সংবাদ সংস্থা ডিপিএ (DPA) জানিয়েছে, প্রতিদিনই শহরের কেন্দ্রে বা খালের পাশে আরও বেশি করে তাঁবু তোলা হচ্ছে। শহরের পেতি শাতু এলাকার সামনে থেকে শুরু করে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের তাঁবু ছড়িয়ে পড়েছে ফেদাজিল হয়ে পালে দে দ্রোটা পর্যন্ত৷

ফেদাজিল হলো বেলজিযয়ম সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত আশ্রয় অভ্যর্থনা পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান। সংবাদ মাধ্যমগুলো বলছে, তাঁবু খাঁটিয়ে যারা কোনো মতে টিকে আছেন তাদের অনেককে আশ্রয়প্রার্থীর মর্যাদা দিয়েছে বেলজিয়াম সরকার৷ কিন্তু থাকার জন্য নিরাপদ ও উষ্ণ বাসস্থান জোটেনি তাদের ভাগ্যে৷

বার্তা সংস্থা ডিপিএ জানিয়েছে, যারা এখন তাঁবুতে আছেন তাদের রাখার জন্য হোটেলও খুঁজছে কর্তৃপক্ষ। যারা কংক্রিটের ফুটপাতে ছোটো ছোটো তাঁবু ফেলে শীতের রাতে কোনোরকম আশ্রয় নিয়েছেন, তাদের জন্য কম্বল ও স্লিপিং ব্যাগ দিচ্ছে কিছু এনজিও সংস্থা। ফ্লেমিশ রিফিউজি অ্যাকশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে যারা তাঁবুতে আশ্রয় নিয়েছেন তাদের অনেকেই আগে স্কয়ারবিকের প্যালিজেনস্ট্রাটের একটি শিবিরে ছিলেন৷ কিন্তু ভেতরের পরিবেশ ‘অস্বাস্থ্যকর এবং অনিরাপদ’ হিসেবে চিহ্নিত করে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি উক্ত কেন্দ্র খালি করে ফেলেছে কর্তৃপক্ষ৷

ওই শিবিরের থাকতেন ইয়াসিন এবং রিয়াজুল্লাহ৷ তারা ফ্লেমিশ রিফিউজি অ্যাকশনকে জানিয়েছেন, শিবিরটি বেশ ‘বিপজ্জনক’ ছিল৷ সেখানে অনেক চোর থাকতেন জানিয়ে তারা আরো বলেন, ‘‘কিছু লোক সেখানে মাদক বিক্রি করতো। নিজেরা মারামারি করতো প্রায় সময়ই৷ কখনও কখনও রক্তও দেখা গেছে৷’’

উচ্ছেদের দিন সকালে ভিআরটি সংবাদ জানিয়েছে, ওই আশ্রয় শিবিরে এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে৷ তবে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে তখনও কেউ মন্তব্য করতে পারেনি৷ আশ্রয়শিবিরটি সরিয়ে ফেলার আগে নিবন্ধিত আশ্রয়প্রার্থীদের বিকল্প আবাসনের প্রস্তাব দিয়েছিল বেলজিয়ান কর্তৃপক্ষ৷ কিন্তু এক দুটি আশ্রয়শিবিরে থাকার জন্য উৎসুক আশ্রয়প্রার্থীদের সংখ্যা এতো বেড়ে গেছে যে দায়িত্বশীলরা তা আর গুছিয়ে করতে পারেনি। ভিআরটি জানিয়েছে, ‘বিশৃঙ্খল ঘটনা’-এর কারণে কম্বলে আগুন ধরে যায়৷ পরে ফায়ার সার্ভিসকে ডাকা হলে তারা এসে আগুন নিভায়।

ভিআরটি আরো জানিয়েছে, ওই শিবিরে যারা বসবাস করতেন তাদের অনেকেই ভেতর থেকে নিজেদের মালামালগুলো বের করে আনতে পারেননি৷ তার আগেই আশ্রয়প্রার্থীদের বের করে দিয়ে ভবনটি বন্ধ করে দেয়া হয়৷ ফলে তারা সবাই অসহায় হয়ে ফুটপাতে বসে ছিলেন৷.থাকার জায়গা না পেলে পরিস্থিতি আরও অবনতি হতে পারে বলে শঙ্কা করছে ফ্লেমিশ রিফিউজি অ্যাকশন৷ তাই নতুন আশ্রয় শিবির খুলতে বেলজিয়ামের সেনাবাহিনীর প্রতিও আহ্বান রেখেছে সংস্থাটি৷

ফ্লেমিশ রিফিউজি অ্যাকশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উচ্ছেদ হওয়া আশ্রয় শিবিরের নিবন্ধিত ১৬০ জনকে রুইসব্রুয়েকের একটি কেন্দ্রে সরিয়ে নেয়া হয়৷ কিন্তু অন্যরা পেটিট চ্যাটোর বাইরে অবস্থান নেয়৷ ১৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তাঁবুর সংখ্যা ছিল ৬০৷.ফ্লেমিশ রিফিউজি অ্যাকশন আরো জানিয়েছে, স্থানীয় এবং স্বেচ্ছাসেবকদের কারণে আশ্রয়প্রার্থীরা অন্তত তাঁবুর নিচে হলেও রাত কাটাতে পেরেছিলেন৷

সংস্থাটির দাবি, আশ্রয়প্রার্থীদের সংখ্যা বাড়ছে বলে বেলজিয়ামে এই অবস্থা তৈরি হয়নি৷ বরং অভিবাসনপ্রত্যাশীদের অভ্যর্থনা কেন্দ্রের সংখ্যা না বাড়ানোর কারণে এমন হয়েছে বলেও মনে করে তারা৷ তাই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলতে থাকা আশ্রয়শিবিরের সংখ্যা বাড়াতে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি৷ বেলজিয়াম সরকারকে অভিযুক্ত করে ফ্লেমিশ রিফিউজি অ্যাকশন বলছে, সরকার তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে, প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যাপ্ত জায়গার ব্যবস্থা না করাটাও ঠিক হয়নি৷ তারা বলছেন, ‘‘মানুষকে রাস্তায় ঘুমাতে দেয়া অপমানজনক৷’’

সংস্থাটির কথা হচ্ছে, বেলজিয়াম আইনগতভাবে আশ্রয়প্রার্থীদের আশ্রয় দিতে বাধ্য৷.কম্বল ও স্লিপিং ব্যাগ দিয়ে আশ্রয়প্রার্থীদের পাশে দাঁড়ালেও আবাসন সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে বেলজিয়াম সরকারের কাছে আহ্বান জানিয়েছে এনজিও ও স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলো৷ কম্বল ও স্লিপিং ব্যাগ দিয়ে আশ্রয়প্রার্থীদের পাশে দাঁড়ালেও আবাসন সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে বেলজিয়াম সরকারের কাছে আহ্বান জানিয়েছে এনজিও ও স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলো ৷

সংস্থাটি জানিয়েছে, প্রায় তিন হাজার মানুষ থাকার জায়গার জন্য অপেক্ষা করছেন। তারা বলছে, বেলজিয়ামের ৫৮১টি পৌরসভার প্রতিটি যদি পাঁচজন আশ্রয়প্রার্থীকে থাকার জায়গা করে দেয় তাহলে আবাসন সংকট কেটে যায়৷ আশ্রয়প্রার্থীদের মধ্যে অনেকই আছেন গত চার মাস ধরে যারা একটা থাকার জায়গা খুঁজেও পাচ্ছেন না ৷

ইইউ এজেন্সি ফর অ্যাসাইলাম (ইইউএএ) বলছে, ২০২২ সালে সবগুলো ইইউভুক্ত (আইসল্যান্ড, লিচেনস্টাইন, নরওয়ে এবং সুইজারল্যান্ডসহ) দেশে সর্বমোট নয় লাখেরও বেশি আশ্রয়ের আবেদন নথিভুক্ত হয়েছে। যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫০ শতাংশ বেশি।

নির্বাহী সম্পাদক আন্তর্জাতিক/ইবিটাইমস 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit exceeded. Please complete the captcha once again.

Translate »