তিন বছর পর চীন থেকে অস্ট্রিয়ান এয়ারলাইন্সের প্রথম ফ্লাইটের ভিয়েনায় অবতরণ

চীন তার শূন্য-কোভিড নীতির ঘোষণা দিয়ে বহির্বিশ্বের জন্য আকাশ সীমানা খুলে দেওয়ার পর ২৩০ জন যাত্রী নিয়ে অস্ট্রিয়ান এয়ারলাইন্সের ভিয়েনায় প্রথম অবতরণ

ব্যুরো চীফ, অস্ট্রিয়াঃ আজ সোমবার (৯ ডিসেম্বর) চীনের সাংহাই থেকে অস্ট্রিয়ান এয়ারলাইন্সের বিমানটি সকাল ৬:২৫ মিনিটে ভিয়েনা-শোয়েখাট আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। চীনে বর্তমানে পুনরায় করোনার নতুন সংক্রমণের বিস্তার বৃদ্ধির ফলে অন্যান্য অনেক দেশের মতো অস্ট্রিয়াও গণপ্রজাতন্ত্রী চীন থেকে আগত ভ্রমণকারীদের জন্য করোনার পিসিআর পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করেছে।

অস্ট্রিয়ান সংবাদ সংস্থা এপিএ- এর সাথে এক সাক্ষাৎকারে অস্ট্রিয়ান এয়ারলাইন্সের একজন মুখপাত্র জানান, চীন থেকে আগত যাত্রীদের অস্ট্রিয়ান এয়ারলাইন্সে উঠার পূর্বে অবশ্যই বাধ্যতামূলক করোনার পিসিআর পরীক্ষার সনদ দেখাতে হবে। এই সনদের মেয়াদ অবশ্যই ৪৮ ঘন্টার মধ্যে হতে হবে। তিনি আরও জানান আজ চীন আগত প্রথম ফ্লাইটটির সকল যাত্রীই করোনার পিসিআর পরীক্ষার বৈধ সময়ের সনদ দেখাতে সক্ষম হয়েছে। তবে সাত জন যাত্রী যথাযথ বৈধ করোনার পিসিআর পরীক্ষার সনদ দেখাতে না পারায় বিমানে উঠতে পারেন নি।

ইতিপূর্বে অস্ট্রিয়ার স্বাস্থ্যমন্ত্রী জোহানেস রাউখ গত বৃহস্পতিবার (৫ ডিসেম্বর) চীন থেকে আগত সকল ভ্রমণকারীদের জন্য করোনার পিসিআর পরীক্ষার সনদ প্রদর্শন বাধ্যতামূলক বলে ঘোষণা দেন। তিনি ইইউর কয়েকটি দেশ সহ বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন সরকারের চীন থেকে আগত ভ্রমণকারীদের জন্য নতুন এই করোনা পরীক্ষার সিদ্ধান্তের সাথে একমত পোষণ করেন।

এখন পর্যন্ত জার্মানি, সুইডেন, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস, গ্রিস, ফ্রান্স, স্পেন, ইতালি, গ্রেট ব্রিটেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইজরায়েল, জাপান এবং পর্তুগাল চীন থেকে আগত ভ্রমণকারীদের জন্য করোনার পিসিআর পরীক্ষাকে বাধ্যতামূলক করেছে। উত্তর আফ্রিকার দেশ মরক্কো এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে চীন থেকে আগত সকল ভ্রমণকারীদের (জাতীয়তা নির্বিশেষে) তার দেশে চীন প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে।

বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের খবর অনুযায়ী সমগ্র চীন জুড়ে এখন পুনরায় ব্যাপক করোনা ঢেউ বয়ে যাচ্ছে। মিডিয়া রিপোর্ট অনুসারে, চীনে করোনার এই নতুন প্রাদুর্ভাবের ফলে দেশটির স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এবং শ্মশান সম্পূর্ণরূপে পরিপূর্ণ। লন্ডন-ভিত্তিক ডেটা প্রসেসর এয়ারফিনিটির অনুমান অনুসারে, বর্তমানে চীনে প্রতিদিন ২,৫ মিলিয়ন লোক নতুন সংক্রমিত হচ্ছে এবং প্রতিদিন ১৬,৬০০ জন মারা যাচ্ছে। তবে চীনের সংবাদ মাধ্যম নতুন প্রাদুর্ভাবে প্রথম কয়েকদিন আপডেট প্রচার করার পর তা পুনরায় বন্ধ করে দেয়।

এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চীনে করোনায় আক্রান্ত হয়ে ২,০৯,০০০ (দুই লাখ নয় হাজার) মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে। পাশ্চাত্যের সংক্রমণ রোগ বিশেষজ্ঞরা চীনে পুনরায় করোনার নতুন বড় ও ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবের পূর্বাভাস দিয়েছেন। অস্ট্রিয়া সহ অসংখ্য দেশ – নতুন ভাইরাস রূপের জন্য চীন থেকে আসা বিমানের বর্জ্য জল পরীক্ষা করারও ঘোষণা দিয়েছে।

চীনে নতুন করে করোনার প্রাদুর্ভাব শুরুর ফলে অস্ট্রিয়ায় করোনা পরিস্থিতি খারাপ হয়ে যাওয়া নিয়ে চিন্তিত নন বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জোহানেস রাউখ। তিনি বলেন, অস্ট্রিয়ায় ওমিক্রন বৈকল্পিকের বিরুদ্ধে বিস্তৃত অনাক্রম্যতা রয়েছে, যা চীনে আধিপত্য বিস্তার করেছে।

জার্মানিও বর্তমানে চীনের সংক্রমণ বিস্তারের ফলে নতুন করে অনেক সতর্কতা জারি করেছে। “জার্মানির রবার্ট কোচ ইনস্টিটিউট চীনকে একটি “ভাইরাস বৈকল্পিক এলাকা বলে চিহ্নিত করেছে যেখানে একটি উদ্বেগজনক ভাইরাস বৈকল্পিক উপস্থিত হওয়ার হুমকি” হিসাবে বর্ণনা করেছে। জার্মানির সরকার এশিয়ার দেশটিতে তার নাগরিকদের “অপ্রয়োজনীয়” ভ্রমণের বিরুদ্ধেও পরামর্শ দিয়েছে। তবে জার্মানির সংক্রমণ রোগ বিশেষজ্ঞরা চীনে নতুন করে করোনার প্রাদুর্ভাব শুরু হলেও তা আপাতত চীন থেকে ভ্রমণের কোনও বড় তরঙ্গ প্রত্যাশিত নয় বলে জানিয়েছে।

চীনের সাথে অস্ট্রিয়ার আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের সংখ্যা এখনও সীমিত এবং টিকিটের দাম অনেক বেশী। চীনা কর্তৃপক্ষ আবার পাসপোর্ট ইস্যু বা প্রসারিত করতে চায়, তবে প্রাথমিকভাবে শুধুমাত্র ব্যবসা এবং অধ্যয়ন ভ্রমণের জন্য। অস্ট্রিয়ায় আগামী গ্রীষ্মকালে আরও চীনাদের আগমনের কয়েক মাস আগে, অস্ট্রিয়ার পর্যটন সেক্রেটারি সুজান ক্রাউস-উইঙ্কলার (ÖVP) উপরোক্ত তথ্যাবলী জানান।

২০২০ সালের গোড়ার দিকে মহামারী শুরু হওয়ার আগে, ইউরোপ চীনের জনগণের জন্য একটি জনপ্রিয় ভ্রমণ গন্তব্য ছিল।ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুসারে, করোনাভাইরাস ২০১৯ এর আগে গত বছরে চীনা নাগরিকরা ইইউর ২৭ টি দেশে প্রায় ২২ মিলিয়নেরও বেশি ভ্রমণ করেছিল। করোনার পূর্বে ২০১৯ সালে অস্ট্রিয়াতে ১,৪২ মিলিয়ন চীনা পর্যটক অস্ট্রিয়া ভ্রমণে এসেছিল। এর মধ্যে প্রায় এক মিলিয়ন অর্থাৎ দুই তৃতীয়াংশ ছিল গ্রীষ্মকালীন পর্যটক।

চীন আকস্মিকভাবে তার কঠোর শূন্য-কোভিড নীতি থেকে সরে আসার এক মাস পরে চীনের উন্মুক্তকরণ এসেছিল। ২০২০ সালের শুরু থেকে বেইজিং মিলিয়ন মিলিয়ন মানুষের জন্য লকডাউন, শহরগুলি ঘেরাও করে রাখা, গণ পরীক্ষা এবং জোরপূর্বক পৃথকীকরণের মাধ্যমে রোগ নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেছিল। নতুন ওমিক্রন ভেরিয়েন্টগুলি বিস্ফোরকভাবে ছড়িয়ে পড়ার ফলে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি ক্রমবর্ধমান চাপের মধ্যে পড়ে এবং লোকেরা কঠোর পদক্ষেপের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে। চীনের সরকার গত ডিসেম্বর ৭ তারিখে তার জিরো-টলারেন্স নীতি ঘোষণা করে।

কবির আহমেদ/ইবিটাইমস 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit exceeded. Please complete the captcha once again.

Translate »