চীনে পুন:রায় করোনার সংক্রমণ বৃদ্ধির ফলে বিশ্বব্যাপী নতুন আতঙ্ক

ইইউর অনেক দেশের সাথে অস্ট্রিয়াও চীন থেকে ভ্রমণকারীদের নতুন করে করোনা পরীক্ষা করার কথা জানিয়েছে

ব্যুরো চীফ, অস্ট্রিয়াঃ আজ বৃহস্পতিবার (৫ জানুয়ারি) অস্ট্রিয়ার স্বাস্থ্যমন্ত্রী জোহানেস রাউখ (Green) ভিয়েনায় জানিয়েছেন এখন চীন থেকে আগত ভ্রমণকারীদের জন্য অস্ট্রিয়া প্রবেশের পূর্বে অবশ্যই করোনার পরীক্ষা করতে হবে।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম জানিয়েছে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য সহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এবং ভারতে কোভিডের অমিক্রন ভ্যারিয়েন্টের একধরনের অতি সংক্রমণশীল সাবভ্যারিয়েন্ট বা উপ-ধরণ শনাক্ত হয়েছে যার নাম বিএফ-৭(BF-7)। এই অমিক্রনের আবার বেশ কয়েকটি প্রকারভেদ বা সাব ভ্যারিয়েন্ট রয়েছে। বিএফ-৭ ছাড়াও BQ.1.1, BQ.1, BA.5, BQ.X, BA.2.75.2,এবং XBB নামক অমিক্রনের সাব ভ্যারিয়েন্ট দিয়ে এখন মূলত সংক্রমণ হচ্ছে।

তবে বিএফ-৭ এর তান্ডবে চীনের করোনা পরিস্থিতি অনেকটাই নড়বড়ে হয়ে গেছে। বিশেষ করে চীনের বেশ কয়েকটি প্রধান শহরে ভয়াবহ মাত্রায় নতুন করে কোভিড সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। বিএফ ৭ এ আক্রান্ত একজন ব্যক্তি অতি অল্প সময়ের ভিতরে ১০-১৮ জন ব্যক্তিকে আক্রান্ত করতে পারে। চীনে সংক্রমণের মাত্রা এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছে যে, বিগত কিছুদিন যাবৎ তারা দৈনিক কোভিড রোগীর সংখ্যাই গণমাধ্যমে প্রকাশ করছেনা।

ধারণা করা হচ্ছে প্রতিদিন সেখানে ১০ লক্ষাধিক মানুষ করোনায় আক্রান্ত হচ্ছে এবং মৃতের সংখ্যা দৈনিক প্রায় ৫০০০ অতিক্রম করছে। বিশেষজ্ঞরা এই ভয়াবহ পরিস্থিতির জন্য তাদের জিরো কোভিড পলিসিকে দোষারোপ করছে। বিগত এক বছর যাবৎ পৃথিবীর প্রায় সব দেশ ধীরে ধীরে সংক্রমণ প্রতিরোধের বিধি নিষেধ তুলে নিয়েছে

পক্ষান্তরে চীন বিগত তিন বছর যাবৎ করোনার কঠোর বিধি-নিষেধ অনুসরণ করে আসছিলো। ২০২১ সালের শেষের দিকে মূল অমিক্রন ভ্যারিয়েন্টটি শনাক্ত হয় এবং তারপর থেকে পৃথিবীব্যাপী অমিক্রন রাজত্ব করে আসছে। ২০২১ সাল থেকে অমিক্রন ভ্যারিয়েন্টের বিভিন্ন প্রকার উপ-ধরন বা সাব ভ্যারিয়েন্টের মাধ্যমে মানুষজন আক্রান্ত হয়। পৃথিবীব্যাপী ব্যাপকভাবে টিকাদান কার্যক্রমের পাশাপাশি এই সমস্ত সাবভ্যারিয়েন্টের প্রাকৃতিক সংক্রমণ মানুষের ভিতরে একধরেণর মিশ্র ইমিউনিটি ( টিকা এবং ইনফেকশন এর ইমিউনিটি) সৃষ্টি করেছে সেজন্য ধীর গতিতে সংক্রমণ প্রতিরোধের বিধি নিষেধ তুলে নেওয়ার পরও আক্রান্তের সংখ্যা এবং মৃত্যু উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

বিশেষজ্ঞদের ধারণা চীনের মানুষজন কঠোর বিধি-নিষেধের ভিতরে থাকায় তারা অমিক্রনের বিভিন্ন ধরনের সাব ভ্যারিয়েন্ট দিয়ে অপেক্ষাকৃত কম প্রাকৃতিক সংক্রমনের শিকার হয়েছে তাতে করে তাদের ভিতরে মিশ্র ইমিউনিটি তৈরী হয়নি। এবং এরজন্যই চীনে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে বাড়ছে।

বিজ্ঞানীরা বলছে বিএফ-৭ অমিক্রন ভ্যারিয়েন্টটি টিকা থেকে তৈরী প্রতিরক্ষাকে খুব সহজে ফাঁকি দিতে পারে। বিএফ-৭ এর বিস্তারিত তথ্য উদ্ধারের জন্য গবেষণা চলমান। পুরাপুরি তথ্য জানার আগ পর্যন্ত আমাদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা উচিত। বিশেষ করে ফ্রন্টলাইন, বয়স্ক এবং বিভিন্ন কোমরবিড রোগে আক্রান্ত মানুষজনের অতিদ্রুত ২য় বুস্টার নিয়ে নেওয়া উচিত। চীনে পুনরায় করোনার সংক্রমণ বৃদ্ধির ফলে বিশ্বব্যাপী নতুন আতঙ্ক

ইইউর অনেক দেশের সাথে অস্ট্রিয়াও চীন থেকে ভ্রমণকারীদের নতুন করে করোনা পরীক্ষা করার কথা জানিয়েছে।অস্ট্রিয়ান সংবাদ সংস্থা এপিএ জানিয়েছে,ইইউর সুপারিশ অনুসরণ করে, অস্ট্রিয়া এখন চীন থেকে দেশে প্রবেশকারীদের জন্য একটি করোনা পরীক্ষার বাধ্যবাধকতা প্রবর্তন করতে
যাচ্ছে। অস্ট্রিয়ার স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয় আজ এপিএ কে জানিয়েছে: “চীনে প্রবেশের সময় অস্ট্রিয়া একটি প্রি-ডিপারচার টেস্ট বাধ্যবাধকতা (প্রস্থানের আগে পরীক্ষা, নোট) চালু করবে। বিস্তারিত বর্তমানে প্রস্তুত করা হচ্ছে।” জার্মানি, সুইডেন এবং বেলজিয়াম আগেই ঘোষণা করেছিল যে তারা চীন থেকে আসা ভ্রমণকারীদের জন্য করোনার পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করেছে।

এদিকে বার্লিনে আজ বৃহস্পতিবার জার্মানির স্বাস্থ্যমন্ত্রী কার্ল লাউটারবাখ বলেছেন, ভবিষ্যতে চীন থেকে আসা যাত্রীদের যাত্রা শুরু করার সময় তাদের অন্তত একটি দ্রুত করোনা অ্যান্টিজেন টেস্টের প্রয়োজন হবে। “চীন থেকে সরাসরি বিমান থেকে বর্জ্য জল পরীক্ষা করা হবে।

এপিএ আরও জানায় অস্ট্রিয়ার স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয় বলেছে অস্ট্রিয়া ইতিমধ্যেই চীনের ভাইরাসের নতুন রূপগুলি সনাক্ত করতে এবং প্রয়োজনে প্রতিক্রিয়া জানাতে সক্ষম হওয়ার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।” এর আগে চীন থেকে প্রবেশের প্রবিধানের বিষয়ে ইইউ স্তরে শুধুমাত্র সুপারিশ করা হয়েছিল।

গ্রিসের সরকারও জানিয়েছে এখন থেকে চীনা ভ্রমণকারীদের অবশ্যই একটি করোনার পরীক্ষা উপস্থাপন করতে হবে। ভবিষ্যতে, চীন থেকে গ্রিসে ভ্রমণকারীদের একটি নেতিবাচক করোনা পরীক্ষা দেখাতে হবে যা ৪৮।ঘন্টার বেশি পুরানো নয়। গ্রীক স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বৃহস্পতিবার নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়া ঘোষণা করেছে। গ্রিসের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার সংস্থা ইআরটি দুপুরে এ সংবাদ জানিয়েছে। গ্রিসের প্রধানমন্ত্রী কিরিয়াকোস মিৎসোটাকিস এর আগে ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করার জন্য একটি বিশেষ মন্ত্রী সভার বৈঠকের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের সাথে দেখা করেছেন।

এপিএ আরও জানায়, ২৭ টি ইইউ দেশের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা গতকাল বুধবার (৪ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় একটি বাধ্যতামূলক পরীক্ষার বিষয়ে একমত হতে পারেননি, তবে এটি দৃঢ়ভাবে সুপারিশ করেছেন। বিশেষজ্ঞরা চীন থেকে আসা বিমানে মেডিকেল বা FFP2 মাস্ক পরার পরামর্শও দিয়েছেন।

জার্মানির স্বাস্থ্যমন্ত্রী লাউটারবাখ একটি ভাল সিদ্ধান্তের কথা বলেছেন। “ইউরোপ চীনের মহামারী পরিস্থিতিতে একটি সাধারণ প্রতিক্রিয়া খুঁজে পেয়েছে। ফেডারেল সরকার হিসাবে আমরা ঠিক এটিই করেছি।” বাধ্যতামূলক পরীক্ষার পাশাপাশি, স্বাস্থ্যমন্ত্রী ভাইরাসের রূপগুলি সনাক্ত করতে প্রবেশের সময় স্পট চেক করার কথা ঘোষণা করেছিলেন। এছাড়াও, চীন ভ্রমণের জন্য অতিরিক্ত বর্জ্য জল নিয়ন্ত্রণ থাকবে।

বার্লিনে জার্মানির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র গতকাল বুধবার বলেছেন যে ফ্রাঙ্কফুর্ট বিমানবন্দরে ইতিমধ্যেই পয়ঃনিষ্কাশন পরীক্ষা করা হয়েছে। এটি প্রসারিত করা যেতে পারে, উদাহরণস্বরূপ, চীন থেকে আসা পৃথক বিমানের বর্জ্য জল পরীক্ষা করে। এদিকে জার্মানির পর পরই অস্ট্রিয়াও ঘোষণা করেছে যে অস্ট্রিয়াতেও আগামী সপ্তাহ থেকে চীন থেকে সমস্ত ফ্লাইটের জন্য বিমানবন্দরে পয়ঃনিষ্কাশন পরীক্ষা করা হবে।

বৃহস্পতিবার বেলজিয়াম এবং সুইডেন থেকেও অনুরূপ বিধিনিষেধের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট রিপোর্ট এসেছে। উদাহরণস্বরূপ, সুইডেনে চীন থেকে আগত ব্যক্তিদের আগামী শনিবার থেকে প্রাথমিকভাবে তিন সপ্তাহের জন্য একটি নেতিবাচক পরীক্ষা করা বাধ্যতামূলক করেছে। ভবিষ্যতে, বেলজিয়ামের সরাসরি ফ্লাইটে ভ্রমণকারীদের প্রস্থানের আগে একটি নেতিবাচক পরীক্ষা দেখাতে হবে। ইতালি, ফ্রান্স বা স্পেনের মতো অন্যান্য দেশগুলি গত কয়েকদিনে ইতিমধ্যে তাদের নিজস্বভাবে প্রবেশের নিয়ম কঠোর করেছে।

প্রায় তিন বছরের লকডাউন, গণপরীক্ষা এবং জোরপূর্বক কোয়ারেন্টাইনের পর, চীন হঠাৎ করে ৭ই ডিসেম্বর তার শূন্য-কোভিড নীতির সমাপ্তি ঘোষণা করে। তারপর থেকে, সবচেয়ে জনবহুল দেশটি একটি বিশাল করোনা তরঙ্গ অনুভব করেছে। ইতিমধ্যেই কয়েক লক্ষ মানুষ এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। চীনে প্রবেশের সময় কোয়ারেন্টাইনের বাধ্যবাধকতাও ৮ জানুয়ারী শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।

এদিকে বাংলাদেশের সংক্রমণ রোগ বিশেষজ্ঞরা বিএফ-৭ দিয়ে আরেকটি করোনা ঢেউ হওয়ার সম্ভাবনা আছে তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই উপসর্গবিহীন বা মৃদু উপসর্গ হওয়ার সম্ভাবনা বেশী। কারণ বাংলাদেশে ইতোমধ্যে বেশীরভাগ মানুষই করোনার টিকা পেয়েছে এবং সময় সময় প্রায় সব ধরণের করোনা ভ্যারিয়েন্ট দিয়ে প্রাকৃতিক সংক্রমণের শিকার হয়েছে। আশা করছি বাংলাদেশের মানুষের ভিতরে মিশ্র বা হাইব্রিড ইমিউনিটি ( টিকা এবং ইনফেকশন এর ইমিউনিটি) সৃষ্টি হয়েছে যা আমাদেরকে বিএফ-৭ এর তান্ডব থেকে রক্ষা করবে।

কবির আহমেদ/ইবিটাইমস 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit exceeded. Please complete the captcha once again.

Translate »