উপ সম্পাদকীয়ঃ ১৯৬৫ সাল থেকে প্রতি বছর ২৬ অক্টোবর অস্ট্রিয়ার জাতীয় দিবস বা স্বাধীনতা দিবস হিসাবে এবং ১৯৬৭ সাল থেকে এই দিনটি সরকারি ছুটির দিন হিসাবে পালিত হয়ে আসছে।
বৈশ্বিক মহামারী করোনার বিভিন্ন বিধিনিষেধের জন্য গত দুই বছর অস্ট্রিয়ার জাতীয় দিবসের তেমন কোন বড় ধরনের আনুষ্ঠানিকতা হয় নি। তবে অস্ট্রিয়ার রাষ্ট্রপতি ভবনের সন্নিকটে অস্ট্রিয়ার “হিরোস স্কোয়ারে” অস্ট্রিয়ান সশস্ত্র বাহিনী ইতিমধ্যে জাতীয় দিবসের কুচকাওয়াজ ও সেনা সামগ্রী প্রদর্শনীর জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি সোমবার ২৪ অক্টোবর থেকেই নিয়ে রেখেছে। বর্তমানে অস্ট্রিয়ান সেনাবাহিনীর তিনটি হেলিকপ্টার সেখানে অবস্থান করছে।
অস্ট্রিয়ান সংবাদ মাধ্যম জানিয়েছে,এই বছর মহামারী করোনার পূর্বের মতোই, সামরিক বাহিনী তার পারফরম্যান্স প্রদর্শনের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। আগামীকাল বুধবার ২৬ অক্টোবর জাতীয় দিবসের ছুটির দিনে সাধারণ জনগণের জন্য অস্ট্রিয়ার রাষ্ট্রপতি ভবন হফবার্গের বিকল্প সংসদের কোয়ার্টারে দরজা খোলা হবে। অস্ট্রিয়ার রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং “সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা” আগামীকাল এখানে উপস্থিত হবেন।
জাতীয় দিবসের শুরুতেই অস্ট্রিয়ার ফেডারেল রাষ্ট্রপতি আলেকজান্ডার ভ্যান ডার বেলেন এবং সরকার প্রধান চ্যান্সেলর দ্বারা একটি পুষ্পস্তবক অর্পণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ঐতিহ্যগতভাবে দিনটি শুরু করা হবে। এর পর অস্ট্রিয়ান সেনাবাহিনীর শতাধিক নতুন বা রিক্রুট সদস্য হিরোস স্কোয়ারে শপথ নেবেন।
এই সময়ে দুটি অত্যাধুনিক ইউরো ফাইটার যুদ্ধ বিমান এবং একটি C-130 হারকিউলিস বিমান এই এলাকার উপর দিয়ে উড়ে যাবে। আগামীকালের জাতীয় দিবসের দিনে অস্ট্রিয়ার সশস্ত্র বাহিনীকে আরও দুটি জায়গায় উপস্থাপন করা হবে সশস্ত্র বাহিনীর এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে।
জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীতে অস্ট্রিয়ান সেনাবাহিনী ও পুলিশের বিভিন্ন বিভাগের অভিযান ও কর্মকাণ্ড সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্যাবলী উপস্থাপন করা হবে। অস্ট্রিয়ার সশস্ত্র বাহিনীর দুর্যোগ, ত্রাণ এবং এবিসি ইউনিটগুলিকে বার্গথিয়েটারে উপস্থাপন করা হবে। এছাড়াও, ভিয়েনা শহরের নিরাপত্তা ইউনিটের বিভিন্ন বিভাগের উৎসব ভিয়েনার সিটি হলে (রাথাউসপ্ল্যাটজে) অনুষ্ঠিত হবে।
অস্ট্রিয়ান ফেডারেল রাষ্ট্রপতি,সরকার প্রধান, মন্ত্রী পরিষদের সদস্যবৃন্দ সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পুষ্পস্তবক অর্পণের পরে আগ্রহী সাধারণ জনগণের জন্য অস্ট্রিয়ার ফেডারেল চ্যান্সেলারির প্রতিনিধিত্বমূলক প্রাঙ্গন দুপুর ১২:০০ টা থেকে বিকাল ১৬:৩০ পর্যন্ত খোলা রাখা হবে।
অস্ট্রিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় “জাতীয় দিবসে” পুলিশ দিবস” উদযাপন করবে। আগামীকাল জাতীয় দিবসে সকাল ৯:৩০ মিনিট থেকে সারা দিনব্যাপী লোকজন অস্ট্রিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সামনে Minoriten Platz-এ অস্ট্রিয়ান পুলিশের দায়িত্বের ক্ষেত্রগুলি সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য জানতে পারবে।
অস্ট্রিয়ার ফ্রেয়ং-এর সাংবিধানিক আদালত (অস্ট্রিয়ার সর্বোচ্চ আদালত) দুপুর ১টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত খোলা থাকবে। এই সময়ে অস্ট্রিয়ার সাংবিধানিক আদালতের রাষ্ট্রপতি ক্রিস্টফ গ্র্যাবেনওয়ার্টারও অস্ট্রিয়ার মিডিয়ার সামনে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেবেন।
আগামীকাল জাতীয় দিবসে জনগণের উদ্দেশ্যে অস্ট্রিয়ার ফেডারেল রাষ্ট্রপতির ভাষণেের রেকর্ড রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশন ORF এ সন্ধ্যা ৭:৪৭ মিনিটে সম্প্রচার করা হবে বলে জানিয়েছে অস্ট্রিয়ান সংবাদ সংস্থা এপিএ।
এপিএ আরও জানিয়েছে দিনটি উপলক্ষে অস্ট্রিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সামনে ভিয়েনার মাইনোরিটেনপ্ল্যাটজে স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের নিজস্ব প্রোগ্রামের মাধ্যমে দিনটির কার্যক্রম শুরু হবে।
পরে অস্ট্রিয়ার Heldenplatz-এ নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত সেনা সদস্যদের ঐতিহ্যগত শপথ গ্রহণের পাশাপাশি, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভিয়েনার কেন্দ্রস্থলে একটি অন-সাইট প্রোগ্রাম প্রদর্শন করবে। অস্ট্রিয়ার ফেডারেল প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার ফান ডার বেলেন সৈনিকদের শপথ বাক্য পাঠ করাবেন। প্রতিবারের মত এবারও ১০০ শত নতুন সৈনিক শপথ নিবেন।
এই অনুষ্ঠানে অস্ট্রিয়ার সরকার প্রধান চ্যান্সেলর কার্ল নেহামার ও সরকারেে উপ প্রধান বা ভাইস চ্যান্সেলর ভার্নার কোগলার সহ মন্ত্রিসভার সদস্যগণ এবং জাতীয় সংসদের বিরোধীদলের প্রধানগণ উপস্থিত থাকবেন।
উল্লেখ্য যে,দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-১৯৪৫) সময় অস্ট্রিয়া জার্মানির পক্ষ নিয়েছিল। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ৪ মিত্র শক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন, গ্রেটব্রিটেন এবং ফ্রান্স অস্ট্রিয়া দখল করে নেয়। মিত্র শক্তি অস্ট্রিয়াকে চার ভাগে ভাগ করে নেন। রাজধানী ভিয়েনাকেও চার ভাগে ভাগ করে মিত্র শক্তি নিজেদের দখলে রেখেছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় প্রচন্ড ঠান্ডার মধ্যে অস্ট্রিয়ার প্রায় এক লাখ সৈনিক নাৎসী বাহিনী হিসাবে রাশিয়া অভিযানে গিয়েছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই একলাখ সৈনিক থেকে মাত্র এক হাজার সৈনিক জীবিত ফেরত আসতে পেরেছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন মিত্র শক্তি বা বাহিনী আকাশ পথে অস্ট্রিয়ার উপর বিশেষ করে রাজধানী ভিয়েনায় প্রচন্ড বোমাবর্ষণ করে সম্পূর্ণ স্থাপত্য ধ্বংস করে ফেলে। বলা হয় সে সময় ভিয়েনায় আর কোন উঁচু ভবন অক্ষত অবস্থায় ছিল না। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর মিত্র শক্তির এক তথ্য অনুসারে ভিয়েনায় বিমান থেকে ফেলা ফ্লাইং বোমার মধ্যে প্রায় সাড়ে তিন হাজার বোমা এখনও অক্ষত অবস্থায় ভিয়েনার মাটির নীচে বা নদীতে আছে। এজন্য ভিয়েনায় বিভিন্ন নির্মাণ কাজের জন্য মাটি খোড়ার সময় বেশ সতর্কতা অবলম্বন করা হয় এবং যুদ্ধের এতো দীর্ঘ বৎসর পরেও এখন প্রায়ই সময় এই সমস্ত ফ্লাইয়িং বোমা পাওয়া যাচ্ছে।
চার মিত্র দেশের সামরিক কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত “মিত্র নিয়ন্ত্রণ কাউন্সিল” দীর্ঘ ১০ বৎসর (১৯৪৫-১৯৫৫) যাবৎ অস্ট্রিয়ার নিয়ন্ত্রণ তাদের কুক্ষিগত করে রেখেছিলেন। যদিও অস্ট্রিয়ান সংসদ গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত ছিল,তবে আইন সংক্রান্ত নিয়ন্ত্রণ বা সরকারের আইনানুগ ব্যবস্থা মিত্র নিয়ন্ত্রণ কাউন্সিলের হাতে ন্যস্ত ছিল। কোন সিদ্ধান্ত নিতে হলে মিত্র নিয়ন্ত্রণ কাউন্সিলের সম্মতির প্রয়োজন হত। তারা যদি কোন ভেটো বা অনুমোদন না দিতেন তখন সেটি বাতিল হয়ে যেতো।
মিত্র শক্তির দখলের অবসান ঘটাতে এবং অস্ট্রিয়াকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে স্বীকৃতির চুক্তির বিষয়ে ব্যাপক আলাপ-আলোচনার পর ভিয়েনায় সাবেক রাজার বেলভেদার প্রাসাদে ১৯৫৫ সালের ১৫ মে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল এবং ২৭ জুলাই ১৯৫৫ সাল থেকে চুক্তিটি কার্যকর হয়েছিল। তারপর মিত্র বাহিনী অস্ট্রিয়া থাকলেও রাস্ট্রীয় ক্ষমতা অস্ট্রিয়ানদের
কাছেই ছিল। মিত্র বাহিনী ১০ বৎসর যাবৎ তাদের সেনাবাহিনীকে অস্ট্রিয়া থেকে সরিয়ে নেয়। শেষ রাশিয়ান সৈন্য ১৯৬৫ সালে অস্ট্রিয়া ত্যাগ করলে তখন দেশটি সম্পূর্ণ বিদেশী সৈন্য মুক্ত হয়।
১৯৫৫ সালের ২৬ অক্টোবর অস্ট্রিয়ান সংসদ স্থায়ী নিরপেক্ষতা সংক্রান্ত সাংবিধানিক আইন পাস করেন। ১৯৯৫ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নে (EU) প্রবেশের পূর্বে অস্ট্রিয়া বিশ্বে একটি নিরপেক্ষ দেশ হিসাবে বেশ সমৃদ্ধি লাভ করেছিল। এই নিরপেক্ষতার ফলেই অস্ট্রিয়ায় জাতিসংঘের আণবিক শক্তি কমিশনের সদর দফতর, তেল উত্তোলনকারী দেশ সমূহের সংস্থা OPEC এর সদর দফতর সহ আরও অনেক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার অফিস অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনা রয়েছে। তবে অস্ট্রিয়া ইইউ সদস্য দেশ হলেও সে তার নিরপেক্ষ নীতি অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন।
১৯৫৫ সালের চুক্তি স্বাক্ষরের ১০ বৎসর পর ১৯৬৫ সালের ২৬ অক্টোবর থেকে অস্ট্রিয়ায় নিয়মিতভাবে এই দিনটিকে দেশের জাতীয় দিবস বা স্বাধীনতা দিবস হিসাবে পালন করে আসছে।
কবির আহমেদ/ইবিটাইমস