স্বাধীনতার ৫০ বছরেও মেলেনি ভোলার প্রথম শহীদ মতিলাল সাহার স্বীকৃতি

ভোলা প্রতিনিধি : দেশের জন্য প্রান দেয়া ভোলার প্রথম শহীদ মতিলাল সাহার সরকারী স্বীকৃতি আজও মেলেনি।তখন ১৯৭১ সালের মে মাস। সূর্য কেবল মাত্র মাথার উপর। প্রতিদিনের মত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন মতিলাল সাহা। মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিয়েছেন রাজাকারদের দেয়া এমন খবরে পাকবাহিনী এসে ঘিরে ফেলে ভোলা শহরের গাজীপুর রোডের মতিলাল সাহার বাড়ি। মতিলাল সাহাকে ঘর থেকে টেনে-হিঁচড়ে উঠানে বের করে পাকবাহিনী। এরপর গুলি করে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় মতিলাল সাহাকে। আর এর মধ্য দিয়েই শুরু হয় ভোলায় পাকসেনাদের প্রথম হত্যাযজ্ঞ।

ভোলা সদর উপজেলার শহীদদের মধ্যে মতিলাল সাহাকে প্রথম হত্যা করা হয়। সদর উপজেলায় ৩৮ জন শহীদের স্বীকৃতি পেলেও স্বাধীনতার ৫০ বছরে তালিকায় স্বীকৃতি পায়নি ভোলার প্রথম শহীদ মতিলাল সাহার নাম। কেউ খোঁজও রাখেনি কেমন আছে এই মতিলাল সাহার পরিবারের মানুষগুলো। যাদের আত্মত্যাগে আর রক্তের মূল্য আজ আমরা স্বাধীন দেশে বসবাস করেছি। তাদের পরিবারের মানুষগুলো কেমন আছে তাদের কি মূল্য মিলেছে এ খবর রাখেনা কেউ। রাষ্ট্রীয় ভাবে স্বীকৃতি মেলেনি এখনো অনেক শহীদের। আবার স্বীকৃত শহীদের অধিকাংশই কোন ধরণের সরকারি সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত তাদের পরিবার ।  স্বাধীনতার ৫০ বছরেও কেউ নেয়নি তাদের খোঁজ খবর।

প্রতিবছর ২৬ শে মার্চ ও বিজয় দিবসসহ জাতীয় দিবস গুলোতে স্মৃতি ফলকে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো এবং শহীদ পরিবারের হাতে সামান্য দু’টি শাড়ি ছাড়া আর কিছুই জোটেনা এসব শহীদ পরিবারের ভাগ্যে। শহীদ মতিলাল সাহার নাতি অভিজিৎ সাহা (৫০) এর দাবি মুক্তিযুদ্ধ  চলাকালীন সময় যারা শহীদ হয়েছেন তাদের তালিকা করে রাষ্ট্রীয় ভাবে সম্মান জানানো হোক। তাদের দুঃখ বিজয়ের ৫০ বছর চলে গেলেও ভোলা জেলার প্রথম শহীদ পরিবারটির খোঁজ নেয়নি ভোলা মুক্তিযুদ্ধ কমান্ডসহ কোন সরকার।

তিনি আরো বলেন, ভোলা জেলার ইতিহাস বইয়ে ২৬২ নং পাতায় শহীদের তালিকায় ও ভোলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ১০০ বছর পূর্তিতে বের হওয়া ম্যাগাজিন শিকড়ের সন্ধানে এর ৪২ পাতায় ভোলার প্রথম শহীদ হিসাবে আমার দাদা মতিলাল সাহার নাম থাকলেও অদৃশ্য কারণে স্বীকৃতি মেলেনি এই অসহায় শহীদ পরিবারটির। মতিলাল সাহার নাতি অরিন্দম সাহা (৫৫) পাকহানাদার বাহিনীর হত্যাযজ্ঞের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন,সেই দিন ছিলো ১৯৭১ সালের ৫ মে। প্রতিদিনের মতো কাজে যাওয়া প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন মতিলাল সাহা। ঘড়িতে তখন সকাল ১১ টা। শহরের গাজীপুর রোড এলাকার প্রভাবশালী রাজাকার মসু মিয়ার নেতৃত্বে একদল পাক হানাদার বাহিনী ঘিরে ফেলে মতিলাল সাহার বাড়ি। এরপর ঘরে ডুকে চিৎকার করে বলতে থাকে “তুমহারা ঘারমে মুক্তি হ্যায়” কেউ উত্তর দেওয়ার আগেই রাজাকার মসু মিয়া বলে উঠে ” হ্যায় সাহাব পিছলে সাত দিন মুক্তি এহি ঘারম্যায় থা”। সাথে সাথে পাক সেনারা মতিলাল সাহা ও তার স্ত্রী সৌল বালা সাহাকে ঘর থাকে টেনে হিঁচড়ে উঠানে বের করে। এর পর চালানো হয় নির্মম হত্যাযজ্ঞ। পাক সেনাদের গুলিতে মতিলাল সাহার মৃত্যু হয়। কিন্তু ভাগ্যক্রমে তার স্ত্রী সৌল বালা সাহা বেঁচে যায়।

মতিলাল সাহার ভাতিজা দিরেন কর্মকার (৬০) বলেন, এসময় মতিলাল সাহার ঘরে রাজাকার মসু মিয়ার নেতৃত্বে চলে লুটতরাজ। পাক হানাদার বাহিনীর যাওয়ার সময় মতিলাল সাহার লাশ সাথে করে নিয়ে যায়। মতিলাল সাহার লাশ নিয়ে পাক বাহিনী কি করেছে তার সন্ধান এখনো মিলেনি পরিবারের কাছে। তবে ধারণা করা হচ্ছে ভোলার বদ্ধ ভূমিতে তার লাশ ফেলে দেওয়া হয়েছিলো।

এব্যাপারে ভোলা সদর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার অহিদুর রহমান বলেন, ভোলা সদর উপজেলায় ৩৮ জন শহীদের স্বীকৃতি তালিকা রয়েছে। এর মধ্যে মতিলাল সাহার কোন নাম নেই। মতিলাল সাহার পরিবার যদি শহীদের স্বীকৃতির জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের আবেদন করেন সেখান থেকে যদি আমাদের কাছে কোন তথ্য চাওয়া হয় তা হলে আমরা যাচাই-বাছাই করে সুপারিশ করবো।

এই শহীদ পরিবারের দাবি সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই করে মতিলাল সাহাকে মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদের তালিকায় অন্তভুক্ত করে যথাযথ স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষসহ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

সাব্বির আলম বাবু /ইবি টাইমস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit exceeded. Please complete the captcha once again.

Translate »