ইবিটাইমস ডেস্ক : অযৌক্তিকভাবে সরকারের বিরোধিতা করতে গিয়ে স্বৈরাচার ফিরে আসার পথ তৈরি হলে তা জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল হবে বলে সতর্ক করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে বিরোধী দলগুলোকে সংসদে গঠনমূলক ভূমিকা পালন এবং জাতীয় স্বার্থে সরকারের সঙ্গে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) সচিবালয়ের পাশে আধুনিকায়ন করা ওসমানী উদ্যান ও জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধনের পর আয়োজিত সমাবেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
তারেক রহমান বলেন, সরকারের বিরোধিতা করতে গিয়ে যদি স্বৈরাচার ফিরে আসার পথ উন্মুক্ত করা হয়, তাহলে তা দেশের জন্য ভালো ফল বয়ে আনবে না। এতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের পাশাপাশি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের সঙ্গেও বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে।
তিনি বলেন, সরকারের বিরোধিতা অবশ্যই করা যাবে। তবে সেই বিরোধিতা হতে হবে গঠনমূলক। কেবল বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা করার পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বিরোধী দল কীভাবে সরকারের বিরোধিতা করছে, তা জনগণ পর্যবেক্ষণ করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণ বিএনপিকে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে এবং অন্য দলগুলোকে বিরোধী দলের ভূমিকা পালনের সুযোগ দিয়েছে। সংসদে সরকারি ও বিরোধী দল থাকার উদ্দেশ্য হলো জাতীয় ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলোচনা, মতবিনিময় এবং ঐকমত্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা।
দোষারোপের রাজনীতি বন্ধের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সরকার কিংবা বিরোধী দল—কোনো পক্ষেরই জনগণের প্রতিনিধিত্ব করার একক অধিকার নেই। উভয় পক্ষই জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে। তাই পাল্টাপাল্টি অভিযোগের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে দেশের উন্নয়নে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, সংবিধান সংশোধন ও বিভিন্ন সংস্কারের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থাকতে পারে। তবে জননিরাপত্তা, জাতীয় স্বাধীনতা, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং দেশের শিশুদের ভবিষ্যতের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সরকার ও বিরোধী দলের ঐকমত্যে পৌঁছানো প্রয়োজন।
অনুষ্ঠানে বিরোধী দলের নেতাদের অনুপস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে জীবন উৎসর্গ করা ব্যক্তিদের সম্মান জানাতে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এ জন্য সরকার ও বিরোধী দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।
বিরোধী দলের নেতাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “সরকারের এই মঞ্চে বসার দরকার ছিল না, কিন্তু সত্যিকারভাবে যদি আপনারা জুলাইকে ধারণ করেন, আপনারা তো এসে জুলাই শহীদদের মানুষগুলোর সঙ্গেও বসতে পারতেন, আমরা তো আজকে আপনাদেরকে দেখতে পাচ্ছি না।”
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে প্রাণ হারানো, আহত হওয়া কিংবা দৃষ্টিশক্তি হারানো ব্যক্তিদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে অনেকেই নতুন পরিচিতি পেয়েছেন। শহীদ পরিবারের সদস্যদের পাশে উপস্থিত থেকে বিরোধী দলের নেতারা জুলাইয়ের চেতনার প্রতি তাঁদের অঙ্গীকারের প্রমাণ দিতে পারতেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
রাজনৈতিক দলগুলোকে সড়ক অবরোধসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত না করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে মানুষের ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা যেন বাধাগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়ে সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে।
তিনি বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সংসদীয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার অবদানের কথাও উল্লেখ করেন।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে সরকারের চলমান পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচিতে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, এডিস মশা সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে কোনো পার্থক্য করে না। তাই জনস্বার্থে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (বিএনসিসি), স্কাউট, শিক্ষার্থী, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের অংশগ্রহণে দেশজুড়ে প্রায় দেড় মাস ধরে পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। তবে শুরুর দিকে ভোরবেলা পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম যেভাবে চোখে পড়ত, বর্তমানে তা কম দেখা যাচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
নিজ নিজ এলাকার পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম অব্যাহত রাখার জন্য জনগণের প্রতিও আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
ভবন ও অন্যান্য অবকাঠামোর নকশা তৈরির সময় গাছপালা ও প্রকৃতির ক্ষতি যতটা সম্ভব কমানোর জন্য স্থপতি ও পরিকল্পনাবিদদের প্রতি আহ্বান জানান তারেক রহমান। তিনি বলেন, মানুষের প্রয়োজন মেটাতে উন্নয়ন জরুরি। তবে উন্নয়ন পরিকল্পনায় পরিবেশ রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
ওসমানী উদ্যান পরিষ্কার রাখা এবং সেখানে ময়লা-আবর্জনা না ফেলার জন্যও নগরবাসীর প্রতি আহ্বান জানান তিনি। পরিবেশদূষণের কারণে বিভিন্ন রোগবালাই বাড়ে উল্লেখ করে পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ গড়তে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
বক্তব্যের শেষে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনা এবং আহত ব্যক্তিদের দ্রুত সুস্থতা প্রার্থনা করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা মির্জা আব্বাস, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না এবং বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হকসহ অন্যরা।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালাম অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। এ সময় বেসামরিক বিমান পরিবহনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব, মন্ত্রিসভার অন্যান্য সদস্য, সংসদ সদস্য এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধর বাবা মীর মোস্তাফিজুর রহমান এবং শহীদ শাহারিয়ার খান আনাসের মা সানজিদা খান দীপ্তি।
ঢাকা/এসএস






















