ভিয়েনা ০১:২৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬, ২৫ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঝিনাইদহ টিটিসিতে অনিয়মের অভিযোগ, তদন্তের দাবি

  • EuroBanglaTimes
  • আপডেটের সময় ০২:৪৬:২৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬
  • ৪ সময় দেখুন

ঝিনাইদহ টিটিসিতে অনিয়মের অভিযোগ, তদন্তের দাবি

শেখ ইমন, ঝিনাইদহ: কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত ঝিনাইদহ সরকারি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে (টিটিসি) অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও সরকারি অর্থ ব্যবহারের স্বচ্ছতা নিয়ে একাধিক অভিযোগ উঠেছে। স্থাপনা নির্মাণ, হিসাব শাখার দায়িত্ব বণ্টন, প্রকল্পের জনবল ব্যবস্থাপনা, প্রশিক্ষণসামগ্রী কেনাকাটা এবং সরকারি গাড়ির ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। একই সঙ্গে প্রশিক্ষণার্থীদের নির্ধারিত সুযোগ-সুবিধা, ভাতা, ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ ও উপস্থিতি ব্যবস্থাপনা নিয়েও অসন্তোষ জানিয়েছেন কয়েকজন শিক্ষার্থী।

এসব অভিযোগের বেশ কয়েকটি ঝিনাইদহ টিটিসির ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ রুস্তম আলীর বিরুদ্ধে। অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি প্রায় ১১ বছর ধরে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করছেন। দীর্ঘ সময় ধরে একই পদে দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসনিক কার্যক্রম, জনবল ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক কর্মকাণ্ডের জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে বলে তাঁদের অভিযোগ।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন খাতে অর্থ ব্যয় ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনার তথ্য থাকলেও বাস্তবে প্রয়োজনীয় উপকরণ, ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ এবং সেবার ঘাটতি দেখা গেছে। কেউ প্রশিক্ষণসামগ্রী না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন, কেউ পর্যাপ্ত সময় গাড়ি চালানোর সুযোগ পাননি বলে জানিয়েছেন। আবার কেউ ভাতা ও অর্থ ফেরত পাওয়া নিয়ে অভিযোগ তুলেছেন।

তবে এসব অভিযোগের সবগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট নথিপত্র, আর্থিক হিসাব, অনুমোদনপত্র এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

নির্দেশ উপেক্ষা করে স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ

ঝিনাইদহ টিটিসি প্রাঙ্গণে নিয়মবহির্ভূতভাবে স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, নির্মাণকাজের জন্য প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারী ও প্রশিক্ষণার্থীদের কাছ থেকেও অর্থ দাবি করা হয়েছিল। একপর্যায়ে সংশ্লিষ্ট প্রধান কার্যালয় থেকে নির্মাণকাজ বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হলেও তা উপেক্ষা করে কাজ চালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

সরকারি প্রতিষ্ঠানে কোনো স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে যথাযথ অনুমোদন, অর্থের উৎস, ব্যয়ের হিসাব এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুসরণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। এ অবস্থায় টিটিসিতে নির্মিত স্থাপনার অনুমোদন ছিল কি না, নির্মাণে কত টাকা ব্যয় হয়েছে এবং অর্থ কোন উৎস থেকে এসেছে—তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।

এ বিষয়ে নির্মাণকাজের অনুমোদনপত্র, ব্যয়ের নথি এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নির্দেশনার কপি যাচাই করা প্রয়োজন।

অনুমোদিত পদে না থেকেও হিসাব শাখার দায়িত্বে থাকার অভিযোগ

প্রতিষ্ঠানের আর্থিক কার্যক্রম পরিচালনায় হিসাব শাখার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অথচ ঝিনাইদহ টিটিসির হিসাব শাখার দায়িত্ব পালন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, হাবিবুর রহমান নামের এক ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে হিসাব শাখার কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। তাঁদের ভাষ্য, তিনি রাজস্ব বা প্রকল্পের অনুমোদিত জনবল কাঠামোর কোনো পদে নেই।

যদি অভিযোগটি সত্য হয়, তাহলে তাঁর দায়িত্ব পালনের প্রশাসনিক ভিত্তি, আর্থিক নথিতে প্রবেশাধিকার এবং অর্থনৈতিক লেনদেনে ভূমিকা কী ছিল, তা যাচাই করা প্রয়োজন। এ জন্য অনুমোদিত জনবল কাঠামো, নিয়োগসংক্রান্ত নথি, দায়িত্ব বণ্টনের আদেশ এবং আর্থিক কার্যক্রমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ভূমিকা পর্যালোচনা করা জরুরি।

সরকারি কর্মীদের দোকানের কাজে ব্যবহার ও গাড়ির ব্যক্তিগত ব্যবহারের অভিযোগ

টিটিসির নিরাপত্তাকর্মী জয় ও মালি আব্দুল হালিমকে তাঁদের নির্ধারিত দায়িত্বের বাইরে দোকান পরিচালনার কাজে ব্যবহার করার অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, সরকারি বেতনভুক্ত কর্মীরা যদি ব্যক্তিগত বা বাণিজ্যিক কাজে ব্যস্ত থাকেন, তাহলে প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা, পরিচর্যা ও দৈনন্দিন রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা হচ্ছে কি না।

এ ছাড়া প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে ব্যবহৃত সরকারি গাড়ি ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ রুস্তম আলী ওই গাড়িতে করে মাঝেমধ্যে তাঁর গ্রামের বাড়ি চুয়াডাঙ্গায় যাতায়াত করেন।

তবে গাড়িটি কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছে, কোন কোন দিনে যাতায়াত করেছে এবং সংশ্লিষ্ট ভ্রমণের অনুমোদন ছিল কি না, তা গাড়ির লগবুক, জ্বালানি ব্যয়ের হিসাব ও দাপ্তরিক নথি পর্যালোচনা করে যাচাই করা প্রয়োজন।

প্রকল্পের জনবল ব্যবস্থাপনা ও অর্থ ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন

প্রকল্পের কর্মীদের ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার এবং তাঁদের দিয়ে কাজ করিয়ে সম্মানীর অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের ভাষ্য, অধ্যক্ষের প্রয়োজন অনুযায়ী প্রকল্পের কর্মীদের বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা হয়।

পাশাপাশি প্রকল্পের বিভিন্ন পদে অধ্যক্ষের আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতদের প্রভাব রয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন তাঁরা। অভিযোগকারীদের দাবি, অধ্যক্ষের ভাগ্নে ফয়সাল ও খাইরুল, তাঁর নিজ এলাকার আব্দুল্লাহ হক এবং তাঁর ভাইয়ের মেয়েকে হাউসকিপিংয়ের কাজে রাখা হয়েছে।

তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়োগপ্রক্রিয়া, যোগ্যতা, দায়িত্ব, উপস্থিতি এবং সম্মানী প্রদানের তথ্য যাচাই ছাড়া এসব অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। প্রকল্পের অনুমোদিত জনবল তালিকা, নিয়োগপত্র, হাজিরা খাতা ও বেতন-ভাতার নথি পরীক্ষা করলে বিষয়টি স্পষ্ট হতে পারে।

কাঁচামাল কেনার ভাউচার আছে, বাস্তবে মালামাল কোথায়?

টিটিসির কেনাকাটা ও প্রশিক্ষণসামগ্রী সংগ্রহের হিসাব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের দাবি, কাঁচামাল কেনার নামে ভাউচারে উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় দেখানো হলেও বাস্তবে সেই পরিমাণ মালামাল প্রতিষ্ঠানে পাওয়া যায় না।

এ অভিযোগের সঙ্গে স্টোরকিপার রুহুল আমিনের কর্মস্থলে উপস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি সপ্তাহে এক থেকে দুই দিন অফিস করেন।

তবে এ বিষয়ে নিজের বক্তব্য দিয়েছেন রুহুল আমিন। তিনি বলেন, “১০০% অফিস করি, এটা বলছি না। নানাবিধ সমস্যায় মাঝে মাঝে অফিসে আসতে পারি না। বাসায় ছোট বাচ্চা আছে, যশোর থেকে যাওয়া-আসায় সমস্যা হয়। যেদিন যেতে পারি না, সেদিন অধ্যক্ষ রুস্তম আলীকে জানিয়ে দিই। অফিসে না যাওয়ার জন্য খুব বেশি সমস্যা হওয়ার কথা না।”

কাঁচামাল কেনার অভিযোগ যাচাই করতে ক্রয়াদেশ, বিল-ভাউচার, সরবরাহকারীর চালান, স্টক রেজিস্টার এবং বাস্তবে মজুত থাকা মালামালের হিসাব মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে স্টোরকিপারের উপস্থিতি ও দায়িত্ব পালনের তথ্যও সংশ্লিষ্ট নথির মাধ্যমে যাচাই করা যেতে পারে।

কম্পিউটার ট্রেডে দক্ষ শিক্ষক ও মানসম্মত যন্ত্রাংশের ঘাটতির অভিযোগ

প্রশিক্ষণের মান নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন কয়েকজন শিক্ষার্থী। অভিযোগকারীদের দাবি, কম্পিউটার ট্রেডে প্রয়োজনীয় দক্ষ শিক্ষক না থাকলেও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এমনকি রেফ্রিজারেশন অ্যান্ড এয়ার কন্ডিশনিং ট্রেডের শিক্ষক সামছুল আলম খানকে দিয়ে কম্পিউটার ট্রেডের কার্যক্রম পরিচালনা করানো হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ ক্ষেত্রে তাঁর কম্পিউটার বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা রয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে সামছুল আলম খানকে ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।

কম্পিউটার ও ইলেকট্রিক্যাল কোর্সের শিক্ষার্থী সবুজ আলী বলেন, “কম্পিউটার কোর্সে ঠিকমতো শিখতে পারিনি। কম্পিউটারের সব যন্ত্রাংশ খুবই নিম্নমানের ছিল, যা দিয়ে সব কাজ করা যেত না। ইলেকট্রিক্যালেও একই অবস্থা। যেসব যন্ত্রাংশ অনেক আগেই ফেলে দেওয়ার কথা, সেসব দিয়েই প্রশিক্ষণ ও কাজ করানো হতো। অনেক সময় প্র্যাকটিস করার মালামাল পেতাম না। এ বিষয়ে অধ্যক্ষকে বললে তিনি বাজেট নেই বলে উড়িয়ে দিতেন।”

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ সত্য হলে তা প্রশিক্ষণের মান ও ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জনের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই প্রশিক্ষকদের যোগ্যতা, যন্ত্রপাতির কার্যকারিতা, ব্যবহারিক ক্লাসের সময়সূচি এবং প্রশিক্ষণসামগ্রী সরবরাহের হিসাব যাচাই করা প্রয়োজন।

দায়িত্ব বণ্টন নিয়েও অভিযোগ

এম এ বাকি নামের এক ব্যক্তির দায়িত্ব বণ্টন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের দাবি, কাগজপত্রে তিনি ইলেকট্রনিকস ট্রেডের দায়িত্বে থাকলেও বাস্তবে ইলেকট্রিক্যাল ট্রেডে চিফ ইন্সট্রাক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

এ বিষয়ে জানতে ফোন করা হলে এম এ বাকি বলেন, “একটা ট্রেনিংয়ে আছি, পরে কথা বলব।”

দায়িত্ব বণ্টনের বিষয়টি নিশ্চিত করতে তাঁর নিয়োগসংক্রান্ত নথি, পদায়ন আদেশ এবং সংশ্লিষ্ট ট্রেডের দায়িত্ব বণ্টনের কাগজপত্র পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

পিডিটি কোর্সে ২০০ টাকা ফি নিয়েও অসন্তোষ

বৈদেশিক কর্মসংস্থানে গমনেচ্ছু কর্মীদের জন্য পরিচালিত প্রাক্-বহির্গমন প্রশিক্ষণ বা পিডিটি কোর্সেও অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন প্রশিক্ষণার্থীরা। তাঁদের দাবি, এ কোর্সে ২০০ টাকা ফি নেওয়া হলেও নির্ধারিত সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হচ্ছে না।

অভিযোগ অনুযায়ী, ফি থেকে ১৩০ টাকা নোটবুক, কলম, সনদপত্রসহ প্রশিক্ষণ-সংশ্লিষ্ট কাজে ব্যয় করার কথা। বাকি ৭০ টাকা প্রশিক্ষণকক্ষের মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর, অ্যামপ্লিফায়ার, প্রজেক্টর স্ক্রিন ও শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মতো সুবিধা নিশ্চিত করার কাজে ব্যবহারের কথা রয়েছে।

তবে প্রশিক্ষণার্থীদের অভিযোগ, সনদপত্র ছাড়া তাঁরা আর কোনো উপকরণ বা সুবিধা পাননি।

তানজির আহমেদ নামে এক প্রশিক্ষণার্থী বলেন, “যে রুমে প্রশিক্ষণ নেওয়া হয়েছে, সেখানে অল্প জায়গা ছিল। ফলে অনেক প্রশিক্ষণার্থীকে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে। আর যা যা দেওয়ার কথা ছিল, তার কিছুই পাইনি। শুধু একটা সার্টিফিকেট দিয়েছে।”

অভিযোগটি যাচাই করতে পিডিটি কোর্সের ফি আদায়ের রসিদ, অর্থ ব্যয়ের হিসাব, প্রশিক্ষণার্থীদের তালিকা এবং প্রশিক্ষণকক্ষের সুযোগ-সুবিধা পরিদর্শন করা প্রয়োজন।

ড্রাইভিং কোর্সে পর্যাপ্ত গাড়ি চালানোর সুযোগ না পাওয়ার অভিযোগ

টিটিসির ড্রাইভিং কোর্সের প্রশিক্ষণার্থীদের মধ্যেও অসন্তোষ রয়েছে। মেহেদী হাসান নামে এক শিক্ষার্থীর অভিযোগ, প্রশিক্ষণ চলাকালে গাড়ি চালাতে চাইলে অধ্যক্ষ রুস্তম আলী বিভিন্ন অজুহাত দেখাতেন। কখনো গাড়িতে তেল নেই, কখনো গাড়ি নষ্ট বলে জানানো হতো। বারবার অনুরোধ করেও তাঁরা পর্যাপ্ত সময় গাড়ি চালানোর সুযোগ পাননি বলে দাবি করেন তিনি।

মেহেদী হাসানের আরও অভিযোগ, ক্লাসে উপস্থিত থাকার পরও অনেক শিক্ষার্থীকে হাজিরা খাতায় অনুপস্থিত দেখানো হয়েছে।

ড্রাইভিং প্রশিক্ষণে ব্যবহারিক অনুশীলন গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় অভিযোগগুলো যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রশিক্ষণের সময়সূচি, গাড়ির ব্যবহারসংক্রান্ত লগবুক, জ্বালানি ব্যয়ের হিসাব এবং হাজিরা খাতা পর্যালোচনা করলে শিক্ষার্থীদের অভিযোগের বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

২০২১ সালের অর্থ ফেরত ও মাসিক ভাতা নিয়ে অভিযোগ

ইলেকট্রিক্যাল ট্রেডের শিক্ষার্থী মো. তামিম আহমেদ অভিযোগ করেন, ২০২১ সালে এসএসসি পরীক্ষার রেজিস্ট্রেশনসংক্রান্ত অর্থ ফেরত দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁদের ব্যাচের শিক্ষার্থীরা বঞ্চিত হয়েছেন। তাঁর দাবি, ওই ব্যাচে শতাধিক শিক্ষার্থী থাকলেও কেউ টাকা ফেরত পাননি।

পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মাসিক এক হাজার টাকা করে ভাতা দেওয়ার কথা থাকলেও তা নিয়মিত দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। তামিম আহমেদের ভাষ্য, ব্যাংকের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ভাতা পাওয়ার কথা থাকলেও তাঁরা প্রত্যাশিত অর্থ নিয়মিত পাননি।

এ অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট ব্যাচের শিক্ষার্থী তালিকা, অর্থ ফেরতের বিধান, ব্যাংক লেনদেনের নথি এবং ভাতা বিতরণের হিসাব পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। শিক্ষার্থীরা নির্ধারিত অর্থ পাওয়ার যোগ্য ছিলেন কি না এবং অর্থ বিতরণে কোনো অনিয়ম হয়েছিল কি না, তা নথিপত্রের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা যেতে পারে।

শিক্ষক-কর্মচারীদের উপস্থিতি ও বদলি নিয়ে প্রশ্ন

টিটিসির বিভিন্ন ট্রেডের শিক্ষকরা নিয়মিত কর্মস্থলে উপস্থিত থাকেন না এবং যথাযথভাবে ক্লাস নেন না বলেও অভিযোগ রয়েছে। কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী নির্ধারিত সময়ের আগেই অফিস ত্যাগ করেন বলে দাবি করেছেন অভিযোগকারীরা।

এ ছাড়া অধ্যক্ষের কথা না শুনলে কিংবা তাঁর বিরুদ্ধে কথা বললে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সরিয়ে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। এ ক্ষেত্রে ইলেকট্রিক্যাল ট্রেডের জাহিদকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনাকে উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন অভিযোগকারীরা।

তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে জাহিদের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি পরে কথা বলবেন বলে কল কেটে দেন। ফলে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতি, দায়িত্ব পালন এবং বদলি বা পদায়নের বিষয়গুলো যাচাই করতে হাজিরা খাতা, অফিস আদেশ ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক নথি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

দুদকের মামলা ও বিভাগীয় তদন্তের দাবি

অধ্যক্ষ রুস্তম আলীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলা এবং নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগে বিভাগীয় মামলা হয়েছিল বলেও দাবি করেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁরা এসব অভিযোগের নথি যাচাই করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

তবে মামলার নম্বর, দায়েরের তারিখ, অভিযোগের সুনির্দিষ্ট বিবরণ, তদন্তের অগ্রগতি কিংবা কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের তথ্য প্রতিবেদনের জন্য পাওয়া যায়নি। ফলে সংশ্লিষ্ট মামলার নথি ও সরকারি সূত্র যাচাই ছাড়া এসব বিষয়ে চূড়ান্ত বক্তব্য দেওয়া সম্ভব নয়।

অভিযোগকারীদের মতে, আর্থিক লেনদেন, নিয়োগপ্রক্রিয়া, প্রকল্পের জনবল, প্রশিক্ষণসামগ্রী এবং সরকারি সম্পদের ব্যবহার নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। এতে অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

অধ্যক্ষ ও জেলা প্রশাসকের বক্তব্য

অভিযোগের বিষয়ে ঝিনাইদহ টিটিসির ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ রুস্তম আলী বলেন, “অভিযোগ থাকলেই তো সত্যি হয় না। আপনি কাল অফিসে আসেন, বিস্তারিত কথা হবে।”

অন্যদিকে, ঝিনাইদহের জেলা প্রশাসক মো. নোমান হোসেন বলেন, “লিখিত অভিযোগ দিলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি

ঝিনাইদহ টিটিসিকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলোর মধ্যে আর্থিক ব্যবস্থাপনা, জনবল নিয়োগ ও দায়িত্ব বণ্টন, প্রশিক্ষণার্থীদের সুযোগ-সুবিধা এবং সরকারি সম্পদ ব্যবহারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নথিপত্র যাচাই, আর্থিক নিরীক্ষা এবং প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিদর্শন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র সামনে আসবে বলে আশা করছেন অভিযোগকারীরা। একই সঙ্গে অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য গ্রহণ এবং নথিভিত্তিক যাচাইয়ের মাধ্যমে দায় নির্ধারণ করা হলে প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার পথ তৈরি হতে পারে।

ঢাকা/এসএস

জনপ্রিয়
Address : Erlaaer Strasse 49/8/16 A-1230 Vienna,Austria. Mob : +43676848863279, 8801719316684 (BD) 8801911691101 ( Ads) Email : eurobanglatimes123@gmail.com
Translate »

ঝিনাইদহ টিটিসিতে অনিয়মের অভিযোগ, তদন্তের দাবি

আপডেটের সময় ০২:৪৬:২৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬

শেখ ইমন, ঝিনাইদহ: কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত ঝিনাইদহ সরকারি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে (টিটিসি) অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও সরকারি অর্থ ব্যবহারের স্বচ্ছতা নিয়ে একাধিক অভিযোগ উঠেছে। স্থাপনা নির্মাণ, হিসাব শাখার দায়িত্ব বণ্টন, প্রকল্পের জনবল ব্যবস্থাপনা, প্রশিক্ষণসামগ্রী কেনাকাটা এবং সরকারি গাড়ির ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। একই সঙ্গে প্রশিক্ষণার্থীদের নির্ধারিত সুযোগ-সুবিধা, ভাতা, ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ ও উপস্থিতি ব্যবস্থাপনা নিয়েও অসন্তোষ জানিয়েছেন কয়েকজন শিক্ষার্থী।

এসব অভিযোগের বেশ কয়েকটি ঝিনাইদহ টিটিসির ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ রুস্তম আলীর বিরুদ্ধে। অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি প্রায় ১১ বছর ধরে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করছেন। দীর্ঘ সময় ধরে একই পদে দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসনিক কার্যক্রম, জনবল ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক কর্মকাণ্ডের জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে বলে তাঁদের অভিযোগ।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন খাতে অর্থ ব্যয় ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনার তথ্য থাকলেও বাস্তবে প্রয়োজনীয় উপকরণ, ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ এবং সেবার ঘাটতি দেখা গেছে। কেউ প্রশিক্ষণসামগ্রী না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন, কেউ পর্যাপ্ত সময় গাড়ি চালানোর সুযোগ পাননি বলে জানিয়েছেন। আবার কেউ ভাতা ও অর্থ ফেরত পাওয়া নিয়ে অভিযোগ তুলেছেন।

তবে এসব অভিযোগের সবগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট নথিপত্র, আর্থিক হিসাব, অনুমোদনপত্র এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

নির্দেশ উপেক্ষা করে স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ

ঝিনাইদহ টিটিসি প্রাঙ্গণে নিয়মবহির্ভূতভাবে স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, নির্মাণকাজের জন্য প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারী ও প্রশিক্ষণার্থীদের কাছ থেকেও অর্থ দাবি করা হয়েছিল। একপর্যায়ে সংশ্লিষ্ট প্রধান কার্যালয় থেকে নির্মাণকাজ বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হলেও তা উপেক্ষা করে কাজ চালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

সরকারি প্রতিষ্ঠানে কোনো স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে যথাযথ অনুমোদন, অর্থের উৎস, ব্যয়ের হিসাব এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুসরণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। এ অবস্থায় টিটিসিতে নির্মিত স্থাপনার অনুমোদন ছিল কি না, নির্মাণে কত টাকা ব্যয় হয়েছে এবং অর্থ কোন উৎস থেকে এসেছে—তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।

এ বিষয়ে নির্মাণকাজের অনুমোদনপত্র, ব্যয়ের নথি এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নির্দেশনার কপি যাচাই করা প্রয়োজন।

অনুমোদিত পদে না থেকেও হিসাব শাখার দায়িত্বে থাকার অভিযোগ

প্রতিষ্ঠানের আর্থিক কার্যক্রম পরিচালনায় হিসাব শাখার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অথচ ঝিনাইদহ টিটিসির হিসাব শাখার দায়িত্ব পালন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, হাবিবুর রহমান নামের এক ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে হিসাব শাখার কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। তাঁদের ভাষ্য, তিনি রাজস্ব বা প্রকল্পের অনুমোদিত জনবল কাঠামোর কোনো পদে নেই।

যদি অভিযোগটি সত্য হয়, তাহলে তাঁর দায়িত্ব পালনের প্রশাসনিক ভিত্তি, আর্থিক নথিতে প্রবেশাধিকার এবং অর্থনৈতিক লেনদেনে ভূমিকা কী ছিল, তা যাচাই করা প্রয়োজন। এ জন্য অনুমোদিত জনবল কাঠামো, নিয়োগসংক্রান্ত নথি, দায়িত্ব বণ্টনের আদেশ এবং আর্থিক কার্যক্রমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ভূমিকা পর্যালোচনা করা জরুরি।

সরকারি কর্মীদের দোকানের কাজে ব্যবহার ও গাড়ির ব্যক্তিগত ব্যবহারের অভিযোগ

টিটিসির নিরাপত্তাকর্মী জয় ও মালি আব্দুল হালিমকে তাঁদের নির্ধারিত দায়িত্বের বাইরে দোকান পরিচালনার কাজে ব্যবহার করার অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, সরকারি বেতনভুক্ত কর্মীরা যদি ব্যক্তিগত বা বাণিজ্যিক কাজে ব্যস্ত থাকেন, তাহলে প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা, পরিচর্যা ও দৈনন্দিন রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা হচ্ছে কি না।

এ ছাড়া প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে ব্যবহৃত সরকারি গাড়ি ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ রুস্তম আলী ওই গাড়িতে করে মাঝেমধ্যে তাঁর গ্রামের বাড়ি চুয়াডাঙ্গায় যাতায়াত করেন।

তবে গাড়িটি কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছে, কোন কোন দিনে যাতায়াত করেছে এবং সংশ্লিষ্ট ভ্রমণের অনুমোদন ছিল কি না, তা গাড়ির লগবুক, জ্বালানি ব্যয়ের হিসাব ও দাপ্তরিক নথি পর্যালোচনা করে যাচাই করা প্রয়োজন।

প্রকল্পের জনবল ব্যবস্থাপনা ও অর্থ ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন

প্রকল্পের কর্মীদের ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার এবং তাঁদের দিয়ে কাজ করিয়ে সম্মানীর অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের ভাষ্য, অধ্যক্ষের প্রয়োজন অনুযায়ী প্রকল্পের কর্মীদের বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা হয়।

পাশাপাশি প্রকল্পের বিভিন্ন পদে অধ্যক্ষের আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতদের প্রভাব রয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন তাঁরা। অভিযোগকারীদের দাবি, অধ্যক্ষের ভাগ্নে ফয়সাল ও খাইরুল, তাঁর নিজ এলাকার আব্দুল্লাহ হক এবং তাঁর ভাইয়ের মেয়েকে হাউসকিপিংয়ের কাজে রাখা হয়েছে।

তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়োগপ্রক্রিয়া, যোগ্যতা, দায়িত্ব, উপস্থিতি এবং সম্মানী প্রদানের তথ্য যাচাই ছাড়া এসব অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। প্রকল্পের অনুমোদিত জনবল তালিকা, নিয়োগপত্র, হাজিরা খাতা ও বেতন-ভাতার নথি পরীক্ষা করলে বিষয়টি স্পষ্ট হতে পারে।

কাঁচামাল কেনার ভাউচার আছে, বাস্তবে মালামাল কোথায়?

টিটিসির কেনাকাটা ও প্রশিক্ষণসামগ্রী সংগ্রহের হিসাব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের দাবি, কাঁচামাল কেনার নামে ভাউচারে উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় দেখানো হলেও বাস্তবে সেই পরিমাণ মালামাল প্রতিষ্ঠানে পাওয়া যায় না।

এ অভিযোগের সঙ্গে স্টোরকিপার রুহুল আমিনের কর্মস্থলে উপস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি সপ্তাহে এক থেকে দুই দিন অফিস করেন।

তবে এ বিষয়ে নিজের বক্তব্য দিয়েছেন রুহুল আমিন। তিনি বলেন, “১০০% অফিস করি, এটা বলছি না। নানাবিধ সমস্যায় মাঝে মাঝে অফিসে আসতে পারি না। বাসায় ছোট বাচ্চা আছে, যশোর থেকে যাওয়া-আসায় সমস্যা হয়। যেদিন যেতে পারি না, সেদিন অধ্যক্ষ রুস্তম আলীকে জানিয়ে দিই। অফিসে না যাওয়ার জন্য খুব বেশি সমস্যা হওয়ার কথা না।”

কাঁচামাল কেনার অভিযোগ যাচাই করতে ক্রয়াদেশ, বিল-ভাউচার, সরবরাহকারীর চালান, স্টক রেজিস্টার এবং বাস্তবে মজুত থাকা মালামালের হিসাব মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে স্টোরকিপারের উপস্থিতি ও দায়িত্ব পালনের তথ্যও সংশ্লিষ্ট নথির মাধ্যমে যাচাই করা যেতে পারে।

কম্পিউটার ট্রেডে দক্ষ শিক্ষক ও মানসম্মত যন্ত্রাংশের ঘাটতির অভিযোগ

প্রশিক্ষণের মান নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন কয়েকজন শিক্ষার্থী। অভিযোগকারীদের দাবি, কম্পিউটার ট্রেডে প্রয়োজনীয় দক্ষ শিক্ষক না থাকলেও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এমনকি রেফ্রিজারেশন অ্যান্ড এয়ার কন্ডিশনিং ট্রেডের শিক্ষক সামছুল আলম খানকে দিয়ে কম্পিউটার ট্রেডের কার্যক্রম পরিচালনা করানো হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ ক্ষেত্রে তাঁর কম্পিউটার বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা রয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে সামছুল আলম খানকে ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।

কম্পিউটার ও ইলেকট্রিক্যাল কোর্সের শিক্ষার্থী সবুজ আলী বলেন, “কম্পিউটার কোর্সে ঠিকমতো শিখতে পারিনি। কম্পিউটারের সব যন্ত্রাংশ খুবই নিম্নমানের ছিল, যা দিয়ে সব কাজ করা যেত না। ইলেকট্রিক্যালেও একই অবস্থা। যেসব যন্ত্রাংশ অনেক আগেই ফেলে দেওয়ার কথা, সেসব দিয়েই প্রশিক্ষণ ও কাজ করানো হতো। অনেক সময় প্র্যাকটিস করার মালামাল পেতাম না। এ বিষয়ে অধ্যক্ষকে বললে তিনি বাজেট নেই বলে উড়িয়ে দিতেন।”

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ সত্য হলে তা প্রশিক্ষণের মান ও ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জনের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই প্রশিক্ষকদের যোগ্যতা, যন্ত্রপাতির কার্যকারিতা, ব্যবহারিক ক্লাসের সময়সূচি এবং প্রশিক্ষণসামগ্রী সরবরাহের হিসাব যাচাই করা প্রয়োজন।

দায়িত্ব বণ্টন নিয়েও অভিযোগ

এম এ বাকি নামের এক ব্যক্তির দায়িত্ব বণ্টন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের দাবি, কাগজপত্রে তিনি ইলেকট্রনিকস ট্রেডের দায়িত্বে থাকলেও বাস্তবে ইলেকট্রিক্যাল ট্রেডে চিফ ইন্সট্রাক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

এ বিষয়ে জানতে ফোন করা হলে এম এ বাকি বলেন, “একটা ট্রেনিংয়ে আছি, পরে কথা বলব।”

দায়িত্ব বণ্টনের বিষয়টি নিশ্চিত করতে তাঁর নিয়োগসংক্রান্ত নথি, পদায়ন আদেশ এবং সংশ্লিষ্ট ট্রেডের দায়িত্ব বণ্টনের কাগজপত্র পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

পিডিটি কোর্সে ২০০ টাকা ফি নিয়েও অসন্তোষ

বৈদেশিক কর্মসংস্থানে গমনেচ্ছু কর্মীদের জন্য পরিচালিত প্রাক্-বহির্গমন প্রশিক্ষণ বা পিডিটি কোর্সেও অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন প্রশিক্ষণার্থীরা। তাঁদের দাবি, এ কোর্সে ২০০ টাকা ফি নেওয়া হলেও নির্ধারিত সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হচ্ছে না।

অভিযোগ অনুযায়ী, ফি থেকে ১৩০ টাকা নোটবুক, কলম, সনদপত্রসহ প্রশিক্ষণ-সংশ্লিষ্ট কাজে ব্যয় করার কথা। বাকি ৭০ টাকা প্রশিক্ষণকক্ষের মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর, অ্যামপ্লিফায়ার, প্রজেক্টর স্ক্রিন ও শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মতো সুবিধা নিশ্চিত করার কাজে ব্যবহারের কথা রয়েছে।

তবে প্রশিক্ষণার্থীদের অভিযোগ, সনদপত্র ছাড়া তাঁরা আর কোনো উপকরণ বা সুবিধা পাননি।

তানজির আহমেদ নামে এক প্রশিক্ষণার্থী বলেন, “যে রুমে প্রশিক্ষণ নেওয়া হয়েছে, সেখানে অল্প জায়গা ছিল। ফলে অনেক প্রশিক্ষণার্থীকে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে। আর যা যা দেওয়ার কথা ছিল, তার কিছুই পাইনি। শুধু একটা সার্টিফিকেট দিয়েছে।”

অভিযোগটি যাচাই করতে পিডিটি কোর্সের ফি আদায়ের রসিদ, অর্থ ব্যয়ের হিসাব, প্রশিক্ষণার্থীদের তালিকা এবং প্রশিক্ষণকক্ষের সুযোগ-সুবিধা পরিদর্শন করা প্রয়োজন।

ড্রাইভিং কোর্সে পর্যাপ্ত গাড়ি চালানোর সুযোগ না পাওয়ার অভিযোগ

টিটিসির ড্রাইভিং কোর্সের প্রশিক্ষণার্থীদের মধ্যেও অসন্তোষ রয়েছে। মেহেদী হাসান নামে এক শিক্ষার্থীর অভিযোগ, প্রশিক্ষণ চলাকালে গাড়ি চালাতে চাইলে অধ্যক্ষ রুস্তম আলী বিভিন্ন অজুহাত দেখাতেন। কখনো গাড়িতে তেল নেই, কখনো গাড়ি নষ্ট বলে জানানো হতো। বারবার অনুরোধ করেও তাঁরা পর্যাপ্ত সময় গাড়ি চালানোর সুযোগ পাননি বলে দাবি করেন তিনি।

মেহেদী হাসানের আরও অভিযোগ, ক্লাসে উপস্থিত থাকার পরও অনেক শিক্ষার্থীকে হাজিরা খাতায় অনুপস্থিত দেখানো হয়েছে।

ড্রাইভিং প্রশিক্ষণে ব্যবহারিক অনুশীলন গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় অভিযোগগুলো যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রশিক্ষণের সময়সূচি, গাড়ির ব্যবহারসংক্রান্ত লগবুক, জ্বালানি ব্যয়ের হিসাব এবং হাজিরা খাতা পর্যালোচনা করলে শিক্ষার্থীদের অভিযোগের বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

২০২১ সালের অর্থ ফেরত ও মাসিক ভাতা নিয়ে অভিযোগ

ইলেকট্রিক্যাল ট্রেডের শিক্ষার্থী মো. তামিম আহমেদ অভিযোগ করেন, ২০২১ সালে এসএসসি পরীক্ষার রেজিস্ট্রেশনসংক্রান্ত অর্থ ফেরত দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁদের ব্যাচের শিক্ষার্থীরা বঞ্চিত হয়েছেন। তাঁর দাবি, ওই ব্যাচে শতাধিক শিক্ষার্থী থাকলেও কেউ টাকা ফেরত পাননি।

পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মাসিক এক হাজার টাকা করে ভাতা দেওয়ার কথা থাকলেও তা নিয়মিত দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। তামিম আহমেদের ভাষ্য, ব্যাংকের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ভাতা পাওয়ার কথা থাকলেও তাঁরা প্রত্যাশিত অর্থ নিয়মিত পাননি।

এ অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট ব্যাচের শিক্ষার্থী তালিকা, অর্থ ফেরতের বিধান, ব্যাংক লেনদেনের নথি এবং ভাতা বিতরণের হিসাব পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। শিক্ষার্থীরা নির্ধারিত অর্থ পাওয়ার যোগ্য ছিলেন কি না এবং অর্থ বিতরণে কোনো অনিয়ম হয়েছিল কি না, তা নথিপত্রের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা যেতে পারে।

শিক্ষক-কর্মচারীদের উপস্থিতি ও বদলি নিয়ে প্রশ্ন

টিটিসির বিভিন্ন ট্রেডের শিক্ষকরা নিয়মিত কর্মস্থলে উপস্থিত থাকেন না এবং যথাযথভাবে ক্লাস নেন না বলেও অভিযোগ রয়েছে। কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী নির্ধারিত সময়ের আগেই অফিস ত্যাগ করেন বলে দাবি করেছেন অভিযোগকারীরা।

এ ছাড়া অধ্যক্ষের কথা না শুনলে কিংবা তাঁর বিরুদ্ধে কথা বললে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সরিয়ে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। এ ক্ষেত্রে ইলেকট্রিক্যাল ট্রেডের জাহিদকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনাকে উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন অভিযোগকারীরা।

তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে জাহিদের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি পরে কথা বলবেন বলে কল কেটে দেন। ফলে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতি, দায়িত্ব পালন এবং বদলি বা পদায়নের বিষয়গুলো যাচাই করতে হাজিরা খাতা, অফিস আদেশ ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক নথি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

দুদকের মামলা ও বিভাগীয় তদন্তের দাবি

অধ্যক্ষ রুস্তম আলীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলা এবং নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগে বিভাগীয় মামলা হয়েছিল বলেও দাবি করেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁরা এসব অভিযোগের নথি যাচাই করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

তবে মামলার নম্বর, দায়েরের তারিখ, অভিযোগের সুনির্দিষ্ট বিবরণ, তদন্তের অগ্রগতি কিংবা কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের তথ্য প্রতিবেদনের জন্য পাওয়া যায়নি। ফলে সংশ্লিষ্ট মামলার নথি ও সরকারি সূত্র যাচাই ছাড়া এসব বিষয়ে চূড়ান্ত বক্তব্য দেওয়া সম্ভব নয়।

অভিযোগকারীদের মতে, আর্থিক লেনদেন, নিয়োগপ্রক্রিয়া, প্রকল্পের জনবল, প্রশিক্ষণসামগ্রী এবং সরকারি সম্পদের ব্যবহার নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। এতে অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

অধ্যক্ষ ও জেলা প্রশাসকের বক্তব্য

অভিযোগের বিষয়ে ঝিনাইদহ টিটিসির ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ রুস্তম আলী বলেন, “অভিযোগ থাকলেই তো সত্যি হয় না। আপনি কাল অফিসে আসেন, বিস্তারিত কথা হবে।”

অন্যদিকে, ঝিনাইদহের জেলা প্রশাসক মো. নোমান হোসেন বলেন, “লিখিত অভিযোগ দিলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি

ঝিনাইদহ টিটিসিকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলোর মধ্যে আর্থিক ব্যবস্থাপনা, জনবল নিয়োগ ও দায়িত্ব বণ্টন, প্রশিক্ষণার্থীদের সুযোগ-সুবিধা এবং সরকারি সম্পদ ব্যবহারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নথিপত্র যাচাই, আর্থিক নিরীক্ষা এবং প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিদর্শন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র সামনে আসবে বলে আশা করছেন অভিযোগকারীরা। একই সঙ্গে অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য গ্রহণ এবং নথিভিত্তিক যাচাইয়ের মাধ্যমে দায় নির্ধারণ করা হলে প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার পথ তৈরি হতে পারে।

ঢাকা/এসএস