লন্ডনের চেলসির চ্যাম্পিয়ন্স লীগের শিরোপা লাভ

ইউরোপের মর্যাদা সম্পন্ন শ্রেষ্ঠ ক্লাব ফুটবল টুর্নামেন্ট চ্যাম্পিয়ন্স লীগের ফাইনালে চেলসি লন্ডন ১-০ গোলে ম্যানচেস্টার সিটিকে পরাজিত করেছে

স্পোর্টস ডেস্কঃ গতকাল শনিবার ২৯ মে পর্তুগালের বন্দর নগরী পোর্তোর এস্তাদিও ডো ড্র্যাগো স্টেডিয়ামে উয়েফা (UEFA) চ্যাম্পিয়ন্স লীগের ফাইনাল খেলায় লন্ডনের চেলসি ফুটবল ক্লাব ম্যানচেস্টার সিটি ক্লাবকে ১-০ গোলে পরাজিত করে দ্বিতীয়বারের মত এই শিরোপা অর্জন করে। খেলার  ৪২ মিনিটের মাথায় জয়সূচক গোলটি করেন দলের সবচেয়ে দামী খেলোয়াড় কাই হাভার্টজ।

৪২ মিনিটের মাথায় গোল করে দলকে এগিয়ে দেন তিনি। আক্রমণ শুরু হয় গোলরক্ষক এডোয়ার্ড মেন্ডির পা থেকে। হাভার্টজকে গোলের পাসটি বাড়িয়েছিলেন মেসন মাউন্ট। চেলসির সব চেয়ে দামি ফুটবলার হাভার্টজ সেই বল নিয়ে এগিয়ে যান গোলের দিকে। সিটির গোলরক্ষককে টপকে ফাঁকা গোলে বল ঠেলে দেন তিনি। চ্যাম্পিয়ন্স লিগে এটাই তাঁর প্রথম গোল। সেই গোলেই চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতে নেয় চেলসি। প্রশিক্ষক থমাস টূশেল গত বার পিএসজি-কে ফাইনালে তুলেও হেরে যান। তবে এ বার হাসি মুখেই মাঠ ছাড়লেন তিনি।

আক্রমণ ও পাল্টা আক্রমণের মধ্য দিয়ে খেলাটি প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছিল প্রথম থেকেই। আক্রমণ নির্ভর খেলাতেই মন দিয়েছিল উভয় দল। ম্যাচের শুরুতে ১৩ মিনিটের মাথায় গোল পেয়ে যেতে পারতো চেলসি। গোলের সামনে সিটির গোলরক্ষক এডেরসন মোরেসকে একা পেয়েও জালে বল জড়াতে ব্যর্থ হন টিমো ওয়ার্নার। পর পর ২ বার সুযোগ পেলেও গোল করতে পারেননি তিনি। প্রথমার্ধে চেলসির আক্রমণের ধার একটু বেশিই ছিল সিটির থেকে। প্রথম বার চ্যাম্পিন্স লিগের ফাইনালে হারলেন কোচ গুয়ার্দিওলা।

দ্বিতীয়ার্ধে আক্রমণে ফেরে পেপ গুয়ার্দিওলার দল। গোলের খোঁজে গ্যাব্রিয়াল জেসুস, ফার্নান্ডিনহো, সের্জিও আগুয়েরোর মতো ফুটবলারদের নামিয়ে দেন গুয়ার্দিওলা। তবে চেলসির রক্ষণভাগে পায়ের জঙ্গল তৈরি করে ফেলছিলেন রুডিগাররা। ২০১২ সালের পর পুনরায় চ্যাম্পিয়ন্স লীগের ট্রফি চেলসির ঘরে।

লন্ডনের ক্লাবটি প্রিমিয়ার লিগে চ্যাম্পিয়ন সিটির পিছনে বিশাল ব্যবধান ১৯ পয়েন্টের পিছে থেকেও পর পর কয়েকটি জয়ের পর চতুর্থ স্থান অর্জন করতে পেরেছে।

উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লীগ (ইউরোপীয় কাপ অথবা সংক্ষেপে ইউসিএল নামে পরিচিত) হচ্ছে ইউরোপীয় ফুটবল ক্লাবগুলোর মধ্যে ১৯৫৫ সাল থেকে ইউনিয়ন অব ইউরোপিয়ান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (উয়েফা) কর্তৃক আয়োজিত একটি বার্ষিক ফুটবল ক্লাব প্রতিযোগিতা। এই প্রতিযোগিতায় ইউরোপের শীর্ষ স্তরের ক্লাবগুলো অংশগ্রহণ করে থাকে। এটি বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবল প্রতিযোগিতার পাশাপাশি ইউরোপীয় ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ক্লাব প্রতিযোগিতা, যেখানে ইউরোপীয় জাতীয় অ্যাসোসিয়েশন দ্বারা আয়োজিত জাতীয় লীগের বিজয়ী দল (কিছু ক্ষেত্রে রানারআপ বা তৃতীয় স্থান অধিকারী দল) অংশগ্রহণ করে থাকে। উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লীগ উয়েফা কাপ এবং উয়েফা কাপ উইনার্স কাপ হতে একটি আলাদা প্রতিযোগিতা।

১৯৫৫ সালে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন ক্লাবস’ কাপ নামে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিযোগিতায় প্রাথমিকভাবে জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপের শুধুমাত্র বিজয়ী দল অংশগ্রহণ করতে পারতো। ১৯৯২ সালে এই প্রতিযোগিতার নাম বর্তমান নামে নামাঙ্কিত করা হয়েছে, একই সাথে এই প্রতিযোগিতাটি একটি রাউন্ড-রবিন গ্রুপ পর্বে রূপান্তরিত করা হয়েছে, যেখানে বিভিন্ন দেশের একাধিক ক্লাব অংশগ্রহণ করার সুযোগ লাভ করে।

পরবর্তীতে এই প্রতিযোগিতার বিন্যাসে আরও পরিবর্তন আনা হয়েছে; বর্তমানে এই প্রতিযোগিতায় ইউরোপের জাতীয় লীগের বিজয়ী দলের পাশাপাশি শীর্ষস্থানীয় অ্যাসোসিয়েশন থেকে চারটি পর্যন্ত দল অংশগ্রহণ করতে পারে। পয়েন্ট তালিকা ঠিক পরের কয়েকটি ক্লাব যারা এই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগ পায়নি, তারা ইউরোপীয় ক্লাব প্রতিযোগিতার দ্বিতীয় স্তরের লীগ, উয়েফা ইউরোপা লীগে অংশগ্রহণ করে থাকে। ২০২১ সাল থেকে উয়েফা ইউরোপা লীগে উত্তীর্ণ দলের পর অবস্থান করা দলগুলো (যারা উয়েফা ইউরোপা লীগে উত্তীর্ণ হতে পারেনি) ইউরোপীয় ক্লাব প্রতিযোগিতার তৃতীয় স্তরের লীগ উয়েফা ইউরোপা কনফারেন্স লীগে অংশগ্রহণ করবে।

বর্তমান বিন্যাসে, জুন মাসের শেষের দিকে চ্যাম্পিয়নস লীগের প্রাথমিক পর্ব, তিনটি বাছাইপর্ব এবং একটি প্লে-অফ পর্বের মধ্য দিয়ে প্রতিটি আসর শুরু হয়, এসময়ের সকল খেলা দুই লেগে আয়োজন করা হয়। বাছাইপর্ব হতে উত্তীর্ণ ছয়টি দল এবং পূর্ব হতে উত্তীর্ণ ২৬টি দল নিয়ে প্রতি মৌসুমের গ্রুপ পর্ব শুরু হয়। ৩২টি দল চারটি দলের আটটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে একই গ্রুপের দলের সাথে দ্বৈত রাউন্ড-রবিন পদ্ধতিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। আট গ্রুপের বিজয়ী এবং রানার-আপ দল নকআউট পর্বে অগ্রসর হয়, যা মে মাসের শেষের দিকে অথবা জুন মাসের শুরুর দিকে ফাইনাল খেলার মাধ্যমে সমাপ্ত হয়। চ্যাম্পিয়নস লীগের বিজয়ী দল পরবর্তী মৌসুমের চ্যাম্পিয়নস লীগ, উয়েফা সুপার কাপ এবং ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপের জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে উত্তীর্ণ হয়। ২০২০ সালে, করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে উয়েফার ঐতিহ্যগতভাবে অনুসৃত সকল লীগের ম্যাচের সময়সূচী ব্যাহত হয়েছিল, ২০২০ সালের মে মাসের জন্য পূর্বনির্ধারিত সকল খেলা স্থগিত করা হয়েছিল এবং উক্ত খেলাগুলো পরবর্তীতে পুনঃনির্ধারণ করা হয়েছিল।

এই পর্যন্ত এই প্রতিযোগিতাটি ২২টি ক্লাব জয়লাভ করেছে, যার মধ্যে ১২টি ক্লাব একাধিকবার জয়লাভ করেছে। স্পেনীয় ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদ এই প্রতিযোগিতার ইতিহাসের সবচেয়ে সফল ক্লাব, যারা প্রথম পাঁচ মৌসুমে টানা ৫টি শিরোপাসহ সর্বমোট ১৩টি শিরোপা জয়ালাভ করেছে। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ইতালীয় ক্লাব এসি মিলান, যারা এপর্যন্ত ৭ বার এবং তৃতীয় স্থানে রয়েছে জার্মান ক্লাব বায়ার্ন মিউনিখ, যারা এপর্যন্ত ৬ বার শিরোপা জয়লাভ করেছে।

বর্তমান চ্যাম্পিয়ন বায়ার্ন মিউনিখ ২০২০ সালের ফাইনালে ফরাসি ক্লাব  প্যারিস সেন্ট জেরমাইনকে ১–০ গোলে হারিয়ে ক্লাবের ইতিহাসে ৬ষ্ঠ বারের মতো শিরোপা ঘরে তুলতে সক্ষম হয়েছিল। এই প্রতিযোগিতায় স্পেনীয় ক্লাবগুলো সর্বাধিক ১৮ বার শিরোপা জয়লাভ করেছে, দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ইংল্যান্ডের ক্লাবগুলো (যারা এপর্যন্ত ১৩ বার শিরোপা জয়লাভ করেছে) এবং তৃতীয় স্থানে রয়েছে ইতালির ক্লাবগুলো (যারা এপর্যন্ত ১২ বার শিরোপা জয়লাভ করেছে)। ইংল্যান্ড হতে সর্বাধিক ৫ বার ভিন্ন ভিন্ন ক্লাব এই প্রতিযোগিতার শিরোপা জয়লাভ করেছে।

কবির আহমেদ/ ইবি টাইমস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit exceeded. Please complete the captcha once again.

Translate »