ভারতে করোনা পরিস্থিতির অব্যাহত অবনতি! ফেসবুক লাইভে এসে কেঁদে দিলেন এক চিকিৎসক
আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের জনপ্রিয় টেলিভিশন নেটওয়ার্ক “News 18 bangla” এক বিশেষ প্রতিবেদনে জানান যে, রাজ্যের বর্ধমান জেলার এক চিকিৎসক ফেসবুকে লাইভে এসে করোনার ভয়াবহ পরিস্থিতির জন্য অঝোরে কেঁদে দিলেন। সম্প্রচার কেন্দ্রের প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বক্ষ ও মেডিসিন বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ডা. অনির্বাণ বিশ্বাস দীর্ঘদিন ধরে বর্ধমান শহরে নিজের চেম্বারে চিকিৎসা করে আসছেন। করোনার সময়ের শুরু থেকেই তিনি বারবার তার ফেসবুক একাউন্টে করোনার সতর্কতামূলক পোষ্ট নিয়মিত দিয়ে আসছেন।
বর্তমানে ভারতে করোনার মিউট্যান্ট ভাইরাসের এই দ্বিতীয় প্রাদুর্ভাবে সমগ্র দেশ স্তব্ধ হয়ে পড়েছে। তাই ডা. অনির্বাণ একমাত্র কন্যা আর স্ত্রীকে বাসায় রেখে দিনে ৮-৯ ঘন্টা পিপি কিট পরে, মুখে মাস্ক লাগিয়ে রোগীদের দেখছেন অনবরত।।তিনি তার ফেসবুকে একটি সতর্ক বার্তা দিতে গিয়ে অঝোরে কেঁদেছেন। কারণ তিনি বুঝতে পেরেছেন এবারে করোনা ক্রমশ শক্তি বাড়াচ্ছে। একজন চিকিৎসক হয়ে মানুষকে না বাঁচাতে পারার যে কতটা যন্ত্রণা,” তা ধরা পড়েছে তার আকুতিতে। ফেসবুকে সাধারণ মানুষকে সতর্ক করতে গিয়ে শিশুর মতন অঝোরে কেঁদে ফেলেন তিনি।
তিনি বলেন,হাসপাতালে ‘বেড নেই,অক্সিজেন নেই। রোগীরা হাঁপাচ্ছে,রোগীদের আত্মীয়-স্বজনের আহাজারি। এই দৃশ্য আর চোখে দেখা যাচ্ছে না। অনেককে হাসপাতালে যেতে বলে বাড়ি চলে এসেছি। তাদের যে কি হবে আমার জানা নেই। সাধারণ জনগণকে সতর্ক করে সচেতন করতে ফেসবুকে এসে অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে হাতজোড় করে তার অনুরোধ, করোনায় আক্রান্ত হলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যান। তার উপলব্ধি,সাত আট দিন পরে এলে চিকিৎসকের আর বিশেষ কিছু করার থাকছে না। তার এই ভিডিও ভাইরাল হয়ে এখন বাসিন্দাদের ফোনে ফোনে ঘুরছে। বিশিষ্ট চিকিৎসককে হাউ হাউ করে কাঁদতে দেখে পরিস্থিতি যে কতটা ভয়াবহ তা অনুভব করছেন অনেকেই।
কাঁদতে কাঁদতেও হাত জোড় করে অনির্বাণ বিশ্বাস বলছেন, অনেকেই আসছেন অনেক দেরি করে। বাড়িতে সাত দশদিন নিজেরাই ডাক্তারি করার পরে ডাক্তারবাবুর কাছে আসছেন। এটা করবেন না। শরীর খারাপ হওয়া মাত্রই চিকিৎসকের কাছে আসুন। আমরা একবার চেষ্টা অন্তত করতে পারি। খুব ভয়াবহ সময়ের মধ্যে দিয়ে আমরা যাচ্ছি। মাস্ক পড়ুন,নির্দিষ্ট দূরত্ব মেনে চলতেই হবে এবং হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করুন।
ডা. অনির্বাণ বিশ্বাস বলেন, ‘হাসপাতালে হুট করে ১০০ থেকে দশ হাজার বেড করে দেওয়া সম্ভব নয়। অনেক পরিকাঠামো প্রয়োজন। আপনারা সচেতন না হলে আরও বিপদ বাড়বে। চোখের সামনে একজন চিকিৎসক হয়ে মানুষের চলে যাওয়াটা মেনে নিতে পারছি না। খুব কষ্ট হচ্ছে।’
এদিকে ভারতের অন্যান্য জাতীয় সংবাদ মাধ্যমে বলা হয়েছে করোনায় মারা যাওয়া হাজার হাজার দেহ ছিড়ে খাচ্ছে কুকুর,চিল আর শকুনের দল। গত কয়েকদিনে ভারতের উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ ও বিহারে গঙ্গা নদীতে ভাসতে দেখা গেছে অসংখ্য মরদেহ। এমন ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে কোভিডে নিহতদের মরদেহ নদীতে ভাসিয়ে দিতে দেখা যাচ্ছে।
সংবাদ মাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে জানা গেছে, উত্তরপ্রদেশের ২৭ জেলায় গঙ্গার তীরে কবর দেওয়া হয়েছে অসংখ্য মরদেহ। গঙ্গার ১,১৪০ কিলোমিটার যাত্রাপথে নদীর তীরে ২ হাজারের বেশী মরদেহ কবর দেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে খারাপ অবস্থা কানপুর, কনৌজ, উন্নাও, গাজিপুর ও বালিয়ার জেলায়। কনৌজের মহাদেবী গঙ্গাঘাটের কাছে ৩৫০ জনের বেশী মরদেহ কবর দেওয়া হয়েছে। ঘাটে কর্মরত রাজনারায়ণ পাণ্ডে নামের এক ব্যক্তি বলেন, বার বার মরদেহগুলো মাটিচাপা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু গঙ্গার জল বাড়লে মাটি সরে যাচ্ছে। ফলে অনেক সময় মরদেহ নদীতে ভেসে যাচ্ছে।
সংবাদ মাধ্যম আরও জানান যে,কানপুরের শেরেশ্বর ঘাটের কাছের চিত্র একই। যে দিকে চোখ যায় সে দিকেই মরদেহ। ৪০০ শতেরও বেশী মরদেহ কবর দেওয়া হয়েছে সেখানে। মাটি সরে গিয়ে মরদেহ বেরিয়ে পড়ছে। তার উপর চিল, শকুন গিয়ে বসছে। এর থেকে সংক্রমণ ও দূষণ ছড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন পরিবেশবিদরা। উন্নাওয়ের দুটি ঘাটের কাছে ৯ শতের বেশী মরদেহ কবর দেওয়া হয়েছে। কুকুর ও শেয়ালে অনেক মৃতদেহ টেনে বের করে নিয়ে আসছে। উত্তরপ্রদেশ জুড়ে ভয়াবহ আতঙ্কের পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
পরিবেশবিদরা বলছেন, করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হলে সেই মরদেহের শেষকৃত্যের একটা বিশেষ পদ্ধতি থাকে। এভাবে কবর দিলে সেটা শুধু পরিবেশের জন্য ক্ষতিকারকই নয়, সেখান থেকে সংক্রমণও দ্রুত ছড়াতে পারে। তা ছাড়া এই মরদেহ গঙ্গায় ভেসে গেলে জলও দূষিত হবে।
ভারতে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুসারে গতকাল শনিবার ১৫ মে নতুন করে করোনায় সংক্রমিত শনাক্ত হয়েছেন ৩ লক্ষ ৭ হাজার ৬৬৫ জন এবং একই দিনে করোনায় মৃত্যুবরণ করেছেন ৪ হাজার ২৫ জন। ভারতে এই পর্যন্ত করোনায় মোট আক্রান্তের সংখ্যা ২ কোটি ৪৬ লক্ষ ৭৯ হাজার ৯০৮ জন। ভারতে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে এই পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করেছেন মোট ২ লক্ষ ৭০ হাজার ২৫৪ জন। বর্তমানে করোনার সক্রিয় রোগীর সংখ্যা ৩৬ লক্ষ ২৭ হাজার ৩৭৮ জন। এর মধ্যে ক্রিটিক্যাল অবস্থার মধ্যে আছেন প্রায় ৯,০০০ হাজার।
কবির আহমেদ/ ইবি টাইমস