এবছর ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেন বিশ্বের অন্যতম সেরা এবং শীর্ষ বাসযোগ্য শহর হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হয়েছে

আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ মঙ্গলবার (৭ জুলাই) লন্ডন ভিত্তিক ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (EIU) গ্লোবাল লিভেবিলিটি বিশ্বের ১৭৩টি দেশের ওপর পরিচালিত জরিপের পর, তাদের ইনডেক্স অনুযায়ী, কোপেনহেগেন বিশ্বের সবচেয়ে বাসযোগ্য শহর হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে।
২০২৬ সালের বিশ্বের বাসযোগ্য শহরের তালিকারশীর্ষ ১০ শহরের মধ্যে রয়েছে যথাক্রমে প্রথম ডেনমার্কের কোপেনহেগেন, দ্বিতীয় অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা, তৃতীয় অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ণ,চতুর্থ অস্ট্রেলিয়ার সিডনি, পঞ্চম সুইজারল্যান্ডের জুরিখ, ৬ষ্ঠ সুইজারল্যান্ডের জেনেভা, সপ্তম জাপানের ওসাকা, অষ্টম
আস্ট্রেলিয়ার এডিলেড,নবম কানাডার ভ্যানকুবার ও দশম জাপানের টোকিও।
কোপেনহেগেনের শীর্ষ শহর হওয়ার কারণসমূহ: নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা: শহরটি তার বাসিন্দাদের জন্য অত্যন্ত নিরাপদ এবং স্থিতিশীল জীবনযাপন নিশ্চিত করেছে, যেখানে অপরাধের হার খুবই কম।
উন্নত অবকাঠামো: পরিবহন ব্যবস্থা, আবাসন এবং নাগরিক সুবিধাসহ অবকাঠামো সূচকে শহরটি একদম নিখুঁত স্কোর অর্জন করেছে।
পরিবেশ-বান্ধব জীবন ও সাইকেলের শহর: কার্বন নিঃসরণ কমানোর ক্ষেত্রে এটি বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় শহর। এখানকার বাসিন্দাদের প্রধান বাহন হলো সাইকেল, যা শহরের পরিবেশকে পরিচ্ছন্ন ও দূষণমুক্ত রাখে।
কর্ম ও জীবনের ভারসাম্য (Work-Life Balance): বিশ্বের সবচেয়ে সুখী শহরগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। এখানকার কর্মীরা সপ্তাহে তুলনামূলক কম কাজ করেন এবং লম্বা ছুটির সুবিধা ভোগ করেন, যা মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করে।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা: আধুনিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং মানসম্মত স্বাস্থ্য সেবার ক্ষেত্রে শহরটি বিশ্বমঞ্চে আদর্শ। কোপেনহেগেনের সৌন্দর্য ও জীবনযাত্রা
কোপেনহেগেন কেবল বাসযোগ্যই নয়, এটি দর্শনীয় স্থাপত্য, সমৃদ্ধ ইতিহাস এবং চমৎকার সংস্কৃতির এক অনন্য মিলনমেলা। পুরানো দিনের ঐতিহ্যবাহী ভবনের পাশাপাশি আধুনিক ডিজাইনের ছোঁয়া শহরটিকে এক দারুণ নান্দনিক রূপ দিয়েছে।
এদিকে যুক্তরাজ্যের ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) গ্লোবাল লিভাবিলিটি ইনডেক্স ২০২৬ অনুযায়ী, বিশ্বের সবচেয়ে কম বসবাসযোগ্য
বা অযোগ্য শহরের তালিকায় রাজধানী ঢাকা তৃতীয় স্থানে রয়েছে।
১৭৩টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ১৭১তম। অন্যদিকে, জনসংখ্যার বিচারে ঢাকা বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ও ঘনবসতিপূর্ণ মেগাসিটি।
২০২৬ সালের বাসযোগ্যতা ও জনবসতি সূচকে ঢাকার তুলনামূলক অবস্থান নিচে দেওয়া হলো: বসবাস অযোগ্য শহরের তালিকা (ইআইইউ সূচক): ১. দামেস্ক (সিরিয়া) – ১৭৩তম, ২. ত্রিপোলি (লিবিয়া) – ১৭২তম, ৩. ঢাকা (বাংলাদেশ) – ১৭১তম, ৪. করাচি (পাকিস্তান) – ১৭০তম।
বিশ্বের শ্রেষ্ঠ শহর নির্বাচনে ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটে (ইআইইউ) ১৭৩টি শহরের মানুষের জীবনযাত্রার মান, নিরাপত্তা, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, মানসম্মত শিক্ষা, দক্ষ গণপরিবহন, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও সমৃদ্ধ সংস্কৃতি—পর্যালোচনা করেছে।
প্রতি বছর প্রকাশিত এই সূচকে বিশ্বের ১৭৩টি শহরকে স্থিতিশীলতা, স্বাস্থ্যসেবা, সংস্কৃতি ও পরিবেশ, শিক্ষা এবং অবকাঠামো—এই পাঁচটি মানদণ্ডে মূল্যায়ন করা হয়। এসব সূচকে সর্বোচ্চ নম্বর অর্জনকারী শহরগুলোই বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত জীবনযাত্রার স্থান হিসেবে বিবেচিত হয়।
এবারের তালিকায় কোপেনহেগেনের পর রয়েছে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা, অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন ও সিডনি, এবং সুইজারল্যান্ডের জুরিখ। ইউরোপের শহরগুলোর শক্তিশালী অবস্থানের পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়ার শহরগুলোর ধারাবাহিক সাফল্যও এবারের তালিকায় স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।
কোপেনহেগেন: এই শহরে সাধারণ জীবনই অসাধারণ। কোপেনহেগেন স্থিতিশীলতা, শিক্ষা ও অবকাঠামো বিভাগে শতভাগ নম্বর পেয়েছে। সংস্কৃতি ও পরিবেশের ক্ষেত্রেও শহরটি সর্বোচ্চ স্কোর অর্জনকারী শহরগুলোর একটি। আট বছর ধরে কোপেনহেগেনে বসবাসকারী এক চিকিৎসক ও পিএইচডি গবেষক লরা আমিরা কাসেম গণমাধ্যমকে বলেন, এই শহরের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো এখানে উন্নত জীবনযাত্রা কোনো বিলাসিতা নয়, বরং প্রতিদিনের বাস্তবতা।
তার ভাষায়, ‘সাইকেলে করে অফিসে যাওয়া, কাজ শেষে বন্দরের স্বচ্ছ পানিতে সাঁতার কাটা এবং সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে পরিবারের সঙ্গে রাতের খাবার খাওয়া এখানে বিশেষ কোনো উপলক্ষ নয়। এটি সপ্তাহের সাধারণ একটি দিনের অংশ।’
তিনি জানান, শহরের বিস্তৃত সাইকেল নেটওয়ার্ক, হাঁটার উপযোগী রাস্তা এবং পরিষ্কার জলাশয় কোপেনহেগেনকে বিশ্বের অন্য শহরগুলোর থেকে আলাদা করেছে।
প্রতিদিন ভোরে তিনি উটার্সলেভ মোসে বা শহরের লেকগুলোর পাশে দৌড়ান। এরপর কফি, নাশতা এবং গ্রীষ্মকালে বন্দরের পানিতে সাঁতার দিয়ে দিন শুরু করেন।
পর্যটকদের জন্য তিনি প্রথমেই বেছে নেন নরেব্রো এলাকা। বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের বসবাসের এই এলাকায় পাশাপাশি রয়েছে সবজির দোকান, কাবাবের দোকান, স্বর্ণালংকারের দোকান, আধুনিক বেকারি, ওয়াইন বার ও ছোট ছোট রেস্তোরাঁ। এরপর সাইকেলে করে নরডহাভনের জলাশয়ের পাশে কফি পান এবং ঐতিহ্যবাহী ড্যানিশ খাবার স্মরেব্রেড খাওয়ার পরামর্শ দেন।
ভিয়েনা: ব্যস্ত নগরীতেও ধীরগতির জীবন.গত বছর শীর্ষস্থান হারালেও অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা এবারও দ্বিতীয় অবস্থান ধরে রেখেছে। স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষায় শহরটি পূর্ণ নম্বর অর্জন করেছে।
ভিয়েনা ট্যুরিস্ট বোর্ডের কর্মকর্তা ফ্রানজিস্কা হখমুলার বলেন, প্রতিদিন ঐতিহাসিক রিংস্ট্রাসে ধরে ট্রামে করে অফিসে যাওয়ার সময় তিনি মোবাইল ফোনে চোখ না রেখে বই পড়েন কিংবা জানালার বাইরে শহরের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো দেখেন।
তার মতে, ভিয়েনার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো—এটি একটি বড় রাজধানী হলেও এখানকার মানুষ কখনোই সময়ের পেছনে ছোটে না।
হোটেল মোটোর কর্মকর্তা রোলান্ড এগেনহোফার জানান, শহরের প্রথম থেকে নবম জেলা পর্যন্ত অধিকাংশ জায়গাই হেঁটে ঘোরা যায়। তিনি পর্যটকদের নিউবাউগাসে, স্পিটেলবার্গ, নাশমার্কেট এবং শরৎকালে শহরের উপকণ্ঠের আঙুরবাগানের ঐতিহ্যবাহী ওয়াইন ট্যাভার্নে যাওয়ার পরামর্শ দেন।
মেলবোর্ন: প্রতিটি এলাকায় ভিন্ন স্বাদ তালিকার তৃতীয় স্থানে থাকা মেলবোর্ন সংস্কৃতি ও পরিবেশ বিভাগে ৯৬ নম্বর পেয়েছে, যা বিশ্বের সর্বোচ্চ স্কোরগুলোর একটি। ক্রাউন প্লাজা কার্লটনের জেনারেল ম্যানেজার অ্যান মেরি লেনন বলেন, ‘মেলবোর্ন বড় শহর হলেও মানুষের আন্তরিকতা এটিকে ছোট একটি গ্রামের মতো মনে হয়।’
তার মতে, শহরের প্রতিটি এলাকার আলাদা পরিচয় রয়েছে। কোথাও শিল্পকলা, কোথাও সঙ্গীত, কোথাও খাবার, আবার কোথাও ফ্যাশনই প্রধান আকর্ষণ।
দুই দশক ধরে মেলবোর্নে বসবাসকারী লু ম্যাকগ্রেগর বলেন, ফুটস্ক্রে বিশ্বের নানা দেশের খাবারের জন্য বিখ্যাত, ফিটজরয়ে রয়েছে ছোট ছোট বার ও পুরোনো সামগ্রীর দোকান, সেন্ট কিল্ডা সমুদ্রসৈকতে হাঁটার জন্য আদর্শ এবং কার্লটন ইতালীয় খাবারের জন্য অনন্য।
তিনি পর্যটকদের স্টেট লাইব্রেরির বিখ্যাত গম্বুজাকৃতির পাঠকক্ষ, হোসিয়ার লেনের স্ট্রিট আর্ট, ন্যাশনাল গ্যালারি অব ভিক্টোরিয়া এবং শহরের ঐতিহ্যবাহী গলিগুলো ঘুরে দেখার পরামর্শ দেন।
সিডনি: প্রকৃতি আর আধুনিকতার নিখুঁত ভারসাম্য ৯৭ স্কোর নিয়ে চতুর্থ স্থানে থাকা অস্ট্রেলিয়ার আরেক শহর সিডনি স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষায় পূর্ণ নম্বর অর্জন করেছে।
নিউ সাউথ ওয়েলসের কর্মসংস্থান ও পর্যটনমন্ত্রী স্টিভ ক্যাম্পার বলেন, সিডনির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এখানকার মানুষ খুব সহজেই সমুদ্রসৈকত, বন্দর, পাহাড় কিংবা পার্কে পৌঁছে যেতে পারেন।
তিনি বলেন, ‘সিডনি একটি বিশ্বনগরী হলেও এটি এখনো ছোট ছোট স্থানীয় কমিউনিটির সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি শহর।’ ফরাসি গয়না ডিজাইনার জুলি লিভনি জানান, পৃথিবীর চারটি মহাদেশে বসবাস করার পরও সিডনি তাকে প্রতিদিন নতুনভাবে মুগ্ধ করে। এখানকার মানুষ সপ্তাহান্তের অপেক্ষা না করে প্রতিদিনই সৈকতে হাঁটতে বা সাঁতার কাটতে যান।
তার দিনের শুরু হয় সূর্যোদয়ের সময় বন্ধুদের সঙ্গে বন্ডাই থেকে ব্রন্টি পর্যন্ত হাঁটার মধ্য দিয়ে। তিনি বলেন, ‘সমুদ্রের পাশে কাটানো এই এক ঘণ্টাই আমাকে পুরো দিনের জন্য নতুন শক্তি দেয়।’
জুরিখ: দক্ষতা, পরিচ্ছন্নতা ও প্রকৃতির অনন্য সমন্বয় যৌথ দ্বিতীয় স্থান থেকে এবার পঞ্চম স্থানে নেমে এলেও সুইজারল্যান্ডের জুরিখ এখনো বিশ্বের অন্যতম বাসযোগ্য শহর।
স্থানীয় কনটেন্ট নির্মাতা ম্যানুয়েলা লিওনহার্ড বলেন, জুরিখের প্রাণ হলো এর হ্রদ ও নদীগুলো। প্রতিদিন তিনি জুরিখ হ্রদ, লিম্মাট নদী কিংবা সিল নদীর পাশ দিয়ে হাঁটার সময় নিজের জন্য কিছুটা সময় বের করেন।
শহরজুড়ে ১ হাজার ২০০টিরও বেশি পাবলিক ফোয়ারা রয়েছে, যেখান থেকে সরাসরি বিশুদ্ধ পানি পান করা যায়।
পর্যটকদের তিনি লিন্ডেনহফ, ওল্ড টাউন এবং ইটিএইচ জুরিখের উঁচু টেরেসে নিয়ে যান, যেখান থেকে পুরো শহরের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দেখা যায়।
তার মতে, জুরিখের সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো পরিচ্ছন্নতা। ‘শহরে যত বড় অনুষ্ঠানই হোক, পরদিন সকালে দেখে বোঝার উপায় থাকে না যে আগের রাতে এখানে হাজারো মানুষের সমাগম হয়েছিল। এই বিষয়টি আমাকে প্রতিবারই অবাক করে।’
ইআইইউ-এর এবারের সূচক আবারও দেখিয়ে দিয়েছে, একটি শহরকে বাসযোগ্য করে তোলে শুধু আধুনিক অবকাঠামো নয়; বরং নিরাপত্তা, কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থা, মানসম্মত শিক্ষা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, সহজ যাতায়াত এবং এমন এক জীবনধারা, যেখানে মানুষ প্রতিদিনের ছোট ছোট মুহূর্তও স্বাচ্ছন্দ্যে উপভোগ করতে পারে।
কবির আহমেদ/ইবিটাইমস/এম আর
















