ঝিনাইদহ প্রতিনিধি: হাতে সুচ,তাতে রঙিন সুতো ভরে নিপুণভাবে তৈরি করছেন নকশি হাতপাখা,আবার কখনও ছোট ছোট পুতুল। প্রায় অর্ধশতকেরও বেশি সময় ধরে এই কাজ করে আসছেন বিনা রানী। যেন সুই-সুতোই তার নিত্যসঙ্গী।
ঝিনাইদহ সদর উপজেলার চেউনিয়া গ্রামের এক নিভৃত কোণে বসে প্রতিদিনই সুই-সুতোয় রঙিন স্বপ্ন বুনে চলেছেন তিনি। বয়সের ভার বাড়লেও থেমে যায়নি তার হাতের কাজ।
বাণিজ্যিক লাভের উদ্দেশ্যে নয়, বরং শখ আর পারিবারিক ভালোবাসা থেকেই এই সেলাইয়ের কাজ শুরু করেছিলেন বিনা রানী। আত্মীয়ের বাড়িতে যাতায়াতের খরচ জোগানো কিংবা নাতি- নাতনিদের জন্য উপহার তৈরি করতেই মূলত এসব পাখা ও পুতুল বানান তিনি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার এই শখই হয়ে উঠেছে গ্রামীণ জীবনের এক নিখাদ শিল্পচর্চা।
বিনা রানীর সেলাইয়ের সঙ্গে পরিচয় সেই শৈশবেই। তার মা নয়ন দাসী ছিলেন সেলাই ও পুতুল তৈরিতে পারদর্শী। ছোটবেলায় মায়ের হাত ধরে সুই-সুতোয় কাজ শেখেন বিনা রানী। সেই শেখা আজও তার জীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার চার বছর পর বিয়ে হয় বিনা রানীর। বিয়ের পর স্বামী মনোরঞ্জন দাসের বাড়িতে এসে শুরু হয় তার নতুন সংসারজীবন। দাম্পত্য জীবনে তিন ছেলে ও এক মেয়ের জন্ম দেন বিনা রানী। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সন্তানেরা বড় হয়ে নিজেদের সংসার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেও মায়ের কাছ থেকে শেখা সেলাইয়ের কাজ কখনও বিস্মৃত হননি তিনি। সংসারের প্রতিদিনের কাজ শেষ করে অবসর পেলেই বসে পড়েন সেলাইয়ে। কখনও নকশি হাতপাখা, আবার কখনও তুলা আর কাপড় দিয়ে শিশুদের জন্য বানান বাহারি পুতুল।

বিনা রানী জানান,‘একসময় দর্জির দোকান থেকেই অবশিষ্ট টুকরো কাপড় সংগ্রহ করা যেত। সেই কাপড় দিয়েই তৈরি হতো পাখা আর পুতুল। তবে সময় বদলেছে। এখন আর আগের মতো সহজে টুকরো কাপড় পাওয়া যায় না। তাই দোকান থেকে গজ কাপড় কিনে আনতে হয় তাকে। সঙ্গে কেনা হয় বিভিন্ন রঙের সুতো। সেই কাপড়ের ওপর নিপুণ হাতে ফুটিয়ে তোলেন ফুল,লতা-পাতা আর নানা নকশা। রঙিন সুতোয় আঁকা সেই নকশাই হয়ে ওঠে তার হাত পাখার সৌন্দর্য।
অন্যদিকে শিশুদের পুতুল তৈরিতে ব্যবহার করা হয় গজের কাপড়ের সঙ্গে তুলা,চুমকি ও বিভিন্ন অলঙ্কার। ধৈর্য আর যতœ নিয়ে সেলাই করে একেকটি পুতুল তৈরি করেন তিনি। প্রতিটি পুতুলেই যেন লুকিয়ে থাকে একজন মায়ের মমতা আর শিল্পীর মনন।
তিনি জানান,একটি হাতপাখা তৈরিতে তার গড়ে ৩০ থেকে ৪০ টাকা খরচ হয়। পরে তা বিক্রি করেন ৭০ থেকে ৮০ টাকায়। পুতুল তৈরিতে আকারভেদে খরচ কিছুটা বেশি হলেও বর্তমানে প্রতিটি পুতুল বিক্রি হচ্ছে গড়ে ২৫০ থেকে ৪০০ টাকা দরে। বিভিন্ন উৎসব উপলক্ষে কিংবা শিশুদের খুশি করতে দূর-দূরান্ত থেকেও মাঝে মাঝে মানুষ এসে তার তৈরি এসব পাখা ও পুতুল কিনে নিয়ে যান।’
বিনা রানীর এই কাজে সবচেয়ে বড় প্রেরণা তার পরিবার। তার স্বামী মনোরঞ্জন দাস বলেন,‘মাঝে মাঝে কেউ এসে পাখা বা পুতুল কিনে নিলে তার স্ত্রী খুব খুশি হন। স্ত্রীর হাতে তৈরি এত সুন্দর কাজ দেখে নিজেরও ভালো লাগে।’ একই কথা জানান বিনা রানীর ছেলের বউরাও। তারা বলেন,‘বিয়ের পর থেকেই শাশুড়িকে নিয়মিত এসব কাজ করতে দেখছেন তারা। সংসারের ফাঁকে ফাঁকে তার এই সৃজনশীল কাজ তাদের কাছে
খুবই ভালো লাগে। তাদের মতে,শাশুড়ির এই হাতের কাজ শুধু শখ নয়,এটি এক ধরনের শিল্প।’ সুই-সুতোয় গাঁথা বিনা রানীর এই দীর্ঘ পথচলা শুধু একজন
নারীর ব্যক্তিগত শখের গল্প নয়। এটি গ্রামীণ নারীর শ্রম,ধৈর্য আর সৃজনশীলতার এক জীবন্ত দলিল। আধুনিকতার ভিড়ে হারিয়ে যেতে বসা হাতে তৈরি শিল্পকর্মের মধ্যে বিনা রানীর কাজ আজও টিকে আছে যতœ আর ভালোবাসার বন্ধনে।
শেখ ইমন/ইবিটাইমস/এম আর










