উত্তর আফ্রিকা থেকে ভূমধ্যসাগর পেরিয়ে আসা অভিবাসীদের আশ্রয় আবেদন প্রক্রিয়া প্রাথমিকভাবে তিন মাসের জন্য স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে গ্রিস সরকার
ইউরোপ ডেস্কঃ বৃহস্পতিবার (১০ জুলাই) ফ্রান্স ভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এএফপি জানায়,এই স্থগিতাদেশ শুধু ক্রিট এবং গাভদোস দ্বীপে আগতদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে বলেও জানিয়েছেন গ্রিক প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, অনিয়মিতভাবে আসা অভিবাসীদের আটক করা হবে। ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, আশ্রয় স্থগিতাদেশ কার্যকর সম্পর্কিত আইনটি বৃহস্পতিবার (১০ জুলাই) পার্লামেন্টে উত্থাপন করার কথা রয়েছে।
উল্লেখ্য যে,জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে উত্তর আফ্রিকার দেশ লিবিয়া থেকে নৌকায় করে গ্রিসের দক্ষিণের দ্বীপ গাভদোস এবং ক্রিটে দুই হাজারেরও বেশি অভিবাসনপ্রত্যাশী পৌঁছেছেন। এই বিষয়ে বুধবার গ্রিক পার্লামেন্টে বক্তব্য রাখছিলেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী কিরিয়াকোস মিতসোতাকিস। এ সময় বর্তমান অবস্থাকে ‘জরুরি পরিস্থিতি’ হিসাবে অভিহিত করেন তিনি।
কিরিয়াকোস বলেন, এমন পরিস্থিতি ‘স্পষ্টতই জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি রাখে।’ আর তাই গ্রিক সরকার উত্তর আফ্রিকা থেকে সমুদ্রপথে আসা অভিবাসীদের আশ্রয় আবেদন প্রক্রিয়াকরণ প্রাথমিকভাবে তিন মাসের জন্য স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
গ্রিসের দ্বীপ গাভদোসে স্থায়ী জনসংখ্যা মাত্র একশজন। দ্বীপটিতে অভিবাসীদের জন্য কোনও আবাসন সুবিধা নেই। এদিকে বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলেছে, সমুদ্রপথে আসা অভিবাসীদের সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে পাশ্ববর্তী দ্বীপ ক্রিটও।
প্রসঙ্গত, লিবিয়া থেকে যাত্রা করা অভিবাসন প্রত্যাশীদের বেশিরভাগই মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা, সুদান, মিশর এবং বাংলাদেশের নাগরিক।
বন্ধ হচ্ছে গ্রিসের দরজা: গ্রিক প্রধানমন্ত্রী মিতসোতাকিস বলেছেন, সরকার মানব পাচারকারীদের একটি স্পষ্ট বার্তা দিতে চায়, গ্রিসে যাওয়ার দরজা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বুধবার ৫২০ জন অভিবাসীকে নিয়ে একটি মাছ ধরার ট্রলারকে ক্রিট উপকূলে পৌঁছায়। কর্তৃপক্ষ বলছে, নৌকাটি লিবিয়া থেকে যাত্রা করেছিল।
মিতসোতাকিসের সরকার ক্রিটে একটি আটককেন্দ্র নির্মাণের কথাও ভাবছে। গ্রিস ইতোমধ্যে বলেছে, সমুদ্রপথে আসা অভিবাসীদের থামাতে দক্ষিণ গ্রিক জলসীমায় নৌবাহিনীর জাহাজ মোতায়েন করা হবে।
মঙ্গলবার হেলেনিক কোস্টগার্ড এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে, সংকটাপন্ন পরিস্থিতিতে গাভদোস উপকূলে অভিবাসীবাহী একটি নৌকা থেকে ৬৭ জনকে উদ্ধার করে লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী একটি জাহাজ। অভিবাসনপ্রত্যাশীদের সবাই পুরুষ এবং তারা সুস্থ আছেন।
উপকূলরক্ষী বাহিনী বলেছে, ফ্রন্টেক্সের একটি জাহাজে করে আগিয়া গালিনির ক্রিটান বন্দরে নিয়ে যাওয়া হয় অভিবাসীদের। পরে সেখান থেকে তাদের রেথিমনোতে অস্থায়ী আবাসন সুবিধায় নেওয়া হয়েছে।
থামছে না আগমন: মঙ্গলবার দুপুরের দিকে ক্রিট উপকূলে আসা একটি নৌকা থেকে সাহায্য চেয়ে গ্রিক উপকূলরক্ষীদের ডাকা হয়। কুয়েতি পতাকাবাহী একটি কার্গো জাহাজ অভিবাসীদের উদ্ধার করে। পরে একটি লাইফবোটে করে কোরা স্ফাকিয়ন বন্দরে নিয়ে যাওয়া হয় তাদের। সেখান থেকে বাসে করে ক্রিটের আগিয়া চানিয়ায় অস্থায়ী আবাসন সুবিধায় নিয়ে যাওয়া হয় অভিবাসনপ্রত্যাশীদের।
গত ৭ জুলাই গ্রিক কর্তৃপক্ষ গাভদোসের দক্ষিণ উপকূল থেকে ৩৫ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীকে উদ্ধার করে এবং পাচারের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে
১৯ বছর বয়সী এক মিসরীয় নাগরিককে গ্রেপ্তার করে। অভিবাসীরা বলেছেন, তারা লিবিয়ার তোব্রুক থেকে ভূমধ্যসাগর পার হওয়ার জন্য পাচারকারীদের অর্থ দিয়েছেন।
ওইদিন ফ্রন্টেক্সের একটি জাহাজ ৪৮ জন পুরুষ এবং সাত অপ্রাপ্তবয়স্কসহ ৫৫ জনকে উদ্ধার করে। অভিবাসনপ্রত্যাশীরা বলেছেন, তারা ৫ জুলাই লিবিয়ার তোব্রুক থেকে রওনা হয়েছিলেন। অভিবাসনপ্রত্যাশীদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ‘পাচারকারী’ হিসাবে ১৯ এবং ১৮ বছর বয়সী দুই সুদানি নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এর আগে, ৬ জুলাই জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর জানায়, চলতি বছরের শুরু থেকে ৫ জুলাই পর্যন্ত ১৯ হাজার ৭৯০ জন অভিবাসনপ্রত্যাশী গ্রিসে পৌঁছেছেন। তাদের মধ্যে কেবল সাত হাজার এসেছেন ক্রিট দ্বীপে। কিন্তু চলতি সপ্তাহে নতুন করে অন্তত আরও দুই হাজার অভিবাসী এসেছেন ওই দ্বীপে। এ নিয়ে ওই দ্বীপে পৌঁছানো অভিবাসীর সংখ্যা ৯ হাজারে পৌঁছেছে।
যাত্রা শুরু পূর্ব লিবিয়া থেকে: গ্রিসের অন্যতম শীর্ষ পর্যটন গন্তব্য ক্রিট। গ্রীষ্ম মৌসুম আসায় শুরু হয়েছে পূর্ণ মৌসুম। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে দ্বীপের স্থানীয় এবং পর্যটন সংশ্লিষ্টরা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন। তারা আশঙ্কা করছেন, হাজার হাজার অভিবাসনপ্রত্যাশী আসার খবর পেয়ে অনেক পর্যটক তাদের ছুটির পরিকল্পনা বাতিল বা পরিবর্তন করতে পারেন।
ক্রিটে আসা বেশিরভাগ মানুষ পূর্ব লিবিয়া থেকে যাত্রা করছেন। লিবিয়ার ওই অংশটি সামরিক ক্ষমতাধর খলিফা হাফতারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। যারা দেশটির পশ্চিমে জাতিসংঘ-স্বীকৃত ত্রিপোলি সরকারের বিরোধী।
লিবিয়ান কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আরও বেশি সহযোগিতা বাড়াতে ইইউকে অনুরোধ করেছে গ্রিস। তারা চায়, অভিবাসনপ্রত্যাশীরা যাতে উপকূল ছেড়ে আসতে না পারেন। এর জের ধরে গ্রিস, মাল্টা, ইতালির মন্ত্রীদের নিয়ে লিবিয়া সফর করেন ইইউ অভিবাসন কমিশনার মাগনুস ব্রুনার।
ত্রিপোলি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সফল আলোচনা করেছেন তারা। কিন্তু কূটনৈতিক শিষ্টাচার লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে তাদের সঙ্গে দেখা না করে দ্রুত পূর্ব লিবিয়া ছাড়ার নির্দেশ দেয় কর্তৃপক্ষ। ফলে অভিবাসীপ্রবাহ কমাতে পূর্ব লিবিয়ার সঙ্গে আলোচনার কোনও সুযোগ পায়নি ইইউ প্রতিনিধি দল।
লিবিয়ার জন্য ইইউর সহযোগিতা: বহু বছর ধরে অভিবাসন ব্যবস্থাপনায় লিবিয়াকে সহযোগিতা দিয়ে আসছে ইউরোপীয় কমিশন (ইসি)। ইইউ ট্রাস্ট ফান্ড ফর আফ্রিকা নামের তহবিলের মাধ্যমে ২০১৫ সাল থেকে এই সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। ২০২১ সাল পর্যন্ত এটাই ছিল মূল তহবিল। এই সময়কালে মোট ৪৬ কোটি ৫০ লাখ ইউরো আর্থিক সহযোগিতার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ইইউ।
‘সুরক্ষা ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিয়ে’ ২০২১ থেকে ২০২৭ সালের মধ্যে নেইবারহুড ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন ইনস্ট্রুমেন্টসের (এনডিআইসিআই) মাধ্যমে লিবিয়াকে আরও ছয় কোটি ৫০ লাখ ইউরোর প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে ইইউ।
এছাড়া, প্রত্যাবাসন এবং পুনঃঅন্তর্ভুক্তিকরণ প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে লিবিয়াকে আরও আড়াই কোটি ইউরো বরাদ্দ করা হয়েছিল। ২০২৪ সালের একটি নথিতে বলা হয়েছে, পাচার এবং চোরাচালানের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে লিবিয়াকে অতিরিক্তি অর্থ বরাদ্দ করা হবে। তবে সেই অর্থের পরিমাণ তখন উল্লেখ করা হয়নি। বলা হয়েছিল, পরবর্তীতে জানানো হবে।
ইউরোপের অভিবাসন বিষয়ক সংবাদমাধ্যম ইনফোমাইগ্রান্টস জানিয়েছে, ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন (ইইউ) বলছে, তারা অভিবাসী এবং শরণার্থীদের সুরক্ষা ও লিবিয়ার স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সহায়তার জন্য কাজ করছে। একইসঙ্গে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং মানবপাচার ও পাচারবিরোধী অভিযানের মাধ্যমে অনিয়মিত অভিবাসন কমাতে পদক্ষেপ নিচ্ছে।
কবির আহমেদ/ইবিটাইমস/এম আর