জার্মানির ২১তম সাধারণ নির্বাচনে রক্ষণশীলদের জয় হয়েছে এবং কট্টর ডানপন্থীরা দ্বিতীয় অবস্থান অর্জন করে চাঞ্চল্য দেখিয়েছে
ইউরোপ ডেস্কঃ রবিবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) জার্মানির সাধারণ (সংসদ) নির্বাচনে ফ্রিডরিখ মেৎস-এর নেতৃত্বাধীন ইউনিয়ন (CDU-CSU) রক্ষণশীলরা জয়লাভ করেছে। তবে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর চেয়ে এগিয়ে থাকলেও তারা তাদের প্রত্যাশিত ৩০ শতাংশের চেয়েও কম ভোট পেয়েছে।
জয়ের পর উল্লাসরত সমর্থকদের উদ্দেশ্যে মেৎস বলেছেন তিনি তার অর্পিত দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন। “চলুন আজ রাত উদযাপন করি এবং সকালে আমরা কাজে যাবো,” তিনি বলেছেন।এই নির্বাচনে আরেকটি জয়ী পক্ষ হলো কট্টর ডানপন্থী অলটারনেটিভ ফর জার্মানি বা এএফডি। তারা ২০ দশমিক ৮ শতাংশ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় স্থানে আছে।
এএফডির চ্যান্সেলর প্রার্থী অ্যালিস ভাইডেল সমর্থকদের নিয়ে বিজয়োল্লাস করেছেন। যদিও তার দল আরও ভালো ফল আশা করেছিলো। দলটির সদর দপ্তরেও কিছুটা হতাশা দেখা গেছে।
সোমবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) দিনের শুরুতেই যখন নির্বাচনের ফল আসতে শুরু করে তখন এটা পরিষ্কার হয়ে যায় যে এএফডি পূর্বাঞ্চলে (পূর্ব জার্মানি) অন্য দলগুলোর চেয়ে অনেক এগিয়ে আছে। “জার্মানরা পরিবর্তনের জন্য ভোট দিয়েছে,” বলেছেন মিজ ভাইডেল।
তিনি বলেন, ফ্রিডরিখ মেৎসের কোয়ালিশন গড়ার চেষ্টা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে: “আমাদের নতুন নির্বাচন হবে- আমাদের আবার চার বছর অপেক্ষা করতে হবে বলে আমি মনে করি না”। তবে নির্বাচনের ম্যাপে পূর্ব দিক নীল রং ধারণ করলেও জার্মানির বাকী অংশের বেশিরভাগ ছিলো কালো- ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাটিক পার্টি বা সিডিইউ’র রং।
জার্মানির বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের তথ্য অনুসারে, নির্বাচনে রক্ষণশীল ক্রিশ্চিয়ান গণতান্ত্রিক ইউনিয়ন দল ২৯ শতাংশ (সিডিইউ ও সিএসইউ), কট্টরবাদী জার্মানির জন্য বিকল্প দল (এএফডি) ১৯ দশমিক ৫ শতাংশ, সামাজিক গণতান্ত্রিক দল (এসপিডি) ১৬ শতাংশে এগিয়ে রয়েছে। এ ছাড়া পরিবেশবাদী সবুজ দল ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ এবং বাম দল দ্য লিঙ্কে ৮ দশমিক ৬ শতাংশে এগিয়ে রয়েছে।
রাজনৈতিক ভাষ্যকারেরা জানাচ্ছেন, এ ক্ষেত্রে ক্রিশ্চিয়ান গণতান্ত্রিক ইউনিয়ন, সামাজিক গণতান্ত্রিক দল ও পরিবেশবাদী সবুজ দল শক্তিশালী জোট করে সরকার গঠন করতে পারে। উল্লেখ্য যে,গত নভেম্বরে জার্মানির তিনদলীয় জোট সরকার ভেঙে যায়। এ পরিপ্রেক্ষিতে নির্দিষ্ট সময়ের ছয় মাস আগেই জার্মানিতে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো।
ইইউর অন্যতম প্রভাবশালী দেশ জার্মানির এ নির্বাচনকে এ মুহূর্তে ইউরোপে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ, ইউরোপে কট্টর জাতীয়তাবাদীদের উত্থান ঘটছে। জার্মানিতে কট্টরপন্থীরা আলোচনায় ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতাধর ব্যক্তিরা ইউরোপীয় রাজনীতি নিয়ে নানা কথাবার্তা বলছেন, আস্ফালন করছেন। ফলে জার্মানিতে কারা ক্ষমতায় আসছে, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
জার্মানির ফেডারেল পরিসংখ্যান অফিস জানিয়েছে, প্রায় সাড়ে ৮ কোটি মানুষের দেশ জার্মানিতে ভোটার প্রায় ৫ কোটি ৯২ লাখ। এর মধ্যে নারী ভোটারের সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ৬ লাখ। আর পুরুষ ভোটার ২ কোটি ৮৬ লাখ। এবারের নির্বাচনে জার্মান পার্লামেন্টের ৬৩০টি আসনের জন্য ২৯টি দল ৪ হাজার ৫০৬ প্রার্থী দিয়েছে।
গতকাল রবিবার জার্মানির সরকার প্রধান চ্যান্সেলর ওলাফ শলৎজ বার্লিনের অনতিদূরে পটসডামে ভোট দেন। ভবিতব্য চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস ভোট দিয়েছেন। তাঁর নির্বাচনী এলাকা হোকসাউরল্যান্ড জেলার আর্নসবার্গে।
প্রসঙ্গত চার বছর আগে ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন দলের নেতা আঙ্গেলা ম্যার্কেল (সাবেক চ্যান্সেলর) ক্ষমতা থেকে সরে যান। পরে নির্বাচনে জয়লাভ করেন সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতা ওলাফ শলৎজ। তিনি গঠন করেন তিনদলীয় জোট সরকার।
এবার নির্বাচনের আগের জরিপগুলোয় দেখা যায়, সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন। এরপর কট্টরবাদী জার্মানির জন্য বিকল্প দল। এরপর রয়েছে ক্ষমতাসীন জোট সরকারের বড় দল সামাজিক গণতান্ত্রিক দল। চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে পরিবেশবাদী সবুজ দল।
নির্বাচনী জরিপের হিসাবে ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নের নেতা ফ্রিডরিখ মের্ৎসকে সম্ভাব্য চ্যান্সেলর হিসেবে দেখা হচ্ছিল। এবারের নির্বাচনে বড় চমক জার্মানির কট্টর রক্ষণশীল ও অভিবাসীবিদ্বেষী হিসেবে পরিচিত অলটারনেটিভ ফর ডয়চেল্যান্ড (জার্মানির জন্য বিকল্প) দলটির জরিপে দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে আসা।
নির্বাচনকে ঘিরে সারা বিশ্বের দৃষ্টি জার্মানির দিকে: জার্মানির জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে সারা বিশ্বের সংবাদমাধ্যমগুলো আলাদা দৃষ্টিতে দেখছে। এর অন্যতম কারণ হলো এবারের নির্বাচনের আগে থেকেই সদ্য ক্ষমতাসীন মার্কিন প্রশাসনের একাধিক রাজনীতিক কর্তৃক জার্মান রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ।
ইউরোপীয় ঐক্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করা, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং আগামীতে ট্রান্স-আটলান্টিক সম্পর্ক।
নির্বাচনের আগের দিন প্রযুক্তি ধনকুবের ও ট্রাম্পের অনুগত পরামর্শদাতা ইলন মাস্ক জার্মানির কট্টরবাদী অল্টানেটিভ ফর ডয়েচল্যান্ড দলটির পক্ষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি দলটির নেত্রী অ্যালিস ভায়ডেলের সঙ্গে কথোপকথনের অডিওটি শেয়ার করে বলেন, শুধু অলটারনেটিভ ফর ডয়েচল্যান্ড দলটিই জার্মানিকে বাঁচাতে পারে। জার্মানির অন্যান্য দলের রাজনীতিবিদেরা এটিকে নির্বাচনকে প্রভাবিত করার অপচেষ্টা হিসেবে দেখছেন।
মার্কিন গণমাধ্যম জার্মানির এ নির্বাচনকে বৃহত্তম ইউরোপীয় অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে বর্ণনা করেছে। ফ্রান্সের “‘লে ফিগারো” পত্রিকাটি জার্মান-ফরাসি সম্পর্কের ওপর আলোকপাত করেছে। তাদের চোখে সম্ভাব্য চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মের্ৎস জার্মান-ফরাসি জোটের পুনরুজ্জীবনকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।
অস্ট্রিয়ার সকল সংবাদ মাধ্যমে ফলাও করে জার্মানির সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল সম্প্রচার করছে।
কবির আহমেদ/ইবিটাইমস