ঝিনাইদহ প্রতিনিধি: নদ-নদী দখল করা,দূষণ ছড়ানো এসব ফৌজদারি অপরাধ। এ জন্য রয়েছে ১০ বছরের কারাদÐের বিধান। পাশাপাশি নদীরক্ষায় পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য রয়েছে আদালতের রায় ও নির্দেশনা। তবু দেশে নদীর ওপর নির্যাতন বেড়ে চলছে। দিনে দিনে বৃদ্ধি পাচ্ছে দখলদার। পানি হচ্ছে দূষিত থেকে দূষিততর।
নবগঙ্গা নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিলো ঝিনাইদহের জনপদ। এক সময় নদীকে কেন্দ্র করেই চলতো এ এলাকার মানুষের জীবন-জীবিকা। কিন্তু সেই নদী এখন পানিশুন্য। বৃষ্টির পানি-ই নদীর একমাত্র উৎস। উৎস মুখে বাঁধ দেওয়ায় খর¯্রােতা নবগঙ্গায় এখন হাটুপানিও থাকে না। আর শুষ্ক মৌসুমে ফেটে চৌচির হয় নদীর বুক। নবগঙ্গার মতই উৎস মুখে বাঁধ দেওয়ায় বিলুপ্তির পথে কালীগঙ্গা। কুমার,ডাকুয়া,কপোতাক্ষ নদী এখন কচুরিপানা আর প্রভাবশালীদের দখলে। নদীর পানি প্রবাহ না থাকার সুযোগে নদী পাড়ের প্রভাবশালী বাসিন্দারা দেদারছে মেতে উঠেছে নদ-নদী দখল উৎসবে। যেকারনে একদিকে যেমন কমছে নদীর প্রশস্ততা,অন্যদিকে হুমকির মুছে পড়ছে মাছসহ জলজ প্রানী।
মহেশপুর কপোতাক্ষ নদে বাঁধ দিয়ে করা হচ্ছে মাছ চাষ। একই উপজেলা কোদালা নদীর অস্তিত্ব নেই। অধিকাংশ নদীর বুকে পুকুর খনন ও ধানের আবাদ করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন খনন না করায় এক সময়ের খর¯্রােতা নদ-নদীগুলো হারাচ্ছে অতীত ঐতিহ্য।
ঝিনাইদহ পানি উন্নয়ন বোর্ড সুত্রে জানা গেছে,জেলায় মোট ১২টি নদী আছে। এসব নদীর মধ্যে রয়েছে ঝিনাইদহ-হরিণাকুন্ডু এলাকায় বেগবতি ও নবগঙ্গা, শৈলকুপায় কুমার,গড়াই,কালীগঙ্গা,মহেশপুওে বেতনা,ইছামতি ও কোদালা, কোটচাঁদপুরে কপোতাক্ষ নদ এবং ঝিনাইদহ-কালীগঞ্জে ফটকি,চিত্রা ও বেগবতি। এসব নদ-নদীর দৈর্ঘ্য প্রায় ৪০৩ কিলোমিটার। ঝিনাইদহ সদর ও কোটচাঁদপুর উপজেলার উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া চিত্রা নদীর অবস্থা বড়ই করুণ। নদীর বুকে মানুষ চাষাবাদ শুরু করেছে বহুকাল আগেই। নদীপাড়ের মানুষ ইচ্ছামতো মাটি কেটে নিয়ে যাচ্ছে। কোটচাঁদপুরের তালসার,ইকড়া গ্রাম,সদর উপজেলার গান্না,জিয়ানগর,কালীগঞ্জ শহরের পুরাতন বাজার,বলিদাপাড়া, হেলাই,নিমতলা ও ফয়লা এলাকায় চিত্রা নদী দখল করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বাড়িঘর তৈরী করা হয়েছে। কাগজে-কলমে চিত্রা নদীর প্রস্থ দেখানো হয়েছে ৮০ মিটার এবং গভীরতা ৫ মিটার। তবে দুষণ,দখল আর ভরাটে এখন তা অর্ধেকে নেমে এসেছে। চিত্রা নদী দখল মুক্ত করতে ২০২৩ সালে তালিকা তৈরী করা হলেও প্রভাবশালীদের বাঁধার কারণে হয়নি। তবে বর্তমান তত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার পর চিত্রা নদীর নব্যতা ফিরিয়ে আনতে দখলদার চিহ্নিত করে অবৈধ উচ্ছেদ অভিযান শুরু করা হচ্ছে। নতুন বছর থেকে চিত্রা নদী দখলমুক্ত হবে বলে ঝিনাইদহ পানি উন্নয়ন বোর্ড সুত্রে জানা গেছে।
এদিকে শৈলকুপার একসময়ের খর¯্রােতা গড়াই ও কুমার নদী পানির অভাবে (বর্ষাকাল ব্যতিত) শুকিয়ে মরা খালে পরিণত হয়েছে। দেখে বোঝার উপায় নেই এখানে একসময় বিশাল নদ-নদী ছিল। নদীর কোথায় হাটুপানি,আবার কোথাও বুকপানি। বেশিরভাগ স্থানে খননের অভাবে পলি জমে ভরাট হয়ে গেছে। সেই ভরাট নদীর বুকে চলছে চাষাবাদ। যতদূর চোখ যায় নদ-নদীর বুকে শুধুই ফসলের ক্ষেত আর মাঝ দিয়ে মিনমিনিয়ে বহমান পানিপ্রবাহ। শুস্ক মৌসুমে নদীর বুকে চাষাবাদ করা হয়। শৈলকুপার কুমার নদটি চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার মাথাভাঙ্গা নদী থেকে উৎপত্তি লাভ করেছে। ১৩০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের কুমার নদের পানির প্রধান উৎস ছিল মাথাভাঙ্গা। চুয়াডাঙ্গার হাটবোয়ালিয়া এলাকায় নদের উৎসমুখ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপরও কুমার নদ কালীগঙ্গা,ডাকুয়া ও সাগরখালী নদীর মাধ্যমে পানি প্রবাহ পেত। কিন্তু জিকে সেচ প্রকল্প বাস্তবায়নকালে এ দুটি নদীর উৎসমুখও বন্ধ করে দেওয়া হয়।
ঝিনাইদহ শহরের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া নবগঙ্গা নদী বেশিরভাগ কচুরিপনায় পরিপূর্ন থাকে। নদীপাড়ে গড়ে উঠেছে দোকান ও বাড়ি। ঝিনাইদহ পৌরসভার প্রধান ড্রেন পড়েছে নবগঙ্গা নদীতে। ফলে আবর্জনা ও বজ্র পড়ছে নদীতে। প্রবাহ না থাকায় এতে দুর্গন্ধময় হয়ে পড়েছে নদীর পানি।
মহেশপুরের কোদালা নদী এখন চেনার উপায় নেই। ২৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য নদীর বুকে অসংখ্য পুকুর খনন করা হয়েছে। গড়ে উঠেছে বাড়িঘর। প্রায় ৩০ বছর ধরে নদীপাড়ের মানুষ আস্ত একটা নদী গিলে খাচ্ছে,অথচ কারো বাথাব্যাথা নেই। একই ভাবে ফটকী,বেতনা,বেগবতী,ভৈরব ও কালীগঙ্গা নদী মরাখালে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে প্রভাবশালীদের দখলের কারণে নদীর চিহ্ন বিলীন হতে চলেছে। মহেশপুর ও কোটচাঁদপুর উপজেলার উপর দিয়ে প্রবাহিত কপোতাক্ষ নদ দখল করে মাছ চাষ করা হয়। বিক্রি হয় নদীর মাটি। চিত্রা পাড়ের বাসিন্দা সদর উপজেলার বংকিরা গ্রামের বাসিন্দা শহিদুল ইসলাম মনসাদ বলেন,‘দখলমুক্ত করে চিত্রা নদী আগের মতো উন্মৃক্ত করে দেওয়া হোক। নদীর বুকে যারা পকুর খনন করে পানি প্রবাহ বাঁধাগ্রস্ত করা করেছে তাদের বিরুদ্ধেও সরকার ব্যবস্থা গ্রহন করুক।’
ঝিনাইদহ নবগঙ্গা নদী পাড়ের আরেক বাসিন্দা সোহাগ হোসেন জানান, ছোটবেলায় দেখেছি নবগঙ্গার বুকে বড় বড় নৌকা চলতো। দখল আর দুষণে এখন তো ডিঙ্গিও চলতে পারে না।’
ঝিনাইদহ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রঞ্জন কুমার দাস জানান,নদীগুলো খনন না করায় পানি প্রবাহ কমে গেছে। আমরা সকল নদীর তথ্য উপাত্ত হালনাগাদ করছি। নদীগুলো খননের প্রস্তবনাও মন্ত্রনালয়ে গেছে। বাজেট পাওয়া গেলে খননকাজ শুরু করা হবে। তিনি আরো জানান,ইতিমধ্যে চিত্রা নদীকে দখলমুক্ত করার চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহন করা হয়েছে। সারা জেলায় পানি উন্নয়ন বোর্ড অবৈধ দখলদারদের তালিকা করে উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে বলেও তিনি যোগ করেন।’
তথ্য মতে,ঝিনাইদহের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া নবগঙ্গা,চিত্রা,কুমার,বেগবতি,গড়াই,ইছামতি, ডাকুয়া,কপোতাক্ষ,কালীগঙ্গাসহ ১২ টি নদ-নদীর আয়তন ১৬’শ ৪১ দশমিক ৭৫ হেক্টর।
শেখ ইমন/ইবিটাইমস