ঝিনাইদহ প্রতিনিধিঃ ঝিনাইদহ জেলার সদর উপজেলার ৬ নম্বর ইউনিয়নের নাম গান্না। ২৬টি গ্রাম নিয়ে ইউনিয়নটিতে প্রায় ২৬ হাজার মানুষের বসতি, যাদের বেশিরভাগই কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত। গান্না গ্রামের নামে সেখানে রয়েছে ছোট্ট একটি ফুলের বাজার। ঝিনাইদহ-কোটচাঁদপুর সড়কের পাশে অবস্থিত বাজারটিতে প্রতিদিন ভোরে গাদা গাদা গাঁদা ফুল নিয়ে আসেন চাষিরা। এক ঘণ্টার এই বাজারে প্রতিদিন ২০ লাখ টাকার ফুল কেনাবেচা হয়।
সম্প্রতি গান্না বাজারে গিয়ে দেখা গেছে, ভোরের আলো ফোটার আগেই শত শত ফুলচাষি আর ব্যবসায়ীর আগমনে জমজমাট হয়ে ওঠে এই বাজার। রাস্তার পাশে বাইসাইকেল, মোটরসাইকেল, ভ্যানসহ বিভিন্ন বাহনে রেখে সারি বেঁধে চলছে ফুলের কেনাবেচা। চাষিরা বলছেন, এই মৌসুমে চড়া দামে ফুল বিক্রি করতে পারছেন তারা। এ জন্য তারা খুশি।
বাজারে কিছুক্ষণ ঘুরে দেখা গেছে, মানভেদে তিন থেকে চারশ টাকা দরে প্রতি ঝোপা ফুল বিক্রি হচ্ছে। ২০টি মালায় এক একটি ঝোপা বানানো হয়। সকাল ৭টায় শুরু হওয়া বাজার ৮টার মধ্যে শেষ। চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একেক জন চাষি ৫ থেকে ১০ হাজার টাকার ফুল বিক্রি করে ঘরে ফেরেন। আর একেক জন ব্যবসায়ী প্রতিদিন ১ থেকে ৩ লাখ টাকার গাঁদা ফুল কিনে নিয়ে যান। এসব ফুল রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম, বরিশাল, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, পাবনা, ফেনী, নোয়াখালী, লাকসাম, বগুড়া, সিলেট, রংপুর, দিনাজপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়।
বেচাবিক্রি শেষে বাজারে বসে কথা হয় কৃষক আব্দুর রাজ্জাকের সঙ্গে। তিনি জানালেন, ২৫ কাঠা জমিতে এবার গাঁদা ফুলের চাষ করেছেন তিনি। প্রতিদিন বাজারে ৩-৪ হাজার টাকার ফুল বিক্রি করছেন।
কোটচাঁদপুর উপজেলার তালিনা গ্রাম থেকে মোটরসাইকেলে ফুল বিক্রি করতে এসেছিলেন কৃষক রফিকুল ইসলাম। তিনি জানান, গান্না বাজারে ফুল আনার সঙ্গে সঙ্গে বিক্রি হয়ে যায়। তাই প্রতিদিন মোটরসাইকেলে চেপে ফুল নিয়ে আসেন বিক্রি করতে। একই উপজেলার এলাঙ্গীর চাঁদপাড়া গ্রাম থেকে প্রথমবারের মতো ফুল বিক্রি করতে এসেছেন কৃষক মাসুম বিল্লাহ। তিনি বলেন, গান্না ফুলবাজারের নাম অনেক শুনেছি। তাই প্রথমবার এখানে এসেছি ফুল নিয়ে। বিক্রি ভালোই হয়েছে, দামও ভালো পেয়েছি।
গান্না এলাকার প্রবীণ ফুলচাষি আবু বক্কর সিদ্দিক ৬ কাঠা জমিতে ফুলের চাষ করেছেন। তিনি ১৯ ঝোপা ফুল এনেছেন বাজারে। বিক্রি করেছেন প্রায় ৫ হাজার টাকায়। তাকে হাসিমুখে বাড়ি ফিরতে দেখা গেল। ফুলচাষি মোতাহার হোসেন জানান, আগের দিনে বিকালে ফুল তুলে বিভিন্ন মানুষ দিয়ে মালা গাঁথার কাজ সেরে ঝোপা বানিয়ে রেখে দেন। পরদিন ভোরে বাজারে বিক্রি করতে আনেন।
গান্না গ্রামের যুবক মহিদুল ইসলাম। তার ফুলের চাষও নেই, ব্যবসাও নেই। তারপরও এই ফুলবাজারকে ঘিরে তার কর্মসংস্থান হয়েছে। প্রতিদিন ভোর থেকে ফুল সাজিয়ে-গুছিয়ে দেওয়াসহ কৃষক-ব্যবসায়ীদের নানা কাজ করে দেন। তাতেই চলে মহিদুলের মতো অনেকের রুটি-রুজি।
গান্না বাজারের ফুলব্যবসায়ী মেহেদী হাসান জানান, প্রচুর ফুলের আমদানি হয় গান্না বাজারে। তারা এই ফুল ঢাকার শাহবাগ, চট্টগ্রাম, পটুয়াখালী, রাজবাড়ী, পাবনাসহ বিভিন্ন স্থানে পাঠান ট্রাকভর্তি করে। মোহাম্মদ হিরো একজন পাইকারি ফুল ব্যবসায়ী। প্রতিদিন ভোরে আসনে ফুলের বাজারে। তিনি জানান, এখানকার ফুলের মান, টেম্পার, গেটআপ, কালার সবই ভালো। ফুল কিনে অস্বস্তিতে পড়তে হয় না। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ফুল পাঠিয়ে থাকেন তিনি।
গান্না বাজারের পাইকারি ফুল ব্যবসায়ী প্রদীপ সাহা ৩৫ বছর ধরে ফুলের ব্যবসা করছেন। তিনি জানান, প্রতিদিন ১ থেকে ২ লাখ টাকার ফুল কেনেন তিনি। এই বাজারে তার মতো ১৪-১৫ জন ব্যবসায়ী আছেন। ফুল ব্যবসায়ী ফরহাদ হোসেন জানান, গান্না বাজারে হলুদ (সাদা) আর লাল (কমলা) রঙের ফুল ওঠে। বেশি দামে বিক্রি হয় লালচে রঙের গাঁদা।
কৃষি অফিসে গান্না ফুলবাজারে প্রতিদিন প্রায় ২০ লাখ টাকার ফুল বিক্রির তথ্য থাকলেও ব্যবসায়ীদের হিসাবে টাকার অঙ্ক আরও বেশি। ফুলচাষি সমিতি ও ব্যবসায়ী নেতারা জানান, প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকার ফুল বিক্রি হয় গান্না বাজারে। সমিতির সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম জানান, শীত মৌসুম ছাড়াও সারা বছর এখানে গাঁদা ফুল বিক্রি হয়।
ঝিনাইদহ সদর উপজেলার গান্না ইউনিয়নে সারা বছরই গাঁদা ফুলের চাষ হয়। কৃষকরা জানান, গাঁদা ফুল চাষ অন্যান্য ফুল চাষের চেয়ে খরচ অনেক কম। এক বিঘা জমিতে অন্যান্য ফুল চাষে খরচ হয় দেড়ে থেকে দুই লাখ টাকা। আর মাত্র ৫০-৬০ হাজার টাকায় এক বিঘা জমিতে গাঁদা ফুলের চাষ করা যায়। এ ছাড়াও গাঁদা ফুল গাছের পরিচর্যা তেমন একটা করতে হয় না। এক বিঘা জমিতে গাঁদা ফুলের চাষ করে কৃষকের আয় হয় দেড় থেকে দুই লাখ টাকা। একবার গাছ লাগিয়ে কয়েক মাস ফুল পাওয়া যায়।
ভালোবাসা দিবস, বসন্তবরণ, বাংলা ও ইংরেজি নববর্ষ, স্বাধীনতা দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মতো দিনগুলোতে ফুলের অতিরিক্ত চাহিদা থাকে। জাতীয় ও বিশেষ দিনগুলো ছাড়াও সারা বছর এ অঞ্চলের উৎপাদিত ফুল দেশের চাহিদা মেটাতে ভূমিকা রাখছে।
কৃষি বিপণন অধিদপ্তর গান্না বাজারে কৃষকদের জন্য স্থায়ী শেড নির্মাণ করে দিয়েছে। ঝিনাইদহ জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তা গোলাম মারুফ খান জানান, ফুলচাষিদের জন্য বাজারে অবকাঠামো নির্মাণ, ফুল সংরক্ষণ ও পরিবহন সুবিধার্থে কাজ করে যাচ্ছেন তারা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ঝিনাইদহের উপপরিচালক আজগর আলী বলেন, শুধু খুলনা বিভাগই নয়, সারা দেশের মধ্যে ঝিনাইদহ জেলায় সবচেয়ে বেশি গাঁদা ফুলের চাষ হচ্ছে। এখানকার ফুলের গুণগত মান খুবই ভালো। তাই প্রতিবছর এই ফুলের চাষ বাড়ছে।
কৃষি অফিসের তথ্যমতে, গান্না এলাকায় ১৭ হেক্টর জমিতে গাঁদা ফুলের চাষ হচ্ছে। ঝিনাইদহ জেলা জুড়ে ১৪৩ হেক্টর জমিতে গাঁদা ফুলের চাষ হয়।
শেখ ইমন/ইবিটাইমস