৪র্থ পর্ব
ড. মোঃ ফজলুর রহমানঃ ৩১। পল্টন ময়দানের ঐ সভায় পশ্চিম পাকিস্তানী নেতৃবৃন্দের উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন- “গণতান্ত্রিক নিয়মে প্রণীত এক শাসনতন্ত্র যদি না চান তাহলে আপনারা আপনাদের শাসনতন্ত্র রচনা করুন। বাংলাদেশের শাসনতন্ত্র আমরাই রচনা করব। … ২৩ বছর ধরে রক্ত দিয়ে আসছি। প্রয়োজনে আবারও বুকের রক্ত দিব। কিন্তু মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে বীর শহীদদের রক্তের সাথে বেঈমানী করব না।” বঙ্গবন্ধুর উপরোক্ত ঘোষণার প্রেক্ষিতে স্বাধিকার এবং স্বাধীনতার দাবিতে বাঙালি জাতির চলমান আন্দোলন আরও অধিক পরিমাণে বেগবান ও প্রাণবন্ত হয়ে উঠে। এমতাবস্থায় ৩রা মার্চ থেকে ৭ই মার্চ পর্যন্ত আন্দোলনের গতি প্রকৃতি অত্যন্ত দুর্বার গতিতে তীব্র থেকে তীব্রতর এবং মারমুখো হতে থাকে। এরই ফলশ্রুতিতে স্বাধীনতার দাবিতে বাঙালি জাতি নিদারুণভাবে আপোষহীন এবং অপ্রতিরোধ্য হয়ে পড়ে। উপরোক্ত বাঁধ ভাঙ্গা আন্দোলন সংগ্রাম ক্রমান্বয়ে এক দফায় রূপান্তরিত হয় এবং শেষ পর্যন্ত তা যুদ্ধের ময়দান পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
৩২। ইতিহাসের আলোকে দেখা যায় যে, জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের কালজয়ী ভাষণটির স্থায়িত্বকাল ছিল প্রায় ১৯ মিনিট। কিন্তু এই ১৯ মিনিটের ভাষণের পিছনে রয়েছে সুদীর্ঘদিনের আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। এরই পাশাপাশি এই ভাষণে রয়েছে বিজাতীয় পাকিস্তানী শাসকবর্গের চরম বৈষম্যমূলক এবং নিপীড়ন মূলক শাসন, শোষণের আনুপূর্বিক ঘটনাপ্রবাহের সকরুণ বর্ণনা। তাই ভাষণের প্রারম্ভেই বঙ্গবন্ধু বলেন- “ভাইয়েরা আমার, আজ দুঃখভারাক্রান্ত মন নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি। আপনারা সবই জানেন এবং বুঝেন। আমরা আমাদের জীবন দিয়ে চেষ্টা করেছি। … কিন্তু দুঃখের বিষয়, আজ দুঃখের সাথে বলতে হয় ২৩ বছরের করুণ ইতিহাস বারবার অত্যাচারে বাংলার মানুষের রক্তের ইতিহাস। ২৩ বছরের ইতিহাস মুমূর্ষু নর- নারীর আর্তনাদের ইতিহাস। বাংলার ইতিহাস এদেশের মানুষের রক্ত দিয়ে রাজপথ রঞ্জিত করার ইতিহাস। ১৯৫২ সালে রক্ত দিয়েছি। ১৯৫৪ সালে নির্বাচনে জয়লাভ করেও আমরা গদিতে বসতে পারিনি। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান মার্শাল ল’ জারি করে দশ বছর পর্যন্ত আমাদের গোলাম করে রেখেছে। ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলনে ৭ই জুনে আমার ছেলেদের গুলি করে হত্যা করা হয়েছে…।”
৩৩। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মামলার প্রেক্ষিতে দীর্ঘদিন কারাভোগকারী বঙ্গবন্ধু ব্যক্তি জীবনে ছিলেন আইনের প্রতি নিদারুণভাবে শ্রদ্ধাশীল। তাঁর নিজের লেখা “অসমাপ্ত আত্মজীবনী” এবং “কারাগারের রোজনামচা” -বই দু’টি পাঠ করলে এ ব্যাপারে যে কেউই সন্দেহ মুক্ত হতে পারবেন। এরই পাশাপাশি নিরপেক্ষভাবে বিচার বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে যে, তিনি ছিলেন বিশাল হৃদয়ের একজন বড় মাপের মানুষ। গরীব, দুঃখী মেহনতি জনতা তথা শ্রমজীবী ও খেটে খাওয়া মানুষ বিশেষ করে স্বল্প আয়ের মানুষদের প্রতি তিনি ছিলেন অনেক বেশি উদার এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল। তাই ৭ই মার্চের ভাষণে তিনি বলেন- “আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না। আমরা এদেশের মানুষের অধিকার চাই। আমি পরিষ্কার অক্ষরে বলে দিবার চাই যে, আজ থেকে এই বাংলাদেশে কোর্ট-কাচারি, আদালত- ফৌজদারি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ থাকবে। গরিবের যাতে কষ্ট না হয়, যাতে আমার মানুষ কষ্ট না করে সেজন্য অন্যান্য যে সমস্ত জিনিসগুলো আছে, সেগুলোর হরতাল কাল থেকে চলবে না। রিকশা, গরুর গাড়ি, রেল চলবে। লঞ্চ চলবে। শুধু সেক্রেটারিয়েট, সুপ্রীম কোর্ট, হাই কোর্ট, জজ কোর্ট, সেমি-গভর্নমেন্ট দপ্তর,
ওয়াপদা কোন কিছু চলবে না। ২৮ তারিখে কর্মচারীরা গিয়ে বেতন নিয়ে আসবেন। এর পর যদি বেতন দেয়া না হয়…।”
৩৪। বাংলাদেশ এবং বাঙালি জাতির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে ভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে তৎকালীন তরুণ নেতা শেখ মুজিবের ভূমিকা, ছয় দফা আন্দোলন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, উক্ত মামলার প্রেক্ষিতে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভূমিধ্বস (Landslide) বিজয়ের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু পর্যায়ক্রমে এবং অবধারিতভাবেই অবিসংবাদিত জাতীয় নেতায় পরিণত হন। কিন্তু এই নির্বাচনের ফল পাকিস্তানের অপরিণামদর্শী শাসকবর্গ মেনে না নেয়ায় ৭ই মার্চের আবেগময় এবং তেজোদীপ্ত ভাষণের মাধ্যমে ঘুমন্ত বাঙালি জাতির সাথে সাথে বিশ্ব মানবতাকেও বঙ্গবন্ধু জাগিয়ে তুলেন। এমতাবস্থায় পুরো দেশ এবং জাতিকে স্বাধীনতার দাবিতে অবিশ্বাস্য রকমভাবে ঐক্যবদ্ধ করতে সক্ষম হন বঙ্গবন্ধু। এই একটি মাত্র ভাষণেই অধিকার বঞ্চিত বাঙালি জাতির ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে যায়। বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠে উচ্চারিত হয় সাড়ে সাত কোটি বাঙালির দৃঢ় প্রত্যয় ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা এবং অত্যাসন্ন মুক্তিযুদ্ধের দিকনির্দেশনা। সাড়ে সাত কোটি বাঙালির কণ্ঠ একত্রিত হয়ে ঐ দিন মুজিবের কণ্ঠে যেন বজ্রকণ্ঠ রূপে গর্জে উঠে।
৩৫। এমতাবস্থায় ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু কর্তৃক প্রদত্ত ভাষণ তাঁর সুদীর্ঘ সংগ্রাম মুখর জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার আলোকে প্রদান করা হলেও প্রকৃত প্রস্তাবে এই ভাষণ কোন একক নেতার ভাষণ ছিল না। এই ভাষণের মাধ্যমে সাড়ে সাত কোটি বাঙালির বঞ্চিত
হৃদয়ের সঞ্চিত বেদনা, অসংযমিত আবেগ এবং বাঙালির প্রাণের দাবি স্বাধীনতা মহান মুজিবের একটি কণ্ঠ থেকে ধ্বনিত এবং প্রতিধ্বনিত হয়। বর্তমান বাস্তবতার আলোকে অবিশ্বাস্য মনে হলেও একথা সত্য যে, বিশ্বের একাধিক পরাশক্তি সহ অনেক দেশের তৎকালীন সরকার ১৯৭১ সনে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে আমাদেরকে সমর্থন দেননি। কিন্তু তা সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধুর সাবলীল বাক্যচয়ন, অসাধারণ নান্দনিক উপস্থাপনা এবং বাগ্মিতার অভাবনীয় স্ফূরণের মাধ্যমে প্রদত্ত উক্ত ভাষণের মর্মবাণী উপলব্ধি করে ঐ সমস্ত দেশের সাধারণ জনগণ সাড়ে সাত কোটি বাঙালির প্রাণের দাবি স্বাধীনতাকে যথারীতি সমর্থন করেছিল। কেউ স্বীকার করুন কিংবা নাই বা করুন, মহান মুজিবের উপরোক্ত ক্ষুরধার এবং আবেগ তাড়িত ভাষণের মাধ্যমেই তা সম্ভব হয়েছিল বটে।
৩৬। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে শব্দচয়ন, বাক্যবিন্যাস এবং তা উপস্থাপনের ব্যাপারে বঙ্গবন্ধু ৭ই মার্চের ভাষণ প্রদানের সময়ে অত্যন্ত কৌশলী, দূরদর্শী এবং বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছেন। তিনি খুব ভাল করেই জানতেন যে, তাঁর সামান্যতম ভুলের কারণে আমাদের স্বাধীনতার স্বপ্ন অনেক বিলম্বিত হতে পারে কিংবা চিরতরে হারিয়েও যেতে পারে। ১লা মার্চই বঙ্গবন্ধু জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, তিনি ৭ই মার্চ আন্দোলনের নতুন রূপরেখা ঘোষণা করবেন। তাই দেশবাসী আশা করেছিল বঙ্গবন্ধু ঐদিন স্বাধীনতা ঘোষণা করবেন। পাকিস্তান সরকার এবং বিশ্ববাসীর ভাবনাতেও তাই ছিল। আর বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করা মাত্রই নির্বিচারে গণহত্যা শুরু করার নিমিত্তে পাকিস্তান সরকারের সর্বাত্মক প্রস্তুতি ও ছিল। এহেন গণহত্যা শুরু করা হলে জাতিসংঘের নিয়ম অনুযায়ী পাকিস্তান সরকারের কোন অপরাধই হতো না। উপরন্তু বঙ্গবন্ধুকে বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা হিসেবে চিহ্নিত করা তাদের জন্য খুবই সহজ হয়ে যেতো। পাকিস্তান সরকারের এহেন কূটচাল এবং কূটবুদ্ধি সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু পূর্বাপর অত্যন্ত সজাগ এবং সচেতন ছিলেন। তাই তিনি তাদের পাতানো ফাঁদে পা দেননি।
৩৭। ৭ই মার্চের পূর্বাপর পরিস্থিতি সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু সম্যকভাবে ওয়াকিবহাল ছিলেন। ঐদিন পাকিস্তানী গোয়েন্দা সংস্থা (Inter Service Intelligence – ISI) -এর চৌকস এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাগণ পূর্ণ প্রস্তুতি সহকারে এবং সদলবলে রমনা রেসকোর্স
সংলগ্ন ঢাকা ক্লাবের সামনে অপেক্ষমাণ ছিলেন। উপরন্তু পাকিস্তান সেনাবাহিনী ঐদিন আক্রমণের জন্য সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত এবং সতর্ক অবস্থায় ছিল। এমনকি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর তৎকালীন প্রধান জেনারেল হামিদ খান ঐদিন রমনা রেসকোর্সের পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত বটগাছ সংলগ্ন টিলার উপরে একটি কাঠের চেয়ারে বসে বঙ্গবন্ধুর পুরো ভাষণ তার নিজ কানে শ্রবণ করেছেন [দ্রঃ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মারকগ্রন্থ, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২১৫; সূত্রঃ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবঃ কাছে থেকে দেখা-
শাহ্রিয়ার ইকবাল, (অবঃ) অতিরিক্ত সচিব]। এছাড়া ঐদিন পাকিস্তানের বোমারু বিমান এবং হেলিকপ্টার গানশিপ যুদ্ধক্ষেত্রের মতো রেসকোর্সের জনসভাস্থলের উপরে অনবরত টহল দিচ্ছিল। এমতাবস্থায় ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করলে
পাকিস্তান এয়ারফোর্সের উপরোক্ত বিমানগুলো উপর থেকে গুলিবর্ষণ করে লক্ষ লক্ষ জনতাকে হত্যা করত বলেও তিনি (শাহ্রিয়ার ইকবাল) তার উক্ত প্রবন্ধে অভিমত ব্যক্ত করেছেন।
৩৭। পাকিস্তানের স্বৈরাচারী সামরিক সরকার এবং তাদের সেনাবাহিনী ও বিমানবাহিনীর এহেন সর্বাত্মক রণপ্রস্তুতির ব্যাপারে বঙ্গবন্ধু পুরোপুরি অবগত এবং অবহিত ছিলেন। তাই ৭ই মার্চ জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু যদি কোনভাবেই বলতেন- “আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন” অথবা “আজ থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করা হলো” – ঠিক তখনই পাকিস্তান সেনাবাহিনী সর্বশক্তি নিয়ে রেসকোর্সের জনসভাস্থলে এবং ঢাকা শহরবাসীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ত এবং গোলাগুলি শুরু করে দিত। পাকিস্তান সরকারের এহেন যুদ্ধংদেহী মনোভাব ও রণ প্রস্তুতি এবং কূট কৌশল সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু সম্যকভাবে অবহিত ছিলেন
বিধায় জনসভাস্থলে তিনি খুবই সুকৌশলে এবং অত্যন্ত বিচক্ষণতার সহিত তাঁর কালজয়ী ভাষণ প্রদান করেন। এহেন ভাষণ প্রদানকালে উক্ত জনসভায় বঙ্গবন্ধু প্রখর বুদ্ধিমত্তার সাথে চারটি শর্ত আরোপ করেন। তিনি বলেন- ১। সামরিক আইন মার্শাল ল
withdraw করতে হবে, ২। সামরিক বাহিনীর সমস্ত লোকদেরকে ব্যারাকে ফেরত যেতে হবে, ৩। যেভাবে হত্যা করা হয়েছে তার তদন্ত করতে হবে এবং ৪। জনগণের প্রতিনিধির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। সুতরাং প্রকাশ্য জনসভায় লক্ষ লক্ষ লোকের উপস্থিতিতে উপরোক্ত ৪টি শর্ত আরোপ করার মাধ্যমে বক্তব্য প্রদান করায় পাকিস্তান সরকারের দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধুকে বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা হিসেবে প্রতিপন্ন করা কিংবা আখ্যায়িত করা সম্ভব হলো না।
৩৯। ১৯৭১ সনে পাকিস্তানের স্বৈরাচারী প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খানের মন্ত্রিপরিষদে Mr. G W Chowdhury অন্যতম মন্ত্রী ছিলেন। তিনি তার Last Days of United Pakistan -বইয়ের ১৫৮ নং পৃষ্ঠায় বর্ণনা করেছেন- “১৯৭১ সালের ৬ই মার্চ গভীর রাতে ইয়াহিয়া খান মুজিবকে ফোন করেছিলেন এবং দীর্ঘ সময় কথা বলেছিলেন। ঐ সময়ে সর্বত্র প্রচারিত হয়েছিল যে মুজিব ৭ই মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণা করবেন।” একই প্রসঙ্গে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ- দলিলপত্র , পঞ্চদশ খণ্ড -এর ২৬৪ নং পৃষ্ঠায় ড. কামাল হোসেন বলেছেন- “১৯৭১ সালের ৬ই মার্চ গভীর রাতে একজন পাকিস্তানী ব্রিগেডিয়ার ইয়াহিয়া খানের বার্তা নিয়ে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে তাঁর সাথে সাক্ষাত করেছিলেন। ইয়াহিয়া খান অনুরোধ করেছিলেন, বঙ্গবন্ধু যেন পরের দিন ৭ই মার্চ কোন কঠিন সিদ্ধান্ত না নেন” [দ্রঃ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মারকগ্রন্থ, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২১৫; সূত্রঃ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবঃ কাছে থেকে দেখা- শাহ্রিয়ার ইকবাল, (অবঃ) অতিরিক্ত সচিব]।
৪০। ৭ই মার্চের ভাষণটি ছিল নিদারুণ এক যন্ত্রণার বহিঃপ্রকাশ এবং সুদূরপ্রসারী তাৎপর্যপূর্ণ। একই সঙ্গে এই ভাষণটি ছিল মরণপণ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার নিমিত্তে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা। এহেন দিকনির্দেশনা প্রদান করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেন- “…
আর যদি একটা গুলি চলে, আর যদি আমার লোককে হত্যা করা হয়- তোমাদের কাছে অনুরোধ রইল, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলো। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে সব কিছু আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি তোমরা বন্ধ করে দিবে। আমরা ভাতে মারব, আমরা পানিতে মারব। তোমরা আমার ভাই, তোমরা ব্যারাকে থাক। কেউ তোমাদের কিছু বলবে না। কিন্তু আর আমার বুকের উপর গুলি চালাবার চেষ্টা করো না। সাত কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবা না। আমরা যখন মরতে শিখেছি তখন কেউ আমাদের দমাতে পারবে না…।” ইতিহাস প্রমাণ করে যে, পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের প্রশিক্ষিত সেনাবাহিনী সর্বশক্তি নিয়ে যুদ্ধ করা সত্ত্বেও সম্পূর্ণভাবে অপ্রশিক্ষিত বাঙালি
মুক্তিযোদ্ধাদেরকে কোনভাবেই দমাতে পারেননি কিংবা পরাস্ত করতে পারেননি। এমনকি সারা দেশের কোন একটি রণাঙ্গনেই তারা বাঙালি মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে সম্মুখযুদ্ধে পেরে উঠেননি। এমতাবস্থায় জীবন বাজি রেখে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে নয় মাস ধরে বীর বিক্রমে লড়াই করে বাঙালি বীর মুক্তিযোদ্ধারা দেশমাতৃকাকে ঠিকই শত্রুমুক্ত করেছেন এবং দেশের স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছেন।
ড. মোঃ ফজলুর রহমান, সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ (অবঃ), লেখক ও কলামিস্ট
(চলবে)
বি /ইবিটাইমস /এম আর