এস্তোনিয়ান ফরেন ইন্টেলিজেন্স সার্ভিসের প্রধান বলেছেন, রাশিয়া ইউক্রেনের সীমান্তে সৈন্য স্থানান্তর অব্যাহত রেখেছে এবং সম্ভবত দেশটির বিরুদ্ধে একটি ‘সীমিত’ সামরিক আক্রমণ শুরু করবে
আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স জানায়,উত্তরের বাল্টিক সাগরের তীরবর্তী সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন
থেকে স্বাধীন হওয়া দেশ এস্তোনিয়ার ফরেন ইন্টেলিজেন্স সার্ভিসের মহাপরিচালক মিক মাররান বলেছেন,সীমিত আকারের এই রাশিয়ান হামলার মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র বোমাবর্ষণ এবং ইউক্রেনের “প্রধান ভূখণ্ড” দখল অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
এস্তোনিয়ার রাজধানী তালিনে এক সংবাদ মিক মাররান আরও বলেন, “এই মুহুর্তে, আমাদের মূল্যায়ন হল যে রাশিয়ান সৈন্যরা বিশাল জনসংখ্যার শহরগুলি এড়িয়ে চলবে, কারণ এই অঞ্চলগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করতে প্রচুর সৈন্য লাগবে। তবে রাশিয়ান সৈন্যরা কোন উপায়টি কাজে লাগাতে পারে সে সম্পর্কে আমরা এখনও কোনও স্পষ্ট ধারণা করতে পারছি না।
রয়টার্স আরও জানান এস্তোনিয়ান গোয়েন্দাদের মতে, পূর্ব ইউক্রেনের দুটি রুশ-সমর্থিত বিচ্ছিন্ন অঞ্চলের মধ্যে লড়াই আরও তীব্র হতে পারে। এই ধরনের বৃদ্ধি “অত্যন্ত সম্ভাবনাময়” এবং এইভাবে “রাশিয়া সম্ভবত যুক্তিসঙ্গত অস্বীকার যোগ্যতা পাবে এবং নিষেধাজ্ঞাগুলি এড়িয়ে যেতে পারবে বলে ধারণা করছেন এস্তোনিয়ার এই শীর্ষ গোয়েন্দা।
“যদি রাশিয়া ইউক্রেনে সফল হয়, তবে এটি আগামী বছরগুলিতে বাল্টিক অঞ্চলে চাপ বাড়াতে উৎসাহিত করবে,” তিনি বলেছিলেন। “যুদ্ধের হুমকি পুতিনের প্রধান নীতির হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।”গোয়েন্দা প্রধান আরও বলেন, এস্তোনিয়ান গোয়েন্দারা রাশিয়ান সৈন্যদের প্রায় ১০ টি যুদ্ধ দল ইউক্রেন সীমান্তের দিকে অগ্রসর হওয়ার বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছেন। যেখানে ১০০ টি রাশিয়ান সামরিক যুদ্ধ গ্রুপ বা প্রায় ১,৭০,০০০ (এক লাখ সত্তর হাজার) সৈন্য ইতিমধ্যেই মোতায়েন রয়েছে, গোয়েন্দা প্রধান বলেছেন।
এই সংখ্যার মধ্যে সাধারণত ইউক্রেনের আশেপাশের অঞ্চলে মোতায়েন করা সৈন্য, তবে বেলারুশের সীমান্তের সৈন্যরাও রয়েছে যা রাশিয়া ইউক্রেনের সীমান্তের কাছে একটি সামরিক মহড়ার জন্য পাঠিয়েছিল। মাররান বলছেন, কিছু সৈন্য মহড়ার শেষে ২০ ফেব্রুয়ারীর পরে বেলারুশে থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়ে গেছে। যা যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ন্যাটো সামরিক জোটের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য উদ্বেগের কারন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এদিকে ভয়েস অফ আমেরিকা জানিয়েছে,যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন মঙ্গলবার (১৫ ফেব্রুয়ারী) বলেন, ওয়াশিংটন বিশ্বাস করে যে ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের “এখনো সমূহ সম্ভাবনা” রয়েছে এবং তিনি পুতিনের প্রতি আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন অথবা গুরুতর পরিণতির মেনে নিতে হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন।
প্রেসিডেন্ট বাইডেন বলেন,“দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ একটি প্রয়োজনীয় যুদ্ধ ছিল”। “কিন্তু যদি রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণ করে, তাহলে সেটা হবে তাদের নিজেদের বেছে নেওয়া, অথবা কোনো কারণ ছাড়াই যুদ্ধ। আমি এসব কথা বলি উসকানি দেওয়ার জন্য নয়, সত্য কথা বলার জন্য, কারণ সত্য বলা জরুরি। জবাবদিহিতা জরুরি। যদি রাশিয়া সামনের দিনগুলোতে আক্রমণ করে, তাহলে ইউক্রেনকে হয়তো চরম মানবিক মূল্য দিতে হবে, কিন্তু রাশিয়ার জন্য পরিণাম হবে কৌশলগত।
রাশিয়া যদি ইউক্রেনে হামলা চালায়, তাহলে তা আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক নিন্দার সম্মুখীন হবে। বিশ্ব ভুলে যাবে না যে, রাশিয়া অপ্রয়োজনীয় মৃত্যু এবং ধ্বংস বেছে নিয়েছে। ইউক্রেন আক্রমণ করা একটি স্বঘোষিত ক্ষত হিসাবে প্রমাণিত হবে। যুক্তরাষ্ট্র এবং আমাদের মিত্র ও অংশীদারেরা সন্দেহাতীতভাবেই এর জবাব দেবে।”
অন্যদিকে গত মঙ্গলবার রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন বলেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্র এবং তার নেটো মিত্রদের সঙ্গে ইউরোপে ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনা এবং সামরিক অনুশীলন নিয়ে আলোচনার জন্য প্রস্তুত। মস্কো থেকে ইউক্রেন সীমান্তে কিছু সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা আসার পর এ কথা বলেন তিনি।
ইউক্রেনীয় এবং ন্যাটো কর্মকর্তাদের সংশয়ের সঙ্গে গলা মিলিয়ে বাইডেন বলেন, “ভালোই হয়। তবে আমরা এখনো বিষয়টি যাচাই করিনি। রাশিয়ার সামরিক ইউনিটগুলো তাদের নিজস্ব ঘাঁটিতে ফিরে যাচ্ছে কি না সেটাও যাচাই করা হয়নি। প্রকৃতপক্ষে, আমাদের বিশ্লেষকেরা ইঙ্গিত দিচ্ছেন যে তারা অনেকটাই হুমকিজনক অবস্থানে রয়েছে। এবং সত্য কথা হলো এখনো রাশিয়ার ১ লাখ ৫০ হাজারেরও বেশি সেনা ইউক্রেন ও বেলারুশ এবং ইউক্রেনের সীমান্তে ঘিরে রেখেছে।”
কঠিন পরিণতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বাইডেন বলেন, “আমরা রাশিয়ার সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষ চাই না। আমি স্পষ্ট বলেছি যে, রাশিয়া যদি ইউক্রেনে যুক্তরাষ্ট্রকে টার্গেট করে, আমরা জোর করে জবাব দেব। যদি রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্র বা আমাদের মিত্রদের বিরুদ্ধে অসম আক্রমণ করে, যেমন আমাদের কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সাইবার আক্রমণ বা গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলা করলে, আমরা সমুচিত জবাব দিতে প্রস্তুত।”
ভয়েস অফ আমেরিকা আরও জানায়,হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি জেন সাকি বলেছেন, ওয়াশিংটন ও ন্যাটো আশা করছে, রাশিয়া ইউক্রেন সীমান্তে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে তার সেনা হ্রাস করবে।
“আমরা এবং আমাদের অনেক ইউরোপীয় অংশীদার ও ন্যাটো মিত্ররা সাফল্য বলতে যেটা বুঝি…ইউক্রেনের সীমান্তে একটি প্রমাণিত উত্তেজনা প্রশমন অর্থাৎ রাশিয়া সেনা প্রত্যাহার করবে এবং যখন তারা সকলের কাছে, বৈশ্বিক সম্প্রদায়ের কাছে, মিডিয়ার কাছে, জনসাধারণের কাছে এটা স্পষ্ট করে দেবে যে, তারা ইউক্রেন আক্রমণ করবে না এবং তাদের কাজের মাধ্যমে তা প্রমাণ করবে।”
এদিকে গত ১৫ ফেব্রুয়ারী ক্রেমলিনে জার্মানির চ্যান্সেলর ওলাফ শোলজের সঙ্গে সাক্ষাতের পর, পুতিন বলেন, যদিও পশ্চিমা দেশগুলো ইউক্রেন এবং অন্য প্রাক্তন সোভিয়েত রাষ্ট্রগুলোর জন্য সম্ভাব্য ন্যাটো সদস্যপদ বাতিল করার এবং রাশিয়ার নিকটবর্তী পূর্ব ইউরোপে পশ্চিমা সেনাদের ফিরিয়ে নেওয়া সহ মস্কোর মূল দাবিগুলো প্রত্যাখ্যান করেছে, তথাপি তিনি পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে যুক্ত হতে ইচ্ছুক।
রুশ প্রেসিডেন্ট বলেন, মস্কো ন্যাটোর সঙ্গে আস্থা পুনস্থাপনের চেষ্টা করবে, যদিও তিনি জোর দিয়ে বলেন, পশ্চিমাদের অবশ্যই তার প্রধান দাবিগুলোর প্রতি মনোযোগ দিতে হবে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স, ভয়েস অফ আমেরিকা
কবির আহমেদ/ ইবিটাইমস /এম আর