ইফতার অনুষ্ঠানে গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের মধ্যে অস্ট্রিয়ার ফেডারেল প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্ডার ফান ডার বেলেন উপস্থিত ছিলেন
ভিয়েনা ডেস্কঃ মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি ) অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনার ঐতিহাসিক ক্যাসেল কোবেনজলে ইসলামিক রিলিজিয়াস অথরিটি ইন অস্ট্রিয়ার (IGGÖ) উদ্দ্যোগে মুসলিম ও সকল ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের সম্মানে এক রাজকীয় আন্তঃধর্মীয় (ইন্টার ফেইথ) ইফতারের আয়োজন করা হয়।
অস্ট্রিয়ায় বসবাসকারী সকল মুসলমানদের গরুত্বপূর্ণ সংস্থাটির আন্তঃধর্মীয় (ইন্টার ফেইথ) ইফতার অনুষ্টানটি অলংকৃত করেন প্রধান অতিথি হিসাবে অস্ট্রিয়ার মহামান্য প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্ডার ফান ডার বেলেন।
এই ইফতার অনুষ্ঠানে মুসলিম বিশ্বের ৪০ টি দেশের রাষ্ট্রদূতগণ, অস্ট্রিয়ান কূটনীতিক, পার্লামেন্ট মেম্বার ,অস্ট্রিয়ার প্রধান মুফতি মুস্তাফা মূল্লুগ্গলো, অস্ট্রিয়ান ক্যাথলিক চার্চের প্রধান কার্ডিনাল ক্রিস্তফ শোনবর্ন, ইহুদি ধর্মের প্রধান রাবি শ্লোমো হফমাইস্টার। এছাড়াও অন্যান্য ধর্মীয় প্রধান ব্যক্তিবর্গ, অথরিটির সুপ্রিম কাউন্সিল সদস্যগণ, ইসলামিক কমিউনিটির কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ সহ দুই শতাধিক আমন্ত্রিত নারী পুরুষ উপস্থিতি ছিলেন।
ইফতারের পূর্বে এদিনা হুসোভিচ , হেড অফ রিলিজিয়াস অথরিটি অফিস এর সঞ্চালনায় উদ্বোধনী বক্তব্য রাখেন ইসলামিক রিলিজিয়াস অথরিটি ইন অস্ট্রিয়ার প্রেসিডেন্ট তুর্কিশ বংশোদ্ভুত জনাব অমিত ভুরাল। স্বাগত বক্তব্য ভুরাল মহামান্য প্রেসিডেন্টকে তার উপস্থিতির জন্য বিশেষ ভাবে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।
ভুরাল বলেন, “ফেডারেল প্রেসিডেন্ট, আপনি প্রায়শই ঐক্যের ডাক দেন। আজ আমি আপনাকে আশ্বস্ত করতে চাই: অস্ট্রিয়ার মুসলিম সম্প্রদায় নিজেকে এই নিশ্চিততার স্তম্ভ হিসেবে দেখে। আমরা আমাদের আশেপাশের এলাকায় স্বেচ্ছাসেবামূলক সেবার মাধ্যমে এবং আমাদের মাতৃভূমির সামাজিক কাঠামোর মধ্যে অবদান রাখি। একটি সাংবিধানিক রাষ্ট্রে মৌলিক অধিকার এবং নীতি যেমন সমতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রীয় নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করে। এই কারণেই, স্কুলের মেয়েদের জন্য স্কার্ফ নিষিদ্ধকরণ সংবিধানের পরিপন্থী এবং সাংবিধানিক আদালত কর্তৃক পর্যালোচনা করা উচিত।
তিনি আরো বলেন,এই সন্ধ্যায় আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি আইনি বিতর্কের সীমানায় থেমে থাকা উচিত নয়। আমরা এমন একটি পৃথিবীতে বাস করছি যেখানে পরিবর্তন ঘটছে। জলবায়ু পরিবর্তন আমাদের শিশুদের জীবনের ভিত্তিকে হুমকির মুখে ফেলছে, যুদ্ধ নিরীহ মানুষের উপর অবর্ণনীয় দুর্ভোগ ডেকে আনছে।“সব শেষে জনাব ভুরাল উল্লেখ করেন , আমি আমাদের সকলের কাছে কামনা করি যে আমরা আজকের নির্ভরতার কিছুটা অংশ আমাদের দৈনন্দিন জীবনে বহন করি, যাতে আমরা এমন এক সময়ে আশার দূত হয়ে উঠি যখন এটির খুব জরুরি প্রয়োজন।
আন্তঃধর্মীয় (ইন্টারফেইথ) ইফতারে আরো উপস্থিত ছিলেন- তুর্কি, বসনিয়ান, অ্যারাবিয়ান,আলবেনিয়ান, আফ্রিকান ও এশিয়ানদের দশটি ইসলামিক কমিউনিটির চেয়ারম্যানগণ।
অস্ট্রিয়া বাংলাদেশ কমুউনিটির পক্ষে উপস্থিত ছিলেন অস্ট্রিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের মান্যবর রাষ্ট্রদূত তৌফিক হাসান ও ইসলামিক রিলিজিয়াস অথরিটি ইন অস্ট্রিয়ার সুপ্রিম কাউন্সিল মেম্বার ও এশিয়ান ইসলামিক কমিউনিটি এর চেয়ারম্যান বাংলাদেশী বংশোদ্ভুত ইঞ্জিনিয়ার হাসিম মোহাম্মেদ।
উল্লেখ্য যে, ইউরোপের মধ্যে, অস্ট্রিয়া একটি ব্যাতিক্রমধর্মী দেশ। যেখানে ১৯১২ সাল থেকে ইসলাম অস্ট্রিয়ায় সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত একটি ধর্ম। অটোমান বা উসমানীয় সম্রাজ্য কর্তৃক ১৪৬৩ সাল থেকে ১৮৭৮ সাল পর্যন্ত শাসিত ও ১৯০৮ পর্যন্ত অটোমান অঞ্চল হিসেবে স্বীকৃত মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বসনিয়া ও হার্জেগোভিনাকে ১৯০৮ সালে অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্য (১৮৬৭ থেকে ১৯১৮) তাদের অধীনে সংযুক্ত করে।
অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্যের এই অঞ্চলে ৬ লাখ মুসলমান বাস করত, যাদের ধর্মীয় অনুশীলনকে রক্ষা করা জরুরি হয়ে দাঁড়ায়। সেই সময় বসনিয়ান মুসলমানরা সম্রাটের দেহরক্ষী হিসেবে কাজ করতেন, ইমামরা সামরিক চ্যাপ্লেন(ধর্মগুরু) হিসেবে কাজ করতেন। মুসলমানদের ধর্মীয় অনুশীলন রক্ষায়, ১৮৭৪ সালে সম্পাদিত স্বীকৃতি আইন ১৮৭৪ (Anerkennungsgesetz 1874, RGBl. Nr. 68/1874- যা ধর্মীয় সমাজের আইনি স্বীকৃতি) মোতাবেক ১৯১২ সালে অস্ট্রিয়ায় ইসলাম আইনি স্বীকৃতি পায়। ( Art. 15 Staatsgrundgesetz, RGBl. Nr. 142/1867, Art. I Islamgesetz, RGBl. Nr. 154/1912 gesetzlich anerkannt.)
১৯৭১ সালে মুসলমানদের একটি সংস্থা ‘ইসলামী আইন ১৯১২’-এর ধারা মোতাবেক একটি ইসলামিক কমিউনিটি প্রতিষ্ঠা করার জন্য আবেদন করলে, ফলস্বরূপ ১৯৭৯ সালে ‘ইসলামিক রিলিজিয়াস অথরিটি ইন অস্ট্রিয়া’ পাবলিক আইনের অধীনে একটি কর্পোরেশন হিসেবে গঠিত হয়।
অস্ট্রিয়ায় বসবাসকারী তুর্কি, বসনিয়ান, অ্যারাবিয়ান, আলবেনিয়ান, আফ্রিকান ও এশিয়ানদের নেতৃত্বাধীন প্রায় চার শ’ মসজিদ ও ইসলামিক সংস্থার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা প্রধানত ১০টি বৃহৎ ইসলামিক কমিউনিটির (Kultusgemeinde) কেন্দ্রীয় সংস্থা ‘ইসলামিক রিলিজিয়াস অথরিটি ইন অস্ট্রিয়া’।
সংস্থাটি পাবলিক আইনের অধীনে একটি কর্পোরেশন হিসেবে অস্ট্রিয়ায় বসবাসকারী সমস্ত মুসলমানদের ধর্মীয় বিষয়ের সরকারী প্রশাসনের প্রতিনিধিত্ব করে, অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলি নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে স্বায়ত্তশাসনও উপভোগ করে। এটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, অন্যান্য ধর্মীয় সম্প্রদায় এবং অস্ট্রিয়ার নাগরিক প্রতিষ্ঠানের ইন্টারফেস। অস্ট্রিয়ান সকল স্কুলে সংস্থাটি কর্তৃক নিয়োগকৃত ও অস্ট্রিয়ান সরকারের বেতনভুক্ত ইসলামী ধর্মীয় শিক্ষকদের মাধ্যমে ইসলামী ধর্মীয় শিক্ষার ব্যবস্তা করা, ইসলামী ধর্মীয় শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ এবং তাদের চলমান প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা করাসহ মুসলমানদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বহুবিধ কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে।
ইসলামিক রিলিজিয়াস অথরিটি ইন অস্ট্রিয়ার সভাপতিগণ- আহমদ আবদেল রহিমসাই (১৯৭৯–১৯৯৯) ডক্টর আনাস শাকফেহ (১৯৯৯-২০১১)
ডক্টর ফুয়াদ সনাক (২০১১-২০১৬) ইব্রাহিম ওলগুন (২০১৬-২০১৮) আইনবিদ অমিত ভুরাল (২০১৮ সাল থেকে-বর্তমান)
কবির আহমেদ/ইবিটাইমস/এম আর




















