৪৩জন ইরাকি নাগরিককে নিজ দেশে ফেরত পাঠিয়েছে জার্মানি
ইউরোপ ডেস্কঃ মঙ্গলবার (২২ জুলাই) জার্মানির লাইপছিগের (Leipzig) হালে বিমানবন্দর থেকে একটি বিশেষ ফ্লাইটে এসব ইরাকিকে দেশটির রাজধানী বাগদাদে ফেরত পাঠানো হয়েছে ৷ জার্মানির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে জার্মানির সংবাদ সংস্থা ডিপিএ (DPA)।
এ বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে জার্মানির সংসদ নির্বাচনে জয় পায় রক্ষণশীল দল সিডিইউ/সিএসইউ৷ মধ্য বামধারার এসপিডিকে সঙ্গে নিয়ে জোট সরকার গঠন করে তারা ৷ দলটির শীর্ষনেতা ফ্রিডরিশ ম্যার্ৎস চ্যান্সেলর নির্বাচিত হয়েছেন ৷
ক্ষমতায় এসে অভিবাসন ইস্যুতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে ম্যার্ৎস সরকার৷ প্রতিবেশী নয়টি দেশের সঙ্গে থাকা সীমান্তে পুলিশি তল্লাশি জোরদার করার পাশাপাশি সীমান্তে আসা আশ্রয়প্রার্থীদের প্রত্যাখ্যানের মতো কঠোর সিদ্ধান্তও নিয়েছে সরকার ৷
উল্লেখ্য যে,চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির পর অর্থাৎ বর্তমান সরকারের অধীনে এটিই ছিল ইরাকে প্রথম নির্বাসন ফ্লাইট৷ এর আগে এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে জার্মানির আরেক শহর হানোফার থেকে ৪৭ জনকে ইরাকে নির্বাসিত করা হয়েছিল ৷
অভিবাসন ইস্যুতে কঠোর অবস্থান নেয়া জার্মানির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলেকজান্ডার ডোব্রিন্ডট জার্মান পত্রিকা বিল্ড-কে(Bild) দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, এই নির্বাসন ফ্লাইটটি সরকারের নতুন নীতির অংশ ৷ এছাড়াও প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে গতিশীল করতে অন্যান্য দেশের সঙ্গে চুক্তি করা এবং মানবপাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি ৷
কঠোর নিরাপত্তা প্রোটোকল: থুরিঙ্গিয়া রাজ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ইরাকের বাগদাদমুখী ফ্লাইটটি মঙ্গলবার স্থানীয় সময় সকাল ১০টা ৫২মিনিটে পূর্বাঞ্চলীয় শহর লাইপছিগের হালে বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়ন করে৷ বিমানে থাকা ৪৩ ইরাকি পুরুষের সবাইকে জার্মানি ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল ৷
নিজ দেশে ফেরত পাঠানো ইরাকিদের সবাই অবিবাহিত এবং তাদের মধ্যে কয়েকজন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে দোষী সাব্যস্ত হয়েছে বলেও জানিয়েছে রাজ্য কর্তৃপক্ষ৷ এই ৪৩ জনের মধ্যে ১৪ জন থুরিঙ্গিয়া রাজ্যে বসবাস করতেন ৷
সংবাদ সংস্থা ডিপিএ-এর একজন আলোকচিত্রী পুরো বিষয়টি প্রত্যক্ষ করেছেন৷ বিমানবন্দরের রানওয়েতে ব্যবহার করা দুটি বড় বাসে করে পুলিশি প্রহরায় যাত্রীদের বিমানের কাছে নিয়ে আসা হয় ৷ বিমানে তোলার সময় প্রত্যেক ইরাকি নাগরিকের সঙ্গে একজন পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন ৷
বিমানবন্দরের একটি সূত্রের বরাত দিয়ে ডিপিএ জানিয়েছে, বিমানটি বাগদাদে অবতরণের পর যাত্রীদের ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপ পেরোতে হবে ৷ জার্মানিতে থাকার অধিকার হারানো এসব ইরাকি নাগরিককে তাদের নিজ দেশে পাঠানোর ক্ষেত্রে কঠোর নিরাপত্তা প্রোটোকল নেয়া হয়েছিল ৷ তবে, নিজ দেশে পৌঁছার পর তাদের কোথায় নেওয়া হবে, তা তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি ৷
নাজুক পরিস্থিতিতে দেশে ফেরা ইরাকিরা: জার্মানির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর জার্মানি ৮১৬ জন ইরাকিকে ফেরত পাঠিয়েছে ৷ তাদের মধ্যে কিছুসংখ্যক ইরাকিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্যান্য দেশে পাঠানো হয়েছিল ৷ কারণ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে তাদের আশ্রয় আবেদন প্রক্রিয়াধীন ছিল৷ অবশিষ্ট ৬১৫ জনকে সরাসরি ইরাকে পাঠানো হয় ৷
দীর্ঘদিনের যুদ্ধ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ইরাকের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনও উত্তেজনাপূর্ণ৷ বর্তমানে দেশটিতে বড় ধরনের যুদ্ধ না থাকলেও, ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়াসহ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হামলা অব্যাহত রয়েছে ৷ দেশটির উত্তরে কুর্দি গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গেও উত্তেজনা বিরাজ করছে ৷
জাতিসংঘ জানিয়েছে, ইরাকে ১২ লাখ মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত এবং ৩০ লাখ মানুষ মানবিক সহায়তার উপর নির্ভরশীল। যাদের দেশটিতে ফেরত পাঠানো হয়েছে, তাদের পক্ষে নিজের মৌলিক চাহিদা পূরণ করাও কঠিন ৷
২০২৩ সালে ইরাকে ফেরত আসা অভিবাসীদের নিয়ে একটি জরিপ করেছিলো আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা আইওএম৷ জরিপে অংশ নেয়া প্রায় অর্ধেক মানুষ বলেছেন, তারা ছয় মাসের মধ্যে আবারও ইরাক ছেড়ে যেতে চান ৷
আফগানিস্তানেও ডিপোর্টেশন ফ্লাইট: আশ্রয় আবেদন প্রত্যাখান এবং ফৌজদারি অপরাধের জন্য দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর একটি চার্টার্ড ফ্লাইটে জার্মানি থেকে একদল আফগানকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে ৷ ১৮ জুলাই ভোরে লাইপছিগ থেকে পুলিশি তত্ত্বাবধানে তাদের ডিপোর্ট করা হয়েছে ৷
জার্মানির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এদিন নিশ্চিত করেছে, লাইপছিগে হালে বিমানবন্দর থেকে একটি ফ্লাইটে ৮১ জন আফগান নাগরিককে তাদের দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে ৷ এটি ছিল চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ ম্যার্ৎসের নেতৃত্বে নতুন জার্মান সরকার পরিচালিত প্রথম ডিপোর্টেশন ফ্লাইট ৷
একটি পরিসংখ্যান বলছে, আট কোটি ৩৩ লাখ মানুষের দেশ জার্মানির প্রতি ২৫ জনে একজন আশ্রয়প্রার্থী৷ তবে, জার্মানির বিভিন্ন রাজ্য বা অঞ্চল ভেদে এই সংখ্যার তারতম্য হতে পারে ৷
কবির আহমেদ/ইবিটাইমস/এম আর