ঢাকার মিটফোর্ড এলাকায় সোহাগের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনাকে ঘিরে সামাজিক মাধ্যমে সমালোচনার পাশাপাশি বিএনপি ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছে ইসলামপন্থি কিছু দল ও জুলাই আন্দোলনের ছাত্র নেতৃত্বের দল এনসিপির
ইবিটাইমস ডেস্কঃ সোমবার (১৪ জুলাই) বৃটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির বাংলা বিভাগের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,এসব সমালোচনার অনেকটাই করা হচ্ছে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে কেন্দ্র করে।
এমনকি বিএনপির একসময়ের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসাবে পরিচিত জামায়াতে ইসলামীও বিএনপির বিরুদ্ধে সমালোচনার মাঠে রয়েছে।এমন প্রেক্ষাপটে রাজনীতিতে বিএনপি অনেকটা কোনঠাসা হয়ে পড়ছে বলে দেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন। এরফলে দলটির ওপর সাধারণ জনগণের একটা বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে আগামী সংসদ নির্বাচনে দলটিকে বড় ধরনের মূল্য দিতে হতে পারে।
দেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, চাঁদাবাজি, খুন, দখলের মতো কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে বিএনপির বিরুদ্ধে গত বছরের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের
পর থেকেই অভিযোগ অব্যাহত ছিল। কিন্তু সম্প্রতি নানা বিতর্কিত বা অপরাধমূলক ঘটনায় বিএনপির নেতা-কর্মীদের নাম আসায় দলটি বড় ধরনের ভাবমূর্তি সংকট তৈরি হয়েছে।এরই মধ্যে মিটফোর্ড এলাকার হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বিএনপি বেকায়দায় পড়েছেন এবং প্রশ্নের মুখে পড়েছেন দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি এখনও লন্ডন থেকেই দল পরিচালনা করছেন।
যদিও বাংলাদেশে বিএনপির শীর্ষ নেতারা পাল্টা অভিযোগ করে বলেছেন, ‘পরিকল্পিতভাবে তাদের দল ও তারেক রহমানের চরিত্র হননের অপচেষ্টা’ চালানো হচ্ছে। সবমিলিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
এদিকে শুক্রবার (১১ জুলাই) ওই নৃশংস ঘটনার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পরই রাতেই বিভিন্ন জায়গায় চাঁদাবাজির অভিযোগ করে বিএনপি ও তারেক রহমানের সমালোচনা করে মিছিলের পর সামাজিক মাধ্যমে উভয় পক্ষ ব্যাপক প্রচার-পাল্টা প্রচারে জড়িয়ে পড়েছেন।
বিএনপি নেতারা দলটির শীর্ষ নেতা তারেক রহমানের বিরুদ্ধে এসব প্রচারণার জন্য কোনও দলের নাম উল্লেখ না করলেও তাদের কর্মী সমর্থকরা জামায়াত-শিবির ও এনসিপিকে দায়ী করছেন। এমনকী দলটির সহযোগী সংগঠনগুলোর মিছিল সমাবেশ থেকে সরাসরি জামায়াত-শিবির ও এনসিপিকে নিয়ে শ্লোগান দেয়া হয়েছে আজ সোমবারও।
যদিও জামায়াতে ইসলামী বলেছে, এ ধরনের তৎপরতা তাদের দলের কেউ করছে না। আর এনসিপি বলছে “তারেক রহমান যেহেতু বিএনপির একক নেতা, সে কারণে দলের কর্মীদের কর্মকাণ্ডের দায় তাকেই নিতে হবে”।বিশ্লেষকরা কেউ কেউ মনে করেন, বিএনপির সাথে অন্য দলগুলোকে মুখোমুখি করার একটি চেষ্টা অন্য কোনও মহল থেকেও থাকতে পারে। তারা মনে করেন, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের জন্য এমন পরিস্থিতি তৈরির উদাহরণ বাংলাদেশে আছে।
প্রসঙ্গত, রাজধানী ঢাকার মিটফোর্ড এলাকায় হত্যাকাণ্ডের শিকার ব্যক্তিকে ব্যবসায়ী ও যুবদল কর্মী আখ্যায়িত করে এ ঘটনা জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠায় পাঁচ জনকে বহিষ্কার করেছে বিএনপির সহযোগী সংগঠনগুলো।
উল্লেখ্য যে,গত বছরের ৫ই অগাস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকেই সারাদেশে চাঁদাবাজি, দখল ও সন্ত্রাসের বিভিন্ন অভিযোগ বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে আসতে থাকে। দলটি নিজেও অপরাধমূলক ঘটনায় সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে অন্তত ৪ হাজার নেতাকর্মীকে দল থেকে বহিষ্কার করেছে বলে জানিয়েছে।
যদিও দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান শনিবার (১২ জুলাই) ছাত্রদলের এক অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি বক্তব্য দেয়ার সময় ‘সরকারই অন্যায়কারীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছে কি না’, সেই প্রশ্ন তুলেছেন।
হত্যাকাণ্ডের জেরে ঘটনাপ্রবাহ: গত কয়েক মাস ধরেই দেশের বিভিন্ন স্থানে নানা অপরাধমূলক ঘটনায় বিএনপি নেতাকর্মীদের নাম জড়ানোর পর বিভিন্ন মহল থেকে সমালোচনা শোনা যাচ্ছিলো। যদিও দলটির নেতারা অনেক ঘটনায় সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিয়ে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আসছিলেন। কিন্তু তারপরেও দলটি কেন তার কর্মীদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না সেটি বড় প্রশ্ন হয়ে এসেছে।
সবশেষ মিটফোর্ড হত্যাকাণ্ডের ভিডিও শুক্রবার সন্ধ্যা নাগাদ সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হবার পর রাতেই বুয়েট ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের কয়েকটি জায়গায় কোথায় ‘ছাত্র-জনতা’ আবার কোথাও ‘সাধারণ শিক্ষার্থী’ পরিচয় দিয়ে প্রতিবাদ মিছিল বের হয়।
কিন্তু এসব মিছিল থেকে এক পর্যায়ে বিএনপির লন্ডনে থাকা ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিরুদ্ধে স্লোগানও সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয় বিএনপিতে। তারেক রহমানকে নিয়ে ‘কুরুচিপূর্ণ’ স্লোগান দেয়া হয়েছে বলে এর প্রতিবাদ জানিয়েছেন দলটির নেতারা।
এসব মিছিলের যেসব ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে এসেছে সেখানে ‘আগের জুলাইয়ে লীগ তাড়াইছি…এবারে দল তাড়াবো’, ‘হাসিনা গেছে যে পথে, খালেদা যাবে সেই পথে’, ‘ঢাকা না লন্ডন.. ঢাকা ঢাকা’ এবং ‘চাঁদা তোলে পল্টনে… ভাগ যায় লন্ডনে’- এমন সব শ্লোগান শোনা গেছে।
এছাড়া নামে-বেনামে সামাজিক মাধ্যমে ফটোকার্ড দিয়ে লন্ডনে থাকা মি. রহমানের ‘জীবনযাত্রার ব্যয় এবং আয়ের উৎস নিয়েও’ নানা ধরনের প্রশ্ন তোলা হয়েছে।বিএনপির কর্মীরাও তাদের ভাষায় এসব অপপ্রচারের জন্য জামায়াত ও এনসিপিকে দায়ী বা ইঙ্গিত করে পাল্টা প্রচারণা শুরু করে।
আবার বিএনপির সহযোগী সংগঠনগুলোও এর বিরুদ্ধে সক্রিয় হয়ে জামায়াত-শিবিরকে ইঙ্গিত করে ‘গোপন তৎপরতায় অভ্যস্ত একটি গুপ্ত সংগঠন কর্তৃক মব সৃষ্টির অপচেষ্টা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ বিনষ্ট করা এবং সারাদেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির’ অভিযোগ এনেছে।
এসব প্রচার পাল্টা প্রচারে দলগুলো পরস্পরের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি কিংবা অর্থ আদায়ের জন্য নানা কৌশল অবলম্বনের প্রচার- পাল্টা প্রচার করছেন যেখানে, ‘চাঁদাবাজি, ডোনেশন, বাইতুল মাল, হাদিয়া কিংবা বিকাশ’ এমন শব্দগুলো তারা একে অন্যের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করছেন।
কবির আহমেদ/ইবিটাইমস