জাহিদ দুলাল, ভোলা দক্ষিণ : ভোলার লালমোহনে বৃহস্পতিবার দুপুর থেকে শুক্রবার সকাল পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরে সৃষ্টি হওয়া গভীর নিম্নচাপের প্রভাবে প্রচন্ড বৃষ্টি ও বাতাসে এই উপজেলায় ব্যাপক ক্ষতি হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। উপজেলার লর্ডহার্ডিঞ্জ, রমাগঞ্জ, ধলীগৌরনগর, চরভূতা ও পশ্চিম চরউমেদ ইউনিয়নসহ আরও কয়েকটি এলাকায় ২০টি বসতঘর পুরোপুরি বিধ্বস্ত হওয়ার পাশাপাশি আরও অন্তত ৫০০টি বসতঘরসহ বিভিন্ন স্থাপনা আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া উপজেলার লর্ডহার্ডিঞ্জ ইউনিয়নের পূর্ব সৈয়দাবাদ এলাকায় বেড়িবাঁধ ভেঙে দুইটি গ্রাম ও অতিবৃষ্টিপাত এবং জোয়ারের পানির কারণে চরকচুয়াখালী এবং পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের কিছু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এতে প্রায় ১০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। পানিতে ভেসে গেছে পঞ্চাশেরও অধিক পুকুরের মাছ। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রচন্ড বাতাসের প্রভাবে উপড়ে গেছে নানা প্রজাতির গাছপালা। যার ফলে শুক্রবার বিকেল ৪ টায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত উপজেলার অধিকাংশ এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। এসব তথ্য লালমোহন উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানা গেছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, উপজেলার চরভূতা ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের হরিগঞ্জ বাজার সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা গোপাল চন্দ্র রবিদাস। তিনি পেশায় একজন মুচি। বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে তার বসতের জরাজীর্ণ ঘরটি গত ৩ মাস আগে টিন দিয়ে নতুনভাবে তৈরি করেন। তবে সেই ঘরটি এখন দুমড়ে-মুচড়ে পড়ে আছে। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্টি হওয়া গভীর নিম্নচাপের প্রভাবে প্রচন্ড বৃষ্টি ও বাতাসের তাণ্ডবে গোপাল চন্দ্র রবিদাসের টিনশেড ঘরটি পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়ে যায়। বৃহস্পতিবার বিকেলে এ ঘটনা ঘটে। এরপর বৃদ্ধা মা, স্ত্রী আর সন্তানদের নিয়ে রাত কাটিয়েছেন পার্শ্ববর্তী এক প্রতিবেশীর ঘরে। বিধ্বস্ত ঘরটি নতুন করে তোলা নিয়ে এখন এক বুক হতাশা গ্রাস করেছে গোপলকে।
তিনি জানান, মানুষের জুতা সেলাই আর পলিস করে দৈনিক আড়াইশত থেকে তিনশত টাকার মতো আয় করি। এই আয়ে চলে বৃদ্ধা মা ও স্ত্রীসহ দুই সন্তানকে নিয়ে সংসার। গত ৩ মাস আগে বিভিন্ন এনজিও থেকে প্রায় ১ লাখ টাকার মতো ঋণ নিয়ে জরাজীর্ণ বসত ঘরটি টিন দিয়ে নতুনভাবে তৈরি করি। তবে বৃহস্পতিবার বিকেলে হঠাৎ প্রচন্ড বেগে বৃষ্টি ও বাতাস শুরু হয়। এতে আমার টিনশেড ঘরটি ভেঙে দুমড়ে-মুচড়ে পড়ে যায়। তখন অল্পের জন্য পরিবারের সবাই প্রাণে রক্ষা পাই। এরপর রাতে এক প্রতিবেশীর ঘরে বৃদ্ধা মা, স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে আশ্রয় নেই। এমনেতেই আমি ঋণগ্রস্ত, এখন নতুন করে এ ঘরটি কিভাবে করবো, তাই ভেবে কূল পাচ্ছি না। আর ঘর তুলতে না পারলে প্রতিবেশীর ঘরেই বা কতদিন থাকতে পারবো। তাই সরকারের কাছে অনুরোধ করছি; ঘরটি পুনর্নির্মাণের জন্য আমাকে দ্রুত সহযোগিতা করার।
একইদিন বৃষ্টি আর বাতাসের তাণ্ডবে ওই এলাকার উকিন্দ চন্দ্র রবিদাসের ঘরের চালা উড়ে যায়। গাছের ডাল ভেঙে পড়ে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায় একই এলাকার সুবাশ চন্দ্র মজুমদারের ঘরের বারান্দা। এতে তার স্ত্রী শিখা রাণী মজুমদার মাথায় আঘাত পান। উকিন্দ চন্দ্র এবং সুবাশ চন্দ্রও পেশায় মুচি। তারাও ঋণগ্রস্ত। নতুন করে ঘর মেরামতের সাধ্য নেই বলে দাবি তাদের। এজন্য তারা ঘর মেরামতের জন্য সরকারি সহযোগিতা কামনা করছেন।
এ বিষয়ে লালমোহন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. শাহ আজিজ বলেন, আমরা নিয়মিত বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শনের পাশাপাশি খোঁজখবর নিয়েছি। ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। চলমান রয়েছে ত্রাণ প্রদান কার্যক্রম। এ ছাড়া নিম্নচাপের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের তালিকা প্রস্তুতের কাজ চলছে। এই তালিকা শিগগিরই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে। তালিকা অনুযায়ী বরাদ্দ পেলে তা দ্রুত সময়ের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে পৌঁছে দেয়া হবে।
সাগরে নিম্নচাপের প্রভাবে লালমোহনে ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত
